অনুগল্প – শিরোনামঃ “রনি ও রিয়া” – কানন কুমার মুখোপাধ্যায়

অনুগল্প -  শিরোনামঃ "রনি ও রিয়া"  -  কানন কুমার মুখোপাধ্যায়
চৈত্র শেষে তমসাচ্ছন্ন দ্বাদশীর সন্ধ্যা। জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের আতঙ্ক রিয়ার চোখে মুখে। জীবনের ভালোলাগা এবং ভালোবাসাগুলো বুঝি শেষ হয়ে গেল। রঙিন স্বপ্নগুলো হয়ে উঠল বিবর্ণ। ঘড়িতে রাত্রি ন’টা বাজার অপেক্ষা। ঘরের বাতি গুলো বন্ধ করে হাতের সুদৃশ্য দিয়াটা জ্বেলে রিয়া এগিয়ে গেল ঝুল বারান্দাটার সামনে। একে একে ফ্ল্যাটের আলো গুলো নিভে গেল। চতুর্দিকে নিকষ কালো অন্ধকার।
নিজেকে আজ বড় অসহায় মনে হচ্ছে তার। ন’টা বাজার সাথে সাথে চতুর্দিকে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে দিয়া, মোমবাতি, টর্চ অথবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো যে আলো বার্তা দেবে সাথে থাকার অঙ্গীকার, যে আলো দুর্লঙ্ঘ্যতাকে অতিক্রম করার আশ্বাস যোগাবে, যে আলো ন্যূব্জ শিরদাঁড়াকে সোজা রাখার প্রেরণা যোগাবে। রিয়ার হাতে প্রজ্বলিত প্রদীপ খানিও যেন সেই যুদ্ধের শরিক হতে চাইছে। সদর্পে ঘোষণা করতে চাইছে এ যুদ্ধের “শেষ হাসি আমরাই হাসবো।”
রনিরও বোধহয় ঈশ্বরের কাছে এটাই প্রার্থনা। রিয়ার সাথে অযাচিত বিচ্ছেদে সেও হয়ে পড়েছে ম্যুহমান। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির স্বপ্নগুলো মুছে গেছে জীবন-প্রবাহ থেকে। তারও চিরন্তন অপেক্ষা জীবন যুদ্ধের শেষ হাসিটা হাসার। দিয়া জ্বালিয়ে আজকের লড়াইটা তাই শুধু প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, এ লড়াই রনি এবং রিয়ার ভালোবাসার মান্যতার লড়াইও বটে।
বাল্যকাল থেকে গড়ে ওঠা দুজনের ভালোলাগা কখন যেন মনের অবচেতনে পূর্ণতা পেয়েছে ভালোবাসায়। অন্তরঙ্গতা পেয়েছে সম্পর্ক। উষ্ণতা, উত্তাপ অথবা শীতলতার স্পর্শ উপভোগ করেছে উভয়েই। ডাহুক-ডাহুকীর মত মিলনের প্রত্যাশায় রত হয়েছে দুজনে। পারিবারিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করেই তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল অসম প্রেমের যুদ্ধে “শেষ হাসি আমরাই হাসবো।”
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো ছ’টা মাস। ‘দিয়া’ জ্বালার শক্তি অথবা ‘একলা চলার’ শপথ নিয়ে বিশ্ব জয়ী হতে পেরেছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে। বিশ্ব ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক চলার ছন্দ। স্বজন হারানোর বেদনা অথবা মৃত্যু মিছিলের স্মৃতি স্তিমিত হয়ে এসেছে মানুষের মনে। আজ প্রকৃতি হাসছে। মন্দির মসজিদ অথবা গির্জায় দেখা গেছে স্বাভাবিক জনস্রোত। জীবন-প্রবাহ চলতে শুরু করেছে আপন গতিতে।
রনি এবং রিয়াও পূর্ণ করতে পেরেছে একসাথে থাকার শপথ নিয়ে শেষ হাসি হাসার প্রত্যাশা। হ্যাঁ, আজ ওরাও হাসছে! ফুলের মালায় সজ্জিত দেওয়ালে টাঙানো তাদের নির্বাক দুটো প্রতিকৃতি হাসছে, শুধু হাসছে। এ হাসি তৃপ্তির হাসি, এ হাসি বিজয়ীর হাসি।
এ হাসি অবিনশ্বর। পারিবারিক অনুশাসন যেখানে তাদের বঞ্চিত করলো শেষ হাসি হাসার আকাঙ্ক্ষাকে, সে হাসি তারা খুঁজে নিল জীবনের শেষ পরিণতিতে।আবার একটা বছর পরে দিয়া এবং মোমবাতি জ্বলে উঠেছে। আজকের দিয়াটা রনি অথবা রিয়ার হাতে নেই। তাদের অবস্থান দিয়ার অপর প্রান্তে। দিয়ার এপ্রান্তে অশ্রুসিক্ত প্রিয়জনেরা। সামনে অবস্থান করছে রনি এবং রিয়ার শেষ হাসির প্রতিকৃতিটুকু।
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: