উপহার // সঞ্চিতা রায় (ঝুমা)কল্যাণী নদীয়া

উপহার  // সঞ্চিতা রায় (ঝুমা)কল্যাণী নদীয়া
                                       
  অস্থির ভাবে পায়চারি  করছেন সুবীর সেন। কি করবেন কিছু ভেবে পাচ্ছেন না। স্ত্রী  রীমা রাগত স্বরে বলছেন“এত অন্যমনস্ক হলে হয়?দেখ তো কী সর্বনাশ  করলে। এই জন্যেই আমি সঙ্গে যেতে চেয়েছিলাম”। মেয়ের বিয়ের গয়না ভরা ব্যাগ কোথায় ফেলে এলেন তিনি। নিজেই নিজের চুল ছিঁড়ছেন সুবীরবাবু। রীমা বলছেন,এখন আমার লকারে যা আছে তাই দিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে দেব উপায় তো কিছু নেই। পুলিশে জানাও ,কিন্তু কিছু লাভ হবে কি?বাড়ির গাড়ীটাও আর বিগরানোর সময় পেলো না। বাড়ি র গাড়ি তে করে গেলে কি আর এত বড় ক্ষতি হ’ত? মেয়ে সিম্পি বাবা মাকে সান্তনা দিয়ে বলে“আমি তো গয়না পড়তেই ভালবাসি না। এত টেনশান কোরো না তো।
 
 
                                                          কিন্তু বাবা মায়ের মন তো তাঁরা মেয়েকে সোনার গয়নায় সাজিয়ে রাজকন্যা রূপে দেখতে চান বিয়ের দিন। সুবীর সেনের মোবাইল টা বেজে উঠলো অজানা নম্বর। কে এই সময় ফোন করলো?একদম কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। ফোনের ওপার থেকে ‘আমি সিদ্ধার্থ,আপনি আমার টোটোতে আজ একটা ব্যাগ ভুলে ফেলে গেছেন। ব্যাগে আধার কার্ডের একটা জেরক্স ছিল,সেখান থেকেই নাম আর ফোন নম্বর পেলাম। আমি এই মুহূর্তে কিছু ব্যস্ততার জন্য আপনার বাড়ি গিয়ে ব্যাগটা দিয়ে আসতে পারছিনা,অনুগ্রহ করে আপনি কাউকে পাঠিয়ে প্রমাণ দিয়ে ব্যাগ নিয়ে যান”। “হ্যাঁ হ্যাঁ আজ বিকালেই যাব,আর আমিই যাব। ” “রীমা গয়না পাওয়া গেছে”।                                                        
 
“আমিও যাব তোমার সাথে ”দৃঢ় কন্ঠে বলেন রীমা। “সঙ্গে সিকিউরিটি যাবে বলে দিলাম ,অজানা জায়গায় একা একা যাওয়া ঠিক নয়,গয়নাখুলো ক্যাশমেমোর সাথে মিলিয়ে নিও কিন্তু”। “রীমা যে মানুষ ফোন করে এতগুলো গয়না ফিরিয়ে দিতে পারে তাকে অকারণ সন্দেহ কোরো না প্লীজ”। “তবুও”  রীমা এইটুকু বলেই চুপ করে গেলো।                                
 
 
 বাড়ির গাড়িতে করে সিকিউরিটিকে নিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেন। বাড়িটা গ্রামের দিকে,অনেকটা পথই যেতে হচ্ছে। দুধারের সবুজ  সুবীরকে মুগ্ধ করছে। সত্যি গ্রামের দিকে এখন ও কত সবুজ। “দেখো রীমা প্রকৃতিকে দেখো”। “দূর আমার মাথায় এক চিন্তা কতক্ষণে গয়না ফেরত পাবো”।                                          
 
 
 গাড়ি এসে পৌঁছালো নির্দিষ্ট  ঠিকানায়। একেবারে ছোট্ট একটা বাড়ি। কিন্তু বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগানে কত ফুল। চোখ জুড়িয়ে যায়। কিছু ফল ও সব্জি ও আছে। সিদ্ধার্থ একটা কাজে বেড়িয়েছিলেন,স্ত্রী কে সব বলা ছিল। আপ্যায়ন করে তাঁদের বসতে দিয়ে,তিনি নিজে হাতে তৈরী সরবত নিয়ে এলেন। সঙ্গে ঘরে তৈরী করা মিষ্টি। “এসবের কি দরকার ছিল?”।
 
 
“আমাদের কাছে অতিথি নারায়ণ”। সত্যিই কী অপূর্ব স্বাদ এই ঘরে তৈরী সরবতের। সুবীররা তো কেনা সরবত খেতে খেতে ঘরোয়া সরবতের স্বাদ ভুলেই গিয়েছিলেন। মিষ্টি আর সরবত দুটোতেই আন্তরিকতার ছোঁয়া এক অন্যরকম স্বাদ এনে দিয়েছিল। “ হ্যাঁ এই নিন আপনাদের ব্যাগ।  একটু মিলিয়ে নিন। ” সিম্পির বয়সী একটি মেয়ে এসে তাঁদের প্রণাম করে বললো“জেঠু জেঠিমা একটু বসে যান। বাবা এক্ষুনি ঢুকবেন।”“তুমি কি করো মা ?”বাংলায় এম এ করেছি,এখন আপাতত একটা বেসরকারী  স্কুলে চাকরি করছি”। সিদ্ধার্থর প্রবেশ। “কমাস পরে আমার এই মেয়ের বিয়ে।
 
 
ও নিজেই পছন্দ করেছে। ভাল ছেলে। কোনো দাবী নেই”। আমি তো মেয়েকে কোনো দিনই তেমন কিছু দিতে পারিনি। ও গৃহশিক্ষকতা করে নিজের পড়াশুনো চালিয়েছে। ও বই পড়তে খুব ভালবাসে। বই কিনে দিতে পারি কই? ও লেখেও ভাল।  “কিছু যদি মনে না করো আমি এখান থেকে কিছু গয়না তোমার মেয়ে সুধাকে দিতে চাই”। সুবীর বলেন। “না বাবু তা নিতে পারবো না,যার জিনিস  তাকে ফিরিয়ে দিতে চাই শুধু”। “তাহলে কিছু টাকা”। “না না”—-বেশ তবে তোমার মেয়ের বিয়েতে আমায় বলবে তো?“সে তো ছমাস দেরী আছে। কার্ড ছাপাই নি । “তুমি মুখে বললেই আমি আসবো,আর মা তোমার লেখার খাতাটা আমায় কদিনের জন্য পড়তে দেবে এখানে বসে বসে পড়ছিলাম খুব ভাল লাগছিল”।  “হ্যা অবশ্যই”।
 
 
                                                   আজ সুধার বিয়ে। সিদ্ধার্থ খুব ব্যস্ত। ব্যস্ত বাড়ির সবাই। আত্মীয় স্বজনে ভর্তি বাড়ি। সুবীর বাবু এসেছেন। সঙ্গে স্ত্রী ও নববিবাহিতা মেয়ে। সঙ্গে সুন্দর মোড়ক  মোরা অনেক গুলো উপহার। সুধাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। “এই নাও মা তোমার জন্য রবীন্দ্র রচনাবলী।
 
আরো কিছু বই,আর এই টা তোমার জন্য  আমার বিশেষ উপহার। খুলে দেখো তো মা”। খুলে সুধা দেখে তার  খাতার লেখা গুলোকে  বই হিসাবে প্রকাশ করে নিয়ে এসেছেন তিনি। সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সুবীর সেনের মনে হ’ল তিনি যেন চাঁদের সমস্ত উজ্জ্বলতা সুধার মুখে দেখলেন। আনন্দে ঝলমল তার মুখ। জীবনে অনেক দামী দামী উপহার উনি অনেককে দিয়েছেন।
 
 
কিন্তু দেওয়ার মধ্যেও যে এত আনন্দ আছে সেটা বোধহয় তিনি আজ সবচেয়ে বেশী অনুভব করলেন। সুধা যেন আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার টা পেল। সিদ্ধার্থ বললেন “আজ আপনি সত্যিই আমার মেয়েকে পৃথিবীর সেরা উপহার দিলেন। আর আমাকে দিলেন আমার মেয়ের খুশী উপহার যা আমাকে সারাজীবন ভরিয়ে রাখবে। সুধা প্রণাম করে বললো “আমায় আশির্বাদ করুন”। হ্যাঁ মা আশীর্বাদ  করি আরো অনেক অনেক পড়,অনেক অনেক লেখো আর খুব আনন্দে কাটাও জীবন। ”।    
 
               না এটা কোনো ঋণ শোধ নয়, নয় গয়না ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো প্রতিদান। এ শুধু পিতৃসম একজন মানুষের ভালবাসার স্পর্ষে এক কন্যার প্রতিভার বিকাশের দ্বার খুলে যাওয়া। সুন্দর সম্পর্কের মেল বন্ধনে জীবন কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।                                                
 
 
 
 স্বত্ব সঞ্চিতা রায় (ঝুমা)কল্যাণী নদীয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *