ইন্টারভিউ // শুভ্র ঘোষ

213

নমস্কার আমি চন্দ্র গুপ্ত। মে দিবসে স্টোরি অ্যান্ড আর্টিকেলের দরবারে আপনাদের আমার ইতিহাস শুনিয়ে, বাড়ি গিয়ে ক্লান্তির বশে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তারপর ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ সেই কথা বলব। যেহেতু স্বপ্ন,তাই পুরোটাই কাল্পনিক। পড়লেই বুঝবেন। আশা করি কেউ আহত হবেন না।

.

বলছি, পড়ুন;

.

তা সেই রাতে ঘুমানোর পর দেখি; এই দরবার, এক সংবাদ পত্রের দপ্তরে রূপান্তরিত হয়েগেছে। আর আমি সেই দপ্তরের একজন সাংবাদিক। দপ্তরের উর্ধ্বতন সাংবাদিক আমাকে দায়ীত্ব দিয়েছেন, সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাতকার নিয়ে আসতে। তাঁর জন্মদিনে, আমাদের ‘স্টোরি এন্ড আর্টিকেলে’ প্রকাশ হবে।

.

আসলে দপ্তরে খবর এসেছিল, দীর্ঘ বিরতির পর বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান চলচ্চিত্র শিল্পী সত্যজিৎ রায় বাবু আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চলেছেন। তবে মর্ত্যলোকে নয়, দেবলোকে।

.

চলচ্চিত্রে ‘অস্কার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই পরিচালক এর আগে পৃথিবীতে দারুন সব ছবি নির্মাণ করেছেন। সর্বশেষ ছবিটি তৈরি করেছিলেন কলকাতায়। সাক্ষাৎকারের আগে শর্ত ছিল, পুরো সাক্ষাৎকার হবে দেবলোকে। এবং তাঁর নির্মিতব্য ছবি নিয়েই যেন কথা হয়। সেই কথামত দপ্তর থেকে বেড়িয়ে, স্বপ্নযানে চড়ে রওনা দিলাম দেবলোকের দিকে।

.

নির্দিষ্ট সময়ের আগে পৌছালাম, যথাস্থানে। নিজের ভিতরে সবকিছু যেন ওলোট-পালট হয়ে যাচ্ছিল। খালি মনে হচ্ছিল, এতদিন পর দেখব চলচ্চিত্রের মহারাজকে। কি বলব কি করব। যাই হোক নিজেকে সামলিয়ে, সাজিয়ে গুছিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন সময়ে উনি এলেন। বসলেন, বসতে বললেন। বসলাম। পরনে তাঁর সাদা বস্ত্র। সেই গম্ভীর কন্ঠস্বর। সেই দৃপ্ত চাহনি। দেখেই বোঝা যায় আজও তিনি একই আছেন।

.

ওঁনাকে নিজের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে, নিজের আর দপ্তরের পরিচয় দিয়ে, প্রথম প্রশ্ন শুরু করলাম;

-নিজস্ব সূত্র থেকে জানা গেছে, আপনি আবার সিনেমা বানাচ্ছেন! কতটুকু সত্যি?

.

-“পুরোপুরি সত্যি। এখানে, দেবলোক থেকে অনুরোধ এসেছে একটি ছবি করতে। ছবিটি দেবলোকের নীতি ‘সত্যের আলো’ কে কেন্দ্র করে।  তাই আর কি … তাছাড়া ওদিকে, দেখতে দেখতে আমাদের বাঙলা চলচ্চিত্রেরো তো ১০০ বছর হয়ে এল। ভাল মনে আছে, সেই ১৯১৯ সালে শুরু হয়েছিল বাঙলা চলচ্চিত্রের পথ চলা। সেখান থেকে এখানে।

.

তাই দেবলোক থেকে অনুরোধ এসেছে একটা বাংলা ছবি করে দেখাতে। তাই করব। সেই অর্থে, আমি আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছি”।

.

-তাহলে দেবলোকে পরিচালক হিসেবে এটি তো হবে আপনার প্রথম ছবি। ছবির নাম ঠিক হয়েছে?

-“এই চলচ্চিত্রের নাম সেরকম নিশ্চিত কিছু ভাবিনি। এটি পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া একটি পৌরাণিক গল্পকে নির্ভর করে হবে”।

-আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণে, এখন এখানে কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন?

.

-“দেখুন, সব সময় মানতাম একটি ছবির গল্পই প্রেক্ষাগৃহে দর্শককে ধরে রাখতে পারে। তাই গল্প, পাশাপাশি ছবির সংলাপ ও গান, কলাকুশলীদের সন্তুষ্টি—এখানেও সেই বিষয়গুলোর ওপরই বেশি জোর দেব”।

.

-এত দিন পর চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য রয়েছে?

.

-“আমি দেখেছি পৃথিবীতে আমাদের বাঙলা ছবি এখন অনেক কিছু থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেই বলয় টিকে বজায় রেখে, তবে চলতি উন্নতির লড়াই এর বাইরে গিয়ে কিছু একটা নিয়ে কাজ করতে চাইব। এই ধরুন, দেব-ধর্ম কে একটু অন্যরকম ভাবে ভেবেছি! পুরোটা এখনই বলতে পারব না। তবে বলে রাখি, ধর্মকে আমাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের কাছে নতুন ভাবে পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু একটা করতে চেষ্টা করব”।

.

-আপনার ভাবনার একটি নমুনা দুই লাইনে জানা যাবে?

.

-“এই যেমন ধরুন, শ্রী কৃষ্ণকে সবাই ভগবান ভাবেন তো। হতেই পারে সে ভগবান! কিন্তু এমনো তো হতে পারত, যে সেই সময়ে শ্রী কৃষ্ণ এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের মস্তিষ্কের অন্তত আশি শতাংশ ব্যবহার করতে পারতেন। যার ফলে অত বুদ্ধি রাখতেন।

.

আসলে আমরা কেউ জানি না যে মগজের আশি শতাংশ ব্যবহার করতে পারলে,একজন সাধারন মানুষ কোন পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করতে পারেন। তাই সেই সূত্র ধরেই এমন ভাবে তো ভাবতেই পারি!

.

দেখুন যেটা পুরোপুরি জানি না, সেটি নিয়ে কিছু বলা উচিৎ হবে না। তবে দেবলোকে এতদিনে থেকে দেখে যা বুঝেছি তাতে মনে হয়, পুরোপুরি দেবত্ব লাভ হলে, তাঁর শরীর কায়া কিছুই অত বছর ধরে ধরাধামে টিকে থাকত না। মানে ব্যাপারটা অনেকটা এরকম হত, হয় তিনি সর্বভূতে মিশে অদৃশ্য অবস্থায় থাকতেন। অথবা তিনি, এই দৃশ্যমান এই অদৃশ্য অবস্থায় থাকতেন”।

.

(এতক্ষন দীর্ঘ সাক্ষাতকারের পর সাময়িক নিস্তব্ধ থেকে, চারপাশ মাথা ঘুড়িয়ে একবার  দেখলেন। ভাবলাম পৃথিবীতে থাকা কালীন পাইপ ধরানোর অভ্যেসটি বোধহয় মনে পড়েছে। কিন্তু আমার ধারনা ভূল ছিল।)

.

-তিনি এবার সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করলেন, “এতক্ষন যা বললাম, বোঝা গেল কি?”

.

(তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমার শব্দ সকল কোনো আকার ধারন করতে পারল না। তাই মাথা নাড়িয়ে জানালাম নিজের উত্তর।)

.

-“এইরকমই আরো অনেক ভাবনা আছে”।

(এই অব্দি বলে হাতের উপর মুখের ভার দিয়ে, কিছুক্ষন  চুপ করে কিছু একটা ভাবলেন।)

– “বুঝলেন, অনেকটা সিনেমার ভেতর সিনেমা। বাকিটা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে জানতে অনুরোধ জানাব”।

.

– এ ছবির কাহিনি, সংলাপ ও চিত্রনাট্য কি আপনার লেখা?

.

-“হ্যাঁ। জানেনই তো এর আগে যে কটা ছবি নির্মাণ করেছি, সব কটিরই সংলাপ আমার লেখা ছিল। ছবিগুলোর কাহিনি ও চিত্রনাট্য গুলিও”।

.

-আপনার এ ছবির অভিনয় শিল্পীদের দু-একজনের নাম যদি… মানে কারা থাকছেন?

.

-“পৃথিবী থেকে আসা চলচ্চিত্র জগতের নতুন পুরানো কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়েছে।

কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত দেবরাজের সাথে, শিডিউলসহ কাগজে-কলমে চুক্তি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বলা ঠিক হবে না। তবে একটা তথ্য দিই, ছবিটি যৌথ প্রযোজনায়ও নির্মাণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছুটা চমক রয়েছে”।

.

-ক্যামেরার সামনে কবে দাঁড়াচ্ছেন?

.

-“আগে অনেক প্রস্তাব পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি ভালো গল্প পাই, তাহলে  ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব। নমস্কার”।

.

এই অব্দি বলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে,পিছন ঘুরে এক সাদা আলোর মধ্যে ধীরে ধীরে মিশে যেতে থাকলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতন সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে, হঠাৎ দুমদাম শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দ শুনে আমি পিছন ফিরে…

.

…ঘুম চোখে কান পেতে শুনি, খবরের কাগজওয়ালা বাকী থাকা টাকা চাইতে এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে।

.

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: