শবরীর প্রতীক্ষা : পৃথা সিনহা দাস

“ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি
কে আমারে.. ও বন্ধু আমার… “

দৌড়ে এসে শবরী ফোন টা ধরল। কবীরের ফোন। “খেয়েছো?আজ ডিউটি কখন? গরম কেমন ওখানে? এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন গুলো করে শবরী একটু দম নিল।
” কি গো… চুপ করে আছো কেন?” শবরী অধৈর্য হয়ে
প্রশ্ন করল।
” তুমি কিছু বলার সুযোগ দিলে তো বলব…


এবার প্রশ্নের উত্তর গুলো একে একে দিয়ে ফেলি। আজ সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, কাজের খুব চাপ। আজ নাইট ডিউটি, গরম একটু কমেছে। হয়েছে… শান্তি হয়েছে? উফ্ .. তুমি পারোও বটে… এত চিন্তা কেন কর আমায় নিয়ে? ” কবীরের কথায় ছদ্ম অভিমান ফুটে ওঠে শবরীর স্বরে…


“হুমম.. সে তো বলবেই, আমি কেন চিন্তা করব? যাওওও.. চিন্তা করার মানুষ খুঁজে নাওও,আমিও শান্তি পাব আর তুমিও মুক্তি পাবে এই বুড়ি টার হাত থেকে”। “

আবার শুরু করলে তুমি? কতবার বলেছি, এই সব আজে বাজে কথা বলে আমায় কষ্ট দেবে না। ” কবীরের রাগত স্বর শুনে শবরী রণে ভঙ্গ দিয়ে আদুরে গলায় প্রিয়তমর মান ভঞ্জনে উদ্যত হল।


” আচ্ছা বাবা ভুল হয়ে গেছে, আর কক্ষনো বলবো না। এইই শোন না… কিছু খেয়ে নিও প্লিজ, খালি পেটে থাকলে কিন্ত শরীর খারাপ করবে। রাতে সাবধানে ডিউটি করো, ডিউটি শেষ হলেই আমাকে মেসেজ করতে ভুলো না কিন্তু। পরশু থেকে আমাদের রোজা শুরু… মনে আছে তো? “
“এত কষ্ট কেন কর তুমি প্রতি বার? বাড়ির সবাই কে লুকিয়ে রোজা রাখতে তোমার অসুবিধা হয় আমি বুঝি। আমার খুব দুঃশ্চিন্তা হয় তোমার জন্য শবনম। ” একরাশ উদ্বেগ কবীরের গলায়….


“শবরীইইইইইই”…. “এই শোন, আমায় ডাকছে। এখন ফোন টা রাখছি, সাবধানে থেকো। ” লাইন টা কেটে দিয়ে শবরী দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে নীচে নেমে গেল।

শবরী আর কবীরের প্রেম কাহিনী আর পাঁচটি প্রেম কাহিনীর মত নয়। এই অন্যরকম ভালোবাসার শুরু আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে। স্মৃতির সড়ক ধরে একটু অতীত ভ্রমণ করে আসি… চলুন…

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজার টা কাজের মধ্যে শবরীর সময় যে কী ভাবে কেটে যায় সে নিজেও জানে না। শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, বর, ছেলে সবার আব্দার, রান্নাবান্না, ঘরের অন্যান্য কাজের মধ্যে নিজের জন্য, নিজের সাথে কাটানোর মত সময় আর অবশিষ্ট থাকে না।

মন দিয়ে রান্না বাটি খেলতে খেলতে তার উনিশ বছরের বৈবাহিক জীবন কেটে গেল, আলাদা করে তার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। সে মা, স্ত্রী, পুত্রবধূ… সম্পর্কের খোলসের আড়ালে শবরীর নিজস্বতা হারিয়ে গেছে। যে শবরী স্কুল, কলেজে ভালো আবৃত্তি বলিয়ে হিসেবে পরিচিত ছিল…কত অনুষ্ঠান করেছে, পুরস্কারে ঠাসা ছিল তাদের বাড়ির আলমারি….সে এখন তার সেই ভালো লাগা টুকু কেও মনে করার সময় পায় না, বলা ভালো মনে করতে চায় না। সৌমেনের এ সব পছন্দ নয়।

প্রথম প্রথম প্রতিবাদ করত শবরী, ক্রমে ক্রমে মানিয়ে নিয়েছে, মানিয়ে নেওয়া আর মানিয়ে চলা… শবরীর মত অধিকাংশের জীবন কাব্য…. সময় কেটে যাচ্ছিল এ ভাবেই।


এক দিন ছেলের স্কুলের পেরেন্ট টিচার মিটিং এ যাওয়ার পথে হঠাৎ করে কলেজ বেলার বন্ধু ফরহতের সাথে দেখা হয়ে গেল। ওর সাথে ছিল ওর মাসতুতো ভাই কবীর চৌধুরী.. সি. আর. পি. এফ জওয়ান.. মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্তিসগড়ে কর্মরত। ঝকঝকে প্রাণবন্ত এক যুবক। ভালো কথা বলতে পারে। অল্পসময়ের মধ্যেই গাম্ভীর্যের খোলোস ভেঙে কলেজ বেলার প্রাণোচ্ছল শবরী কে বাইরে বের করে আনলো কবীর। আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল। “এ বাবা.. কত দেরী হয়ে গেল রে। এবার আমি যাই”। শবরী ব্যস্ত ভাবে বলে উঠলো”।
“যাই বলতে নেই, বল আসি”… গাঢ় স্বরে বলা কবীরের এই কথা টায় শবরীর শরীরে এক অদ্ভুত তরঙ্গ প্রবাহিত হল। বুকের ভিতর একটা দম বন্ধ ভাব। সে তাড়াতাড়ি অটো তে উঠে পড়ল, হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো ফরহত আর কবীর কে। কবীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শবরীর দিকে, সে দৃষ্টি যেন শবরীর অন্তঃপুরের খবর নিতে চায়। অটো এগোচ্ছিল সামনের পথে… শবরীর মন কেবলই ছুটে যেতে চায় পিছন পানে। মনকে বোঝালো শবরী… ক্ষনিকের আলাপে কারোও প্রতি এত অনুরক্ত হওয়া তার মত চোখে চালশে পড়ার বয়সী, ঘোর সংসারী, এক বাচ্চার মায়ের পক্ষে অনভিপ্রেত। বিধাতা পুরুষ সেই সময় হয়তো মুচকি হেসে ছিলেন। তার হাতে যে ততক্ষণে রচিত হয়ে গেছে শবরীর দিক্ পরিবর্তনের নতুন কাহিনী।

দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়ার পর খবরের কাগজ বা গল্পের বই পড়া শবরীর একটা অভ্যাস। সে দিন ও তার অন্যথা হয় নি। ফোন বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার। শবরী ফোন কল রিসিভ করল.. “হ্যালো”… ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসল গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠে কবিতা…
” শবরীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে, ফিরে
আসি বারে বারে..নব রূপে, নব আঙ্গিকে
আমার কথার অনুরণন…আকাশে, বাতাসে
ভালোবাসি শুধু তোমারে, শুধু তোমারে…….

কেমন আছো? চিনতে পারছো? ” শবরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রোজ, প্রতি মুহূর্ত যাকে সে কল্পনা করেছে, নিজের বিবেকের শাসণ, বারন উপেক্ষা করে… তাকে কি সে না চিনে পারে? তার চেহারায় অদ্ভুত এক আলো খেলা করে গেল,কপোলে লাগলো রক্তিমাভা… তবুও একটু নাটুকে গলায় সে বলল..
“ঠিক চিনতে পারলাম না তো, কে বলছেন? ” “

তোমার মুখটা আমি বেশ স্পষ্ট দেখতে পারছি। মুখের ঐ রক্তিমাভা আমায় ছুঁয়ে আছে। তোমার মনের আরশি তে আমার ছবি…মানস চক্ষে দেখতে পারছি আমি,আর গলায় যে নাটুকে স্বর, না চিনতে পারার অভিনয়…. তাও আমার কানে ধরা পরে গেছে ম্যাডাম…. আসলে কি জান তো? রাতের আঁধারে বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে চোখের সাথে সাথে মনের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে তাই তোমার সব জাড়ি জুড়ি বৃথা গেল”।

বলেই প্রাণ খোলা হাসি তে ফেটে পড়ল কবীর। শবরীও যোগ দিল কবীরের সাথে। কত দিন পর সে প্রাণ খুলে হাসল।
” তা হঠাৎ কী মনে করে? ফরহতের কাছ থেকে ফোন নম্বর বাগিয়েছো? ” শবরীর কথা কে প্রায় না শেষ হতে দিয়েই কবীর শুরু করল..
” বাগিয়েছি মানে? নম্বর টা আমার হকের, তোমার সব কিছু তেই আমার অধিকার। তোমার সাথে কথা বলা খুব জরুরি হয়ে পরেছিল। কী জাদু করেছো বস্.. মাওবাদী ভুলে এখন আমি শবরী বাদী।” কিছু ক্ষণের জন্য ফোনের ও প্রান্তে নিস্তব্ধতা… একটু সময় নিয়ে কবীর শুরু করল


” তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি।ভালোবাসবে আমায়? কোনো দিন, কোনো দাবি নিয়ে হাজির হবো না তোমার সামনে, তোমার দায়িত্ব, কর্তব্যের মাঝে কোনো দিন ও অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবো না, সমূলে উৎপাটিত করবো না তোমায় তোমার শিকড় থেকে। শুধু তোমার ছায়ায় ক্লান্ত, শ্রান্ত আমি দু দন্ড বিশ্রাম চাই, বল না ভালোবাসবে আমায়? আমার চাহিদা শুধু ঐ টুকুই। যে দিন তোমার ডালে বাসা বাঁধা পাখির ছানা সাবলম্বী হয়ে উড়ে যাবে আপন দিশায়,যে দিন তোমার প্রয়োজন ফুরাবে সকলের জন্য। সে দিন আমায় ডেকে নিও… গভীর আবেশে তোমায় জড়িয়ে ধরবো, বজ্রকঠীন আলিঙ্গনে তোমায় নিষ্পেষিত করবো, কত শত বিনীদ্র রজনীর দীর্ঘশ্বাস, উত্তপ্ত শরীরের হা হুতাশ মিশিয়ে তোমায় আদরে আদরে ভরিয়ে দেবো। ভীক্ষা দেবে আমায় আমার শবনম কে, সবার শবরী… আমার… শুধু আমার শবনম”।
শবরী কোনো উত্তর দিতে পারছিল না। এমন করেও কেউ ভালোবাসা ভীক্ষা চাইতে পারে? কেবল মাত্র শবরীর মত এক সামান্য মেয়ের ভালোবাসা পাওয়ার আশায় কাঙাল হতে পারে? কোনো চাহিদা হীন, শরীর সর্বস্বতা হীন এক পবিত্র প্রেমের বার্তা নিয়ে কবীর অপেক্ষা করছে শবরীর জীবনে পদার্পণ করার আশা নিয়ে। কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও পুত্রবধূ, কারও কন্যা, কারও ভগিনী … এই সকল সম্পর্কের খোলসে আবৃত শবরীকে ভালবাসে এই পাগল টা। প্রতিটি পরত ভেদ করে কবীর নামের দূরন্ত ঘূর্ণিঝড় শবরীর অন্তঃপুরের কপাটে আছড়ে পড়ছে স জোড়ে। শবরীও আকুল হয়ে আছে সেই ঝড় কে আবাহন জানানোর জন্য। কিন্তু সমাজ, সংস্কারের শিকলের বাঁধন যে অনেক কালের। কী ভীষণ দোলাচলে ভাসছে শবরী। কূল রাখি, না শ্যাম…. শবরী দিশেহারা হয়ে পড়ে।

“বুঝতে পারছি… তুমি ধর্ম সঙ্কটে পড়েছো। ভাবনা চিন্তা করে ভালোবাসা হয় না শবনম। জানি না কি করে এত ভালোবেসে ফেললাম তোমায় প্রথম দর্শনে। মন বার বার বলছে তোমাকেই খুঁজেছি এতদিন। তোমার কথা বলা, তোমার সৌন্দর্য, চেহারার অদ্ভুত স্নিগ্ধতা এক অমোঘ আকর্ষণে তোমার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।

তাই তো আজ সব অকপটে স্বীকার করলাম তোমার সামনে। সমাজের চোখে এ প্রেম হয়তো অপবিত্র, পাপ। কিন্তু, আমাদের প্রেম তো ভাঙতে চায় না কিছু। শুধু দূর থেকে একে অপরকে ভালবেসে যাবো আজীবন। এ টুকু চাওয়াও কি পাপ? অপেক্ষা করবো তোমার জন্য… কথা দিলাম। ” কবীর লাইন কেটে দিল।

রাত দিন, কাজে কর্মে কেবলই কবীরের চিন্তা। এ যেন শ্যামের বাঁশি। এ ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য রাধার ছিল না, শবরীর ও হয়তো হবে না। সংসারের জন্য নিজেকে উজাড় করার পর যদি নিজের জন্য ক্ষনিকের মুক্তি প্রার্থনা করে সে, খুব দোষের হবে? সে এখন সংসারের আর পাঁচটা আসবাবের ন্যায়, সে এখন অভ্যাস মাত্র সকলের কাছে। সৌমেনের কাছে শবরী নিতান্তই তার ছেলের মা, তার মা বাবার সেবা দাসী।

কখনো সখোনো ইচ্ছে হলে নিজের কাম চরিতার্থ করার মাধ্যম। শবরীর ও যে শারীরিক চাহিদা থাকতে পারে তা কখনো ভেবেও দেখেনা। আর মনের খবর রাখা সৌমেন অনেক দিন যাবৎ ছেড়ে দিয়েছে। ছেলেও সাবালকত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। পক্ষী মাতার কক্ষ পুটের আড়াল ছেড়ে আকাশে ডানা মেলার জন্য প্রায় প্রস্তুত। সবাই ব্যস্ত যে যার জগতে। কেবল একাকী শবরী বসে আছে প্রতীক্ষা নিয়ে যদি কেউ এসে তার মনের ঘরের আগল ভেঙে মুক্তি দেয় তাকে।

কবীর যেন তার জীবনের এক চিলতে খোলা আকাশ,ঘরের বাইরে এক টুকরো বারান্দা। সংসারের দায়িত্ব, কর্তব্য পালনের পর যেখানে সে নিজের সাথে সময় কাটাবে। রোজনামচায় নতুন ভাবে লড়াই করার উৎসাহ যোগাবে কবীরের ভালোবাসার নির্মল বাতাস।

ভেসে গেল শবরীর সব দ্বিধা, দ্বন্দ, সংকোচ, সংস্কার, ভয়।কবীর নামক ঘূর্ণিঝড়ের ভালোবাসার প্রবল বেগে সে আবর্তিত হতে লাগল। সারা দিনে কাজের মাঝে নিয়ম করে একবার কি দু বার ফোনালাপ, একাধিক বার চোখের দেখার উদ্দেশ্যে সেল্ফি আদান প্রদান, কখনও সখনও ভিডিও কল এবং অগুনতি মেসেজ। এই ভাবে তাদের প্রেম গভীর থেকে গভীর তর হয়ে উঠল। শবরী নতুন করে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শিখেছে।

নিজেকে নতুন ভাবে সাজাতে শিখেছে। আজকাল সে গুনগুন করে গান গায় গরমে ঘেমে নেয়ে রান্না করতে করতে। শবরী ভাবে… তার মধ্যে ও এত প্রেম ছিল? অন্তঃসলীলা সে প্রেম এখন অগ্নুৎপাতের ন্যায় ভলকে ভলকে নির্গত হয়ে চলেছে।

চার বছর যাবৎ শবরী কবীরের সাথে পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখে। ভোরবেলা সবার অলক্ষ্যে কিছু খেয়ে সেহরির মাধ্যমে রোজা শুরু করে, দিনের শেষে সন্ধ্যা দেওয়ার পর ইফ্তার করে রোজা ভঙ্গ করে। সারাদিন সে খেল কি না খেল সে খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই, তাই রোজা রাখতে তার কোনো অসুবিধা হয়না। কবীর বার বার মেসেজ করে খোঁজ নেয় তার শবনম ঠিক আছে কি না। শবরীর মা বলতেন দূর্গা ষষ্ঠীর দিন নতুন কিছু গায়ে তুলতেই হয়।

শবরীর মধ্যে ও সেই বিশ্বাসটাই তৈরী হয়ে গেছে। তার সপ্তদশ বর্ষীয় পুত্র বা সৌমেনের কাছে এ সব ব্যাক ডেটেড চিন্তাধারা। কবীর কিন্তু শবরীর এই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে আসছে সম্পর্কের শুরু থেকে। সারাদিন ডিউটি থাকলে, ডিউটি শেষে ইউনিফর্ম খুলে নতুন একটা স্যান্ডো গেঞ্জি হলেও গায়ে তোলে প্রতি বছর ষষ্ঠীর দিন।

আবৃত্তি শবরীর ভালোবাসা, ভালোলাগা…. গল্প করতে করতে একবার বলেছিল সে কবীর কে। সময়ের স্রোতে যে ভালোবাসা কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল, কবীরের উদ্যোগে সেই ভালোবাসা ফিরে এসেছে শবরীর জীবনে। খোঁজ খবর নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার এক বাচিক শিল্পীর কাছে শবরী কে জোড় করে আবৃত্তি পাঠের শিক্ষা নেওয়া শুরু করিয়েছে। শবরীর প্রথম প্রথম খুব লজ্জা করত। ” লোকে বলবে বুড়ো বয়সের ভীমরতি “।

শবরীর কথাকে নস্যাৎ করে কবীর তাকে বলত… ” শেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় হয় না। আজীবন আমরা কিছু না কিছু শিখেই চলি”…. বাড়ির সবাই হেসেছে, মুখ বেঁকিয়েছে। শবরী দমে যায়নি, কবীরের সঙ্গ, তার ভালোবাসা, শবরীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

এই সকল ছোটো ছোটো ঘটনা কবীর আর শবরীর ভালোবাসা কে আরোও দৃঢ় করে তুলেছে। তাদের বোঝাপড়া, তাদের প্রেম বিরহের আঁচে দগ্ধ হয়ে দিনে দিনে আরোও খাঁটি হয়ে উঠেছে।

পাঁচ বছরের সম্পর্কে সর্ব সাকুল্যে তারা হয়তো বার চারেক দেখা করেছে। কোনো রেস্তোরাঁয় কয়েক ঘণ্টার জন্য। আঙুলের ছোঁয়াছুঁয়ি তে শিহরিত দুজন মিলনন্মুখ যুগল অপলক চেয়ে থেকেছে একে অপরের দিকে। শবরী রান্না করে নিয়ে গেছে কবীরের পছন্দের চিংড়ি মাছের মালাইকারি, ওর প্রিয় রঙের হলুদ পাঞ্জাবি, টি শার্ট, এটা ওটা কত কি…. কবীরের দেওয়া মুক্ত বসানো সোনার দুল শবরীর কানে সর্বসময় শোভা পায়, যেন তাতে কবীরের স্পর্শ অনুভব করে সে। প্রতি বার কবীর ফিরে যাওয়ার সময় ট্যাক্সিতে গভীর আশ্লেষে জড়িয়ে ধরে শবরী কে,তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায় শবরীর অধরামৃত পান করে এবং তার পর তার কপালে এঁকে দেয় স্নেহ চুম্বন। এ টুকুই তো পরম পাওয়া।

পাগল টা কে শবরীর ব্যাবহৃত একটা রুমাল দিতেই হয় প্রতি বার। ওটা বলে তার শবনমের হয়ে প্রক্সি দেয় , রুমাল টা নাকের কাছে ধরলেই সে শবনম কে অনুভব করে। শবরী কবীরের পকেটে গুঁজে দেয় ঠাকুরের প্রসাদী ফুল… প্রতি বার।
এক সময় শবরীর নামার সময় হয় ট্যাক্সি থেকে, সজল নয়নে চেয়ে থাকে দুজনে একে অপরের দিকে। শবরী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে কবীরের চলে যাওয়া, ইচ্ছে করে বার বার পেছনে ফিরে তাকানো কবীর কে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে….. কিন্তু……. আবার শবরীর প্রতীক্ষার শুরু…….

শবরী আর কবীরের প্রেম কে সমাজের নির্ধারিত গন্ডির মধ্যে বাঁধা যায় না। শুধু মাত্র মন ছুঁয়ে একে অপরের কাছে থাকা যায়…. ভালোবেসে ভালো থাকা যায়…. কারো অনিষ্ট না করে, দেশের প্রতি, সমাজ সংসারের প্রতি কর্তব্য পালনের পর দূরত্ব প্রেমে একে অপরের সাথে আবদ্ধ থাকা যায়। এ প্রেম শুধু গড়তে জানে, এ প্রেম অপেক্ষার, এ প্রেম উদারতার……

টুং করে একটা শব্দ। কবীরের মেসেজ ঢুকলো শবরীর ফোনে। হাসি খেলে গেলো শবরীর ঠোঁটে। পাগল টা রোজ একটা কবিতা লিখে পাঠায়…. ভালোবাসার উপঢৌকন…. কবীরের শবনম কে…… শবরী পড়তে শুরু করল…..
‘আমি যে দিক পানে চাই.. শুধু তোমায়
খুঁজে পাই
সুখের তুমি, দুখের তুমি, কান্না হাসির
দোলায় তুমি
তোমার মাঝেই চির তরে হারিয়ে
যেতে চাই
অপেক্ষার প্রহর গুনি, তোমায় নিয়ে
স্বপন বুনি
ক্ষনিক তরে সকল ভুলে তোমাতে
বিলীন হ ওয়া, মোর সেই তো
পরম পাওয়া
প্রেম বাঁচে অপেক্ষায়, প্রেম বাঁচে
বিশ্বাসে, তোমার আমার দীর্ঘশ্বাসে
দিনের শেষে মিলন হবে, বেঁচে আছি সেই
আশে…..

চোখের জল মুছলো শবরী। আশা নিয়ে আমি ও যে বসে আছি। জীবন সায়াহ্নে এসে তোমার হাত ছুঁয়ে পরপারে যাত্রার প্রতীক্ষা করতে চাই কবীর।শবরীর প্রতীক্ষা আজও আছে, তখনো থাকবে। কখনো কবীর রূপি রামের আগমনে, কখনো মৃত্যু রূপি রামের আগমনে সে প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে…….

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: