উপন্যাস – পটচিত্র -সুদীপ ঘোষাল-পর্ব – ২

পাশ দিয়ে কোপাই নদী বয়ে চলেছে। লাল মাটির উচুনীচু ঢিবি। মন কেড়ে  নেওয়া হাওয়া। সব কিছু ছাড়িয়ে সাধুর হায় হায় স্বর হাওয়া বাতাস ছাড়িয়ে নদীর জলে হারিয়ে যাচ্ছে।

আমার চিন্তার সুতো সরিয়ে সাধুবাবা বলে উঠলেন,কি গো কিছু বলো।

আমি বললাম,আপনি রত্নাকে ভালোবাসতেন?  

তবু ও চলে গেলো কিসের লোভে।

সাধু বললেন, ছি ছি ওকথা বলো না। ও আমার। মেয়ের মতো। হু হু হু…

আমি বললাম, কি কারণ বলুন। আমি শুনতে চাই।

সাধু বললেন,আমি গান লিখেছি অনেক। রত্না সব গান নিয়ে পালিয়ে গেছে। ও দরদি আর একমুঠো আকাশ দে… , বড়ো মানুষের মন লো,এইসব গান শোনো নি।

—– হ্যাঁ শুনেছি, সবাই শুনেছে। সব বিখ্যাত গান। রত্না লাহার কন্ঠে।

আমি বললাম আপনার নাম কি?

সাধু বললেন,কাউকে বোলো না। আমি  হিয়ানন্দ চট্টরাজ।

আমি তো অবাক। বলে কি লোকটা। হতেও পারে। ছাই সরিয়ে সোনা,একবার দেখলি না কানা।

সঙ্গে সঙ্গে আমি সাধুকে নিয়ে চলে এলাম বোলপুর। দাড়ি,গোঁফ কামানোর পর সবাই চিনতে পারলেন।

নব বিশ্বভারতীর এক প্রফেসর বললেন,ইনিই সেই হিয়ানন্দ। সুরকার,গীতিকার। আর তুই সোম শোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হয়ে যা। পড়াশোনা শুরু কর।

স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি আমার সকল সমস্যা দূর করলেন।

হিয়ানন্দবাবু আবার লেখা শুরু করলেন। কবি, লেখকের  মৃত্যু নেই। পাঠকের হৃদয়ে তারা চির অমর।

তারপর আমার পালে হাওয়া উঠলো। তর তর করে এগিয়ে গেলো পানসি।

আমার মনে পড়ছে,কোপাই নদীর ধারে আশ্রম করেছিলাম। মহিলা ও পুরুষের পায়খানা ঘর তৈরি করেছিলাম পাঁচটা গ্রামে চাঁদা তুলে। কি সুন্দর পরিবেশ। সহজ সরল লোকের ভালোবাসা ভুলিয়ে দিয়েছিলো কৃত্রিম শহুরে জীবন।

একবার রাতে আমার ভালোবাসার লোকেরা খবর দিলো, বটগাছের তলায় অপ্সরা নামেন আকাশ থেকে।

—- কাছে গেয়েছিস কোনোদিন?

—- না বাবা ভয় লাগে। অমর বললো।

—– তাহলে চ, আজকে চ, সবাই দেখে আসি।

পাঁচজন গেলাম। তখন এক মহিলা বললেন,টাকা এনেছিস?

আর একজন বললো, ফেলো কড়ি মাখো তেল….

আর বুঝতে বাকি থাকলো   না। ওরা অপ্সরা নয়, বেশ্যা। রোজগার করে, কষ্টের সংসারে।

মনে পড়ছে,গ্রামের সহজ সরল লোকগুলোকে

কিছু ঠগ ঠকিয়ে রোজগার করে। একটা সুড়ঙ্গ। তার ভিতরে  মা মনসা থাকেন। সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দে ওদের ভয় পায়। ঠাকুরের নাম করে সবাই দু টাকা, পাঁচ টাকা দেয়। আর ওই টাকা মদ আর মাংসে খরচ করে খচ্চর গুলো।

একদিন আমি একা সুড়ঙ্গ দিয়ে  নেমে দেখলাম কেউ নেই, কিছু নেই। হাওয়ার শব্দ। মানুষের ভুল ধারণা ভেঙ্গে গেলো। বন্ধ হয়ে গেলো রোজগার। ওদের রাগ হলো। ষড়যন্ত্র শুরু করলো ওরা।

আমার ভক্ত রহিম বললো,বিরাজুলের কাছে শুনলাম আপনাকে আজ রাতে আক্রমণ করবে খচ্চরের দল। সাবধানে থাকবেন।

সেদিন একটা লাঠি হাতে ওদের খেলা দেখালাম।

মারতে এসে ওরা বসে পরলো আমার খেলা দেখার জন্য। দশটা টালি পর পর সাজিয়ে ভেঙ্গে দেখালাম।

ওদের একজন বললো,এ ব্যাটা সাধু না ডাকাত। তারপর আমার মারমুখী মূর্তি দেখে ওরা ভালো মানুষের মতো বললো,আমরা আপনার এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। অন্য কিছু নয়।

তারপর থেকে আর ওরা কোনো অসুবিধা করে নি। ওরাও ভক্তের দলে নাম লিখিয়েছিলো। ঈশ্বর দর্শন আমার হলো সহজ সরল মানুষের মাঝে।

আজ আমি আবার পড়াশোনায় মন দিয়েছি। তবু ভুলতে পারি না বাল্যবন্ধুদের।

কদতলার মাঠে এসে ঢিল মেরে পেরে নিতাম কাঁচা কদবেল। কামড়ে কচ কচ শব্দে সাবাড় করতাম কদ। বুড়ো বলতো, কদ খেয়ছিস। আর খাবি। কই তখন তো গলা জ্বলতো না। এখন শুধু ওষুধ। ভক্ত,ভব,ভম্বল,বাবু বুলা, রিলীফ সবাই তখন আমরা আমড়া তলায় গিয়ে পাকা আমড়া খেতাম।

জাম, তাল,বেল, কুল,শসা, কলা, নারকেল কিছুই বাদ রাখতাম না। নারকেল গাছে উঠতে পারতো গজানন। শুধু দুহাতের একটা দড়ি। তাকে পায়ের সঙ্গে ফাঁদের মতো পরে নিতো গজানন। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই নারকেল গাছের পাতা সরিয়ে ধপাধপ নিচে ফেলতো।

আমরা কুড়িয়ে বস্তায় ভরে সোজা মাঠে। বাবা দেখলেই বকবেন। তারপর দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে আছাড় মেরে ভেঙ্গে মাঠেই খেয়ে নিতাম নারকেল। একদম বাস্তব। মনগড়া গল্প নয়। তারপর গাজনের রাতে স্বাধীন আমরা। সারা রাত বোলান গান শুনতাম। সারা রাত নাচতাম বাজনার তালে তালে।

শীতকালে খেজুর গাছের রস। গাছের কামান হতো হেঁসো দিয়ে। মাথার মেথি বার করে কাঠি পুঁতে দিতো গুড় ব্যাবসায়ী। আমাদের ভয় দেখাতো, ধুতরা ফুলের বীজ দিয়ে রাকবো। রস খেলেই মরবে সে। চুরি করা কাকে বলে জানতাম না। একরাতে বাহাদুর বিশুর পাল্লায় পরে রাতে রস খেতে গেছিলাম। বিশু বললো, তোরা বসে থাক।

কেউএলে বলবি। আমি গাছে উঠে রস পেরে আনি। তারপর গাছে উঠে হাত ডুবিয়ে ধুতরো ফুলের বীজ আছে কিনা দেখতো। পেরে আনতো নিচে। তারপর মাটির হাঁড়ি থেকে রস ঢেলে নিতাম আমাদের ঘটিতে। গাছেউঠে আবার হাঁড়ি টাঙিয়ে দিয়ে আসতো বিশু। সকালে হাড়ি রসে ভরে যেতো। ভোরবেলা ব্যাবসায়ির কাছে গিয়ে বলতাম, রস দাও, বাড়ির সবাইকে দোবো। বুক ঢিপঢিপ চাঁদের গর্ত।

দেবে কি দেবে না, জানিনা। অবশেষে প্রাপ্তিযোগ। যেদিন রস পেতাম না তখন মাথায় কুবুদ্ধির পোকা নড়তো। তাতে ক্ষতি কারো হতো না। বিশু ভালো মিষ্টি রস হলে বলতো, এটা জিরেন কাঠের রস। মানে চারদিন হাড়ি না বাঁধলে রস মিষ্টি হতো। জানি না। আমরা গাছে  নিচে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। রস পরতো জিভে টুপ টাপ। কতদিন ঘনটার পর ঘনটা কেটে গেছে রসাস্বাদনে। মোবাইল ছিলো ।

চলবে …………

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: