ঐতিহাসিক গল্প : কালধর্ম : অভীক পোদ্দার

দক্ষিণ বিহারের অন্তর্গত মগধ এবং উড়িষ্যা উপকূলে অবস্থিত কলিঙ্গ প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্য। মগধ অপেক্ষাকৃত বড়,তার শক্তিও তুলনায় বেশি। তবুও মগধ সম্রাটের মনে শান্তি নেই।

প্রতিবেশী এক শত্রুকে রেখে কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়! খ্রিস্টপূর্ব 268 সনে বিন্দুসারের পুত্র অশোক তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সুধীনকে হত্যা করে মগধের সিংহাসন দখল করলেন। প্রবল পরাক্রমশালী ও যুদ্ধপ্রিয় সম্রাট হিসাবে তার খ্যাতি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল।

অশোকও প্রতিবেশী রাজ্য গুলোকে জয় করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। যারা তার আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করল, তিনি তাদের নির্মমভাবে হত্যা করলেন। অতঃপর মগধ ও কলিঙ্গের রণডঙ্কা বেজে উঠলো। দুই পক্ষের সৈন্যবাহিনীই শক্তিশালী।

কিন্তু মগধের সৈন্যরা অনেক বেশি যুদ্ধপটু আর কৌশলী। কলিঙ্গের সৈন্যরা বীর বীক্রমে লড়াই করেও পরাজিত হলো। আহত আর নিহত সৈন্যে ভরে উঠল যুদ্ধক্ষেত্র। রক্তাক্ত হলো সমস্ত প্রান্তর। কলিঙ্গরাজ মহাপদ্মনাভ নিহত হলেন। 

বিজয়ী মগধ সম্রাট হাতির পিঠে চেপে যেতে যেতে দেখলেন তার দুপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কত অসংখ্য মৃতদেহ। কত আহত সৈনিক। কেউ আর্তনাদ করছে, কেউ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চিৎকার করছে। কেউ সামান্য একটু পানির জন্য ছটফট করছে। আকাশে মাংসের লোভে শকুনের দল ভিড় করছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে সম্রাট বিষণ্ন হয়ে গেলেন। অনুভব করলেন তার সমস্ত অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নিজের তাঁবুতে ফিরে দেখলেন শিবিরের সামনে দিয়ে চলেছে এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী।

সন্ন্যাসী বললেন, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের সেবা করতে চলেছি।

মুহূর্তে অনুতাপের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল সম্রাটের হৃদয়। সম্রাটের অন্তরে জ্বলে উঠল নতুন এক প্রজ্ঞার আলোক। তিনি শপথ করলেন আর যুদ্ধ নয়, আর হিংসা নয়, ভগবান বুদ্ধের করুণায় আলোয় অহিংসা মন্ত্রে ভরিয়ে দিতে হবে সমগ্র পৃথিবী। একদিন যিনি ছিলেন উন্মত্ত দানব-এবার হলেন শান্তি আর অহিংসার পূজারি প্রিয়দর্শী অশোক।

বৌদ্ধগুরু উপগুপ্তের নিকট দীক্ষা নিয়ে চন্ডাশোক রূপান্তরিত হল ধর্মাশোকে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রেম করুণায় পূর্ণ হয়ে উঠল তার হৃদয়। অশোক ঘোষণা করলেন আর যুদ্ধ নয়, এবার হবে ধর্ম বিজয়। ভ্রাতৃত্ব প্রেম, করুণার মধ্যে দিয়ে অপরকে জয় করতে হবে। শুধুমাত্র নির্দেশ প্রদান করেই নিজের কর্তব্য শেষ করলেন না। এত দিন যে রাজসুখ বিলাস ব্যসনের সাথে পরিচিত ছিলেন তা পরিত্যাগ করে সরল পবিত্র জীবনযাত্রা অবলম্বন করলেন।

তিনি সকল প্রতিবেশী দেশের রাজাদের কাছে দূত পাঠিয়ে ঘোষণা করেছিলেন তিনি তাদের সাথে মৈত্রী, প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান। সকলে যেন নির্ভয়ে আপন রাজ্য শাসন করেন।

এমনকি সম্রাট অশোক তার উত্তরাধিকারীদের কাছেও দেশ জয়ের জন্য যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি তাদের উপদেশ দিতেন অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, প্রেম করুণা সহৃদয়তার মধ্যে দিয়েই মানুষকে জয় কর। এই জয়কে সম্রাট অশোক বলতেন ধর্ম বিজয়।

অপরদিকে মগধের উত্তর প্রান্তরে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় এক বালিকা ও বালকের খুনসুঁটি ও অভিমানের পালা রঙ্গায়িত হচ্ছে। একটু একটু করে তাদের কাছে আশা কবে যে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে তা তারা নিজেরাই জানে না। মেয়েটির কোলে মাথা রেখে তার মুখপানে চেয়ে ছেলেটি বলে উঠলো, তুমি আমাকে ঠিক কতখানি ভালোবাসো?

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। শুধুমাত্র তার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। সে একদৃষ্টে অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে রইলো। 

ছেলেটি আবার প্রশ্ন করলো, হে সখী,আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো?এভাবেই সর্বদা আমার পাশে থাকবে তো?

মেয়েটি এবার লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললো, সবসময় থাকবো।

আচ্ছা সন্ধ্যে হতে চললো, এবার আমি উঠি,নয়তো গৃহে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে।

ছেলেটি মেয়েটির কপালে ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়ে বললো, বিদায়।

এদিকে দিকে দিকে সম্রাট অশোকের ধর্মের বাণী প্রচার হতে থাকলো। তিনি বললেন, “জনগণ আমার নিজ সন্তানের মতো। আমি তাদের পিতার মতোই স্নেহ করি। একজন পিতা যেমন সর্বদা তার সন্তানদের মঙ্গল কামনা করে, আমিও আমার রাজ্যবাসীদের মঙ্গল কামনা করি, সর্বদা তাদের সুখ-শান্তির জন্যে প্রার্থনা করি।”

অশোকের স্ত্রী দেবী ছিলেন বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী, দেবীর কাছ থেকে অশোক বৌদ্ধধর্মের অনেক কিছুই জানতে পেরেছিলেন। উপগুপ্তের শিক্ষায় অশোক হয়ে ওঠেন এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব।

নগরে নগরে শান্তির বাণী প্রচার করেন। ধর্মবিশ্বাসকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। ধর্মের প্রতি সহনশীলতা ও শিক্ষাগুরুর প্রতি সদাচরণকে বিয়ে কিংবা অন্য যেকোনো পালা-পার্বণের চেয়ে অধিক সম্মানের বলে বিবেচিত করা হল।

বলির নামে প্রাণী হত্যা, খেলার নামে পশু শিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। বন-জঙ্গল উচ্ছেদ করা বন্ধ করেন, কারণ বন্য প্রাণীদের একমাত্র বাসস্থানই ছিল জঙ্গল। পুরো রাজ্য জুড়ে মানুষের সাথে সাথে পশুদের জন্যও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়। মগধের জনগন মহানন্দে বলে উঠলো,জয় সম্রাটের জয়।

পূর্বের সেই মেয়েটি ও ছেলেটির মধ্যে ইতিপূর্বে পত্র বিনিময় চলতে থাকলো। প্রায় সায়াহ্নে-ই তারা লুকিয়ে লুকিয়ে সেই কৃষ্ণচূড়ার প্রান্তরে দেখা করত। দীর্ঘ প্রেম বিনিময়ের পর যে যার গৃহে ফিরে যেত। মেয়েটির নাম সঙ্ঘমিত্রা, সম্রাট অশোকের জ্যেষ্ঠ কন্যা। ছেলেটি অগরিভ্রমা।

একদিন প্রাতে সম্রাটের শয়ন কক্ষ হতে কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহিন্দর ডাক পড়লো। প্রাতপ্রার্থনার পর পুত্র-কন্যার উদ্দেশ্যে সম্রাট বললেন, তোমরা দুজনেই আমার গর্ব, তোমাদের নিকট বুদ্ধ ধর্মের মূল নীতি অর্থাৎ ‘জীবে প্রেমের’ শিক্ষা দিয়েছি। এমতবস্থায় আমার একান্ত ইচ্ছে তোমরা দুজন বহির্দেশে এই ধর্মের বিস্তার কর। 

শ্রীলঙ্কার শাসক দেবনামপিয়া আমার মিত্র। উনি এই ধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন ও ওনার দরবারে তোমাদের আমন্ত্রণ করেছেন। তোমরা প্রস্তুত হও।

এই কথা শুনে সঙ্ঘমিত্রার মন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে রইলো। সারাটাদিন না খেয়ে রাজ পালঙ্কের ওপর মুখ গুজে পড়ে রইলো। দু একবার হয়ত ফুঁপড়ে ফুঁপড়ে কেঁদেও উঠলো। এদিকে অগরিভ্রমার কথা ভেবে তার মন দোলাচলে দুলতে থাকলো। কিন্তু পিতার আদেশ অমান্য করার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না। অতঃপর পত্রপাঠ পরদিন সায়াহ্নে অগরিভ্রমার নিকট দেখা করার বাসনা প্রেরিত হল। 

পূর্বের বার্তানুযায়ী পরদিন সায়াহ্নে অগরিভ্রমা সেই কৃষ্ণচূড়ার তলায় সঙ্ঘমিত্রার অপেক্ষা করতে থাকলো। কিছুক্ষন পর শান্ত দীপ্ত নয়নে সঙ্ঘমিত্রা এসে উপস্থিত হলো। দৃষ্টি বিনিময়ের পর সঙ্ঘমিত্রা অগরিভ্রমার নিকট সমস্ত কথা খুলে বললো। 

সঙ্ঘমিত্রার কথা শেষ হলে অগরিভ্রমা বললো, তবে তুমি কি শ্রীলঙ্কা যাবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছো?

সঙ্ঘমিত্রা শান্ত কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ। 

অগরিভ্রমা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো, তবে কি আমাদের ভালোবাসা মিথ্যে? 

সঙ্ঘমিত্রা উত্তর দিল, না, তবে পিতার আদেশ অমান্য করতে আমি অপারক। আমাকে ক্ষমা কর। আমি নিরুপায়। এই বলে সঙ্ঘমিত্রা সবে দু পা বাড়িয়েছে, পিছন থেকে অগরিভ্রমা অস্ফুটে বলে উঠলো, আমি তোমার অপেক্ষায় রইবো,বিদায়।

ঠিক দুদিন পরে সূর্যোদয়ের পূর্বে পাটলিপুত্র হতে রাজকুমার মহেন্দ্র,রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রা,তার কয়েকজন সখী এবং কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু সিংহলের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। বন্দরের বহিঃপাঁচিলের আড়াল থেকে অগরিভ্রমা তাদের বিদায় যাত্রা দেখলেন। গৃহে প্রত্যাবর্তনের সময় সবার অগোচরে তার চোখে জলবিন্দু পরিলক্ষিত হলো।

দীর্ঘ জলযাত্রার পর রাজতরী সিংহলের মানথাই বন্দরে প্রবেশ করল। মহারাজা দেবনামপিয়া তিস্য তাদেরকে রাজ অভ্যর্থনে গ্রহণ করলেন। রাজ অতিথিশালায় সুন্দর মখমলে সিংহলী বস্ত্র দিয়ে তাদের বরণ করা হলো। আড়ম্বর যতই সুসজ্জিত হোক সঙ্ঘমিত্রার মন পরে রইলো সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ ও অগরিভ্রমার প্রতি। ভাগ্যের চক্রে ভালোবাসার এত নিষ্ঠুর পরিহাসের কথা সে কখনো কল্পনায়ও আনতে পারেনি।

কিছুদিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে প্রায় সমগ্র সিংহলেই বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র বাণী ছড়িয়ে পড়ল। পিতার উপদেশে রাজকন্যা অনুলা স্বয়ং বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হলেন। সিংহল ঘুরে ঘুরে সঙ্ঘমিত্রা দীপ্ত কণ্ঠে বৌদ্ধধর্মের থেরভেদ মতধারা প্রচার করতে থাকেন। বৌদ্ধমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। এমতবস্থায় সঙ্ঘমিত্রা একদিন মন্দিরের পাদদেশে কিছু দুঃস্থ মানুষদের সেবা করবেন বলে ঠিক করেন। সেমত আয়োজনও করা হয়।

নির্দিষ্ট দিনে সব সখীর সাথে সঙ্ঘমিত্রা সকালে স্নান সেরে মন্দিরে প্রবেশ করছিলেন, হঠাৎ একটি ভিখারি গোছের লোক সঙ্ঘমিত্রার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, অসুস্থ মানুষকে কিছু সাহায্য করুন,দুদিন ধরে কিছু খাইনি। সঙ্ঘমিত্রার দৃষ্টি সেই দিকে নিক্ষিপ্ত হতেই একগাল দাঁড়ি ও কয়েকদিনের না খাওয়া চেহারা দেখে সঙ্ঘমিত্রার বড় মায়া হলো।

তৎক্ষণাৎ সে সখীদের উদ্দেশ্যে আদেশ দিলো ওই লোকটির সেবা শুশ্রুষা করার জন্য। নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে লোকটিকে খাওয়ালো। সেই দুঃস্থ লোকটিও পরম তৃপ্তি,ভক্তির সাথে সমস্ত আহার চেঁটেপুটে খেয়ে পরম শান্ত কণ্ঠে বলল, ঈস্বর তোমার মঙ্গল করুক।

পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা অতিথিশালায় ফিরে সঙ্ঘমিত্রার কিছুতেই শুতে ইচ্ছে হলো না। সারাদিন ধর্মবাণী প্রচারের পর সন্ধ্যের দিকটায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাসের সুযোগ হয় সঙ্ঘমিত্রার। ওপরের বারান্দা থেকে কোমল আকাশের দিকে চেয়ে সে অতীতের কথা ভাবতে লাগলো। সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ,সেই সূর্যাগামী আকাশ,আর অগরিভ্রমা।

হঠাৎ নিচের কাঁটাগাছের ঝোপের দিকে চোখ পড়তেই সে দেখলো আড়ালে বসে কেউ তার দিকে চেয়ে আছে। অন্ধকারে খানিক চোখ সয়ে যেতেই সে বুঝতে পারলো আরে, এ তো মন্দিরের সেই ভিক্ষুক না। তবে তার চোখে উদ্দীপ্ত আগুন নয় যেন ভালোবাসা স্পষ্ট।

ধীরে ধীরে সঙ্ঘমিত্রা সিঁড়ি থেকে নামলো। নিচে নেমেই এদিক ওদিক চেয়ে সেই কাঁটাঝোপের দিকে এগোতে থাকলো। ঝাড়ের কাছাকাছি গিয়ে কোমল শান্ত কণ্ঠে সঙ্ঘমিত্রা প্রশ্ন করলো, হে পথিক সত্যি করে বল তো তুমি কে? কেন তোমার এ চোখ আমার খুব পরিচিত মনে হয়? 

প্রায় সাথে সাথেই চমকের সাথে সেই ভিক্ষুক দাঁড়ির ঝাড় ও নকল বেশ প্রত্যাহার করলো। 

অবাক হয়ে সে দিকে চেয়ে সঙ্ঘমিত্রা সেই মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, অগরিভ্রমা, তুমি। তুমি আমার জন্য এই দূরদেশে এসেছো?

অগরিভ্রমা ভালোবাসা মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, হে প্রিয়, তুমি যে আমার ভালোবাসা,তুমিই আমার জীবন,সেকথা কিকরে ভুলি বল। আমি জানতাম আমাকে একবার দেখলে তুমি আমার ভালোবাসার নিকট ধরা দেবেই। তাইতো দূরসমুদ্র পাড়ি দিয়ে তোমার কাছে আসা। 

এমন সময় হঠাৎ দুজন বল্লমধারী রক্ষী সেপথ দিয়ে যাওয়ার সময় এই ঘটনা দেখতে পেল। সাথে সাথে তারা দৌড়ে এসে অগরিভ্রমাকে আটক করলো। রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রার সহিত খারাপ ব্যবহারের জন্য তাকে বল্লমের আঘাতও সইতে হলো।

সঙ্ঘমিত্রা অনেকবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তবে তা একেবারেই ব্যর্থ হয়। মহারাজা দেবনামপিয়ার নিকট এ খবর প্রেরিত হতেই অগরিভ্রমার রাজদণ্ড ঘোষিত হয়।

সঙ্ঘমিত্রা অনেক অনুরোধের পর মহারাজা বলেন, আচ্ছা ঠিকাছে তুমি স্বয়ং তোমার পিতার নিকট পত্র পাঠাও, তারপর উনি যেমন আদেশ দেবেন তেমনই পালিত হবে। সঙ্ঘমিত্রা তৎক্ষণাৎ সব লিখে রাজদূত মারফত পত্র পাঠানোর ব্যাবস্থা করলেন।

তারপর বেশ কিছুদিন অগরিভ্রমাকে কারাগারেই কাটাতে হলো। সঙ্ঘমিত্রা রোজ দুবার করে খাবার দিয়ে আসার অনুমতি আদায় করেছিল, সেই মতন দিনে দুবার তাদের মধ্যে অল্পস্বল্প কথা হতো,সঙ্ঘমিত্রা বলে উঠতো, হে প্রিয়,আজ আমার জন্যই তোমার এ দশা, পারলে আমায় ক্ষমা করো। 

দিন পনেরো পর মহারাজা অশোক স্বয়ং সিংহলে প্রবেশ করলেন। সঙ্ঘমিত্রা খবর পেয়েই ছুট্টে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। মেয়ের চোখের জল কোনো পিতার দ্বারাই প্রত্যক্ষ করা সম্ভবপর নয়, অশোকও এর ব্যাতিক্রম নয়। দুহাতে সঙ্ঘমিত্রার চোখের জল মুছিয়ে কপালে আদরের চুম্বন করলেন। তারপর অগরিভ্রমাকে কারামুক্ত করার আদেশ দিলেন। 

এর দুদিন পর মহাধুমধামের সহিত সঙ্ঘমিত্রা ও অগরিভ্রমার বিবাহ সম্পন্ন হলো। সিংহলের রাজা দেবনামপিয়ার সহায়তায় স্বয়ং অশোক নিজে দাঁড়িয়ে দেখে কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন। এরপর আর মাত্র কিছুদিন তারা সিংহলে থাকলো, ধর্মপ্রচার করলো। মগধ ফেরার আগেরদিন অনুরাধাপুরা শহরের মহামেঘ বাগানে বৌদ্ধগয়া থেকে আনা পবিত্র বোধিবৃক্ষের কিয়দাংশ প্রোথিত করলেন। চারিদিক সুগন্ধে ছেয়ে গেল। দিকে দিকে উচ্চারিত হতে থাকলো  ‘বৌদ্ধং চৈতং গচ্ছামি’।।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: