আদা // সুব্রত মজুমদার

.

“ঘরে আছো মা !”

একটা খুনখুনে গলা পেয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে সরলার মা। বুড়োটা আজও এসেছে। গতকাল বিকালবেলায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মিটিং ছিল। ‘মিনতি স্বনির্ভর গোষ্ঠী’ র দলনেত্রী হল সরলার মা। তাই  তড়িঘড়ি দরজায় শিকল দিয়ে যেই বেরোতে যাবে অমনি বুড়োটা হাজির।

“কোথাও যাচ্ছিলে মা ?”

.

“হ্যাঁ  কাকা, কিছু বলবেন ?”  সরলার মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে। বুড়ো লাঠি ঠুকতে ঠুকতে রাস্তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। নিচু গলায় বলে, “কাল আসব মা, তুমি যেখানে যাচ্ছিলে যাও।”

সরলার মায়ের কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই বুড়ো হাঁটতে শুরু করল। এই রকমই স্বভাব বুড়োর। নিজে যা ভাবে তাই করে। আর করবেই না বা কেন, – মান সন্মান ধন সম্পত্তি কিছু তো কম ছিল না বুড়োর। নিজে পাঁচ পাঁচবার পঞ্চায়েত প্রধান হয়েছিল।

.

 বুড়োর বাবা ঘনশ্যাম সরকার ছিলেন ডাকসাইটে জমিদার। এলাকার তাবড় তাবড় লোক ঘনশ্যাম সরকারের ভয়ে কাঁপত । তারপর একদিন জমির সিলিং হল, বহুজমি খাস হয়ে গেল ঘনশ্যাম সরকারের। শোকে দুঃখে দু’বছরের মাথায় দেহ রাখলেন তিনি।

বাপের মৃত্যুর পর জমিজমা সম্পত্তি সবকিছুই বুড়োর হাতে এল। বুড়ো দেখল শুধু জমিজমার উপর ভরসা করে থাকলে চলবে না, তাই শুরু করল ঠিকাদারি ব্যবসা। জেলাপরিষদের রাস্তা, পঞ্চায়েতের নালা, হাসপাতালের বিল্ডিং —  কাজের কমতি কোনোদিনই ছিল না। আর এ সূত্রে বাড়ল বড় বড় মানুষজনের সঙ্গে ওঠাবসা।

.

সেবার ছোট ছেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে মস্তবড় পার্টির আয়োজন হল। শহর থেকে এলেন ডি.এম.স্যার লালমোহন চট্টরাজ, কৃষি মন্ত্রী গোপেন গুঁই, জেলাপরিষদের সভাধিপতি আরো কত নামিদামি লোক। কেক কাটা হল, বাজি পুড়ল, – গ্রামের লোক ধন্যি ধন্যি করতে লাগল।

.

কথাটা সভাধিপতি মশায়ই বললেন। গলা যথাসম্ভব নীচু করে বললেন, ” জয়ন্তবাবু, টাকা তো অনেক ইনকাম করলেন, এবার একটু খ্যাতি প্রতিপত্তির দিকে মন দেন।”

বুড়ো বলল, ” কিরকম..”

.

সভাধিপতি বললেন, “সামনের পঞ্চায়েত ইলেকশনে আমাদের পার্টির হয়ে দাঁড়ান। জিত আপনার নিশ্চিত। আর জিতলেই আপনাকে পঞ্চায়েত প্রধান হতে রোখে কে !”

বুড়োর মনে কথাটা ধরল। পরের পঞ্চায়েত ভোটেই হলেন পঞ্চায়েত প্রধান। আর এইটাই কাল হল। গ্রামের যত বদলোকের আস্তানা হল সরকার বাড়ির খাজাঞ্চিখানায়।

.

জমিদারি নেই তো কি হয়েছে খাজাঞ্চিখানাটি রয়েছে বহাল তবিয়তে। ঘনশ্যাম সরকারের মৃত্যুর পর বুড়ো খাজাঞ্চি মনোহর ভট্টাচার্যকে ডেকে পাঠালেন ছোটবাবু জয়ন্ত সরকার। মাথা নীচু করে ছোটবাবুর কাছে দাঁড়ালেল  খাজাঞ্চিবাবু। ছোটবাবু বললেন, “জ্যেঠামশাই, একটা কথা বলতে আপনাকে ডেকেছি।”

.

খাজাঞ্চিবাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েই রইলেন। তার উত্তরের প্রত্যাশা না কর ছোটবাবু বললেন, “আজ থেকে আপনার ছুটি। জমিদারিই যখন নেই তখন খাজাঞ্চির কি প্রয়োজন।”

.

সেই খাজাঞ্চিখানায় এখন পার্টির ছেলেরা মদ খায়, শলা পরামর্শ করে। গ্রামের লোকেরা বিশেষ কাজ ছাড়া ওদিকটায় যায় না। এদিকে বুড়োর ছেলেরাও এক একটা রত্ন হয়ে উঠেছে, – মদ আর জুয়ো আর মেয়েছেলের পেছনে হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে অক্লেশে। এক এক ছেলের লক্ষাধিক টাকা করে টাকা বাজারে দেনা।

.

পাওনাদারদের টাকা মেটাতে মেটাতেই তালপুকুরের জল তলানিতে, – এখন ঘটিও ডোবে না। সেদিনকার সেইসব বন্ধুরা আজ আর দেখা হলে রা কাড়ে না। বসতবাড়ির একপাশটা ধ্বসে পড়েছে, সিংহদরজার মাধবীলতার ঝোঁপে পাঁইপালো লতার ঘটেছে অনুপ্রবেশ। মোটকথা সরকারবাড়ি এখন দিনে দুপুরে ভুতের আড্ডাখানা ।

.

         বুড়ো জয়ন্ত সরকার মাসে একবার করে আসে সরলাদের বাড়ি। সরলার বাবা সিউড়িতে চাকরি করেন। বুড়ো মাসে একবার এসে কিছু টাকা দিয়ে যায় সরলার মাকে। খুনখুনে গলায় বলে, ” ভাইপোকে দিও, আমার জন্যে হরলিক্স আর কাজুবাদাম এনে দেবে।”

সরলার মা বলে, ” কাজুবাদাম কি করবেন কাকা ?”

.

সরলার মায়ের দেওয়া গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বুড়ো বলে, ” গুঁড়ো করে হরলিক্সে মিশিয়ে খাই মা। সবই তো গেল, শেষ সম্বল কিছু আছে ঈশ্বর চাইলে ওতেই বাকি দিনকটা চলে যাবে। “

এ মাসে তো হরলিক্স-বাদাম নিয়ে গেছে বুড়ো তাহলে কিসের দরকার – – সরলার মা ভাবে। কিন্তু আর ভাবার সময় নেই মিটিংয়ের সময় হয়ে গেল।

.

      – – দুই–

.

   পরের দিন বুড়ো আবার এল।

 সরলার মা বলল,” কাকা কাল চলে গেলেন যে, কি দরকার বললেন না..”

বুড়ো বলল, “বয়স হয়েছে মা, কবে ডাক আসবে তা তিনিই জানেন ।  জানো মা, আমাদের বংশে আদাচাষ সহ্য হয় না। আমার বাবা মরার আগে আদার চাষ করেছিলেন। আমিও আর বাঁচতে চাই না। তাই ভাবছি আদা লাগাবো। যদি মৃত্যু আমাকে করুণা করে। “

.

সরলার মা কি বলবে ভেবে পেল না। বুড়ো পাঞ্জাবির পকেট হতে টাকা বের করে সরলার মায়ের হাতে দিয়ে বললো,” এই টাকাটা ভাইপোকে দিয়ো, সিউড়ি হতে আদার বেচন এনে দেবে। “

.

          আদা লাগিয়েছিল বুড়ো । অশক্ত হাতে খুন্তি দিয়ে উঠানে লাগিয়ে দিল দুই সারি আদা। নিয়মিত পরিচর্যায় লকলক করে বেড়ে উঠল আদার গাছ। একদিন একটা আদাগাছের গোঁড়ার মাটি সরিয়ে দেখলেন বেশ পুরুষ্টু হয়েছে আদার গিঁটগুলো। বুড়োর মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।

.

পাড়ার শঙ্করী কাকিমা ভোরবেলায় ফুল তুলতে এসে দেখলেন উঠোনে পড়ে আছে বুড়োর অসাড় দেহ, অশক্ত শরীরখানা পড়ে আছে চিৎ হয়ে। একটা রংচটা প্লাস্টিকের চেয়ার উল্টে পড়ে আছে বুড়োর মতোই। আর চেয়ারটা হতে আধহাত দূরে একটা স্টেনলেসস্টিলের বাটির চারধারে কাকেদের ভিড়। তাদের চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছে। উঠানময় ছড়িয়ে আদামাখা আধভেজা মুড়ি।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: