আমার প্রথম যৌবনে লেখা কবিতাগুলি – তৈমুর খান

(তখন ১৯৮৭ সাল। আমি রামপুরহাট মহাবিদ্যালয়ের বাংলা অনার্সের ছাত্র। রামপুরহাট কলেজ ম্যাগাজিনে কবিতা লিখে কয়েকজন স্যারের নজরে পড়েছি। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন, ফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক . নোজফুল হক বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক . সুনীলবরণ ব্যানার্জি। স্যারদের উদ্যোগেইবালার্কনামে একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার প্রথম দ্বিতীয় সংখ্যায় বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিলাম। সেই সময়ের পত্রিকার সংখ্যাগুলি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। মাত্র দুটি সংখ্যা বেরিয়েই তা বন্ধ হয়ে যায়। দুজন স্যারই বহু আগেই প্রয়াত হয়েছেন। পত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে কয়েকটি কবিতা উদ্ধার করলাম। কেমন ছিল আমার ছাত্রজীবনের সেই লেখা? পাঠকের কৌতূহল কিছুটা প্রশমিত হবে আশা করি।)



এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক 
——————————————
 এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক। 
 সবকিছু দিয়েছি জলাঞ্জলি
 ভালোবাসার আরসি ভেঙেছে টুকরো টুকরো—
বয়ঃসন্ধির উচ্ছল প্রেমে 
 শিয়রে আর ফুল ফোটে না
 প্রিয়ার চোখে সীমাহীন অন্ধকার।
 নিকুঞ্জ-কাননে কাঁদে কৃষ্ণের বাঁশি
 নিসর্গ বেদনা প্লাবিত মাঠে
 ফুঁসে ওঠে মহেঞ্জোদারো— 
 হতচ্ছায়া গুঞ্জরিত বাতাসের কানে 
নাভিশ্বাস ওঠে।
 কবে গুরু দ্রোণ ছুঁড়েছিল বাণ
 আজ নিলাম হয়েছে দেহ
 ক্ষয়ে গেছে পৌরুষ
 নিরালম্ব বর্ষণের রক্ত ধোয়া পথে
 শুরু হয়েছে এবার নদীর ভাঙন ।
 হে কাপুরুষ
 তোমার শিরাল শরীরের বিষণ্ণ ঊরু বেয়ে
 শিহরনে কম্র  গৃধ্রতা নাচে
 সরওয়ারে সংবর্ত  রূপহীন তমিস্রা
 ছদ্ম বিলাসিতায় মরছে মানুষ
 দুই ঠোঁটে তার তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ
 পাশাপাশি তিরভর্তি তূণ
 হিংস্র থাবা 
 রণভূমের লীলাক্ষেত্র
 এখনো পড়া হয়নি ‘মোহাম্মদাং রসুলাং’
 এখনো  ‘ওঁ’ উচ্চারণে কোণঠাসা হয় মানুষ।
 সব সমাচ্ছন্ন মানবতা জ্বলে ওঠে
 প্রতিদিন পুড়ে ছাই হয় 
শান্তি 
ঐক্য 
প্রেম
 পৃথিবীর স্তব্ধ ডাকে উড়ে যায়
 রক্তপায়ী সঙ্কুল শকুন।
 বিশ্বাসের তুলসী তলায় জ্বালুক প্রদীপ
 বাজক শঙ্খ ধ্বনি
 সংঘর্ষের নিঃসৃত অভিযানে
 এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক ।
২ 
 বলে যেতে হবে
————————————–
 তোমাকে ডাকতে পারি না
আজও,
 কেবলই ভয় হয়
 পাছে তুমি এসে চলে যাও।
 তোমাকে বলতে পারি না
কোনো কথা
আজও,
কেবলই ভয় হয়
পাছে সব কথা ফেলে যাও।
 শুধু শূন্যের টানে মিলে যাই
 একাকী 
একাকী 
কতদূর
কতদূর
 অমৃত নদী পার হয়ে যাই—
 পদ্মনাভির দেশে ,
 তোমাকে পেছন ফেলে যেতে হবে?
 অথচ তোমার সুখের জন্যই
আমি চলে যাব 
         :
 নদীর ভাঙনে
 আদিম মানুষের  ভোঁতা পাথারে,
 বন্য শরীর….
 জীবনের সব ভাষা হারা
 পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষত—
 মোম করে নিয়ে যাব
 সাদা কাফনের মতো 
  লেফফায় ঢাকা।
 তখন তোমাকে না ডাকলেও
তুমি আসবে 
সেদিন
  তখন তোমাকে কোনো কথা
 না বললেও
 সব কথা তোমার জানা।
 তখন আমাকে খুঁজবে
 তোমার দুই চোখের নদী 
 মৃত বন্যায়,
 কুচি কুচি হাড়ের বালির ভিতর।
 আমি তখন পাথর
 একটা কথাও বলব না 
আর।
 তোমাকে আজ শুধু এটুকুই 
বলে যেতে হবে।
            ৩
 দূরত্বের কাব্য
—————————————-
 আজও আমি থেকে গেছি অচেনা
 তোমাদের কাছে,
 আজও কাছে থেকে চলে গেছি দূরে।
 গবাক্ষের ঘুরপাক বাতাসে
 হাজার পাতার কাঁপন বাজে
 এসে এসে ফিরে যায়
 নিথর শূন্যতা এঁকে মনের বাহিরে।
 রক্তের নিরামিষ ভালোবাসা ব্যথাতুর দুই ঠোঁটে
 ডাকিনি তো কাছে
 কখনো বলিনি তোমাকে :
‘তুমি আমার ভালোবাসার রানি,
 তোমায় আমি ছেড়ে যেতে পারি?’
 তবু এমন অবিশ্বাসের চোখে দেখো
 এমন ব্যবধান করে রাখো—
 ফাঁকা হাত থেকে ফসকে নাও আঙুলগুলি
 তারপর দুপুরবেলায় ঘুমোবার সময় হলে
 ‘ফক্কড় কবি’ বলে বাইরে যেতে বল আমাকে।
 একটি চিলের সোনালি পালক ভেঙে পড়ে
 ফুলের বন্দিত গান গায় না মৌমাছি
 প্রেমের প্রেপসা ছিঁড়ে  শ্মশানের মড়কের কাছে
 তোমার তীব্র  প্রলন্তনে অস্ফুট ভাসায়
 গাহে গান…
 আজও তাই প্রলম্বিত পথে
 ভুলের ভষক হয়ে পারি না তো
 ক্ষমা চেয়ে মানুষ হতে!
 সব বসন্তে যে ফুল ফোটে না
 তা জানো নাকো তুমি।
 সব কবি যে প্রেমিক নয় 
তা জানা নেই তোমার।
 অথচ প্রেমিকওতোমার কাছে 
কামুক হয়ে যায়।
 আবিল অন্ধকারে শুয়ে থাকে কাপুরুষ
 নির্জীব পুতুলের মতো।
 তবু জেনো আমি একাকী সম্রাট
  নাড়ির একাগ্র টানে বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রভূমি
 শতাব্দীর  শিরাল শিকড়ে
 দৈন্যের রাজ্যপাট মহাকাব্য হয়।
 রণরঙ্গে তোমার সন্ধানে
 আজও খুঁজি উদ্ভাবিত অচেতন মাঠে
 অশ্বখুর— দিগ্বিজয় —মঙ্গোলীয় তরবারি—
 আত্মহারা বিপ্লবের আহ্বান।
 বাসন্তী রাতের নেশা রমণী-রমণ ভারে
 এ কাব্য ছোঁবে না তোমাকে,
 বরফের মতো জ্বরে
 একাকী সে বসে থাকে
 তোমাদের ঘরে।
            ৪
 আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি
—————————————–
 এখন যুদ্ধ নেই তবু যুদ্ধক্ষেত্রে
 একাকী আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি
 নগ্ন ইতিহাস  দাঁড়িয়ে আছে।
 রক্তের মিশ্রণে ফোরাত নদীর উষ্ণ তৃষ্ণা
 স্নায়ুর যন্ত্রণায় শুধু কারবালা
 সীমারের বুকের মতো ধূসর মরুর বুকে
 রক্তাক্ত সাখায়াত—
 নিরাসক্তির   শূন্য স্রোত বুকের ভিতরে বয়ে যায়—
 শূন্য আকাশ — শূন্য প্রান্তর
 মাঠে ঘাটে ঘাসে গাছের পাতায়
 অবিচ্ছিন্ন নীরবতায় শব্দের শোহরত
 হৃদয়ের স্পন্দনে বিভোল দোল ওঠে :
‘ফাবি ইয়াহি আলায়্যি  রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’
 বেদাতের  বিদাহি শ্মশানে সেজদায় নত হয় শির।
 এখন যুদ্ধ নেই তবু যুদ্ধক্ষেত্রে
 একাকী আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি।
                  ৫

 এক তরুণী সন্ন্যাসিনীকে
—————————————–
 হে সন্ন্যাসিনী, তুমি কী অপরূপ যন্ত্রণা পাও
 বল বল বল
 সহজ করে বল
 কেন তুমি সন্ন্যাসিনী হয়ে যাও?
 দুচোখে তোমার ধূসর কামনা কী যাতনা বিষ
 দুহাত তোমার নির্লিপ্ত  এমন নিথর বিবশ,
 কেন ওগো অশ্রুতে এমন আলপনা এঁকে চলো
 কী ব্যথা পাও
 বল বল বল
 তোমার আনত উচ্চারণে স্পষ্ট করে বল!
 ব্যর্থতার কোলাহলে কী গান শুনেছ বারবার?
 একা একা হেঁটে যেতে এত ভালোবাসো 
 কী সুখ পাও?
 বাসন্তী রাতের কুয়াশায় মৃত  স্বপ্নেরা
 তোমার আলতো বুক ছুঁয়ে
 অনাঘ্রাত অস্ফুট গন্ধে পাক খায়!
 এ মাটির স্পর্শ তুমি  চাও নাকো আর?
 কখনো ধূলোর পরে তুলবে না ঝড়?
 নদীর মতো চঞ্চল ভেঙে
 যাবে না কি হারানোর খোঁজে?
 বিস্মরণী সাগর তীরে বিদ্রুত জীবনের ভ্রষ্ট লগ্নগুলি
 স্পন্দিত নিক্কণের স্মিত ঢেউ তুলে
 হে নিষ্ঠিতা,স্বতঃই তুমি নেবে না ফিরে ফিরে?
 বল বল বল
 স্নিগ্ধ দীপ্ত উন্মেষিত ব্যগ্র দুই ঠোঁটে
 পল্লবিত বাতাসের কানে
 বঞ্চনার কোন অভিশাপে
 তুমি এমন আকসার চলে যেতে পারো?
 আজ পূজার পারুলবনে সন্ন্যাসিনী ফিরে এসো
 ক্লেদ ক্লিষ্ট রক্তমাখা দেহে
 উজ্জীবনে প্রেমে ধ্যানে সংসার সাধনে!
                ৬
 স্বপ্ন দেখতে নেই
———————————————
 জীবনের সব নিমেষগুলি জ্বলে যায়
 অনবরত জ্বলে যায়—
 ভাতে হাত ডুবিয়ে উদরের ক্ষুধা শুকায়
 জলে আর তেমন তৃষ্ণা মেটে না
 শোকের জলসাঘরে দাঁড়িয়ে
 বন্যায় ভেসে যেতে দেখি—
 লাখো লাখো মানুষ।
 কী হবে আর এমন কবিতা লিখে?
 যেখানে আমি মৃত অর্ধমৃত
 অথবা আছি আছি করে থেকেও নেই
 এমন করে কী পাব কী পেয়েছি এতদিন?
 আমার ঘরে সারারাত মোমবাতি জ্বলে গেছে
 তবু তো কেউ আলো দিয়ে যায়নি—
 সারারাত সাজগোজ করে বসে বসে আছি ;
 অন্ধকারে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে
 হয়তো  নিষ্কর্মা জোনাকিরা খুঁড়ে গেছে পথ ।
 আমি বেদব্যাসের খোঁজে গেছি—
 বাল্মীকির খোঁজে গেছি—
 হোমারের খোঁজে গেছি—
 কোথাও পাইনি তাদের সন্ধান।
 হেলেনের আজ পায়ের খুরে রক্ত ঝরতে দেখি
 পাথরের ঘর্ষণে
 বেথো শাক খেয়ে বেঁচে থাকে দ্রৌপদী,
 সীতাকে আর রাবণের প্রয়োজন নেই
 সে এখন কাঠকুড়োয় বনে।
 রোজ সকালে বিপ্লবের নামতা পড়তে পড়তে
 ফিরে আসে বিপ্লবী নেতার দল,
 লোকালয়ে —জলে ডুবে জল খায়
 দরুদের ধুলো মাখা গায়ে….
 নতুন নতুন ঘর বানায়।
 আমার সামনে বিকৃত বিপ্লব কেঁপে ওঠে
  আদিমতার অন্ধকারে প্রতিদিন সূর্য ডুবে যায়,
 পৃথিবীতে জেগে থাকে ছদ্ম-মানুষ
 আর  ভস্ম মানবতা।
 এখানে কখনো স্বপ্ন দেখতে নেই।


ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: