ইমপোস্টার – ২ : সুব্রত মজুমদার

দুই
                               এরপর দিনতিনেক কেটে গিয়েছে। সকালবেলা আমরা ত্রিরত্ন মিলে চায়ের কাপে ঝড় তুলছি। আগামী কালই পেনসন তুলেছেন বলে অঘোরবাবু আজ বেশ দরাজ দিল। দুপুরের মাংসভাতের সমস্ত খরচ তার। বললেন, “জমিয়ে খাব মশাই। তবে রান্নাটা কিন্তু আমিই করব। সেদিন…..”    কথা শেষ করতে পারলেন না অঘোরবাবু, কলিংবেলের আওয়াজ হল।


                   দরজা খুলতেই রবীন্দ্রনাথের মতো চেহারার সেই বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক মন্থর গতিতে  ঘরে ঢুকে এলেন । প্রফেসর লোমহর্ষণ । প্রফেসরকে বেশ চিন্তিত দেখাল। বিক্রম জিজ্ঞেস করতেই প্রফেসর বললেন তার উদ্বেগের কারণ। “সেদিন জন্মদিনের পার্টিতে যে ঘটনাটা ঘটল সেটাই আমার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে বিক্রমবাবু। সেদিন ওই লোকটাকে দেখে শুধুই মনে হচ্ছিল কোথাও যেন দেখেছি উনাকে। গত দু’দিন খুবই মানসিক স্ট্রেস নিয়ে কাটিয়েছি। কাল রাতে হঠাৎ মনে পড়ল।”


আমরা বেশ উৎসাহের সঙ্গেই শুনছিলাম। বিক্রম বলল,” স্ট্রেঞ্জ ! “
” হ্যাঁ বিক্রমবাবু, গল্ফগ্রীনে একটা বেসরকারী ব্যাঙ্কে  আমার একটা অ্যাকাউন্ট আছে। মাস তিনেক আগে KYC সংক্রান্ত ব্যাপারে সেখানে গিয়েছিলাম । কিন্তু হঠাৎই একদল দুষ্কৃতী এসে  চড়াও হয়। প্রায় দু’তিন কোটি টাকা লুঠ করে নিয়ে যায়। একজন কাস্টমারের মৃত্যুও হয়। ওখানেই দেখেছি উনাকে। কেন জানি না একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। আমি চাই এই কেসটা  আপনি ইনভেস্টিগেট করুন। ” 


                   দুটো পেন  নিয়ে খেলছিল বিক্রম। পেনদুটো নামিয়ে রেখে বলে,”মানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। আমারও যে খটকা লাগেনি তা নয়, তবে  আর মাথা ঘামাইনি। তবে আপনি যখন বলছেন তখন অবশ্যই দেখবো। “


                     প্রফেসর বললেন ,”তিন্নির বাবা আমার বিশেষ পরিচিত। সেই সূত্রেই ওই জন্মদিনের পার্টিতে আমার নেমন্তন্ন ছিল। আমি উনাকে ফোন করেছিলাম, বললেন এখন সবকিছু ওকে আছে। কিন্তু যাই বলুন বিক্রমবাবু এই ঘটনার আড়ালে আরেকটা ঘটনা তো আছেই। 

-“হুম্ । আর সেটাই  আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আপনি চিন্তা করবেন না প্রফেসর, আমার টিম রেডি। তবে  একটা ছোট্ট অনুরোধ ছিল, যদি রাখেন তবেই বলব। “-“হ্যাঁ অবশ্যই রাখব । বলুন। আপনার উপর আমার বিশ্বাস আছে। সাধ্যের বাইরে যে কোনও আবদার করবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। “


                  বিক্রম বিনয়াবনত হয়ে বলল, “এই গরীবের কুটিরে একটু অজমাংস দিয়ে দুপুরের আহারটা সেরে যেতে হবে। অঘোরবাবু পেনসন তুলেই কচি পাঁঠার মাংস কিনে এনেছেন। উনার সম্মানে যদি….” 


             প্রফেসর আর না বলতে পারলেন না। খাবার টেবিলে মাধবদার হাতের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন তিনি । গল্পচ্ছলে অঘোরবাবুর নরমাংসের প্রসঙ্গও উঠল। হাঁসিতে ফেটে পড়ল সবাই। অঘোরবাবু নিজের নির্বুদ্ধিতা বুঝতে পেরে বললেন,”অনেক হয়েছ। বগলা যে ধরনের লোক তাতে এ ভুল যে কারোরই হতে পারে।” 


                   পরদিনই গিয়ে হাজির হলাম ‘বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক’ এর গল্ফগ্রীন শাখায়। এখানেই  অগ্নি ক্যাশ অফিসার পোষ্টে কাজ করত। ম্যানেজারবাবু অবাঙ্গালী, দেওঘরের কাছাকাছি বাড়ি। যথেষ্টই অমার্জিত ব্যবহার। বিক্রম সেদিনের সেই ইনসিডেন্টের প্রসঙ্গ তুলতেই রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। রুক্ষ গলায় তর্জনি উঁচিয়ে বললেন, “হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ? কি চাই আপনার ? শখের গোয়েন্দাগিরি বের করে দেব। পুলিশ ডাকব না এমনি যাবেন ?” 
               বিক্রম শান্ত গলায় বলল, “আপনাকে আর কষ্ট করে পুলিশ ডাকতে হবে না। আমিই ডাকছি।” 


             কমিশনারকে ফোন লাগাল বিক্রম। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর ম্যানেজারবাবুকে ফোনটা দেওয়া হল। ম্যানেজারবাবু কয়েকবার ‘ইয়েস স্যার’ ‘নো স্যার’ করার পর বিক্রমের হাতে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “স্যরি স্যার। আসলে কিছুদিন হতে কাজের এত চাপ যে মাথাটা কাজ করছে না। “

-“মাথা ঠিক হলে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি ?” -“হ্যাঁ স্যার, যা জানতে চান বলুন।” ম্যানেজারবাবু বিনয়াবনত কণ্ঠে বললেন। -“সেদিন ঠিক কি হয়েছিল বলুন।” -“সে এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড স্যার। ঠিক এগারোটা নাগাদ জন চারেক ডাকাত এসে হানা দেয়। কাস্টমার কর্মচারী সবাইকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেয় ওরা। ফোনগুলোও কেড়ে নিয়েছিল। তারপর আমাকে আর ক্যাশ অফিসার অগ্নিকে নিয়ে চলে আসে আমার কেবিনে । 


একটা কাস্টমারের ডিটেইলস নেয় ওরা। তারপর আমাকে হাতমুখ বেঁধে ওখানেই ফেলে রেখে অগ্নিকে  নিয়ে চলে যায় লকার রুমে। সেদিন হতেই অগ্নি নিখোঁজ। ওকে পাওয়া যায় তিনদিন পর। ফেরার পর। হতেই কেমন যেন পাগলেট হয়ে গেছে ও।”


-“সেই কাস্টমারের নামটা মনে আছে ? ” বিক্রম প্রশ্ন করল। -“হ্যাঁ, চিং লি। অভারতীয়, কোনও একটা মোবাইল…. ও হ্যাঁ টুকাট মোবাইল কোম্পানির কলকাতা শাখার সিইও। “-“লকার আছে ? “-” হ্যাঁ স্যার । 302 আর 303 । “-” চলুন তো দেখি। ”   বিক্রম ম্যানেজারের সঙ্গে লকার রুমে ঢুকল।

 
                 তিনশো দুই আর তিনশো তিন নম্বর লকারটা ভালোভাবে পরীক্ষা করল। গ্যাস কাটার দিয়ে লকারদুটো কাটা হয়েছে। আর কোনও ক্লু নেই। সেদিনকার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এলাম।

 
                রাস্তায় বিক্রম বলল,”বুঝলে সায়ক, কেসটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম ততটা সহজ নয়। ডাকাতেরা ব্যাঙ্কে এল, সবাইকে পণবন্দি করল, অথচ সোনাদানা টাকাপয়সা সবকিছু ছেড়ে লুঠকরল কি না দুটো লকার, তাও আবার একই লোকের। গোলমাল আছে সায়ক, গোলমাল আছে। চল একবার থানা হতে ঘুরে আসি। ” 


                     থানায় গেলাম। বড়বাবু গোপেন শীল বিশাল বপু নিয়ে একখানা বেঞ্চের উপর বসে আছেন। বিক্রম কানে কানে বলল,”আজ পর্যন্ত শ’খানেকের উপর চেয়ার ভেঙ্গেছেন উনি, বাধ্য হয়েই এই ব্যবস্থা। কমফর্টেবল আর লোকসানও কম। “


              আমাদের দেখেই ওঠার চেষ্টা করলেন বড়বাবু । কিন্তু পারলেন না। বাধ্য হয়েই ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “সুস্বাগতম বিক্রমবাবু। দিয়ে কি কারণে আগমন ?” -“বিনিয়োগ ব্যাঙ্কের সেই ডাকাতির ঘটনাটা।

কিছু যদি তথ্য দিতে পারেন। “”দিয়ে ওই অগ্নিমিত্র মৈত্রের কিডন্যাপ তো ? আর বলবেন না মশাই, দিয়ে ওই কেসটায় আগাগোড়া কিছুই পাইনি। দিয়ে হল কি, ব্যাটা ফরেন্সিক এক্সপার্ট বলে কি জলের বোতল রাখা ছিল ওই লকারে। দিয়ে ভাবুন কাণ্ড ! – “
এটুকু বলেই বড়বাবু তার পাশে রাখা টিফিনবক্স হতে একটুকরো কেক তুলে নিয়ে মুখে পুরে চিবোতে লাগলেন।


                     আর কিছু তথ্য পাওয়া গেল না। বললাম, “জলের বোতলের ডাকাতি ? তোমার এটা অস্বাভাবিক লাগছে না ?” বিক্রম বলল, “ফরেন্সিক এক্সপার্ট লকার নাম্বার 302 তে একটা বোতলের দাগ পেয়েছেন। সেই দাগে অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেস পাওয়া গেছে। রি-কনস্ট্রাক্ট করে দেখা গেছে ওটা একটা অ্যালুমিনিয়ামের জলের বোতল। বোতলগুলোর ভেতরে কাচের একটা লেয়ার থাকে। বাজারে ইজিলি পাওয়া যায়। কিন্তু ওই কয়েকশো টাকার জলের বোতলের জন্য এতবড় ডাকাতি ? বোতলটাতেই কিছু ব্যাপার আছে। “

(চলবে ) 

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: