অলীকপুরের লোককথা // পর্ব – ২ // সুব্রত মজুমদার

123

হাতিডোবায় যখন পুরুষসিংহেরা আটচালা অবলম্বন করেছে তখন অলীকপুরের চণ্ডীমণ্ডপে চলছে যাত্রাপালার রিহার্সাল। একজন শুঁটকো মতো লোক দেহের তুলনায় ভারি একজোড়া গোঁফ নিয়ে যাত্রার পাট বলছেঃ
কি আশে প্রবিশে রাম কনক লঙ্কাপুরে
অজ কভু পশে কিরে শার্দূলের ঘরে ?
মিটাইব রণসাধ ভিখারী রাঘবে
সাজ তাই ত্বরা করি রণসাজে সবে।

মাঝখানে বসে থাকা মাছি গোঁফওয়ালা প্রম্পটার রাবণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ” তা যাই বল ভাই অবিনাশ, আমি তো চিন্তায় মরে যাচ্ছি এটা ভেবে যে তোমার ওই দুবলা পাতলা শরীরে দশটা মাথার ভার নিতে পারবে কিনা। “
অবিনাশ প্রম্পটাররের দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “মেলা বকোনা তো ! চারফুট গতরে ছ’ফুট গোঁফ, তাও আবার হিটলার মার্কা। পর পর তিন তিনখান পালা ফ্লপ হয়ে গেল, কোথায় ছিল তোমার মুরোদ ? হাতিডোবার ডোবায় ডুবে মরা উচিত তোমার। “

এরপর দুজনের কথা কথান্তর হাতাহাতির রুপ নিল। বেগতিক দেখে হনুমানবেশী চঞ্চল চাকলাদার দুজনকেই বগলদাবা করে জোরজবস্তি বসিয়ে দিল। তবুও দুজনের আক্রোশ কমল না। বসে বসেই একে অপরকে বাছা বাছা বাক্যবাণে বিদ্ধ করতে লাগল।
প্রম্পটার রজত রায় তর্জনি ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে তার মাছি গোঁফকে বার দুয়েক তা দিয়ে নিলেন। অবশ্য এটা ঠিক গোঁফে তা দেওয়া বোঝায় কিনা তা বলা শক্ত। এরপর রজত রায় বলল, “বুঝলে চাকলাদার, এখানে শিল্প-সাহিত্যের বোঝদার খুব কমই আছে। সর্বক্ষণ একটাই চেষ্টা – নিজের ঢাক কিভাবে পেটানো যায়। নাও শুরু কর।”

]
চাকলাদার শুরু করল,
” দুর্মতি দশানন এবে পাবে দরশন কৃতান্তের, মম গদাঘাতে;
শির তব করি চূর্ণ করিব গোধূমচূর্ণ লুচি গড়ি খাইব প্রাতে।
এখনো সময় আছে সীতা দাও রাম কাছে নতুবা নিশ্চিত মরন
আসিছেন রঘুপতি এবে তব দুর্গতি, – কে ঠেকাব তোমার শমন !
ওরে ব্যাটা নরাধম.. ঈ.. ঊ.. আ… খ্রি…… ঈঈঈঈঈ…..

হনুমানের গলায় বিজাতীয় শব্দসম্ভার শুনে সবাই একটু অবাক হল। রজত রায় চারপাঁচ বার বইটা দেখে নিলেন । না এমন ডায়ালগ তো নেই কোত্থাও নেই । এরই মধ্যে হনুমানরুপী চাকলাদার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তার মুখ দিয়ে শুধু ‘শি-শি’ শব্দ বের হচ্ছে, – মায়েরা তাদের বাচ্চাদের প্রস্রাব করাবার সময় ঠিক যেমন আওয়াজ করেন। চাকলাদারের চোখ বন্ধ।
অবিনাশ ঘোষ এতক্ষণ রাগে গজগজ করেছিলেন, ব্যাপার দেখে তিনিও রাগ দুঃখ ভুলে রজত রায়কে বললেন, ” রজতদা, কি হলো বলুন তো ? চাকলাদারের মতো হাট্টাগোট্টা ছেলে….”
রজত রায় গম্ভীর গলায় বললো, ” নিঘঘাৎ মৃগি।”

…. চলবে

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: