অখণ্ড মানবকল্যাণই সভ্যতাকে রক্ষা করবে // তৈমুর খান

আমাদের ইচ্ছেগুলি বাঁশি বাজাচ্ছে। বাঁশিতে নিজের নিজের মতো সুর। আমরা নিজেদের সুর নিজেরাই শুনি। অন্যকেও শোনাতে চাই। আমাদের আন্তর ধর্মের বিজ্ঞাপন হয়ে যায় সেইসব সুর ।

.

.

     এই কথাগুলি বোঝা কঠিন নয়। মানুষ এক বুদ্ধিবাদী জটিল প্রাণী। জটিল বলেই তার সীমাহীন প্রজ্ঞা। আর এই প্রজ্ঞা আদিমতাকেই বহন করে নিয়ে চলেছে। পশুদের আমরা আদিম হিংস্র বলে থাকি, কিন্তু একথা ঠিক নয়। পশুরা একটা সীমিত জৈবিক তাড়নায় আবদ্ধ। তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম কম দেখা যায়। প্রকৃতিগত কারণেই তারা নিয়ন্ত্রিত ও আবর্তিত।

.

.

তাদেরকে পথ দেখানোর জন্য কোনও আলোক বহনকারী পশুরও আবির্ভাব ঘটেনি। স্রষ্টাও মনে হয় তাদের নিয়ে চিন্তিত নন। কিন্তু মানুষকে নিয়েই বেশি চিন্তিত। বারবার দূত প্রেরণ করে, ধর্মগ্রন্থ প্রণয়ন করেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস টলোমলো। মানুষ এমনই এক শক্তি, যে শক্তির দ্বারা সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে। সভ্যতা বিশৃঙ্খল হতে পারে।

.

.

হত্যা, রক্তপাত, ধর্ষণ সবকিছুই সংগঠিত হতে পারে এবং আজ অবধি তা হয়ে আসছে। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র, পুলিশ, সমাজ ও আইন সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মগুরুরও উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানগুলিই অনাচারে ভর্তি। সেখানেও আদিমতার ভয়ঙ্কর রূপ আড়ালে আবডালে বিরাজ করছে। মনুষ্যত্ব বা মানবিকতার সুমহান আদর্শ গড়ে ওঠেনি।

         মানুষ যদি সবাই এক হয় এবং ঈশ্বরও যদি একজনই হন তাহলে আমাদের সমাজে এত বিভক্তিকরণের প্রয়োগ কেন?

.

.

          ঈশ্বর বা প্রভু নৈবেদ্য পেলে খুশি হন। ধর্মাচরণ বা নাম জপ করলেও খুশি হন। একান্ত আনুগত্য প্রদর্শনে তাঁকে খুশি করা যায়। তাহলে তো ঈশ্বরও মানুষের মতোই কোনও স্বার্থপর প্রাণী। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতিও সংশয় জেগে ওঠে। এই অলীক শক্তিকে এভাবে মান্যতার কিছু পজেটিভ দিক আছে অবশ্যই, কিন্তু ভেবে দেখা দরকার মানুষকে ভালবাসাই সর্বাগ্রে জরুরি কিনা। ওমর খৈয়ামের একটি শায়েরিতে পড়েছিলাম :

.

.

“ধূসর মরুর ঊষর বুকে বিশাল যদি শহর গড়ো

একটি জীবন সফল করা তার চাইতে নয়কো বড়ো।

একটি যদি উদাস হৃদয় বাঁধতে পারো প্রেমের ডোরে

বন্দি শতেক মুক্তিদানের চাইতেও ওযে শ্রেষ্ঠ ওরে।”

.

.

সুতরাং ঈশ্বরকে খুশি করার থেকে বাস্তবের একটা মানুষকেই বাঁচানো অনেক বেশি ধর্মীয় কাজ। এই কাজটি আমরা শিক্ষা করতে পারলে সমাজের অসাম্য ও সংঘাতকে এড়াতে পারতাম। বিবেকানন্দ তাঁর জীবন ও বাণীতে বলেছেন, “পরোপকারই ধর্ম।”

.

.

      আধ্যাত্মিক অনুভূতি এবং ধর্ম এক নয়। আধ্যাত্মিক অনুভূতির মধ্যেও প্রাকৃতিক শক্তির দেখা পাওয়া যায়। শিব-পার্বতীর মিলিত রূপ অর্ধনারীশ্বর। প্রকৃতি এবং পুরুষের মিলন সেখানে। শাস্ত্রীয় এই প্রজ্ঞাকে কবি জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার কবিতায় লিখেছেন :

.

.

“রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর

জেগে থাকে ; তারি নিচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।”

শাক্ত কবি সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্যও লিখেছেন :

“জানো নারে মন পরম কারণ কালী শুধু মেয়ে নয়।

সে যে মেঘের বরণ করিয়া ধারণ কখনো কখনো পুরুষ হয় ॥”

.

.

নারী-পুরুষ অথবা জীবন-মৃত্যু যা হবে হোক, প্রকৃতির স্বরূপেই তা নির্ণীত অভিব্যক্তি মাত্র। বাউলেরা দেহের দেউলেই মনের মানুষকে বাস করতে দেখেছেন। তাঁদের কাছে মানুষের কোনও ভেদ নেই। কিন্তু আমরা সংসারের মধ্যে থেকেও যে বিচ্ছিন্ন আর এক ঈশ্বরের খোঁজ করি এবং ভেদাভেদের অনুগামী হয়ে উঠি তা কি ঠিক?

.

.

          যে সব মহাপুরুষেরা মানব সমাজকে ভাগ করে মানুষে মানুষে ফারাক তৈরি করতে চেয়েছেন তাঁরা সত্যিকারের কোনও মহাপুরুষ নন। রাজনৈতিক কূটকচালিতে মানুষের ঐক্যবদ্ধ মেরুদন্ডকে ভেঙে দিয়েছেন। সভ্যতা তাঁদেরই পন্থায় যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক হানাহানিকে প্রশ্রয় দিয়েছে । সভ্যতার বিরাট ক্ষতি হয়েছে, এখনও হচ্ছে। ইতিহাস তারই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে মানবপন্থাই সকলের কাছে একমাত্র কাম্য।

.

.

দারিদ্র দূরীকরণ, জনবিস্ফোরণ রোধ, বৃহত্তর মানবিক কল্যাণের পথে সভ্যতাকে চালিত করতে না পারলে পৃথিবীকে আর রক্ষা করা যাবে না। মানুষের আদিম প্রবৃত্তির কাছেই লোভ রিরংসার অনুবৃত্তি ফিরে ফিরে আসবে। একদিকে দূষণ, অন্যদিকে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা আমাদের জীবনে নানা অন্তরায় সৃষ্টি করবে। সুতরাং মানবিক কল্যাণের কথা ভেবেই কোনও সম্প্রদায় নয়, ধর্ম নয়, অখণ্ড মানবিক কল্যাণের পথে সভ্যতাকে চালিত করতে হবে। মানুষের মনেও অখণ্ড মানবকল্যাণের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

.

.

তৈমুর খান, কবি ও গদ্যকার।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: