একতরফা ভালোবাসা : অনন্যা ঘোষ

এই রাহুল তোমার মনে আছে ? আজ থেকে ঠিক ত্রিশ বছর আগে তোমার আমার প্রথম দেখা হয়েছিল l তখন তুমি সবে মাত্ৰ ক্লাস ফোর থেকে ফাইভ এ উঠেছিলে ভালো নম্বর পেয়ে l সেদিনটি ছিল রবিবার, তুমি আর তোমার বাবা সকাল সকাল এসে আমাকে নিয়ে গেলে তোমাদের বাড়িতে l তুমি অনেকের মধ্যে থেকে আমাকে পছন্দ করেছিলে, তার জন্য আমি আজও কৃতজ্ঞ তোমার কাছে রাহুল l


প্রথম প্রথম তুমি আমাকে খুব ভালোবাসতে, প্রতি রবিবার সকালবেলায় তুমি উঠে আমার কি যত্নটাই না করতে, তোমার বন্ধুদের ছুঁতে পর্যন্ত দিতে না l ওরা রাগ করে তোমাকে বলতো যে এটা তোর সাইকেল না প্রেমিকা l


তারপর যখন তুমি ক্লাস এইট এ উঠলে তখন থেকে তোমার পড়াশোনার চাপটা অনেক বেড়ে গেল, সপ্তাহের প্রতিদিনই দুবেলা তোমার টিউশন শুরু হলো, তখন আমাদের দুজনের একসাথে থাকার সময় টাও বেড়ে গেল l

তোমার মনে আছে? একবার ইংলিশ টিউশন থেকে ফেরার সময় একটা কুকুর কোথা থেকে ছুটে এসে আমার চাকায় ঢুকে গেল, আর আমরা দু’জনে রাস্তার দু’দিকে ছিটকে পরলাম l আমার সেরকম কিছু হয়নি কিন্তু কি চোটটাই না পেয়েছিলে তুমি ! 

প্রায় পনেরো দিন মতো তুমি বাড়িতে বসেছিলে, স্কুল-টিউশন সব বন্ধ….সেই প্রথম আমি এতো গুলো দিন তোমায় ছেড়ে আমি ছিলাম, একটিবারের জন্যও দেখতে পাইনি তোমাকে l তখন বারবার মনে হয়েছিল যদি আমি মানুষ হতাম তাহলে ছুটে তোমার ঘরে গিয়ে একটিবারের জন্য দেখে আসতাম তুমি কেমন আছো ?


তখন তোমার ক্লাস নাইন, তুমি প্রেমে পড়লে অঙ্কিতা নামে একটা মেয়ের l মেয়েটা দেবেন বাবুর কাছে টিউশন পড়তো, আর তুমি বাপিদার কাছে l রোজ তাড়াতাড়ি টিউশন থেকে বেরিয়ে আমাকে নিয়ে ছুটতে অঙ্কিতাকে একটিবার দেখবে বলে l এই ভাবেই কাটলো ক্লাস টেন পর্যন্ত l

ক্লাস টেন এর এক্সাম শেষ হবার দু’সপ্তাহের মধ্যেই তুমি ইংলিশ টিউশনএ ভর্তি হলে প্রবীর দার কাছে যেখানে অঙ্কিতা পড়তো l শুরু হলো তোমার অঙ্কিতাকে প্রপোস করার প্রবল প্রচেষ্টা l অঙ্কিতাও তোমাকে মনে মনে পছন্দ করতো, কিন্তু তোমাকে বুঝতে দিতো না l

তোমার হয়তো মনে নেই রাহুল, কিন্তু আজও আমার মনে আছে একদিকে তুমি আর অন্যদিকে অঙ্কিতা হেঁটে হেঁটে গল্প করতে করতে যেতে আর আমি তোমাদের দু ‘জনের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকতাম… হা হা হা l তুমি পড়তে বয়েজ স্কুলে, স্কুল ছুটির পর আবার আমাকে নিয়ে ছুটতে অঙ্কিতার গার্লস স্কুল এর দিকে একটিবার যদি ওর সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে যায়, এই আশায় l তোমরা দু’জনেই খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলে ক্লাস টুয়েলভে l 

তোমার ক্লাস টুয়েলভের রেজাল্ট বেরোবার পরে পরেই তুমি গ্রাম থেকে উঠে গিয়ে শহরে থাকতে শুরু করলে তোমাদের শহরের বাড়িতে l  নাম করা একটা কলেজে ভর্তি হলে l আর  অঙ্কিতা গ্রামের বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতো l তোমরা দুজনে একই কলেজে ইকোনমিক্স এ অনার্স নিয়ে ভর্তি হলে l

একদিন বর্ষার বিকালে, কলেজ ছুটির পর রাস্তায় হাটতে হাটতে অঙ্কিতা তোমাকে প্রশ্ন করল ” রাহুল তুমি আমায় ভালোবাসো ? ”  তুমি চুপ করে তাকিয়ে রইলে একদৃষ্টিতে ওর দিকে, বুঝিয়ে দিলে মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ l বললে এক্ষুনি বৃষ্টি আসবে চাপ আমার সাইকেলে আমি তোকে ট্রেন ধরিয়ে দেব l 

তারপর থেকে প্রতিদিনই তুমি অঙ্কিতাকে  কলেজ থেকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিতে, কত কথা বলতে তোমরা দুজনে , আর আমি ছিলাম নীরব শ্রোতা l অঙ্কিতা খুব কথা বলতো, তোমার ওপর ওর অধিকার বোধটা ছিলো একটু বেশি, মাঝে মাঝে তোমাকে শাসনও করতো l

মাঝে মাঝে কলেজ বাঁঙ্ক করে সারাদিন ঘুরতে তোমরা l একবার তো আমার চেন টা ওর চুড়িদার -এ আটকে গিয়ে কি কান্ডটাই না হয়েছিল !  অঙ্কিতার অনুরোধে তুমি বেতের একটা বাস্কেট জুড়ে দিলে আমার সাথে, আমারও খুব পছন্দ হয়েছিল, মনে হচ্ছিলো যেন আমার একটু শ্রী বৃদ্ধি হলো l

যেদিন প্রথম ওই বাস্কেট সমেত তুমি আমাকে কলেজে নিয়ে গেলে,সেদিন সবাই ঘুরে ঘুরে আমার দিকে দেখছিল ,নিজেকে সেদিন সেলিব্রিটি সেলিব্রিটি মনে হচ্ছিলো l তোমার সাথে সাথে অঙ্কিতাও আমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠল ধীরে  ধীরে ,ও আমার সাজ পোশাকের দিকে নজর রাখতো, কোন চাবির রিং থাকবে আমার সাথে, বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে কোন মালাটা আমাকে ভালো লাগবে সেটা ও ঠিক করতো l

যেদিন অঙ্কিতা কলেজ আসতো না সেদিন আমারও যেন খালি খালি লাগতো, আর সারাক্ষন মিস করতাম ওর বক-বকানি l এভাবেই তোমরা একদিন  কলেজের গন্ডি পেরোলে  l 


কলেজ পাস করার পরে পরেই তুমি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেলে l অঙ্কিতা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, ওর সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়, তুমি ওকে একটা মোবাইল গিফ্ট করেছো, তাতেই কথা হয় রোজ l আমারও বয়স  হচ্ছে মাঝে মধ্যে সারাতে নিয়ে যেতে হয় l তুমি নিজের নতুন চাকরি নিয়ে একটু বেশিই ব্যাস্ত হয়ে পড়লে l 


শহরে তোমার চেনা পরিচতি বাড়তে থাকলো , নতুন  নতুন বন্ধু বান্ধব হলো l একদিন শনিবার, তোমার ছুটির দিন, দেখি হঠাৎ তুমি সুন্দর করে সেজে গুজে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লে, তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কারো জন্য যেন অপেক্ষা করছো l আমি একটু অবাক হলাম তুমি তো অঙ্কিতার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করতে? তাহলে এখানে  কেন ? দেখলাম একটা অন্য মেয়ে সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়ালো তোমার সামনে, আমার সেদিন খুব মনে পড়ছিলো অঙ্কিতার কথা l 


এরকম প্রতি শনিবারই তোমরা দেখা করতে শুরু করলে…. তোমাদের কথোপকথনে জানতে পারলাম মেয়েটির নাম সঙ্গীতা,জিওগ্রাফিতে অনার্স নিয়ে পড়ছে, কম কথা বলে, ঠিক যেন অঙ্কিতার উল্টো l সঙ্গীতার কখনো প্রয়োজন হয়নি তোমার এই পুরোনো সাইকেলে চাপার l অঙ্কিতা তোমার খোঁজ নেয় প্রতিদিন ফোন করে l তুমি একদিন ওকে বললে জানিস আমাদের পাড়ার একটা মেয়েকে আমার ভালোলাগে l

অঙ্কিতা ভেবেছিলো হয়তো তুমি ওকে রাগানোর জন্য মিথ্যে মিথ্যে বলছো l সেদিনও আমার মনে হয়েছিল আমি যদি যন্ত্র না হয়ে মানুষ হতাম তাহলে অঙ্কিতাকে বলতাম ” রাহুল তোমাকে ঠকাচ্ছে l”  এক রবিবারের সকালে হঠাৎ অঙ্কিতা হন্ত-দন্ত  হয়ে তোমাদের বাড়ি এলো l এর আগেও ও তোমাদের বাড়ি এসেছে কয়েকবার কলেজে পড়া কালীন l ওকে তোমার বান্ধবী হিসাবে চিনতো তোমার বাবা-মা আগে থেকেই, তাই তারাও কোনো প্রশ্ন করেনি l 

অঙ্কিতা সেদিন তোমাকে প্রশ্ন করেছিলো “তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”  তুমি সেদিনও কোনো উত্তর দিলে না l তোমার মুখ দেখে ও সব টা বুঝে গেল, ও ধপ করে বসে পড়লো তোমার সামনে , তুমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলে l হঠাৎ তোমার মা এসে বললেন অঙ্কিতা তুই এতো দিন পরে এসেছিস, খেয়েযাস কিন্তু, না কাকিমা মা কে বলে এসেছি বাড়ি ফিরে খাবো…আমি এবার উঠবো l যাওয়ার সময় রাহুল বলল চল তোকে স্টেশনে  ছেড়ে  আসি l.. না গো আজ তোমায় আমি ছুটি দিলাম l


এর কিছু দিনের মধ্যেই তোমার  সঙ্গীতার  সাথে  বিয়ে হয় l  মাস খানেকের মধ্যেই তুমি একটা নতুন বাইক কিনলে l এখন তো শুধু বাজারে সবজি কিনতে গেলেই  কেবল  আমাকে নিয়ে বেড়াও,  বাকি সময় সঙ্গীতা কে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, অফিস সব ওই  বাইকেই l

এখন  আমি অঙ্কিতার মতই দূরে চলে গেছি, পর হয়ে গেছি, আর নতুন বাইকটা আর সঙ্গীতাই  এখন তোমার সব  কিন্তু বিশ্বাস করো রাহুল আজও আমি তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসি, মাঝে মাঝে একটু অভিমান ও  হয় যখন তুমি আমার চোখের সামনে দিয়ে বাইকটা নিয়ে হুস করে বেরিয়ে যাও, তবুও আমার ভালোবাসা তোমার প্রতি একটুও কমেনি l

আজও তুমি যদি  অফিস থেকে ফিরতে দেরি করো,  আমার খুব চিন্তা হয়,  বুক টা ঢিপ ঢিপ করে কিছু  হয়নি তো তোমার? 
 আরও অনেক গুলো বছর কেটে গেল……
এখন  আরও একটা নতুন স্কুটি এসেছে তোমাদের বাড়িতে সঙ্গীতার জন্য  আর আমার ঠিকানা.. তোমাদের  বাড়ির পিছনে , স্যাতস্যাতে গলিটায়, যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত  পৌঁছায় না l

সেদিন তোমার ছেলে রোহন খেলতে খেলতে  একবার আমার দিকে আসছিলো, আমারও খুব ইচ্ছা করছিল ওর হাত টা একটু স্পর্শ করতে কিন্তু ও আসার আগেই তুমি ওকে ধমক দিয়ে বললে ওদিকে যেও না… পুরানো জং ধরা সাইকেল, হাত দিওনা, কোথাও লেগে কেটে গেলেই নির্ঘাত  ইনজেকশন l সঙ্গীতা আরও একধাপ এগিয়ে বলল এবার ওটাকে বিক্রি করো তো , শুধু শুধু ঘর জোড়া…


আজ ত্রিশ বছর পূর্ণ হলো তোমার আমার সাক্ষাৎ  হবার, বুঝতে পারছি আর হয়তো বেশি দিন নয়  এই বাড়িতে, এতো দিন তবুও দূর থেকে তোমায় দেখতে পেতাম , এবার  সেটাও হারাতে  চলেছি , শুধু যাবার আগে একটা কথাই বলতে ইচ্ছা করছে   …….”তুমি অনেক বদলে গেছো রাহুল !!”

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

5 1 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: