অলীকপুরের লোককথা পর্ব – ৬ // সুব্রত মজুমদার

212

জগদীশ দারোগার রসিকদাদু আর পঞ্চানন ডাক্তারকে জোর করে জিপে তুলে নিলেন। জিপে বসেই তারা দারোগাবাবুকে সমস্ত বৃত্তান্ত খুলে বললেন। দারোগাবাবু সমস্ত কথাশুনে একটু নরম হলেন। তিনি বললেন, ” তাহলে প্রথম ঢিলটা ওই ছোঁড়াটাই মেরেছে। ওকে আমার কাছে হ্যাণ্ডওভার করবেন। আর আপনাদেরকে অলীকপুরে নামিয়ে দিচ্ছি চলুন।”

               জগদীশ দারোগা রসিকদাদু আর পঞ্চানন ডাক্তারকে অলীকপুরের চণ্ডীমণ্ডপে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। যাবার সময় সাহেবের সব বৃত্তান্ত রজত রায়কে জানিয়ে দিয়ে গেলেন। এবং বলে গেলেন,” আচ্ছা ছেলে তৈরি করেছেন মশাই। আর একটু হলে আমার ছবিতে মালা ঝুলে যেত। “

রজত রায় কাঁচুমাচু হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু জগদীশ দারোগা তাতে কর্ণপাত না করে গাড়ি স্টার্ট করে দিলেন। রসিকদাদুও তাদের শর্তের কথা জানালেন । এতে রজত রায় কোন মন্তব্য করলেন না। তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

     ওদিকে হাতিডোবার লোকেরা অলীকপুরের লোকেদের উপর বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। তারা রসিকদাদুদের বেরোনোর আধঘণ্টা পরেই বাছা বাছা ষণ্ডামার্কা লোক পাঠিয়েছে অলীকপুরে। কোনোরকম বেগতিক দেখলেই রসিকদাদু আর পঞ্চানন ডাক্তারকে ঘাড়ে করে নিয়ে আসবে হাতিডোবায়।

                             পঞ্চানন ডাক্তার স্টেথস্কোপ বাগিয়ে হরি ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গেলেন। হরি ডাক্তারের বুকে স্টেথস্কোপ বসানো মাত্র সাপ বাবাজী পুরাতন আশ্রয় ত্যাগ করে পঞ্চানন ডাক্তারের জামার নিচে আশ্রয় নিল। হরি ডাক্তার কাটা গাছের মতো পড়ে গেলেন ও সঙ্গে সঙ্গে মূর্ছা। আর পঞ্চানন ডাক্তার দুই বাহু তুলে নিতাইগৌর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ সবকিছুর উপরে লক্ষ্য রাখছিল হাতিডোবার কম্যাণ্ডোবাহিনী । তারা পঞ্চানন রসিকদাদু আর ডাক্তারকে তুলে নিয়ে দে ছুট।

                                                – – ৪–

                        সকাল হতেই মহান্তজীর আশ্রমে প্রায় মেলা বসে গেছে। গ্রামের ছেলে বুড়ো বৌ-ঝিরা এসে ভিড় জমিয়েছে আশ্রমের প্রাঙ্গণে। তিন্নির আজ কাজের শেষ নেই, – আগত লোকজনের ভিড় সামাল দেওয়া, বাপের স্ট্যাচুতে ঝাড়পোঁছ করা, অলীকপুরের ছেলেটাকে দেখাশোনা করা, আরো কত কি। আজ তার বসার সময় নেই।

                 অন্যদিন মহান্তজীর আশ্রমে লোক আসে নামগান করতে, আর আজ সবাই এসেছে পঞ্চানন ডাক্তারের স্ট্যাচু দেখতে। গোটা গ্রামে রটে গেছে যে অলীকপুরের লোকেরা ম্যাজিক করে পঞ্চানন ডাক্তারকে স্ট্যাচু করে দিয়েছে। গ্রামের লোকেরা সাহেবের উপর খুব রেগে আছে, একবার সুযোগ পেলেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে একদম। আর তার সাথে যোগ দিয়েছেন মহান্তজী। মহান্তজী মাঝে মাঝেই সাহেবের কাছে আসছেন আর মধুর স্বরে জিজ্ঞেস করছেন, ” গোবিন্দের কৃপায় সব ঠিকঠাক আছে তো বাবা ? তোমার পিসি যদি আমাকে একটু বুঝত…. গোবিন্দ !.. গোবিন্দ !!…”

            রসিকদাদু ব্যাপার-স্যাপার দেখে রাত্রেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। সকাল থেকেই রসিকদাদুর মাঝে মাঝে জ্ঞান আসছে, আবার তিনি “ঊরিব্বাস !!! ” বলে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। তার শিয়রের পাশেই বটেশ্বর ওঝা বসে আছে ঝাঁটা আর শুকনোলঙ্কা নিয়ে। জ্ঞান হলেই ভুত ঝাড়বে রসিকদাদুর।

        সুভাষখুঁড়ো রসিকদাদুর কপালে হাত রেখে বিজ্ঞের মতো কিছু পরীক্ষা করলেন। তারপর উদাস গলায় বললেন, “একেবারে মেরে রেখেদিয়েছে গো অলীকপুরের শয়তানগুলো !”

বটেশ্বর বলল, ” যা বলেন কত্তা, আমিও ছাড়বো না বলে রাখলাম কিন্তু।”   বটেশ্বরের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল মনে হয় যেন গড়িয়ে পড়ল। অনেকেই লক্ষ্য করল, আবার অনেকেই অবিশ্বাস করে বলল, ” বটেশ্বরের মতো ঘুঘু লোক বিনা স্বার্থে কাঁদবে ! যে ভুতের শরীর হতেও তেল নিংড়ে নেয় তার চোখের জলে বিশ্বাস হয় না। “

  করালির মা সত্তর-আশি বছরের বৃদ্ধা, সে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এসে খুনখুনে গলায় বলল, ” রসিকঠাকুরপো বরাবরই ধাতপাতলা, তুলারাশি তো…। তা ও বাবা বটা, রসিকঠাকুরপো বাঁচবে তো রে ? “

বটেশ্বর তার মাথার ঝাঁকড়া চুল নাড়িয়ে বলল,” অলীকপুরের সবকিছুর কাটান আমার কাছে আছে কাকি। তুমি দেখতেই থাকো না কি করি আমি।”

জ্ঞান হবারমাত্র রসিকদাদুর দৃষ্টি গেল  বটেশ্বরের মুড়ো ঝাঁটার দিকে, রসিকদাদু আবার চোখ বুজলেন। এইভাবে যতবার রসিকদাদু চোখমেলেন ততবারই আবার চোখ বুঝতে হয়। এইভাবে বটেশ্বর বিরক্ত হয়ে উঠল। সে আর রসিকদাদুর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করল না। মন্ত্র বলতে বলতে ঝাঁটা চালাতে লাগল।

             অলীকপুরের শালিখ জোড়া ঘুরে বেড়ায় সারা পাড়া,

              মাছি মশা পচা ব্যাঙ রসিকদাদুর বেতো ঠ্যাং

      সেই ঠ্যাঙে বসল মশা, মশার এবার শেষের দশা।

        বটেশ্বরের খিলের ঝাঁটা দে দমাদম এক্কাশিটা,

        তাতেও যদি না দেয় রা শুকনা মরিচ লে আ।

মন্ত্রযুক্ত ঝাঁটার প্রভাবে রসিকদাদু উঠে দাঁড়ালেন। পিঠে বুকে সর্বাঙ্গে তার ঝাঁটার কাঠি ফুটে চিনচিনে জ্বালা। রসিকদাদু বিচক্ষণ মানুষ, তিনি জানেন এসময় বটেশ্বরের বিরোধিতা করলে বটেশ্বর স্বমহিমা বজায় রাখতে আবার আসুরিক চিকিৎসা শুরু করবে, তাই তিনি এমন ভাব করলেন যেন এইমাত্র একডজন প্রেতাত্মা তার শরীর থেকে বেরিয়ে গেল।

রসিকদাদু  বললেন, “আমি কোথায় ?”

বটেশ্বর ধুনুচিতে শুকনো লঙ্কা দিতে যাচ্ছিল কিন্তু রসিকদাদুর আচমকা সুস্থ্য হয়ে যাওয়াতে সে লঙ্কাগুলো নামিয়ে রাখল। তারপর একগাল হেঁসে সবার উদ্দেশ্যে বলল, ” দেখলেন তো সবাই, এই বটেশ্বর ওঝাকে ভয় পায় না এমন ভুত ভূভারতে নেই। চলুন এবার ডাক্তারের চিকিৎসা করি। “

সবাই চলল উৎসাহী হয়ে। আশ্রমের একটা ঘরে একপাশে হাতমুখ বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে চেয়ারম্যান হয়ে বসে আছে রজত উকিলের একমাত্র বংশপ্রদীপ শ্রীমান সাহেব। আর সাহেবের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পঞ্চানন ডাক্তারের মেয়ে তিন্নি। সাহেবের দৃষ্টিও অপলক।

   ঘরের আরেকদিকে স্টেথস্কোপ গলায় প্লাস্টার-অফ-প্যারিসের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পঞ্চানন ডাক্তার। বটেশ্বর প্রথমে তিন্নি আর সাহেবের কাছে এসে একবার সাহেবের দিকে তো একবার তিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। তারপর চোখ কচলে মেঝেতে বসে পড়ল। একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, ” উচাটন। এর কাটানও আমার কাছে আছে, তবে পরে। আগে ডাক্তারবাবুকে চেকআপ করি।”

… চলবে

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: