ঈশানপুরের অশরীরী // ৭ // সুব্রত মজুমদার

fty
 শেষের কথা

.

সকালে উঠেই বিক্রম ঘোষণা করেছিল যে সে আজ সব রহস্যের সমাধান করবে। এজন্য বাড়ির সবাইকে মাসিমার রুমে ডেকে পাঠিয়েছে। সবাই একে একে জড়ো হল। শশাঙ্ক ও অপরুপাও এল। এবার বিক্রম শুরু করল।

.

” রায়ভিলার রহস্য আমার এযাবৎ নেওয়া সব কেসকেই ছাপিয়ে যায়। কারণ,…. কারণ হলো এই কেসে আমার ভূমিকা। রহস্য সমাধানের জন্য আমাকে নিয়োগ করা হয় কুড়ি হাজা টাকার অগ্রীম পারিশ্রমিক দিয়ে। কিন্তু কি কেস, কে আমার নিয়োগকর্ত্রী এসবের কিছুই আমি জানতাম না। আমার কাছে সম্বল কেবল একটা ঠিকানা, – – ঈশানপুর রায়ভিলা।

.

এখানে এসে দেখলাম একটা ভূত রাতবিরেতে মোমবাতি নিয়ে শোক মিছিল করছে আর সামনে যাকে পাচ্ছে তার মাথার পিণ্ডি চটকে দিয়ে মেন্টাল অ্যাসাইলামে পাঠাবার সুবন্দোবস্ত করছে। অনেকের মতে তিনি বাড়ির বড়কর্তা মহেন্দ্র রায়। মহেন্দ্রবাবু আবার মারা যাওয়ার সময় ‘র..’ বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই ‘র’ টি কে ? র দিয়ে নাম এমন লোকের অভাব এ বাড়িতে নেই। রথিন, রমলা, রমেশ…. “
” রমেশ ? এ আবার কে ? ” দেবলীনা অবাক হয়।

.

বিক্রম আবার শুরু করে। ” সব বলব। এখন একটা ম্যাজিক দেখাই। ” এই বলে বিক্রম মাসিমার কাছে এগিয়ে যান। “মাসিমা, একটু উঠে দাঁড়াবেন দয়া করে, – – একটু চরণধূলি নেব। “
মাসিমার কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। বিক্রম এবার সবার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,” আপনারা সবাই জানেন যে মাসিমা বহু বছর ধরে বিছানাগত। কিন্তু যেটা জানেন না সেটা হল আমার নিয়োগকর্ত্রী ইনিই। আর ইনিই হাবলকে খুন করেছেন। “

.

বিক্রমের কথা শেষ হতে না হতেই মাসিমা বিছানা হতে উঠে পাশের টেবিলে রাখা ওষুধের শিশিগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন, ” মিথ্যে কথা। আমি কারোর খুন করিনি। হাবলকে আমি ছেলের মতো ভালোবাসতাম। “

.

বিক্রম এবার মৃদু হেঁসে জবাব দেন,” জানি মাসিমা। আমি সব জানি। আপনি খুনি হতে পারেন না কোনোদিনই। আপনি চেয়েছিলেন বাড়িতে শান্তি ফিরে আসুক। আর আসল অপরাধীকেও আপনি চেনেন। সে যাতে কোনো অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে তার জন্যেই আপনি আমাকে এখানে ডেকে আনলেন। কি ঠিক বলছি তো ?”

.

মাসিমা বিছানায় বসে পড়লেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,” হ্যাঁ, আমি সবই জানতাম। আর বিক্রমবাবুকে আমিই নিয়োগ করেছি। আমি চেয়েছিলাম সব ঝঞ্ঝাটের শেষ হোক। “

.

” কিন্তু হাবলের খুনি কে ? ” রায়গিন্নী বিক্রমকে প্রশ্ন করলেন।
” খুনি কে জানতে হলে জানতে হবে এ বাড়ির একটা অজানা রহস্যের ব্যাপারে। সবাই জানে মাসিমার দিদি আর দিদির ছেলে ছাড়া তিনকুলে কেউ নেই। এই ধারণাটা ভুল। মাসিমার একটি ছেলে আছে। আর এই ব্যাপারটা এই বাড়িতে তিনজন জানেন, – – শশাঙ্কবাবু, জ্যেঠিমা আর মাসিমা। জ্যেঠিমা জানতেন বলেই সেই সন্তানকে সমস্ত সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করে রেখেছিলেন। মহেন্দ্র জ্যেঠুকে দিয়ে উইল করিয়ে তিনি বঞ্চিত করেন সেই সন্তানকে।

.

জ্যেঠিমার প্রথম সন্তান গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। এসময় তিনি যথেষ্ট অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। আর তখনই অসুস্থ্য দিদির সেবার জন্যে আসে বোন। রায়বাবুর সঙ্গে তাঁর শ্যালিকার একটা অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে গর্ভে আসেন শশাঙ্কবাবু। শুরু হয় তুমুল অশান্তি। আর তার জেরেই শিশু সন্তানকে দিদির হেফাজতে রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে যান রমলা স্যান্যাল অর্থাৎ মাসিমা।

.

মাসিমা যখন আবার এ বাড়িতে ফেরেন তখন শশাঙ্কবাবু মেডিক্যাল কলেজে পড়ছেন। সাজানো সংসার যাতে ভেঁসে না যায় তার জন্য দিদি বোনের কাছে এক অদ্ভুত শর্ত রাখে, – মাসিমা কোনোদিন ছেলের কাছে নিজের পরিচয় দিতে পারবেন না।

.

রায়জ্যেঠু মারা যাওয়ার সময় ‘র’ অর্থাৎ রমলা মাসিমার কথাই বলতে চেয়েছিলেন। তিনি অনুরোধ জানাতে চাইছিলেন তার স্ত্রীর কাছে যে রমলা ও তার ছেলেকে যেন বঞ্চিত না করা হয়। ” এতদূর বলে বিক্রম থামল। শশাঙ্ক আর মাসিমার চোখ ভিজে এসেছে। রায়গিন্নী স্তম্ভিত।

.

জ্যেঠিমা কিন্তু বরাবরই শশাঙ্কবাবুর প্রতি বিদ্বেষপোষন করতেন। শশাঙ্কবাবুর শৈশবকাল থেকে ডাক্তার হওয়া সমস্ত কিছুতেই জ্যেঠিমা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। রায়জ্যেঠু তার সমস্ত শক্তি দিয়ে শশাঙ্কবাবুকে আগলে রেখেছিলেন । ইতিমধ্যে শশাঙ্কবাবু অপরুপা দেবীকে বিয়ে করেন বাড়ির অমতে। আর এতেই জ্যেঠিমা বিরাট সূযোগ পেয়ে গেলেন। রায়জ্যেঠুর সমস্ত আপত্তি অগ্রাহ্য করে শশাঙ্কবাবুকে বাড়িছাড়া করেন।
শশাঙ্কবাবুর বিয়ের খবরে আঘাত পেয়েছিলেন আরেকজন। তিনি রথিনবাবুর স্ত্রী তিয়াশা। “

.

এতক্ষণে তিয়াশা মৌনব্রত ভেঙে গর্জে উঠল, “ইউ স্কাউন্ড্রেল !! আই উইল কিল ইউ !!” তিয়াশা ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল বিক্রমের উপর। দেবলীনা তিয়াশাকে ধরে ফেলল। তারপর লাগাল কষে দুই চড়। তিয়াশা কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল।

.

” আপনি উত্তেজিত হবেন না ম্যাডাম, আপনাকে চুপ করাবার ওষুধ আমার কাছে আছে।” বিক্রম স্যাম্পল ব্যাগে ভরা একটা কাঁচের শিশি বের করে সবার সামনে তুলে ধরে। ” এটা হল সেই ড্রাগ যেটি ভিকটিমের নাকে মোমবাতির ধোঁয়ার মাধ্যমে প্রবেশ করিয়ে পাগল করে দেওয়া হত। আর সেই কাজটি করতেন স্বয়ং তিয়াশা ম্যাডাম।

.

এখন প্রশ্ন মোটিভটা কি ? কারণ ছাড়া তো আর কার্য হয় না। তাই কারণ অবশ্যই আছে। আর সেই কারণটা হল অপূর্ণ প্রেম। তিয়াশা ম্যাডাম ও শশাঙ্কবাবুর মধ্যে একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তাই শশাঙ্কবাবুর বিয়েতে তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হন। শশাঙ্কবাবু তিয়াশা দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে নতুন খেলা শুরু করেন। চক্রান্ত শুরু হয় রথিনবাবু সমেত অন্যদেরকে পথ হতে সরিয়ে ফেলার। তাই শুরু হল ভুতের অত্যাচার। “

.

” কিন্তু রমা তো শশাঙ্কের ভালো চায়, তাহলে তোমাকে সে ডাকলো কেন ? ” রায়গিন্নী বিক্রমকে জিজ্ঞাসা করলেন।
বিক্রম রায়গিন্নীর দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,” কারণ উনি চাননি রথিনবাবু বা বাড়ির আর কারো কোনো ক্ষতি হোক। পুত্রস্নেহ থাকলেও মাসিমা সেই পুত্রস্নেহকে পারিবারিক স্বার্থের উর্ধে স্থান দেন নি।দেবলীনার হাবভাবে তিয়াশা দেবীর সন্দেহ হয়। তখন তিনি শশাঙ্কবাবুকে খবর দেন। আর শশাঙ্কবাবুই মন্দিরে সাধুর বেশে আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাবার চেষ্টা করেন। “

.

এবার রমলা মাসিমা নীরবতা ভঙ্গ করলেন। ” কিন্তু বিক্রম হাবলের মত নিরীহ মানুষকে মারল কে ? ও তো কারোর কোন ক্ষতি করে নি ! “
” মাসিমা, আপনার মতো ভালো মানুষ তো সবাই নয়। মন্দিরে সাধুর বেশে এসেছিল হাবল আর তিয়াশা দেবী চাননি তাদের ষড়যন্ত্রের কেউ সাক্ষী থাকুক। অফিসার আপনার কাজ করুন।”
বিক্রমের কথা শেষ হবার মাত্র পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকলেন। এগিয়ে গেলেন তিয়াশার দিকে।
” হ্যাঁ, আমিই মেরেছি হাবলদাকে। কোনো উপাই ছিল না। ” তিয়াশা কাঁদতে থাকল।

.

পুলিশ অ্যারেস্ট করল তিয়াশাকে খুন আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। শশাঙ্ককেও ষড়যন্ত্রে শামিল থাকার চার্জে অ্যারেস্ট করা হল। বিন্দিকে চিকিৎসার জন্য অ্যাসাইলামে পাঠানো হল।
আসার সময় একটা দশ হাজার টাকার চেক দিয়ে রায়গিন্নী বললেন,” এটা রাখো। রমার উপর আমার আর কোনো ক্ষোভ নেই। বড় বৌমাকেও আমি মেনে নেবো। তুমি না এলে কতবড় অনর্থ হয়ে যেত ! আবার এসো। তবে বিয়ে করে। দেবলীনা মা আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।”

.

.

— সমাপ্ত – –

.

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *