অনন্তের পথে জাদু বাস্তবই কবির আত্মমুক্তির সোপান // তৈমুর খান

ম্যাজিক রিয়ালিজম্, মার্ভেলাস রিয়ালিজম্ এবং ফেবুলিজম্ সব কথাগুলি একই গোত্রের ।  এসবের বাংলা করলে জাদু বাস্তবতা বা মায়া বাস্তবতা কথাগুলি পাই । মানুষের বাস্তব জীবন দুঃখ বিষাদ যন্ত্রণায় পূর্ণ ।  সেখানে না-পাওয়ার হিসেবই বেশি । সেই একঘেয়েমি শূন্যতা এবং ক্লান্ত বিপন্নতা থেকে মুক্তির জন্য একটা আলদা জগতের খোঁজ করে ।

.

 সে জগৎ রূপকথার, কল্পনার, স্বপ্নচারিতার এবং অলৌকিক বা অতিবাস্তবতার জগৎ । এই ধারাটির নামই ‘জাদু বাস্তবতা’ । বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকে সাহিত্য এবং চিত্রশিল্প সম্পর্কে প্রযোজ্য হয়েছিল   । ল্যাটিন আমেরিকায় এর বিস্তার ঘটে । বিশেষ করে মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল অস্টরিয়াস, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ , জর্জ লুইস বার্গেস, ইসাবেল অ্যালেন্দ প্রমুখ সাহিত্যকগণ এই ধারাটির পরিপুষ্ট করেছেন ।

.

 ইংরেজি সাহিত্যে সলমন রুশদি, এলিস হফম্যান এবং বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখের গদ্য সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার দেখা পাওয়া যায় । আর্জেন্টিনার প্রসিদ্ধ লেখক হর্হে লুইস বর্হেস, জার্মানির গুন্টার গ্রাস কিংবা ইংল্যান্ডের আর এক লেখক জন ফাউলসের রচনায় যথেষ্ট জাদু বাস্তবতার উপাদান আছে ।  Matthew Stretcher তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন , “What happens when a highly detailed, realistic setting is invaded by something too strange to believe.”

.

Edward Quinn তাঁর কলিনস অভিধানে উল্লেখ করেছেন ,   “A term referring to fiction that integrates realistic elements with supernatural or fantastics experience.”

.

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাতেই বলতে হলে বলা যায় , রূপকথা, উপকথার ফ্যান্টাসি —  যার অনেকখানি অলৌকিক বা অবিশ্বাস্য বা মিথ্যা, তার সঙ্গে আধুনিক জীবনের বাস্তব বা বিশ্বাসযোগ্য ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ মেলবন্ধন ঘটানোকেই জাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজম্ বলা যায় ।  উপকথা, মিথ, রূপক এবং রূপকথার জগতেই জাদু বাস্তবতার পরিচয় মেলে ।

.

বাংলা কবিতায় এই জাদু বাস্তবতার প্রচলন স্বয়ংক্রিয় ভাবেই ঘটে চলেছে ।  কবিতায় অধরা শূন্যতার জগৎই কবিকে বেশি আকৃষ্ট করে । তাই শব্দ-ছন্দের ব্যাকরণ নিয়ে কবি মাথা ঘামান না ।  ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিয়েও কবির তেমন উৎসাহ নেই । আত্মযাপনের অভিক্ষেপে সর্বদা এক আত্মজগতের বিনির্মাণ চলতে থাকে   ।

.

সেই জগৎ যেমন পোস্ট মডার্ন হতে পারে , তেমনি ফ্যান্টাসির জগৎও । আবার বিষয়কে ত্যাগ করে বিষয়ান্তরে যেতেও কবির আপত্তি নেই ।  সাহিত্যে এও এক বিপ্লব । কবিতা যদি জীবনের আশ্রয় হয় , স্বপ্ন হয়, অধিজগৎ হয় তাহলে কবি তো কবিতাতে মুক্তিই খোঁজেন । এই মুক্তির আবহাওয়াটি এনে দিতে পেরেছে জাদু বাস্তব ।  আমেরিকান কবি Simon Perchik (১৯২৩) তাঁর Mark Rothko, No. 14 কবিতাংশে লিখেছেন —

.

             “you show up late as usual

              need more darkness

               though you wait

               the way each star

                smell from dirt

                 and her eyelids

                 — the mouth you return to

                   is already weeds

                   worn down by the silence

                  that’s lost its balance

                  can’t escape

                   and won’t let go

                   — some nights

                 further than others

                smaller and smaller. “

.

অংশটিতে বিরহ বিধুর এক অন্ধকার রূপকের আশ্রয় যদিও, কিন্তু তার মধ্যেও ইন্দ্রিয় বৈভবের সাযুজ্য আছে   । অপেক্ষার পথে নক্ষত্রের উদ্গম, কিংবা আবর্জনার গন্ধের সঙ্গে চোখের পাতা যা শেষ পর্যন্ত weeds বা শোক পরিচ্ছদ যা কেবল মাত্র বিধবারই হতে পারে ।  কিন্তু সর্বব্যাপী পরিগ্রহ করে আছে স্তব্ধতা । ভারসাম্য হারালেও যা ত্যাগ করে যায়নি । সেই রাত্রি, অনেক দূরের রাত্রি smaller and smaller. দুঃখ বিন্দুর ভেতর দৃষ্টির এই ইল্যুশান তার ব্যাপ্তির সাম্রাজ্য বিধৃত করেছে ।  বাস্তবতাকে ত্যাগ করে নয়, বরং তাকে ভিত্তি করেই কবির বোধের জগৎটি নির্ণীত ।

.

বাংলা সাহিত্যে এই সময়ের কবিতায় জাদু বাস্তবের প্রয়োগ ব্যাপক ভাবেই ঘটে চলেছে ।  আমাদের জাতীয় জীবনের অস্তিত্ব সংকট তথা ব্যক্তি জীবনেও আত্মিক সংকটের সম্মুখীন আমরা  ।এক ধরনের বিমর্ষ চেতনায় নাথিংনেসকেই আমরা লালন করে চলেছি । কিন্তু নাথিংনেস বা এম্পটিনেস জীবনের মূল প্রাপ্য নয়  । রোমান্স বা স্বপ্ন পূরণের বাস্তব রাস্তাগুলি রুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু কাল্পনিক বা ফ্যান্টাসি জগতের ঠিকানা আমাদের মন জানে ।  জ্যোৎস্না রাতে ডানাঅলা কোনো পরির সঙ্গে আমরা যদি সত্যিই পোশাকবিহীন হয়ে উড়ে যাই কার তাতে কী এসে যায় ?

.

নিজেকে সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যতিক্রমী করে তুলতে চাইলে তো জাদু বাস্তবের কাছে আমাদের যেতেই হবে ।  আমাদের দৃশ্যপথ যতই অন্ধকার হোক, সেখানেই প্রাণের নক্ষত্ররা জ্বলে ওঠে । আলো দেয় । সূর্যহীন পৃথিবী আমরা দেখতে পাই । আলোর পৃথিবীও আমরা রচনা করি । এই আলো-আঁধারির গতিরেখার ভেতর কোনোই সামঞ্জস্য নেই ।  মনের জগৎ, চেতনার জগৎ, শূন্য বা অবিরাম দুঃখের জগৎ তো সামঞ্জস্য নিয়ে গঠিত হয় না । সেখানে বিশৃঙ্খলাই বিরাজ করে । আর ঘন ঘন পরিবর্তন হয় । জীবনের উত্তরণ অথবা বিপর্যয়, সফলতা অথবা অসফলতা সবই তার পথ নির্মাণ করে চলে । স্বয়ংক্রিয়তাকেও কবিরা এড়িয়ে চলতে পারেন না ।

.

কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক “মুক্তধারা”র এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন —” আমি কবিতাকে ম্যাজিক রিয়ালিটি মনে করি ।” মনে করার কারণটিও স্পষ্ট । ধ্বংসের মারমুখী সময়ে যে কবিতা লেখা হচ্ছে তা কবির আত্মগত পর্যটন ছাড়া কিছু নয় । নিজেকে বাঁচানোর প্রয়াসেই এই সদর্থক জগতের সৃষ্টি করেছে ।  সেখানে মেটাফোর অলংকারগুলিও নতুন করে প্রয়োগ করছেন কবিরা । যাতে বস্তুতান্ত্রিকতাকে অতিক্রম করে মায়াবাদের প্রক্রিয়াকে সচল করা যায় । বিদ্যুৎ ভৌমিক একটি কবিতাংশে লিখেছেন —

.

“যাবতীয় তরঙ্গ ভেঙে পার্থিব আঙুলে ছুঁই

অপরাহ্নের রোদ !  শেষ রাস্তায় গাছের ছায়াকে দেখি

বিস্মৃতির প্রত্যন্ত গভীরে…

কতবার অন্ধকার সংখ্যাতীত রাতের কাছে বৃষ্টির পরাগ

ছড়ায়, এই পাড়ে এসে নদীর নাম বারবার ভুলে যাই —

ভেতরের সর্বনাশ গোল হয়ে ঘিরে থাকে অন্ধকুঠুরির

নিভৃত দরজা   ! অত্যন্ত নিঃসঙ্গতা নিভৃত অতিথি

এই ঘরে সকল অহমিকা আশ্চর্যভাবে অশরীরী

এই সময় অন্যকোনো ব্যথার মতো পদবীহীন

অথচ এই মন অহর্নিশ ডুবে থাকে মহৎ মৃত্যুতে  ! “

পার্থিব আবহাওয়ায় যে বাস্তব রূপের ভেতর কবির ক্রিয়াসংযোগ ঘটেছে তাতে একে অভিজ্ঞতারই কার্যকারণ রূপ বলা যেতে পারে ।  কিন্তু ‘সংখ্যাতীত রাত’ বলার সঙ্গে সঙ্গে সিমন পার্চিকের need more darkness কথাটি মনে পড়ে যায় । গোল হয়ে ঘিরে থাকা অন্ধকুঠুরির নিভৃত দরজা তো worn down by the silence-কেই নির্দেশ করছে ।

.

 নিঃসঙ্গতার নিভৃত অতিথি, অহমিকার আশ্চর্যভাবে অশরীরী হওয়া এবং সময়ের ব্যথার মতো পদবীহীন হওয়া সবেতেই এক রূপান্তর ঘটে চলেছে । আর এই রূপান্তর যে পরিবর্তন সূচিত করে তা বাস্তবের ভেতরেই সুকৌশলে মায়াবাস্তবের প্রভাব জাত ।  ‘মহৎ মৃত্যু’ যে মহতী হয়ে ওঠে একমাত্র তার কারণেই । নবজীবনের জন্য যে এক্সপ্লোরেশন সম্ভব, নতুনভাবে কবিরা দেখিয়ে দিতে পেরেছেন । উপমা রূপক ছন্দ গীতপ্রবণতা বাদ দিয়েও এক কাব্যভাষাও কবিরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন । জাদু বাস্তবের বীজ তো সেখানেই আছে ।  আমজাদ সুজন একটি কবিতাংশে লিখলেন —

.

” এই সেদিন আমরা দুজনে হাবুডুবু খেলাম আর

প্রেমের কবিতা লিখলাম না বলে ঈশ্বর রেগে গেলেন   ।

বললাম, মহান ঈশ্বর, প্রেমের কবিতা না পড়ে

বরং এবার সত্যি সত্যি প্রেমে পড় — না  !

দুজনেই যেন থমকে গেলাম এমন মহাশূন্যের নীরবতা

 ঈশ্বর যে নিঃসঙ্গ তা আমার মনে ছিল না ,

মনে ছিল না তারও

ঈশ্বর আর পাঠকের মধ্যে এমনই মহাশূন্যময় বিস্ময়   ।

যেন

প্রতিটি কবিতা বহন করে সুস্পষ্ট প্রেমের প্রস্তাব   । “

আমজাদ সুজন এক সংলাপময় চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে অথবা নানা মিথলজির ব্যবহার করে কবিতায় বাস্তবকে অতিক্রম করে যান ।  তাঁর ঈশ্বর আত্মসত্তারই নিরন্তর কোনো রূপ, এই আত্মসত্তাকে তিনি অতিক্রম করে পৌঁছে যান এক মহাশূন্য নীরবতার কাছে ।

.

 কিন্তু can’t escape বরং and won’t let go তাঁর অনুধাবন ক্ষমতা প্রখর বলেই মায়াবাস্তবও পাল্টে যায় ভিন্নতায় । মহাশূন্য বিস্ময় নিয়েই পাঠককে দরজা খোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয় ।  এই সময়ের উজ্জ্বল কবি ব্যক্তিত্ব রনি অধিকারীর কবিতাতেও জাদু বাস্তবের প্রয়োগ যথেষ্ট ঘটতে দেখা যাচ্ছে । ‘ একটি উজ্জ্বল ঘোড়া’ য় তিনি লিখেছেন —

.

  পায়ে হেঁটে ক্রমাগত রাতের আকাশে

   সবুজ মেঘের সিঁড়ি বেয়ে

    একটি উজ্জ্বল ঘোড়া নেমে এলো বুঝি !

    ক্রমশ ঘোড়াটি নাচে চোখের গুহায়  ।

ভীষণ প্রলুব্ধ করে অশুভ আত্মারা

অন্ধকার অক্টোপাসে মৃত্যু বাসা বাঁধে…

মধ্যরাতে অশ্বখুর দ্বন্দ্বে নিরন্তর

জ্বলন্ত চিতায় দেখি মৃত্যুর নোঙর  ।”

.

বিশেষ্য বিশেষণ ক্রিয়াপদ ব্যবহারও মায়াবাস্তবের প্রভাব কতখানি তা রনি অধিকারী দেখিয়েদেন ।  পায়ে হেঁটে আকাশ অতিক্রম করা অথবা সবুজ মেঘের সিঁড়ি বেয়ে ঘোড়ার নেমে আসা, ভীষণ প্রলুব্ধ প্রবৃত্তির জাগরণ টের পাওয়া, সবই অবিমিশ্র স্বয়ংক্রিয় গতিমানতায় ধাবিত ।  ‘কুবলাই খান’ কবিতার মতো অশুভ আত্মাদের নাচ কিংবা অশ্বখুরের ধ্বনি অলৌকিক বা অতিবাস্তবের মোহিনী কাজকেই ত্বরান্বিত করে ।

.

মৃত্যুর নোঙরকে জ্বলন্ত চিতায় দেখা পাওয়া সেই মায়ারই অনুপম ঐশ্বর্য  ।এভাবেই এক মুক্তির সোপানে উত্তীর্ণ হন কবি তবু এক গভীর নৈঃশাব্দিক প্রচ্ছায়া এখানেও থাকে যা worn down by the silence-কেই নির্দেশ করে বিনীত ভাবে । সাম্য ভট্টাচার্য তাঁর ‘অনন্তের গান’ এ লিখলেন আরও এক মুক্তির কথা , যেখানে অনুভূতিই স্বয়ং ব্যক্তি বা চরিত্র হয়ে উঠেছে ।  সময়ও প্রাণময় আধার । অনন্ত অনন্তেই আছে, তবু কবি ব্যক্তিটি কালের সীমানায় মৃত্যুর বৈঠকখানায় তাঁর বোধকে প্রেরণ করেছেন । কবিতাতে সেকথাই —

.

               “নষ্ট রাত্রির ঝরা ফুলের বৃত্ত

                ভেঙে দিতে চেয়ে

                 জীবন বৈঠকখানায় বসে আছে এই শিহরন   ।

              কী অপূর্ব জন্মঢেউ

             এখন ৠতুপাখিরা তোমার আকাশে খেলা করছে

              নীচে বিস্মৃতি বাগানে

             অনন্তের গান মনে পড়ে না আমার  । “

রাত্রি নষ্ট হলেও কিংবা ফুলের বৃত্ত ঝরলেও জীবনের বৈঠকখানায় বসে থাকার শিহরনটি বাস্তবকে অতিক্রম করেছে ।  The wave of birth বা জন্মঢেউ কথাটি অনন্ত প্রবাহেরই ধারক, যা জীবনান্তর পর্যায়ক্রমকে বহন করে চলেছে । ‘ৠতুপাখি’ বা The birds of season যা নবজন্মের মুক্তিকেই ধারণ করে  । বাস্তবের এই খণ্ডিত জীবনে অনন্তের গান মনে না পড়লেও অনন্তের যাত্রী হয়ে ওঠেন কবি ।

.

        প্রতিটি কবিতায় একইভাবে জাদু বাস্তবের প্রয়োগ ঘটে না,  কিন্তু এক মুক্তির দ্রাঘিমা খুঁজে পাওয়া যায় । বাস্তবের জর্জরিত ক্লান্ত সীমিত অচলায়তন থেকে জীবনের বেগ ধাবিত হয় অনন্তের পথে  । প্রতিটি ক্ষণ তাই রূপান্তরের ডাক দেয় ।

.

একটা কবিতা থেকে আর একটা কবিতায় কবির বোধের রূপান্তর ঘটতে থাকে । শুধু বর্ণনা বিবৃতি বা সৌন্দর্যের দিগন্ত উন্মোচন নয়  , কবিতায় সদর্থক আত্মাভিযানের গভীর প্রক্রিয়াটিই জাদু বাস্তব করে থাকে । কখনো কখনো এই কারণেই কবিতাকে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে । কিন্তু জাদুর অন্তরালে জীবনের কাঙ্ক্ষিত সমর্পণ বিলক্ষণ ফুটে উঠতে বাধ্য ।  এই সময়ের এক উল্লেখযোগ্য কবি গোলাম রসুলের একটি কবিতাংশ থেকে উদ্ধৃতি নেওয়া যেতে পারে —

” একটি ব্যথার গরম মুদ্রা ভাসছে আমার পিঠে

 আর পূর্ণিমার চাঁদ থেকে মোটর গাড়ি করে রওনা দিয়েছে আমার হৃদয়

   গন্তব্য একটি নক্ষত্র  “

আর একটি কবিতাংশ এমনই —

       ” প্রাচীন হাওয়া

         মহাকাশে ভোরের গাছ

          সব পাতা নিঃসঙ্গ ঝরে পড়ছে আমার ঘুমের ভেতরে “

গোলাম রসুলের সমস্ত কবিতাই জাদু বাস্তবের তীব্র উদাহরণ  । আত্মবাচক অনুভূতির ভেতর ঘটে চলা প্রক্রিয়াগুলি মহাজাগতিক বিস্ময়ের গতিময় স্বয়ংক্রিয় অভীপ্সা ।  যে চিত্রকল্পগুলির তিনি বিনির্মাণ করেন সেগুলি বাস্তবের কার্যকারণে আবদ্ধ নয় , অথচ বাস্তবের উপাদানেই সেগুলি সক্রিয়তা পায়  । ব্যথার গরম মুদ্রা, পূর্ণিমার চাঁদ থেকে মোটরগাড়ির রওনা দেওয়া আমরা দেখিনি , উপলব্ধি হয়তো করতে পারি, কিন্তু গরম মুদ্রা, পূর্ণিমার চাঁদ এবং মোটরগাড়ি বাস্তবেরই উপাদান   । এগুলির সক্রিয়তা অতিবাস্তবের নিরিখ এনে দিয়েছে ।

.

তেমনি প্রাচীন হাওয়া, মহাকাশে ভোরের গাছ, সব পাতা নিঃসঙ্গ ঘুমের ভেতরে ঝরে পড়ার প্রক্রিয়াও মায়াময় বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে ।  আমাদের মনন কল্পনা এবং অনুভূতির মুক্তি এনে দেয় । বাস্তবে থেকেও অতিবাস্তবে এই যাতায়াত চলতে থাকে । কেননা শুধু বাস্তব কবির কাম্য নয় ।

.

সলমন রুশদি এই কারণেই বলেছেন —”Realism can break a writer’s heart. “(shame). সুতরাং নিজেকে রক্ষা করার তাগিদ থেকেই জাদু বাস্তবের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ।  আবার শিল্পীর এবং শিল্পের পূর্ণতা আনতে, বাস্তবের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাতে, নিজেকে বাইরের সঙ্গে মেলে ধরতে জাদু বাস্তবের প্রয়োগ ঘটাতেই হয় । নিছক বাস্তবতা কখনো শিল্প হতে পারে না । অস্কার ওয়াইল্ড এই কারণেই বলেছেন —

“Art finds her own perfection within, and not outside of, herself.

She is not to be judged by any external standard of resemblance. “

.

শিল্প তখনই প্রকৃত শিল্প হয়ে ওঠে, যখন তার পূর্ণতা ঘটে, শুধু বাইরে প্রকাশ করা নয়  ।বাইরের প্রতিচ্ছায়াকে সে বিচার করে না । শিল্পসত্তার এই পর্যাপ্ত সমৃদ্ধিতেই জাদু বাস্তবের নিয়ত অভিক্ষেপ লক্ষ করা যায় ।  ব্যক্তি হৃদয়ে এই পর্যটন থেকেই শিল্পের মুক্তি সূচিত হয় । নিজের কবিতাতেও এই মুক্তির পর্যাপ্ত অবকাশ দেখতে পাই —

.

                  এসো ঠোঁট, উপোসী কাজল

                 চোখে চোখে বসো,

                  আজ চুম্বন আসবে

                 রাস্তা ছাড়ো,

               রাস্তায় কোনও বৃংহণ রেখো না

            জলীয় প্রশংসায় ভিজে গেছে

            আমাদের নৈঃশব্দ্য মৈথুন

            প্রসবকালের সংবাদ ঘুরেফিরে আসে

.

Rich Sapero এই কারণেই হয়তো বলেছিলেন, “To be free means always leaving… or returning to a place where leaves never fall. ” নিজেকে এভাবেই হয়তো বাঁচিয়ে সযত্ন রাখা সম্ভব  । always leaving যে রাস্তা ছাড়া অথবা রাস্তায় বাস্তবের কোনো গর্জন না রাখা এবং ফিরে আসার মধ্যে where leaves never fall যা প্রসবকালের সংবাদে নির্ণীত হয়েছে । আমাদের জীবনের প্রতিটি অবকাশই জাদু বাস্তবের দ্বারা তার গতি অর্জন করে ।  জাদু বাস্তব ছাড়া কোথাও মুক্তি নেই ।

.

           তবু প্রকৃত শিল্পী ছাড়া জাদু বাস্তবের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে পারে না । কবিকে তাই পৃথিবী ছেড়ে মহাপৃথিবীর অনুসন্ধান করতে হয় ।  আকাশ ছেড়ে মহাকাশে পাড়ি দিতে হয় । জীবন থেকে মহাজীবনের দিকে ধাবিত হতে হয় । কবির পথ অনন্তের পথ । সময়কে অতিক্রম করে মহাসময়ে তার যাত্রা । টি এস এলিয়ট এই কারণেই প্রবহমান জীবনকে এবং প্রবহমান সময়কে ধারণ করেছেন তাঁর কাব্যে  । প্রতিটি ‘বর্তমান’ই চিরন্তন বর্তমান তাঁর কাছে ।

.

মানবজীবনের মহাজটিল পথকে অতিক্রম করে মহাজীবনের দ্বারে উপনীত করেছেন নিজেকে । বিভিন্ন মিথলজির ব্যবহার করে জীবনের সঠিক অবকাশ বা মুক্তিকে চিহ্নিত করেছেন । মোহাবিষ্ট জীবনের প্রেমসংগীত তো সেখানেই —

.

     ” There will be time, there will be time

        To prepare a face to meet the face that you meet.”

আমরা সবাই সেই যাত্রী, কাঙ্ক্ষিত সেই মুখের সমীপেই উপস্থিত হতে চাই  । মোহের মধ্যেই এই মায়াবাস্তবতার দেখা পেয়েছেন প্রুফকও । আমাদের অতীত – ভবিষ্যৎই তো ইল্যুশান তৈরি করে ।  তার অস্তিত্ব জুড়েই বর্তমান, আর সেটাই আমাদের সৃষ্টির কাল । একটা জীবনের সামগ্রিক বোধিকেন্দ্রে এই অস্তিত্বের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় ।  অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কবি তার চলাচল উপলব্ধি করেই কবিতা রচনা করেন ।

.

এই কারণেই Alan W. Watts বলেছেন — “I have realized that the past and future are real illusions, that they exist in the present, which is what there is and all there is.” সময়, ব্যক্তি, উত্তরণ সবকিছুই নির্ভর করে সৃষ্টি হয় real illusions. আর এই ইল্যুশানই মায়াবাস্তবের জগতে পৌঁছে দেয় ।  কিন্তু এই ইল্যুশান কখনো কখনো ভার হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে ।

.

.

Simon Perchik তাই বলেছেন, “It is that illusion that build for the overburdened reader a way out.” সুতরাং জাদু বাস্তবের পথ সকলের কাছেই সুখকর নাও হতে পারে । সিমন পার্চিকের কথাটি অনেকাংশেই সত্যি বলেই হয়তো বাংলা কবিতার পাঠকও কমে আসছে ।

.

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: