অলীকপুরের লোককথা // শেষ পর্ব // সুব্রত মজুমদার

123

আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে এল। অলীকপুরের বাহিনী রজত রায়, চাকলাদার আর হরি ডাক্তারের নেতৃত্বে রওনা দিল। হরি ডাক্তারের হাতে কিরিচ। কিরিচ হল একরকমের তরোয়াল যা ফাঁপা বাঁশের ভিতরে ঢোকানো থাকে। প্রয়োজনে লাঠি অংশটি একজন ও তরোয়ালটি আরেকজন ব্যবহার করতে পারে। হরি ডাক্তার নিয়েছেন ঘুমের ওষুধ ভর্তি ইঞ্জেকশন। আর অন্যান্যদের হাতে তেল মাখানো লাঠি।

হাতিডোবার লোকেরাও পিছিয়ে নেই। সাহেবকে পিছমোড়া করে বেঁধে আগে আগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার পেছনে কত্থক নৃত্যরত বটেশ্বর ওঝা। শেষের সারিতে কর্ণেল সরকার, মহান্তজী, রসিকদাদু, সুভাষখুঁড়ো ও অন্যান্যরা ।

কর্ণেল সরকারের পরনে মিলিটারি পোষাক, হাতে দোনলা বন্দুক । মহান্তজী কর্ণেল সরকারের পেছন পেছন আসছেন ইষ্টনাম জপ করতে করতে। তার মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। তিনি এক একবার হুঙ্কার ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, আবার কর্ণেল সরকারের পেছনে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন। সুভাষখুঁড়ো একটা রামদা নিয়ে ঘোরাচ্ছেন আর ‘লড়াই’ ‘লড়াই’ বলে চিৎকার করছেন। রসিকদাদু সবার পেছনে চলেছেন তার প্রিয় রূপো বাঁধানো লাঠিটি নিয়ে। সবে মিলিয়ে লড়াইয়ের একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেছে।

ডাকু ছপ্পর সিংও পিছিয়ে নেই। সে তার দলবল নিয়ে তৈরি হয়ে আছে। যে কোনো সময় রওনা দেবে। টেনশনে ছপ্পর সিংয়ের বড় বাইরে যাওয়ার ডিউরেশন কমে গেছে। ছকুয়া বন্দুক হাতে এক একবার লাফিয়ে উঠছে। ছপ্পর সিং তার বিশাল পাগড়ি ঝাঁকিয়ে গর্জন করে উঠল, “কাউকে ছাড়বোনা। বটেশ্বর আমি আতা হুঁ। তোকে ছোড়তা নেহি।”

তিন দিক হতে তিনটে দল মার্চ করে এগিয়ে যেতে লাগলো। সবার মনেই চরম উত্তেজনা। ক্যানেল ব্রিজের কিছু পরে একটা নিম গাছের তলায় অলীকপুরের দল থামল। রজত রায় বসে পড়লেন গাছের তলায়। হরি ডাক্তার স্টেথস্কোপ লাগিয়ে রজত রায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিলেন।

হাতিডোবার দল নিমগাছ হতে অনেকটাই দূরে। দূর থেকে তারা আন্দাজ করতে পারলো যে গাছতলায় কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। মশালের আলো দেখে রসিকদাদু বললেন, ” এ তো ছপ্পর সিংয়ের দলবল মনে হচ্ছে। কোথাও বোধহয় ডাকাতির পরিকল্পনা আছে। আমাদের সাবধানে পা ফেলতে হবে। কি বল কর্ণেল ?”

কর্ণেল বললেন, “আমরা আলো নিভিয়ে ঝোঁপের আড়ালে আড়ালে ওদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াব। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। এমনও তো হতে পারে ওরা আমাদের গ্রাম লুঠ করতেই জড়ো হয়েছে। “

কর্ণেলের কথায় সবাই সন্মতি জানাল। কেবল মহান্তজী নিমরাজি হলেন। তিনি বললেন,” এ পথটা ভালো নয়। সাপখোপ থাকতে পারে। আমি অন্ধকারে একপাও যাবো না। “

সবাই বিপদে পড়লো মহান্তজীকে নিয়ে। শেষে রসিকদাদু রেগে গিয়ে বললেন,” ওকে এইখানেই ছেড়ে দিয়ে চল। বাঘে শেয়ালে ছিঁড়ে খাক। এমন লোক মাইরি বাপের জন্মেও দেখিনি।”

দলের সবাই এগোতে শুরু করলে মহান্তজীও পেছন ধরলেন। সকলে ধীর পায়ে নিমগাছের পেছনের ঝোঁপের পেছনে হাজির হল। ইতিমধ্যেই হাতিডোবার মতো অলীকপুরের বাহিনীও আলো নিভিয়ে চলার নীতি নিয়েছে। কারন তারা কিছুক্ষণ আগেই একটা দলকে এগিয়ে আসতে দেখেছে। হঠাৎ করে কি করে দলটা অদৃশ্য হয়ে গেল তা হরি ডাক্তারের মাথায় ঢুকছে না।

   এমন সময় ছপ্পর সিংয়ের দল নিমতলার কিছুটা দূরে এসে হাজির হল।  বড় বাইরে পেতেই  ছপ্পর সিং পাশের ঝোপের দিকে দৌড় দিল। দলের এক নতুন ডাকাতের প্রশ্নের উত্তরে ছকুয়া বলল, ” টাট্টি ফিরনে গেয়া। হর আধা ঘণ্টে মে সর্দারকো টাট্টি আতা হ্যা।”

 কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও হাতিডোবার দল নিমতলাতে সঠিক কি হচ্ছে তা বুঝতে পারল না। কর্ণেল সরকার বলল, “আমাদের আক্রমন করে দেওয়া উচিত। এরা যেই হোক ভালো লোক নয়।”

রসিকদাদু ডান হাত তুলে তর্জনি উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,” আক্রমণ !! “

  সাথে সাথেই হাতিডোবার বাহিনী অলীকপুরের বাহিনীকে আক্রমণ করে দিল। আতর্কিত আক্রমণে অলীকপুরের  বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে গেল। অমাবস্যার অন্ধকারে কেউ কারোর মুখ  দেখতে পাচ্ছে না। রজত রায়ের হাত হতে কিরিচটা পড়ে গেল। রজত রায় অন্ধকারে হাঁতড়ে হাঁতড়ে কিরিচ খুঁজতে লাগলেন। এমন সময় হরি ডাক্তার এসে রজত রায়কে এক চড় মারল। ডাক্তার অন্ধকারে রজত রায়কে বিপক্ষ দলের ভেবে নিল।

রজত রায় হরি ডাক্তারের ধুতি ধরে টান মারতেই ধুতি খুলে চলে এল। রসিকদাদু তার লাঠি তুলে চোখ বন্ধ করে হাওয়ায় বাড়ি মারতে লাগলেন । দু’তিনটে বাড়ি ব্যর্থ হওয়ার পর সামনের জমাট অন্ধকার হতে ‘মা গো’ বলে চিৎকার ভেঁসে এল। রসিকদাদু গলার স্বরটা চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, ” সুভাষ নাকি ? আমি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না বাবা।”

সুভাষখুঁড়ো আর্তস্বরে বললেন, “তা বলে খুঁড়ো তুমি আমাকে মারবে !”

অন্ধকারে যে যাকে পারল  মারল।  কারোর পরনের ধুতিটা নেই তো কারোর বাঁধানো দাঁতের পাটি খুলে পড়ে গেছে। সবেমিলে জগাখিঁচুড়ি অবস্থা। নিমতলাকে মহাভারতের স্ত্রীপর্বে উল্লিখিত যুদ্ধক্ষেত্রের মর্মন্তুদ দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। পার্থক্য কেবল একটাই এখানে কেউই নিহত বা সিরিয়াস আহত নয়।

       ছপ্পর সিংয়ের দলবল নব্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ লক্ষ্য করছিল। অন্ধকারে রথিমহারথিদের কেবল চিনতে পারেনি। এবার তারা পেট্রোম্যাক্স জ্বেলে নিমতলায় হাজির হল। পেট্রোম্যাক্সের আলোয় এখন নিমতলা আলোকিত হয়ে উঠেছে। সব রথিমহারথিরা একে অপরকে চিনতে পেরে ও নিজেদের মূর্খতায় লজ্জ্বিত হল। ছপ্পর সিং রাগ সম্বরণ করতে না পেরে ছুটে গিয়ে বটেশ্বরকে এক চড় মারে। আর তখনই সাপটি বটেশ্বরের আলখাল্লা হতে বের হয়ে ঝোঁপে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ছপ্পর সিং বলল, ” চলরে ছকুয়া, এরা আপসে লড়ে নিক। পরে আসবো।”

ছকুয়া বলল, ” এ লোক কিউ আপসমে লড়তা..”

ছপ্পর সিং আর দলবল চলে গেল। যাবার আগে বটেশ্বরের জটা রামদা দিয়ে কেটে নিয়ে গেল।

       রজত রায় উঠে চিৎকার বললেন, “আপনারা শান্ত হন, আমি সবকিছু বুঝিয়ে বলছি।”

রজত রায় আদ্যোপ্রান্ত গুছিয়ে বললেন। সব শুনে রসিকদাদু বললেন, “আমরাও অমানুষ নই বাবা। তোমার ছেলেকে আমরা সঙ্গেই এনেছি। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েগেছে আর কি। তবে এখন থেকে আমরা দুটো গ্রাম একসাথে মিলেমিশে থাকব।”

হরি ডাক্তার বললেন,” আমরাও তাই চাই। কি বলেন মহান্তজী ?”

মহান্তজী বললেন, “আমার একটা প্রস্তাব আছে।”

রজত রায় বললেন,” কি প্রস্তাব ? “

মহান্তজী বললেন,” সাহেব বাবা আর তিন্নি মায়ের চারহাত এক করে দিলে একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠবে দুই গ্রামের ভেতরে। “

সুভাষখুঁড়ো বললেন, “ছেলের মতটাও তো দরকার। কি বল সাহেব বাবা ? “

সাহেব লজ্জ্বায় মাথা নিচু করে রইল। রজত রায় বললেন, ” ও রাজি হবে না ওর ঘাড় হবে। ওর আবার মত কি। আমি এই বিয়েতে মত দিচ্ছি। “

                           – – নটে গাছটি মুড়োলো–

এরপরে যা হল তা ভালোই হল। এক শুভক্ষণে সাহেব আর তিন্নির চারহাত এক হয়ে গেল। দুই গ্রাম পেটভরে ভোজ খেল। বিয়েতে ছপ্পর সিংও এসেছিল, তবে ডাকাতির জন্য নয় সে এসেছিল দলবল নিয়ে বিবাহ উৎসবে যোগ দিতে। ছপ্পর সিং সজল চোখে বলল, “আমার তো কোনো মেয়ে নেই, আমি তিন্নির কণ্যাদান করতে চাই।”

এ প্রস্তাবে কেউ গররাজি হল না। দুই গ্রাম বিভেদ ভুলে এক হয়ে গেল। ভোজ যা হল তা অনবদ্য। মেনু করেছেন স্বয়ং মহান্তজী। মেনুতে কি কি ছিল ?

রোষো বলছি….

            কল্যাণীয় সাহেব ও কল্যাণীয়া তিন্নির বিবাহ উৎসব

            বিবাহ বাসর :- হাতিডোবা

             রাত্রি আট ঘটিকায় বিবাহ অনুষ্ঠান ও প্রীতিভোজ

            অতিথি আপ্যায়নে ব্যাঞ্জনসমূহ :

        চাটনি সহযোগে মৎস্যের বড়া।

          মশলা ঘৃত ও বাদামাদি সংযোগে ভর্জিত অন্ন।

        গান্ধারদেশস্থ চানা সহযোগে পনিরের ব্যাঞ্জন।

          শুভ্র অন্ন।

       রোহিত মৎস্যের মস্তকচূর্ণ সহযোগে মুগসূপ।

       পঞ্চ সব্জি সহযোগে সুস্বাদু ব্যাঞ্জন।

        আলু সহযোগে অহিফেনবৃক্ষবীজ প্রস্তুত ব্যাঞ্জন।

        তরুণ অজ মাংস / রোহিত মৎস্য।

         পঞ্চফলাদি প্রস্তুত চাটনি।

       বারিপূর্ণ সন্দেশমিষ্টান্ন।

        রসগুলিকা।

        পরমান্ন।

        পাঁপড়াদি।

       গুবাকাদি সহযোগে মুখশুদ্ধি।

সকলে উপস্থিত থাকিয়া নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করিয়া বাধিত করিবেন।

                                       – শুভমস্তু-

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: