ইমপোস্টার – শেষ পর্ব : সুব্রত মজুমদার

 তিন             

সন্ধ্যাবেলা নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে সেদিনের সেই ডাকাতির ফুটেজ দেখেছিল বিক্রম। মোবাইলটা বেজে উঠল। প্রফেসরের ফোন। -“হ্যালো, বিক্রম ? আমি প্রফেসর লোমহর্ষণ বলছি। “-“হ্যাঁ বলুন। “-“কিছু জানতে পারলেন ?” -“সেদিনের সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছি। ওটাই দেখছি। ডাকাতরা কিন্তু নিছক ডাকাতির জন্য আসেনি। ওদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল।
              ম্যানেজারবাবুর বক্তব্য আর সেদিনের ঘটনা মিলে যাচ্ছে। তবে অগ্নিবাবুর অপহরণ আর ডাকাতির মোটিভ এই দুটোই স্পষ্ট নয়। আচ্ছা বাইরে অ্যালুমিনিয়ামের কভার যুক্ত কাচের বোতলে কি কি রাখা যেতে পারে একটা অনুমান দিতে পারবেন ? “-“চা, কফি, জল। ” অনিলিখার গলা ভেসে এল। -” আর.. “-“অ্যাসিড। বাইরে অ্যালুমিনিয়াম থাকায় পোর্টেবল হবে। এছাড়াও কোনও জৈবরাসায়নিক পদার্থ অনায়াসে রাখা যেতে পারে। কেন বলুন তো। “-” না এমন কিছু না, জাস্ট কৌতুহল। ওকে বাই প্রফেসর । ” বিক্রম ফোনটা রেখে দিল। 
                       সন্ধ্যাবেলা তিন্নিদের ঘরে জড়ো হলাম সবাই। অগ্নিমিত্রর ব্যাপারে কিছু রহস্যের উজাগর হবে । তিন্নির মা তার ভাইকে নিয়ে এরকম আলোচনায় যথেষ্টই বিরক্ত। তার হাবভাব আর ব্যবহারই বিরক্তির পরিমাণটা বুঝিয়ে দিচ্ছে।
                          প্রফেসর বললেন, “আমি সকলের কাছ হতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তিন্নির মামা মানে অগ্নিমিত্রবাবুকে আমি বৃথাই সন্দেহ করেছিলাম। আসলে উনি ভুগছেন একটা জটিল মানসিক অসুখে। Capgras delusion । এ রোগে সবসময়ই কাউকে না কাউকে ইমপোস্টার বলে ভ্রান্তি হয়। সাধারণত কোনও নিকটজন বা পরিচিতের কাছে ধোঁকা খাওয়ার পর হতেই এই সমস্যা শুরু হয়। আমার মনে হয় ব্যাঙ্কের সেই ইনসিডেন্টের পরই উনার এরকম মানসিক অবস্থা হয়। আই এম স্যরি ফর মাই অ্যাপ্রোচ। “


                  বিক্রমের মুখে হাসির রেখা দেখা যায়। সে বলে,”আপনার দুঃখপ্রকাশের কোনও কারণ নেই প্রফেসর । ইউ ওয়ের রাইট। “-“মানে ?”  চমকে ওঠেন প্রফেসর । বিক্রম বলল,”মানে খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে আজ হতে তিনমাস আগে। যেদিন অগ্নিবাবুর ব্যাঙ্কে ডাকাত পড়ে। আপনারা হয়তো জানেন সেদিন ওই ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। মৃতদেহ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সেদিন দু’তিন কোটি টাকার মতো লুঠ হলেও যে আইটেমটি পুলিশের ডায়েরিবুকে জ্বলজ্বল করছে সেটি হল লকার নাম্বার ৩০২। লকার রুমের একমাত্র ওই লকারটিই লুঠ করেছে দুষ্কৃতীরা। “


“কি এমন ছিল ওতে যে বেছে বেছে ওই লকারটিতেই নজর গেল দুষ্কৃতীদের ?” প্রফেসর জিজ্ঞাসা করলেন । “ইশিওনেট 4140, একটা জৈব অস্ত্র। এটা এক ধরনের ভাইরাস। রেসপিরেটরি সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রোগীকে সোজা যমালয়ে পাঠিয়ে দেয়। আর যেহেতু এয়ার কনটেক্টে ছড়ায় তাই একবার ছড়িয়ে গেলে এর বিস্তার রোধ করা কার্যত অসম্ভব। “


-” এ তো অতি মারাত্মক অস্ত্র। আমাদের দেশে এটা পাওয়া যায় না। কিন্তু এই ভাইরাসের সঙ্গে অগ্নিবাবুর সম্পর্ক কি ?” প্রফেসরের কৌতুহলী প্রশ্ন ধেয়ে এল। অগ্নিমিত্রর দিকে চেয়ে বিক্রম বলল,” আছে প্রফেসর আছে। সেদিন ভাইরাসের কনটেনারটা নিয়ে পালাবার সময় রাস্তায় পুলিশের নজরে পড়ে যায় ওরা। সবাই পালিয়ে গেলেও ওদের হেড  কালাটোপি ওরফ ডঃ করঞ্জ বণিক পুলিশের সামনাসামনি পড়ে যায়।

ঠিক তখনই ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙ্গে নিচে পড়ে যায় সে। অনেক কষ্টে উপরে উঠে এলেও সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারে না। এদিকে ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রেড অ্যালার্ট জারি হয়েছে। সুতরাং নিজের বুদ্ধির উপর ভরসা রাখল করঞ্জ।
                  অঘোরবাবু এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন। স্বভাবতই ভঙ্গিতেই তিনি বললেন, “কিরকম বুদ্ধি মশাই ? বিক্রম বলল,”ফেস চেঞ্জিং মাস্ক। এটি ব্যবহার করেই ডঃ করঞ্জ বণিক হয়ে গেলেন অগ্নিমিত্র মৈত্র, আর বাস করতে লাগলেন নির্ভয়ে, – সঠিক সময় আসা পর্যন্ত। “


-” মিথ্যা কথা ! এও একটা ইমপোস্টার। সব মিথ্যা…. সব…. ”     অগ্নিমিত্র চিৎকার করে উঠল। বিক্রম উঠে এসে চেপে ধরল অগ্নিমিত্রকে, তারপর টেনে খুলে ফেলল অগ্নিমিত্রর মাস্ক, বেরিয়ে এল একটা অজানা মুখ। কালাটোপি ওরফ ডঃ করঞ্জ বণিক। আর সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রমের নির্দেশ পেয়ে ঘরে ঢুকল সশস্ত্র পুলিশ। ডঃ করঞ্জ বণিককে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। আর উদ্ধার হল ভাইরাসের কনটেইনার।


         প্রফেসর বললেন , “কিন্তু কিভাবে বুঝলেন যে ও অগ্নিমিত্র নয় ?” -“আর দাদাই বা কোথায় ?” তিন্নির মায়ের সকরুণ প্রশ্ন। বিক্রম বলল, “আপনার মনে আছে কিনা জানি না ম্যাডাম, আমি মিসেস ভটচাযকে শুধিয়েছিলাম যে অগ্নিবাবুর কোনও অপারেশন বা দুর্ঘটনা হয়েছিল কিনা। আসলে মাস্কের লাইনিংটা সেদিনই আমার চোখে পড়েছিল। পরে নেটে ফেস মাস্কিং নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়তে পড়তে ওইরকমই লাইনিংয়ের ছবি আমার চোখে পড়ে। ব্যাস দু’য়ে দু’য়ে চার। বিস্তৃত তদন্ত শুরু করলাম। সব তথ্য সামনে চলে এল। “
            এরপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নামিয়ে বলল, ” অগ্নিমিত্রবাবু সেদিনই দুষ্কৃতীদের হাতে নিহত হন। তার লাশ মর্গে সুরক্ষিত আছে। “


                 তিন্নির মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। প্রফেসর মাথা নিচু করে বসে রইলেন। গোটা পরিবেশটা বদলে গেল। সেদিনই লিগাল কাজকর্ম সেরে লাশ সংগ্রহ করা হল। সৎকারের পর অগ্নিমিত্রর দশ বছরের ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে  কাঁদতে লাগলেন অঘোরবাবু। যে লোকটাকে সবসময় হাসতে ও হাসতে দেখেছি তাকে কাঁদতে দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল।                                সমাপ্ত 

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: