আত্ম আলো: পর্ব – ১১ – দেবদাস কুণ্ডু

আজ দশটায় শুয়ে পড়ে ছিল শতাংশু। প্রায়ই এখন শ্বাস কষ্ট হয় তার। কলকাতার বাতাসে মারাত্মক দূর্ষন। এই দূষিত বায়ুর মধ্যে সাইকেল চালাতে হয় তাকে। কখনো কোন বাস বা লড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যায়। সেই কালো ধোঁয়া নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে ঢুকে যায় তার ফুসফুসে। তখন সে ভাবে, পলিউশন দপ্তর কি ভাবে এই গাড়িগুলিকে পলিউশন ফ্রি লাইসেন্স দেয়? সব জায়গায় টাকার খেলা। একটা সরকারি অফিসার কি কম বেতন পায়? তা দিয়ে কি তার সংসার চলে না? প্রতি বছর দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির সংগে সামযোস্য রেখে ডি এ দিচ্ছে সরকার। তার পরও আরো দরকার হয়? এ এক নারী মাংসের মতো লোভ। কি করে তারা এতো টাকা দিয়ে? একটা মানুষ কতো ভোগ করে? একটা সময় তো অনীহা এসে যাবে। অথচ ওদের তা হয় না। মদের নেশার চেয়েও এই নেশা সাংঘাতিক। চাকরি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘুস খেয়ে যায়। একবারও ভাবে না সাধারণ মানুষ কত টাকা আয় করছে। তারা কি ভাবে বেঁচে আছে? আমার এতো টাকার দরকার কি? সদ্য যে চাকরিতে ঢুকেছে, সেও এই পাপের গরলে হাত ডুবিয়ে দিয়ে বসে আছে। একটা ঘটনা তার মনে পড়লো। তার মেয়ের পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন হয়ে যাবার পরও মেয়ের পাসপোর্ট আসে নি। পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করা হলে বলা হয়, পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট আসেনি। বলে কি? কবে করে গেছে ভেরিফিকেশন! এখনও অফিসে পাঠায় নি? থানায় যোগাযোগ করলে অফিসার বলল, ‘আমাদের তো জলমিষ্টি খাবার জন্য কিছু দেবেন।’

‘আপনারা এতো গরীব, তা তো জানতাম না। অবশ্য গরীব মানুষ এভাবে ভিক্ষা করে না। তাদের একটা নূন্যতম মান সন্মান থাকে?

‘ কি যে বলেন স্যার। কটা আর টাকা দেবেন?

‘তা কতো দিতে হবে? ‘

‘বেশি না স্যার, সামান্য’

‘সেই সামান্যটাই শুনি কতো?

‘পাঁচশো।’

‘না। আমি এক টাকাও দেবো না।আপনি কতো

দিন রিপোর্ট আটকে রাখতে পারেন, আমি দেখবো’। শতাংশু থানা থোকে বেরিয়ে আসছে তখন থানায় ঢুকছে কাউন্সিলর ভোলা রায়। সে বলে,’ মাস্টার মশাই আপনি থানায় কেন?

কাউন্সিলর ভোলাদার মেয়েকে সে পড়িয়েছে। সব শুনে কাউন্সিলর বলেন,’ দও? ‘

‘ জানি না সারনেম। 

‘আপনি আমার সংগে আসুন।’

কাউন্সিলরকে দেখে অফিসার  উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আপনি স্যার’?

‘ এসব কি হচ্ছে? সি এমকে রিপোর্ট করবো?

‘কেন স্যার কি অন্যায় করলাম?’

‘মাস্টার মশাই এদিকে আসুন। বাইরে কেন আপনি? ‘

শতাংশু ঢুকতে অফিসার  বলে ওঠে,’ আপনি একবার বলবেন তো যে, আপনি কাউন্সিলরের আত্মীয়।’

‘না। আমি কাউন্সিলরের আত্মীয়  নই। কাউন্সিলরের আত্মীয় না হলে বুঝি টাকা দিতে হয়? 

‘একবার যদি বলতেন আপনি কাউন্সিলরের লোক তাহলে আপনি কবে পেয়ে যেতেন পার্সপোট।

‘আপনি বেশি ভ্যান তারা না করে রিপোর্ট এখনই ছেড়ে দিন। উনি একজন মাস্টার মশাই। আপনি তার কাছ থেকে ঘুস চেয়েছেন?  যদি উনি গিভেন্স সেলে রিপোর্ট করতো, আপনার চাকরি থাকতো? উনি তো মাস্টার মশাই। সব আট ঘাট জানে। যেখানে সি এম সরাসরি বলেছেন, এই রকম অভিযোগ থাকলে তাকে ফোনে জানাতে পারে যে কেউ। তবু আপনাদের ভয় হয় না? । একবার সাসপেন্ড হলে পরিবার রাস্তায় বসবে এই চিন্তাও করেন না? অবশ্য হাফ মাইনে পাবেন। সরকার  তো করোনার মতো এই দুর্দিনে আপনাদের মাইনে মাসের শুরুতে দিয়ে দিচ্ছে। এই নিয়ে আপনার নামে দুটো অভিযোগ পেলাম। লাস্ট ওয়ানিং আপনাকে দিচ্ছি, আমার ওয়ার্ডে এসব চলবে না। শুনে রাখুন ভালো করে। মাস্টমশাই আপনি আসুন। কোন সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবেন। থানায় আপনাকে আসতে হবে না।

‘সোমা রাখি কেমন আছে? কতো বছর ওদের দেখি না। ভালো আছে তো ওরা?’

‘হ্যাঁ ।ভালো আছে।সোমবার বর দিল্লিতে। রাখির বর কাশ্মীরে।

  ওদের তো দুজনের মিলিটারি বর, তাই তো? 

‘ হ্যাঁ ।’

‘ ছেলেমেয়ে? ‘

‘ রাখির ছেলে আর সোমার মেয়ে। ‘

‘ আচ্ছা আসি। ‘

‘ আসুন। আমার নম্বর আপনার কাছে আছে তো? 

‘ হ্যাঁ আছে। ‘

  পাসপোর্ট পেতে দেরি হলে আমাকে জানাবেন।. 

  আর দেরি হবে না স্যার। আমি আজই রিপোর্ট পাঠিয়ে দিচ্ছি। উনি তিনদিনের মধ্যে পেয়ে যাবেন। 

        সেদিন মনে হয়েছিল দেশের সব মানুষ বা রাজনৈতিক নেতা কালো হয়ে যায় নি। বাতাস

 দূষিত করেছে কিছু কালো মানুষ। সব মানুষ কালো হয়ে গেলে পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যেতো। 

তাতো হয়নি। পৃথিবীর সৃর্য প্রদক্ষিনের জন্য বারো ঘন্টা অন্ধকার। তারপর আবার তো রাজহাঁসের শুভ্রতা নিয়ে দিনের আলোয়  পৃথিবী জেগে ওঠে।এই সত্য মুষ্টিমেয় কিছু কালো মানুষ পাল্টে দিতে পারে নি। আগামী দিনেও পারবে না। কারন আলোর পথে বহু মানুষ হাঁটে যে এখনো। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top