অলীকপুরের লোককথা // পর্ব – ৪ // সুব্রত মজুমদার

120

.

                                 উকিল রজত রায়ের বাড়ি।   রজত রায়ের ছেলে সাহেব, সামনেই কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা তার। বই নিয়ে বসে আছে, কিন্তু পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র মন নেই। সামনেই অলীকপুরের যাত্রানুষ্ঠান। বাপের কাছে আবদার করেছিল একটা পার্টের। টাকা নয়, পয়সা নয়, সামান্য একটা পার্ট – – তাও দিল না। মুখ ব্যাজার করে পড়তে লাগল বাংলা সাহিত্যে লোকশিল্পের অবদান ।

                 ঠিক এসময় হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকলেন উকিলবাবু।  বাড়িতে ঢুকেই হাঁক পড়লেন, ” সাহেব ..সাহেব ! , কই রে.. গেলি কোথায় ?

ঘরের ভেতর থেকে সাহেবের উত্তর এল,” পড়ছি। কেন কি হল ? ভটচাজ্ কাকাকে ডাকতে যেতে হবে তো !… ও আমি পারব না। “

রজত রায় ঘরের ভেতরে ঢুকেই ছেলের কানে একটা রামমোচড় দিয়ে বললেন,” লেখা পড়া শিখিয়ে তোমাকে এই মানুষ করছি ! বাপের মুখের উপর না বলা !”    এরপর কানটা ছেড়ে দিয়ে গলা একটু নরম করে বললেন, ” একটু হাতিডোবায় যেতে হবে, পঞ্চানন ডাক্তারের কাছে। টর্চটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ো।”

      অন্যদিন হলে সাহেব বাবার মুখের উপর না বলে দিত, কিন্তু আজ সে না-সূচক কোনো কথাই মুখে আনল না। কারনটা হল তিন্নি। পঞ্চানন ডাক্তাররের মেয়ে তিন্নি। সাহেবের ভারি পছন্দ তিন্নিকে। তিন্নি অবশ্য এখনো হ্যাঁ বলেনি তবুও সাহেবের মনে আশা আছে যে তিন্নি একদিন ওকে হ্যাঁ বলবেই ।

      পিতার আদেশ শিরোধার্য করে উকিল বাপের শ্রবণকুমার সন্তান বেরিয়ে পড়লেন হাতিডোবার উদ্দেশ্যে । হাতিডোবা হতে অলীকপুর বেশিদূর নয়। খুব বেশি হলে আড়াই কিলোমিটার। তবুও এই অল্প রাস্তাটুকুও সাহেবের কাছে অনন্ত পথ বলে বোধ হল। তার মনে শুধু একটাই বাসনা, একটাই কামনা – – তিন্নিকে একঝলক দেখতে পাওয়া। হাতিডোবা আর অলীকপুরের মধ্যে যা শত্রুতা তাতে তাদের ভালবাসাকে ভালচোখে দেখবে এমন মানুষ দুই গ্রামে নেই।

              সাহেব ছুটে চলেছে, – হাতে তার তিন সেলের টর্চ। কিছুদূর যাবার পর ব্রিজের কাছে সাহেব থেমে গেল। ব্রিজটি একটা ক্যানেলের উপরে নির্মিত হয়েছে। ব্রিজ পেরিয়েই সাহেবের মনে হল  কেউ যেন পাশের ঝোপ হতে তাকে লক্ষ্য করছে। সাহেব  রাস্তা হতে একটা আধলা ইঁট তুলে নিয়ে ঝোপের দিকে ছুড়ে মারল। সহসা একটা আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভরে উঠল । পাশের গাছটিতে  ঘুমন্ত বকগুলো জেগে উঠে কলরব জুড়ে দিল। কেউ কেউ তো আবার বাঁসা ছেড়ে বেরিয়ে এসে কি ঘটল তার পরীক্ষায় মনোনিবেশ করল।

                     ঝোপ হতে বেরিয়ে এলেন জগদীশ দারোগা। দারোগাবাবু একটা চোরের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। পথিমধ্যে গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে তিনি হেঁটেই অলীকপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ব্রিজের কাছে আসতেই পেটটা গুড়গুড় করে ওঠে। তাই রাস্তার পাশের ঝোপেই বসে যান। পেট সাফ হবার আগেই সাহেব দারোগাবাবুর উপর হাত সাফ করে বসে।

দারোগাবাবু  শরীরের অর্ধেকটা ঝোপের ভেতর রেখেই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ” কে রে ! মাই কা লাল হলে এগিয়ে আয়। জগদীশ দারোগার সঙ্গে পাঙ্গা ভারি পড়বে রে হারামি !”

আরো যা যা বলল তা শোনার মতো নয়। বিপদ বুঝে সাহেব টর্চ নিভিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল। পেছনে তখনও জগদীশ দারোগার চিল চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

কিছুটা এগিয়ে যেতেই দারোগাবাবুর গাড়িটা নজরে পড়ল সাহেবের। সাহেব দেখল ড্রাইভার সিটে বসে বসে ঘুমোচ্ছে। ড্রাইভারকে এড়িয়ে যাবার জন্য সাহেব মাঠে নেমে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর আবার রাস্তায় উঠে এল সাহেব। হাতিডোবা গ্রামের শুরুতেই চণ্ডীমণ্ডপ। সাহেব চণ্ডীমণ্ডপের কাছাকাছি যেতেই একটা কাশির আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়াল। চণ্ডীমণ্ডপের সামনে বসে থাকা কুকুরগুলোও একসাথে চেঁচাতে লাগল। সাহেব ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে হুশহাশ শব্দ করে কুকুরগুলোকে  তাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল ।

” কে যায় ? দেখতো সুভাষ, চোর ছ্যাঁচড় কিনা।”   রসিকদাদু কাশতে কাশতে উঠে বসেন।

সুভাষখুঁড়ো অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে বসেন। তারপর মাথার কাছে থাকা তেলচকচকে লাঠিটা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। রসিকদাদুও সুভাষখুঁড়োর সঙ্গ নিলেন। এরই মধ্যে অন্যরাও জেগে উঠেছে। সবাইকে একসাথে আসতে দেখে সাহেবের আত্মারাম খাঁচাছাড়া।

সুভাষখুঁড়ো সাহেবের দিকে লন্ঠন উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে হে ছোকরা ! এদিকে কোন মতলবে ?”

সাহেবের মুখ দিয়ে ভয়ে আওয়াজ বেরোল না। সে জানে হাতিডোবার লোকেরা অলীকপুরের চরম শত্রু। এত রাতে অলীকপুরের কোন ছেলেকে আয়ত্তে পেয়ে ছেড়ে দেবে না। আজ সবাই মিলে মনের সুখে তার পিঠে হাতসাফ করবে। ভাবতেই ভয়ে কেঁপে ওঠে সাহেব।

রসিকদাদু বার দুয়েক কেশে নিয়ে বললেন, ” এ নিঘ্ঘাত চোর। ও সুভাষ, তুমি বরং জগদীশ দারোগাকে খবর দাও। আর ততক্ষণ এই ব্যাটা চোরকে বেঁধে রাখা হোক চণ্ডিমণ্ডপে।”

সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো। রাজি হলেন না কেবল মহান্তজী। তিনি বললেন, ” পেটের দায় বড় দায় বাবা। ওকে পুলিশে দিয়ো না। হরির সংসারে কেউ না খেয়ে থাকবে আর কেউ খেতে পারছে না বলে অপচয় করবে, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না বাবা। তুমি ভয় পেয়ে না চোর বাবা, আমি আছি। আমি থাকতে কেউ তোমার উপর অন্যায় করতে পারবে না।”

সাহেব দেখলো যদি পুলিশে দেয় তবে জগদীশ দারোগা ঠিক পেট হতে কথা বের করে ফেলবে। তখন ঢিল মারার জন্য উল্টো করে টাঙ্গিয়ে মারবে। তাই সত্যি সত্যি বলে দেওয়াটাই মঙ্গল। কথায় আছে না, – ‘সচ্ বোলনে সে রাহত হ্যায়’ ।

সাহেব বলল,” আমি সাহেব, অলীকপুরের উকিল রজত রায়ের ছেলে।আমি চোর টোর নই ।”

সুভাষখুঁড়ো বললেন, “তাহলে এত রাতে এখানে কি করছ বাছাধন ? হাতিডোবার কি সর্বনাশ করতে এসেছ ?”

মহান্তজী বললেন, “আহাহা ! ছেলেটাকে ধমকাও কেন ! ওকে থামের সাথে বেঁধে রাখো। আমি সর্বজীবে প্রেম বিলাই, কেবল অলীকপুর বাদে। ওই অলীকপুরে বিয়ে করেই আমার কাল হল। “

রসিকদাদু মহান্তজীর দিক তাকিয়ে বললেন,” তখন শুনেছিলে আমার কথা ? বার বার বলেছিলাম মেয়ে না জুটলে বিলেত হতে মেম এনে দেব তবুও অলীকপুরের মেয়ে বিয়ে করো না। এখন আর আফসোস করে কি হবে ? “

সুভাষখুঁড়ো এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,” যা করবার সেটা ঠিক করো। অনেকদিন পর অলীকপুরের কাউকে বাগে পেয়েছি, ছাড়া চলবে না। হাতের সুখ করে নেবো। “

বিপদ বুঝে কাঁদো কাঁদো হয়ে সাহেব বলল,” আমি আসতে চাইনি। বাবা জোর করে পাঠিয়েছে। “

রসিকদাদু বললেন,” তা তো পাঠাবেই ! না পাঠালে কি হয় ! তোমার বাবার উকিলি বুদ্ধি, কাকে কি করে বাঁশ দিতে হয় তা তোমার বাবা ছাড়া ভালো কে জানেন বলো ! “

… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *