একটি কাব্যগ্রন্থ আলোচনা

একটি কাব্যগ্রন্থ আলোচনা

দর্শনের প্রজ্ঞা থেকেই আশরাফুলের কবিতার সিদ্ধি 

.

কবি আশরাফুল মণ্ডলের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “নাবিক হব ঝড়ের পাখি”(২০১৯) এইমাত্র হাতে পেলাম ।প্রচ্ছদসহ ৫৬ টি কবিতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম । কবিতাগুলিতে বিবৃতি কমে এসেছে, তার বদলে এসেছে অলংকারহীন আত্মক্ষরণের নির্বেদ অভিঘাত ।

জীবনের গতিময় ক্রিয়ায় কবিতার সিদ্ধি খুঁজতে গিয়ে কবি বাহ্যিক আড়ম্বরকে প্রশ্রয় দেননি ।স্তব্ধতার ভেতর এক ইংগিতময়তায় তিনি বাক্য নির্মাণের রীতি অবলম্বন করেছেন । স্মৃতি, প্রণয়, সংসার যাবতীয় ভাবনার বহুমুখী দরজায় উপনীত হতে চেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই কবিতাগুলিতে একান্ত ব্যক্তিগত প্রচ্ছায়া প্রলম্বিত হয়ে উঠেছে। ব্রহ্মসাধ এবং ব্রহ্মস্বাদের ভেতর কবিও ব্রহ্মসত্তাকে চালনা করেছেন ।
.

শূন্যতার অভিক্ষেপ ব্যক্তিহৃদয়ের নিরবধি প্রলাপ হয়ে উঠেছে । এক সংবেদনশীল হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন আবহমান প্রেমিক সত্তার রূপান্তরকে । স্বাভাবিকভাবেই কবিতা মানবীয় অনুজ্ঞার পরিশীলিত সুচারু শিল্প হয়েও দর্শনের প্রজ্ঞায় তার সিদ্ধি লাভ ঘটেছে । শূন্যতার নিদর্শ এভাবেই কবি তুলে আনেন :

“ভালো লাগে না হিজিবিজি। শূন্য বেশ পরিচ্ছন্ন ।ভেতরেও

অনেকটা স্পেস।”

কবির উপলব্ধিতে “শূন্য আমার একার।” অর্থাৎ চিরন্তন যা ব্যক্তিগত যোগ্যতায় অর্জন করতে পেরেছেন। শূন্যতার আয়নায় নিজের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে দিয়েই আত্মদর্শন ঘটেছে ।কবির প্রাজ্ঞ অভিমুখ দর্শনের নিরাবয়ব সংকেতে যে কাব্যিক সততার পরিচয় দিয়েছেন তাতে মিথকথনের এক আলোকসাম্যে পাঠককে সহজে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। রহস্যময়তায় সেই অদৃশ্য ক্রিয়ারই অভীপ্সা :

“কার বাড়ি

আবছায়া নিবিড়

চলাফেরা চুপচাপ”

.

নিভৃতচারী কবির আত্মযাত্রা এভাবেই যা শূন্যতার আত্মোন্মোচনে পাক খায় ।স্মৃতিবনে ধাবিত হয়। একাকিত্বের নিবিড় সংশ্লেষে “দহন দহন” অনুজ্ঞাটিও জুড়ে যায়। “স্তব্ধতার চিতায় শুয়ে” যে “আগুন স্পর্শ” তা মৃত্যুধ্বনিরই পর্যায়ক্রমিক বোধকে তুলে ধরে। কবি লেখেন :

.

“কোথাও কি লেগেছে আগুন

পুড়ছে কি ঝরে যাওয়া হৃদয়

হাসি কই

উল্লাস কই”

ব্রহ্মস্বাদের গ্রহণ থেকেই আমেরিকান কবি সিলভিয়া পাথও আগুনে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। এও ছিল এক শূন্যতার নিমগ্ন পর্যটন । সিলভিয়া পাথ লিখেছেন :.
.

           “I felt very still and empty, the way the eye of a tornado must feel, moving dully along in the middle of the surrounding hullabaloo.”

 (Sylvia Plath, The Bell Jar)

.

জীবনানন্দ দাশের “বোধ”ও যে শূন্যতার নিরিখে সবকিছু পণ্ড করে দেয়, এই শূন্যতাও টর্নেডো চোখের সামনে ভেসে ওঠে তীব্র অভিঘাত।প্রেমের সেই চোখই তো কখনও টর্নেডো হয়ে ফিরে আসে। যে প্রজ্ঞায় প্রেমের কবি বলেছেন :
.

“দু’চোখে শুধু অক্লান্ত নাবিক দেখি আর ঝড়ের পাখি…”

.

কবির উপলব্ধিতে সেই সমুদ্রেই আমাদের পথ খুঁজতে হয়। কিন্তু পথ কি আছে? একাকিত্বের “নিরীহ শিরীষ পাতা”এবং “ফুড়ুৎ একদিন” ক্রিয়ায় কবি জীবনের গতিময় সাবলীল প্রক্রিয়ায় বাধা পান। কবিতায় উল্লেখ করেছেন :
.

“জানালা রেখেছি খুলে

দুয়ারে জলতরঙ্গ।”

.

যেখানে Surrounding hullabaloo, সেখানে এই জলতরঙ্গের অভিরূপ লীলা তো থাকবেই। শূন্যতার নিদর্শ নিয়েই আত্মরচনার এই নিভৃতি পারস্পরিক বিপন্নতার মধ্যেই ঘুরপাক খায়। নির্মেদ কবিতাগুলি তখনই ভিন্ন মাত্রায় উত্তীর্ণ হতে পারে। আশরাফুল এই কাব্যটিতে বাক্ সংযমী নিরীক্ষায় নান্দনিক চৈতন্যের এক দার্শনিক প্রজ্ঞার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছেন।

     .

নাবিক হব ঝড়ের পাখি  :  আশরাফুল মণ্ডল, পাঠক, ৩৬ এ কলেজ রো, কলকাতা —৭০০০০৯,   প্রচ্ছদ :  রাজদীপ পুরী, মূল্য :১০০ টাকা ।

  .

.

    আলোচক  :  তৈমুর খান

  .

.

  .

.

  .

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *