অসাধারণ // তৈমুর খান

একটি গদ্য কবিতা

312

অসাধারণকে কখনও চোখে দেখিনি , আজ খুব কাছে থেকে দেখলাম ওকে । ওর পেছন পেছন অনেকদূর হেঁটে এলাম, তারপর অসাধারণ একটা ট্যাক্সি চেপে অদৃশ্য হয়ে গেল। কী মিষ্টি গন্ধ, কী শ্যাম্পু করা চুল, চুলের ঢেউ, কী ছন্দোময় হাঁটা  ! দেখতে দেখতে শুঁকতে শুঁকতে আমি আর আমি ছিলাম না । আমি কী যেন হয়ে গেছিলাম ।

     অত সুন্দর নাক , অমন কাজল-ভোমর চোখ , ধনুক-বাঁকা চোখের ভ্রু , লাল ঠোঁট, ঠোঁটে লেগে থাকা কী মিষ্টি হাসি, আহা এমনটি আর কখনও দেখিনি !

      মাজা দুলে দুলে হাঁটা, চিকন নাভির নিচে গভীর ঊরু-সন্ধি , ব্লাউজের ফাঁকে পিছল মৎস্যপিঠ , সুললিত হাতে নির্ভার দুটি শাঁখা, কপালরাঙা ঝিলিক মারা সিঁদুর , দেখতে দেখতে আমি চোখের পাতাও ফেলতে ভুলে যাচ্ছিলাম।

        সুখের বিন্দু বিন্দু ঘামগুলি মণিমুক্তার মতো জ্বল জ্বল করছিল খুব । বারবার মুছে নিচ্ছিল একটা রক্তগোলাপ রুমাল। বুকের মগ্ন গোলাপ দুটি ছটফট করছিল কাপড়ের অন্তরালে । আহা কী পবিত্র , আহা কী সাহসী , আহা কী উন্নত , আহা কী তীব্র তারা  !

           একটা ছোট্ট শিশি বের করে ছুটছিলাম একশিশি ঘাম নেবো বলে। একটা ছোট্ট রুমাল বের করে দেখাচ্ছিলাম গোলাপী ঠোঁটের থুথুতে ভিজিয়ে নেবো বলে। হাঁটার ছন্দ শিখে নেবো বলে পেছনে পেছনে ছুটছিলাম।

                        ২.

এই ছোট্ট শহরে এমনই এক অসাধারণের সঙ্গে দেখা হল। স্বপ্নমাত্র। তারপর আমি পাগল হয়ে যেতে লাগলাম। আমার আর কোনও স্মৃতিশক্তি রইল না। এখন যেকোনও মহিলাই আমার কাছে অসাধারণ হয়ে গেল। অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম তাদের। ছোট্ট শিশি ভরে নেবার জন্য , ছোট্ট রুমালটি ভিজিয়ে নেবার জন্য পেছন পেছন ফিরতে লাগলাম। এক ক্ষণিকের এক অসাধারণ অনন্ত সময়ের অনন্ত অসাধারণ হয়ে উঠল । আমি বাতাসে মিষ্টি গন্ধ পেতে লাগলাম। আমি মাজার দুলুনি দেখে দেখে ছন্দ শিখতে লাগলাম। গাছে গাছে ফুল ফুটলে সকল ফুলকেই মগ্ন গোলাপ মনে হল। আমি তাদের সাহস ও সৌন্দর্যে পুনরায় বিমুগ্ধ হতে থাকলাম।

                              ৩.

অভাবের পৃথিবীতে এত দুঃখ নিয়ে জন্মেছিলাম , কিন্তু দুঃখকে কখনও ভালোবাসতে শিখিনি।  এত অভাব ছিল , তবু অভাবকে সুন্দর করে তুলতে পারিনি। এক অসাধারণ সব , সব শিখিয়ে গেল । এখন দুঃখ যন্ত্রণা অভাব আমার বন্ধু। তারা আমার সঙ্গে থাকে আর অসাধারণের চলে যাওয়া উপভোগ করে  । শিশির মাখা পদ্মফুলের মতো আমি ফুটে উঠি মানস সরোবরে। কেউ কি আমাকে চেনে ?

                        ৪.

 ছোট্ট শহর ।  রোজ ধানসিঁড়ি নদীটি বাসে উঠে চলে যায় । বনলতা বাস থেকে নামে। রোজ রাতে চুমু খেতে আসে অরুণা। আহা বিকেল‌-রাঙা শাড়িতে তার কী মুগ্ধতা না ঝরে  ! চারপাশে কত খঞ্জনা পাখি নেচে যায় । অনবরত নাচে । বসন্তের জলে কোনও কোনও মৎস্য ঘাইমারে । আহা কী আনন্দ , আকাশে বাতাসে রবীন্দ্রনাথ !

                      ৫.

চেয়ে চেয়ে দেখি হাঁকডাকের ভেতরও কী সুন্দর নির্জন পড়া করে তার গভীর পাঠশালায়।   ছবি আঁকে। ভূগোল ও নৃতত্ত্বের ক্লাসে আমিও কোন্ আদিযুগ থেকে সত্যের নির্ণয় যন্ত্র ধরে থাকি । দিকচিহ্ন , ইতিহাস অথবা দর্পণ মায়ার আড়ালে ঢেউ খেলা করে । কুরুক্ষেত্রের মাঠ অথবা শ্রীলঙ্কায় রাম-রাবণের যুদ্ধক্ষেত্রের পাশ কাটিয়ে হেঁটে আসছে অসাধারণ ।  এখনও অতীতচারী চোখে দেখতে পাই তার ঘোড়া । ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পাই মেঘে মেঘে বাজে ।

                   ৬.

আমাদের যুদ্ধক্ষেত্র , আমাদের হাটবাজার , আমাদের পশ্চিমের রাস্তায় , আমাদের অন্ধকার গলির মোড়ে আজও কত কত অসাধারণ বিকিনি পরে দাঁড়ায় । মেঘলাদুয়ার খুলে বজ্র-বিদ্যুৎ চমকায় । জয়দেব দ্যাখো , কালিদাস দ্যাখো, বিদ্যাপতি, তুমিও দ্যাখো , বারান্দায় দাঁড়াও, কী সুন্দর অসাধারণ যায় । যেতে যেতে পেছন ফেরে । কী ছুঁড়ে দ্যায় ? কী ছুঁড়ে দ্যায় ?

                           ৭.

অসাধারণ , আমাকে কবিতা লিখিয়ে করে দিলে ? আরও তো কত লোক শিল্পী হয়ে গেল , আরও কত লোক সানাই-সরোদ-বাঁশিতে বিসমিল্লায়, তবলা-লহড়ায়…….। অথবা কারও কোনও চিৎকার হল না । চিকিৎসাও হল না। এই রোদ্দুরের হাসপাতালে জীবন কাটাল। ছোট্ট শিশিটি কি এখনও ওঁদের হারিয়ে যায়নি ?  ছোট্ট রুমালটি এখনও হাতে আছে ?

                           ৮.

কীরকম বোকা বোকা জীবন । কীরকম সস্তা সস্তা মেধা।কীরকম নরমনরম আত্মমর্যাদা । এসব নিয়েই চলে যাই। যেতে যেতে আজ শহর পরিক্রমা। যেতে যেতে সেই ট্যাক্সির খোঁজে ফেরা। যেতে যেতে পথ ভুল। বেঁচে থাকার প্রগাঢ় ইচ্ছায় আবার নিজেই কেমন নিজের শিষ্য। অসাধারণ, এসব তুমিই বোঝো।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: