অসহযোগ // সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

432

কলেজ থেকে ফিরে ইস্তক ভুবনবাবু দেখছেন স্ত্রী শিখাদেবীর মুখখানা অমাবস্যার অন্ধকার মাখা। সুদীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে এই দৃশ্যের অবতারণা বহুবার ঘটেছে, ভুবনবাবু প্রমাদ গুনলেন, এটি আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস! যাইহোক ভুবনবাবু সাবধানতা অবলম্বন করলেন এবং বেশ ভাবনাচিন্তা করেই উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে মনে মনে এই সাব্যস্ত করলেন। যদিও এখনো আদৌ জানেন না ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতটা ঠিক কি?

আমাদের ভুবনবাবু প্রফেসর ভুবনমোহন ভট্টাচার্য, ছাত্রমহলে পরিচিত বিএমবি বলে, সহকর্মীদের কাছে ভটচাজ বা ভটচাজদা হিসেবে, বর্তমান পাড়ায় মাষ্টারমশাই ডাকে, দেশের বাড়ির গাঁয়ে ভোব্না নামে, শ্যালক শ্যালিকাদের কাছে ভুমোনদা ও শ্বশুর শাশুড়ির স্নেহময় ডাকায় ভুবনবাবাজী হলেও গভীর রাতে বন্ধ দরজার পিছনে স্ত্রী শিখাদেবীর মুখে বোমভোলা এই আদুরে নামটাই কিন্তু আমাদের ভুবনবাবুর বড্ড প্রিয়।

ওসব ধান ভানতে শিবের গীত রাখা থাক, বরং খোঁজ করে দেখা যাক শিখাদেবীর  মুখশশী অন্ধকারের রহস্য! অহোরাত্র ঝগড়াঝাটি হলে কি হবে ভুবনমোহন ভট্টাচার্য কিন্তু স্ত্রীকে চক্ষে হারান। যদিও আড়ালে মন্দলোকেরা নিন্দে করে ভুবনবাবুকে স্ত্রৈণ বলে, তবু্ও ভুবনবাবুকে বেজায় ঈর্ষাও করে তাঁর অনিন্দ্যসুন্দরী স্ত্রীর কারণে।

অতিবড় নিন্দুকেও শিখাদেবীর রূপের খুঁত খুঁজে বের করতে পারে না। আর এইটেই শিখাদেবীর তুরুপের তাস! নইলে কি আর টেনেটুনে দুবারের চেষ্টায় মাধ্যমিক পাশ শিখাদেবীর সাথে সম্বন্ধ করে বিবাহ হয় পিএইচডি ডিগ্রিধারী কলেজ প্রফেসর ভুবনবাবুর? অত্যন্ত সাদামাটা চেহারার কিঞ্চিৎ ঘনশ্যাম বর্ণ, ঈষৎ নেয়াপাতি ভুঁড়ি এবং বিরল কেশযুক্ত খর্বকায় ভুবনবাবুর বাড়ির লোকেরা কিছুতেই শিখাদেবীর মতো রূপসী পাত্রীকে হাতছাড়া না করে শুভদিনে শুভক্ষণে শুভলগ্নে শুভদৃষ্টি করিয়ে চারহাত এক করিয়ে দিলেন। আর শিখাদেবীর বাবা-মা মেয়েকে সৎপাত্রস্থ করার  আহ্লাদে আটখানা, জামাই শ্বশুরালয়ে  সকলের চোখের মণি। সেই থেকে এই সহধর্ম পালনের সহযাত্রা চলছে।

যথার্থ সুন্দরী সহধর্মিনীর কিঞ্চিৎ উষ্মাও ভুবনবাবুর যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সুতরাং স্ত্রীর মুখে অমাবস্যার অন্ধকার দেখে যে যারপরনাই চিন্তিত হয়ে পড়বেন তাতো বলাই বাহুল্যমাত্র। আজকাল বাবা-মায়ের এই খুনসুটি দেখে কর্পোরেট চাকুরে মেয়ে জামাইও ভুবনবাবুর লেগপুলিং করতে ছাড়ে না।

এবারের এই মান অভিমান পালা কোথায় গিয়ে থামবে তা এখনো ভুবনবাবু বুঝতেই পারছেন না, রাগ হোক বা অভিমান তার কারণটাই তো এখনো অজানা, অন্যান্য সময়ের মতো এবারে এখনো গর্জন বর্ষণ নেই, আর এটাই ভয়ঙ্কর ভীতিজনক। মেয়েকে একবার ফোন করবেন ভাবলেন, যদি কিছু সূত্র দিতে পারে। পরক্ষণেই একটু লজ্জাও পেলেন। তার থেকে বরং যা থাকে কপালে, সরাসরি শিখাদেবীকেই জিজ্ঞাসা করবেন।

কাজের মেয়েটি চা-জলখাবার নিয়ে আসছে, পিছনে শিখাদেবী। গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলতে শুরু করবেন এমন সময় শিখাদেবী ঠকাস করে একটা লালরঙা বড়সড় মাপের কার্ড সেন্টার টেবিলের উপর রেখে চলে গেলেন। শিখাদেবী টিভি চালিয়ে বসে পড়েছেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় কম্পমান হাতে বুক  ঢিপঢিপ নিয়ে কার্ডখানা খুললেন, কিন্তু খুলে দেখার পর ভুবনবাবুর গলা ফাটিয়ে হাসতে ইচ্ছা হলেও নিজেকে সামলে নিলেন।

এই কার্ডের সাথে স্ত্রীর রাগ বা ক্ষোভ বা অভিমানের সম্পর্কটা আন্দাজ করতে পারলেও, পুরোটা ঠিক বোঝেন নি এখনো। কাজেই সময় নেওয়া সমীচীন মনে করলেন, অন্যথায় অগ্ন্যুৎপাতের ঠেলা সামলানো দায় হতে পারে, চুপিচুপি মেয়েকে ফোন করে অফিস ফেরত আসতে বলে দিলেন।

শিখাদেবী একেবারে মেয়ের সামনে মুখ খুললেন, চেনা পরিচিত সব্বাই কুড়ি বছর, পঁচিশ বছর, তিরিশ বছর, পঁয়ত্রিশ বছর নানান রকম ধূমধাড়াক্কা করে বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করছে আর তাঁদের আজ পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বর বা কালীঘাটে পুজো দিতে যাওয়া ছাড়া আর কোনদিন কোনও উদযাপনের কথাটুকু পর্যন্ত ওঠে নি, সবসময় কেবল নানান ছুতোয় এই বিষয়টিকে ভুবনবাবু এড়িয়ে গেছেন শুধুমাত্র খরচের ভয়ে, এটিই শিখাদেবীর অভিযোগ।  পাড়ার বিশ্বাসবাবুদের তিরিশ বছরের বিবাহবার্ষিকী পালনের নিমন্ত্রণ কর্তাগিন্নী এসে ওই কার্ড দিয়ে করে গেছেন। আর ঠারেঠোরে টিপ্পনী কাটতেও ছাড়েন নি।

মেয়েজামাই ভুবনবাবুকে বলল, অবশ্যই একটা গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন হওয়া দরকার, এবং আসছে অ্যানিভার্সারীটাই সেলিব্রেট করা হোক সবাইকে নিয়ে বেশ জমজমাট করে। আমতা আমতা করে ভুবনবাবু শেষমেশ রাজীই হয়ে গেলেন আর কেমন একটু লজ্জালজ্জা মুখ করে মেয়ে জামাইয়ের ওপর অনুষ্ঠানের সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে দিলেন।

মেয়ে এবার  মাকে জড়িয়ে মায়ের গাল টিপে আদর করে বলল, হাতে প্রায় মাস নয়েক সময় আছে, সুতরাং চিন্তার কিচ্ছু নেই, দুর্দান্ত সেলিব্রেশনের আয়োজন করে সব আত্মীয় বন্ধু প্রতিবেশী সক্কলকে তাক লাগিয়ে দেওয়া যাবে যাতে করে শিখাদেবীর মনে আর কোনো ক্ষোভ না থাকে। শিখাদেবী হতভম্ব,  সবকিছু এত সহজে মিটে যাওয়াতে চেঁচামেচি করার কোনো সুযোগই পেলেন না দেখে।

রাতে শোবার সময় ভুবনবাবু কিছু একটা বলতে যাবেন এমনসময় শিখাদেবী আলো নিভিয়ে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লেন, এখনো মুখে কোনো কথা নেই। ভুবনবাবু বললেন স্ত্রীর কথা তো তিনি মেনেই নিয়েছেন, তাছাড়া এই বিষয়ে তো আগে কখনো কোনো আলোচনাই হয় নি, তবু্ও স্ত্রীর অসহযোগ আন্দোলন কেন? এইবার শিখাদেবী ফেটে পড়লেন, হানিমুনটা পর্যন্ত হয় নি, আর তিনি কিনা স্ত্রীর মতামতের কোনো অপেক্ষা না করেই মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে বসে সেলিব্রেশনের যাবতীয় কার্যকলাপ স্থির করে ফেললেন !

এবার শিখাদেবী ইনিয়ে বিনিয়ে বিলাপ করে চলেছেন, কেউ কখনো তাঁর মতামতের গুরুত্বই দেয় না ( যদিও সংসারে তাঁর অমতে কুটোটি নাড়বার ক্ষমতা কারুর নেই ) , আবার শুরু করলেন, নইলে নিজের বাবা-মা কখনো তাঁর মতো ডাকসাইটে সুন্দরী মেয়েকে ভুবনবাবুর মতো লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়! এবার ভুবনবাবুর বড্ড আঁতে লাগলো, কিন্তু বাস্তবিকই তিনি স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন তাই আর কথা না বাড়িয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করলেন।

মাস কয়েক পরে ভুবনবাবুর রিটায়ারমেন্ট, ফেয়ারওয়েল এর পরেও ঘরে খুব বিশেষ থাকেন না, কোথায় কোথায় ঘোরেন কে জানে? শিখাদেবীও সেদিন রাতের ঘটনা মনে করে একটু অস্বস্তিই বোধ করেন, সবকথা মেয়েকে বললেও সেরাতের ঝগড়ার কথাটা বলতে কেমন যেন মুখে বেধেছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে একটা শৈত্য বিরাজ করছে।

অবশেষে বিবাহ বার্ষিকীর দিন উপস্থিত, অতিথি অভ্যাগতে বাড়ি সরগরম, নির্বিঘ্নেই সব মিটলো, যথেষ্ট রাত হয়েছে, মেয়ে জামাই সব সামলে ভীষণ ক্লান্ত, শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে। এমন সময় ভুবনবাবু খুব অপ্রস্তুত লজ্জা লজ্জা মুখে মেয়ে জামাইকে বললেন রাত একটা বাজে, তখনই ভুবনমোহনবাবু স্ত্রীকে নিয়ে বেরোবেন এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, কারণ ভোর তিনটেয় দিল্লীগামী ফ্লাইটের রিপোর্টিং টাইম, দিল্লী হয়ে আমেরিকা যাচ্ছেন তাঁরা, হানিমুনে!

মেয়ে জামাইয়ের বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই ভুবনমোহনবাবু সস্ত্রীক অপেক্ষারত ট্যাক্সিতে চেপে বসেছেন। মেয়ে জামাই হাত নেড়ে একসাথে উচ্চারণ করল, “অসহযোগ!”

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *