একুশে ফেব্রুয়ারি // সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

একুশে ফেব্রুয়ারি  //  সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

আমার দুঃখ নেই, শোক নেই, নেই কোনো আনন্দ

হে বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ,আপনাদের ব্যবহারেও কোনো কান্না নেই আমার।
 গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা করবেন
আনন্দমুখর রোমাঞ্চভরা প্রান্তরে আপনি নীরব অসহায়
তাই আপনাকে প্রণাম জানাতে সংকোচ জাগে, ভয় হয়।
  আর আমার গুণী সাহিত্যিকের দল, ভারত বিজয়ী বীর
নজরুল, সুকান্ত, বঙ্কিম, শরৎ, সুনীল আর ত্রয়ী বন্দোপাধ্যায়গণ
আপনারা আমার কৃতজ্ঞ অভিবাদন গ্রহণ করুন।
আমি বেজন্মা নই । আন্দোলনের রক্তভূমিতে
আমার জন্ম, কাউকে অপমান করার ইচ্ছা আমার অজানা
আপনাদের বিচার করা আমার অসাধ্য
ভুরি ভুরি পরিপূর্ণ পূর্ণিমার জোছনায় আপনারা আলোকিত
নাচ গান কমলা বসনা রূপময়ী আভায় উদ্ভাসিত
কত নানান শংসাপত্র- ভূষিত আরও কত শত
তোমাদের করুণা করতে ইচ্ছা হয়।সমবেদনায় ধাবমান উল্কা
ভুলুণ্ঠিত। পাঁচিলের ওপারেও আরও কত রূপমুগ্ধ প্রেমিক
তাদের জন্যও আঁখি অশ্রু ভরা দীঘল। নীল আকাশ
শ্যামল সবুজ, নদীর স্রোত, শীতল ছায়া, বনানী
সকলকে ভালোবেসেছি। প্রতিদানে কী পেলাম?
শুধু গালভরা মেকি ভালোবাসার প্রতিচ্ছায়া
প্রেম নয় ছলনা শুধু ছলনা আর মিথ্যার স্বরলিপি।
আজকের এই নান্দনিক সভায় জানা গেল
আমি শুধু কয়েক ঘন্টার সাংস্কৃতিক- বিলাস।
রত্নখচিত বক্তব্য ,পোষ্টার, লেখা, বিপ্লবী চিৎকার
ক্ষণিকের ধনী ব্যক্তির প্রমোদ- উদ্যান কিংবা
নিজ ভাষা ফেলে পর -ভাষাকে পরম আত্মীয়রূপে ভাবা!
ইউনেস্কোর কলমের খোঁচায় আমি আজ বিশ্ববন্দিত
তোমাদের স্নেহ প্রেম পাপ পূণ্য আমাকে করেছে নির্বাসিত।
বারে বারে প্রতিবাদ করে পেয়েছি কেবল লাঞ্ছনা
যে সকল আমার অপ্রত্যাশিত অনাকাঙ্ক্ষিত। এখন
বল সত্য করে, তোমরা কী চাও
শুধু আপন পৌরুষের অহঙ্কার মাখা সান্ত্বনার প্রলেপ ?
হয়তো অবাঞ্ছিত প্রশ্নঃ দেখি তোমাদের উত্তরসূরীরা 
তুহিন মেঘের মতো, প্রখরতা জুড়োবার সাধ্য নেই যাদের
 কুহেলিকায় তারা নন্দন আলোর আঁধারিতে
সুরের পাখি, বিনুনি লোটানো পিঠ, অগুন্তি ফোঁটা ফোঁটা
বসন্ত রজনীর সুধামাখা বুকের খাঁজ। মুখ ঢাকা মুখোশ
আবরণের সম্ভার শিরীষের হাওয়ায় তুলতুলে দ্রুতপদী।
শুধু রোশনাই, উপকরণ, পূজা নেই। শুধুই কিশোরের অনুমানে
উত্তরাধিকারী। স্বর্গীয় সুরের সুধা নেই– আছে শুধু ভোগেচ্ছা।
আমার দেহ- বল্লরীতেই তোমাদের দৃষ্টি, হে মানবকূল। তাই
ভাষা অবিন্যস্ত, রত্নখচিত নয়। অনুষ্ঠান শেষে আবার বেলেল্লাপনা উল্লাস।
বাংলা কে জগৎজয়ী করার ইচ্ছা তোমাদের আকাঙ্ক্ষিত নয়।
পর ভাষাই আজ তোমাদের কাঙ্খিত বিলাস- সঙ্গিনী।
কোনো প্রার্থনা নেই আমার। যে যার আসনে অবিচল থেকে
লুব্ধ নয়নে ধেয়ে আসা অন্য ভাষাকে আলিঙ্গন করো।
ধনী থেকে আরো ধনী আরো খ্যাতিমান হও।
এই সভাগৃহ মাঝে জানলাম— এর প্রতিকার নেই
শুধুই সংস্কার আর বাৎসরিক পার্বন ছাড়া কিছু না।
চারপাশে অসংখ্য ক্লাব, স্তাবকের দল– পূণ্য লগ্নে
ভুলে যেতে চায় আমার জন্মবৃত্তান্ত, আমার আগুন।
আমি অশ্রু দগ্ধ অবলা নারী নই, আমি প্রতি বাদী, আমি চেতনা
আমি শহীদের রক্তে ভেজা –“একুশে ফেব্রুয়ারি”!!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *