ঈশানপুরের অশরীরী // ৬ // সুব্রত মজুমদার

545

.

.

.

শশাঙ্ক জোর করে দোতলায় উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন নিচে নেমে এল তখন তার চোখেমুখে একটা আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। দরজার সামনেই বিক্রমকে দেখে  শশাঙ্ক সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকাল। বিক্রম হাঁসিমুখে এগিয়ে এল শশাঙ্কের কাছে। ” আমি যদি খুব ভুল না করি তাহলে আপনিই শশাঙ্ক শেখর রায়।”

.

.

” হ্যাঁ, কিন্তু আপনি ? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না !” শশাঙ্ক উত্তর দেয়।

বিক্রম হাতজোড় করে প্রণামের ভঙ্গিতে বলেন, ” আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ বিক্রম মুখোপাধ্যায়। আপনার জনৈকা শুভাকাঙ্খী আমাকে অ্যাপোয়েণ্ট করেছেন। উদ্দেশ্য কি তা ডিটেইলসে জানি না, তবে তিনি যে আপনাকে বাঁচাতে চান তা পরিস্কার। “

.

.

শশাঙ্কবাবুর মুখে হারানো দীপ্তি আবার ফিরে আসে। ” যদি তাই হয় তাহলে আপনাকে আমার কিছু বলার আছে। কিন্তু উনি কে ? ” শশাঙ্ক দেবলীনার দিকে তাকায়।

বিক্রম শশাঙ্ককে আশ্বস্ত করে,” আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, দেবলীনা। আপনি ওর সামনেই সবকিছু বলতে পারেন। “

.

.

       শশাঙ্ক বিক্রমকে নিয়ে গাড়ির ভেতরে যায়। দেবলীনা, শশাঙ্ক আর বিক্রম গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়ে । গাড়িটা কিছুদূর এগোতেই নজরে পড়ে একটা মিছিল। একদল লোক আবিরে রাঙা হয়ে গান গাইতে গাইতে আসছে। কাজের চাপে খেয়ালই ছিল না যে আজ হোলি। দেবলীনার ইশারায় গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। বিক্রম আর দেবলীনা নেমে পড়ে। তারা মিশে যায় ঐ ভিড়ের মধ্যে। উড়তে থাকে আবির। বিক্রম গান ধরে – 

.

.

আজ ফাগুন হাওয়ায় উড়িয়ে দাও

                                            ব্যর্থ প্রাণের যত আবর্জনা 

আজ নতুন আলোয় ধুইয়ে দাও 

                                        কঠোর প্রাণের যত নিষেধ যত প্রবঞ্চনা। 

ঐ দিকে দিকে পলাশ হাঁসে 

                                       (তার ) আগুন রঙে ফাগুন আসে 

আমের বোলে ভ্রমর বসে

                               – মেলে নবীন ডানা। 

ভোরের রবি আবির মেখে 

                                 দ্বারে দ্বারে যায় গো ডেকে,

কার কপালে তিলক আঁকে 

                                      প্রজাপতির ডানা। 

আজ শিমূলবনে পাগলা হাওয়া 

                                          করে কেবল আসা যাওয়া, 

(তার) নদীর জলে উজান বাওয়া, 

                                     ঘুচিয়ে নিষেধ-মানা ।

হোলির দল গেয়ে ওঠে, 

          হোলি হ্যায় হোলি হ্যায়…. 

বৃন্দাবনমে হোরি খেলে রাধা প্যারী

আবিরে আবিরে রাঙা হল অঙ্গ ভিজিল নীল শাড়ি। 

হাতে পিচকারি চলে গোপনারী 

                                   কালো তমালে লুকাইল হরি, 

আহিড়িনী রোষে টানে পীত শাড়ি, 

                            বসন ধরে কানা কাঁপে থরথরি। 

সাত রঙে রাঙে গোপী সাত সুর তুলে 

                                দখিনা পবন বয় যমুনার কূলে, 

শিমূল পলাশ ঝরে ফাগুনের কালে 

                              পঞ্চমে ধরে তাণ কোকিল কূহরী। 

.

.

                                  হোলির শোভাযাত্রা এগিয়ে যেতেই বিক্রম আর দেবলীনা গাড়িতে এসে বসে । দুজনেই আবির গুলালে মাখামাখি হয়ে এসেছে। বিক্রম শশাঙ্ককে রহস্যময়ী মহিলাকণ্ঠ আর সাধুবাবার কথা বললেন। সবকিছু শুনে শশাঙ্ক কিছুক্ষন থ হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, ” আমার বিপদ সন্মন্ধে কিছুটা পূর্বাভাস আমাকে ছোটমা দিয়েছেন।”

.

.

” ছোটমা ! কিন্তু তিনি তো প্যারালাইজড।” বিক্রম দ্বিধা প্রকাশ করে।

” প্যারালাইজড হলেও কথাবার্তা বলতে পারেন। তবে অনেক কষ্টে।”

বিক্রম বাধা দিয়ে বলে, ” আমি সেকথা বলছি না। একজন প্যারালাইজড মহিলা যিনি নিজের ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তিনি এত খবর পান কোথা থেকে ? “

.

.

” বিক্রমবাবু, যারা মা বা মাতৃতুল্য তারা সন্তানের বিপদের আঁচ অনেক আগে থেকেই পান। ”  শশাঙ্ক ব্রেক কষে। গাড়িটা এসে দাঁড়ায় একটা দোতলা বাংলো টাইপের বাড়ির সামনে।

                     দোতলা বাড়িটা বেশ আধুনিক। একতলায় গাড়ির পার্কিং। সিঁড়ি বরাবর উঠে গিয়ে দোতলার সামনে ঝুলবারান্দা। সেখানে এক ভদ্রমহিলা বসে মোবাইল ঘাঁটছেন। বিক্রমরা এসে পড়াতেও তার কোনো ভাবান্তর হল না। শশাঙ্ক বিক্রমকে বসতে বললেন।

এতক্ষণে চোখ তুললেন ভদ্রমহিলা।  “সকাল সকাল কোথায় বেরিয়েছিলে ?”

.

.

” বাড়ি গিয়েছিলাম। পরিচয় করিয়ে দিই ইনি বিখ্যাত গোয়েন্দা বিক্রম মুখার্জি।”   শশাঙ্ক বিক্রমের দিকে নির্দেশ করল। বিক্রম হাত জোড় করে নমস্কার জানাল।

“… আমি ডাঃ অপরুপা সাহা রায়”  ভদ্রমহিলা প্রতি নমস্কার জানাল।

           অপরুপার সাথে কথা বলে বিক্রম যা বুঝল তাতে অপরুপাও তার শাশুড়ির প্রতি প্রসন্ন নয়। শশাঙ্কের বাড়িতে কফি খেতে খেতে ভুতের ব্যাপারে আলোচনা হল। বোঝা গেল ডাক্তার হলেও শশাঙ্ক ভুতে বিশ্বাস করে। 

.

.

” আপনাদের দুজনের কাছেই একটা কমন প্রশ্ন আছে। তিয়াশা দেবীর ব্যাপারে।” বিক্রমের কথাটা শেষ হবার আগেই অপরুপা বলে ওঠে, ” মহা ধড়িবাজ মেয়ে। ওর পেটে পেটে শয়তানি।” 

শশাঙ্ক আপত্তি জানায়, ” অপরুপার কথায় কান দেবেন না। তিয়াশা কিচ্ছু বোঝে না। না বুঝেই আলটপকা মন্তব্য করার অভ্যাস ওর। রথিনের পূর্বজন্মের পূন্যের ফল যে ওকে বৌ হিসেবে পেয়েছে।” 

.

.

          যে ভ্রাতৃবধূ ভাসুরকে সন্মান দেয় না তার জন্য ভাসুর মহাশয়টির এত দরদ কেন তা বুঝে উঠতে পারে না বিক্রম। আসার সময় শশাঙ্ক তার গাড়িতে করে বিক্রম আর দেবলীনাকে রায়ভিলার সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। 

.

.

              রাত্রে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিক্রমরা ঘুমিয়ে পড়ে। রাত ঠিক দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙ্গে যায় বিক্রমের। লোডশেডিং হয়ে গেছে। টর্চ জ্বালিয়ে বিছানা থেকে উঠে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় সে। জলের জাগ হতে কাঁচের গ্লাসে জল ঢালে বিক্রম। জল খেতে খেতে দেবলীনার দিকে তাকায়, – – কি সুন্দর লাগছে দেবলীনাকে। মনে হচ্ছে গল্পের রাজকন্যা জাদুকরের রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছে। 

.

.

                       হঠাৎ একটা চাপা কথোপকথনে সজাগ হয়ে ওঠে বিক্রম। দরজার ওপার হতে ভেঁসে আসছে সেই আওয়াজ। খুব সন্তর্পনে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় বিক্রম। সিঁড়ির কাছে দুটো ছায়া মূর্তি নিজেদের মধ্যে কি যেন কথা বলছে। এমন সময় একটা তীব্র আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে গেল। একটা ছায়ামূর্তি লুটিয়ে পড়ল সিঁড়ির উপর আর আরেকজন দৌড়ে পালাল। বিক্রম টর্চটা জ্বালিয়ে দৌড়ে এল সিঁড়ির কাছে। দেখল সিঁড়ির উপর পড়ে আছে হাবল। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বুকের উপর বেঁধানো একটা ধারালো ছুরি। ক্ষতস্থান হতে গলগল করে বেরিয়ে আসছে তাজা রক্ত। পরীক্ষা করে দেখল বিক্রম, – – না আশা নেই। হি হ্যাজ নো মোর। 

.

.

                     চিৎকারের শব্দে ইতিমধ্যেই বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এর মধ্যেই বিদ্যুৎও এসে গেছে। একে একে সবাই অকুস্থলে হাজির হল। সবার মুখেই আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট। বিক্রম মোবাইল বের করে পুলিশকে খবর দিল।

.

.

 পুলিশ ঘন্টাখানেকের মধ্যে এসে পৌঁছল । পুলিশ অফিসার বিক্রমকে ভালোকরে চেনেন। এসডিপিও প্রেমা সিং চৌহানের বন্ধু হিসাবে বিক্রমের পুলিশ মহলে খুব খাতির। এছাড়া মুয়াদেবের রহস্য সমাধান করার পর (   পড়ুন বিক্রম কাহিনী – ‘মুয়াদেবের শাপ’  ) বিক্রমের নাম সব বড় বড় পেপারে বেরিয়েছিল। তাই তদন্তের ভার বিক্রমের উপর ছেড়ে অফিসার ডেডবডি মর্গে পাঠিয়ে দিলেন। 

.

.

       “আপনারা যে যার রুমে যান। আমি কথা দিচ্ছি কালকেই সব রহস্যের সমাধান করব।”  বিক্রম সকলকে নিজের নিজের রুমে পাঠিয়ে নিজেও চলল ঘুমোতে। খুব ঘুম পাচ্ছে। তাছাড়া দেবলীনা একা আছে ঘরে। 

.

.

  সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় বিক্রমের পায়ে কি একটা ঠেকল। জিনিসটা সন্তর্পনে তুলে নিল বিক্রম। উল্টে পাল্টে দেখল। একটা কেমিক্যালের শিশি । মেড ইন জার্মান। শিশিটা স্যাম্পল ব্যাগে ভরে নিল।

.

.

…. চলবে 

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *