ওয়ান জিরো জিরো – শম্পা সাহা

Spread the love

      স্টেশনে যখন নামলে , তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা তো হবেই । পার্কসারকাস স্টেশন থেকে বামুনপাড়া পৌঁছতে গেলে, এ সময় রিক্সা পেলে  খুবই ভালো হয় কিন্তু লাইন পার হয়ে রিকশা স্ট্যান্ডে এসে দেখে একটা ও রিক্সা নেই। হয়তো বৃষ্টির কারনে লোকজন ফাঁকা হয়ে গেছে। এমনিতেই এই স্ট্যান্ডে রিক্সা খুব একটা থাকে না কারণ সওয়ারী খুব একটা পাওয়া যায় না, যে দু’একজন ওঠেন তাদের যদি সঙ্গে লাগেজ থাকে তবেই রিক্সা নেয়। 

    বিনীতা ভেবেছিল সময়মতো এসে পৌঁছবে ,মানে এতটা রাত হবে বুঝতে পারেনি। কিন্তু লালগোলা লোকাল এ উঠে শিমুরালির আগে কি একটা কারণে ট্রেন মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ ,প্রায় ঘন্টাখানেক তো হবেই ,তাই এই দেরি। এদিকে বারাকপুর পার হতেই টিপ টিপ বৃষ্টি । এমনিতে এ  সময়টা খুব একটা বৃষ্টি হয় না, কারণ বর্ষা পার হয়েছে বহুদিন, কালীপুজো গেছে তাও দিন সাতেক । মামার বাড়ি বহরমপুর থেকে বিনীতা একাই ফিরছে। ও ভেবেছিল সকাল-সকাল বের হবে কিন্তু দিদা আর মামি রা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়ল না,ফলে এই বিপত্তি। ছয় সাড়ে ছয় ঘন্টার রাস্তা লেগে গেল আট সাড়ে আট ঘণ্টা।      

    আসলে ওর নিজের ভাই নেই তাই প্রতিবারই ভাইফোঁটায় ও মামার বাড়ি যায়, প্রতি বছর মা ও সঙ্গে যায় কিন্তু এবছর বাবার শরীরটা খুব একটা ভালো না থাকায় ও একাই গিয়ে ছিলো। আসলে ভাইফোঁটার কদিন ওখানে যে মজা হয় সেটা ও কিছুতেই মিস করতে চায়না । সব মামা মাসিরা তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে একেবারেই জমজমাট ব্যাপার।রাউরকেল্লা রতু মাসি, ব্যাঙ্গালোরের মেজ মামা, দুর্গাপুরের ছোটমামা সবাই এই পুজোর সময় একসাথে হবেই । বাড়ির পুজো কেউ মিস করতে চায়না কোনমতেই। অন্যান্যবার অবশ্য মাও থাকে।  এবার মা না থাকায়  সবাই বারবার বলছিল, “দিদি এলো না? “, বা ,”বড় মাসী এলো না ?”বারবার ফোনে ,ভিডিও কল করেছে বিনীতার মাকে।  মা অবশ্য  ফোঁটাটা ভিডিও কলেই সেরেছেন । কি আর করা?      

    নিত্যানন্দ বাবু মানে, বিনীতার বাবার একটু হার্টের প্রবলেম দেখা গেছে।পুজোর ক’দিন বেহিসেবে খাওয়া-দাওয়া তার ওপর উনি আবার ভীষণ খাদ্য রসিক ,সকালে ইলিশ তো রাতে মাটান ,আবার এ বেলা বিরিয়ানি তো  ও বেলা মোগলাই । এই চুয়ান্ন বছরের পেট কি অত ধকল নিতে পারে? দিয়েছে বুকে এক ধাক্কা! দশমীর দিন খাসির মাংস ভাত খেয়ে দুপুরের পরে বুকের বাঁ দিকে চিনচিনে ব্যথা, হাসপাতালে নিয়ে সব টেস্ট করে জানা গেল একটা মাইল্ড অ্যাটাক মত হয়েছে কিন্তু চিন্তার তেমন কিছু নেই তবে এবার থেকে সাবধানে থাকতে হবে। তাই আর বিনীতার মা বিজয়া দেবীর ভাইফোঁটায় বহরমপুর, বাপের বাড়ি যাওয়া হয়নি।কিন্তু মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ,ওর সঙ্গে সব ভাইদের জন্য ভাইফোঁটার গিফট ও। 

     বিনীতা থার্ড ইয়ারে পড়ে বঙ্গবাসী কলেজ এ, ফিজিক্সে অনার্স । বেশ পড়াশোনায় ভালো, ভালো গান করে এবং বাড়িতে বা বলা ভাল ওদের পরিবারে বাবার পরে সেকেন্ড অভিভাবক ওই ,কারণ বাবা-মা বিজয়া দেবী আর নিত্যানন্দ বাবু ওকে একেবারে অন্যরকম করে মানুষ করেছেন । বেশ ডাকাবুকো টম বয় টাইপের,ভয় ডর একেবারে নেই বললেই চলে । বাজার হাট করা তো যেমন তেমন ,পাশের বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে মাঝরাতে ও বিনা দ্বিধায় নিয়ে চলে যায় হাসপাতালে, অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে । ও কোনদিন মেয়ে এই ভাবনা ওর বাড়ির লোক ওকে ভাবতে শেখায় নি।যখন চেয়েছে ওকে পুতুল কিনে দিয়েছেন নিত্যানন্দ বাবু আবার চাইলে খেলনা বন্দুক ও । যখন অন্যান্য মেয়েরা নিজেদের সুন্দর করে সাজাতে ব্যস্ত বিজয়া দেবী মেয়েকে শিখিয়েছেন ,”সুন্দর হওয়া দরকার কিন্তু তুমি মেয়ে বলে শুধু তোমার চেহারার চর্চা করতে হবে এমন নয় ,যে কোনো মানুষেরই ছিমছাম পরিপাটি হওয়া দরকার, তাই হবে। এতে মেয়ে আর ছেলের কোন পার্থক্য নেই”। কোনদিন ওকে বাড়ি থেকে শুনতে হয়নি ,”বিনি তুমি মেয়ে এটা করো না ,ওটা করো না, “।পরবর্তীতে ও যখন ফুটবল খেলতে যেত পাড়ায় অন্য ছেলেদের সঙ্গে, হয়তো ছেলেরা ওকে নিতে চাইত না মেয়ে বলে,তখন বিজয়া দেবী নিজে ওকে ফুটবল কিনে  রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েকে ,একা একাই ফুটবল খেলতে উৎসাহ দিয়েছেন । পরে অবশ্য পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ও ফুটবল, ক্রিকেট খেলেছে। তাবলে আবার মেয়েকে তারা জোর করে ছেলে বানাতেও উদ্যোগী হন নি। বিনীতা গান শিখেছে, নাচ ও, ভারতনাট্যমে ডিপ্লোমা করেছে ও।মোদ্দাকথা মেয়েকে মানুষ করার জন্য যা যা করার দরকার তাই করেছেন ওর বাবা-মা। সেই যেবার পাশের ফ্লাটের রথীনকাকুর মা বাথরুমে পড়ে পা ভাঙলেন ,বাড়িতে শুধু কাকিমা আর ঠাকুমা । কাকু তো অফিসে । মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ওই বৃদ্ধ ভদ্রমহিলাকে হাসপাতালে গিয়ে প্লাস্টার করিয়ে আনেন বিজয়া দেবী নিজে।রাতবিরেতে পাড়া-প্রতিবেশীর বিপদে-আপদে বিজয়া দেবী নিজের স্বামীকে যেমন পাঠান তেমন মেয়েকেও। তার ফলে নিজেকে বিনীতা শুধু একটা মেয়ে ভাবে না। বিজয় দেবী শিখিয়েছেন, “একজন  ওয়েট লিফটার মেয়ে বা ক্যারাটে তে ব্ল্যাকবেল্ট মেয়ে কি কোন ছেলের থেকে শারীরিকভাবে কম ?কখনো না । আসলে হলো স্কিল আর মনের জোর। মেয়েরা নিজেদের ছেলেদের থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল ভাবে বলেই ,তারা দুর্বল। আসলে তাদের হাত-পা চালানোর অভ্যাস নেই। তারাও যদি ছেলেদের মত হাত-পা চালায় তাদেরও তাহলে পেড়ে ফেলা সহজ নয়।আসল দুর্বলতা শরীরে নয় আসল দুর্বলতা মনে “।তাই বিনীতা এই এত রাতেও স্টেশনে নেমে হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে। এর মধ্যে অবশ্য মা বার দুয়েক ফোন করেছেন আর বলেছেন সাবধানে আসতে, কারণ পার্কসারকাস স্টেশন টা খুব একটা ভালো জায়গা নয়, আশে পাশে বস্তি থাকার কারণে নেশাখোরদের চুরি-ছিনতাই লেগেই থাকে আর স্টেশনে রাতের দিকে বহুলোক নেশা করে পড়ে থাকে। কিন্তু মেয়ে নিয়ে বিজয় দেবী খুব একটা দুশ্চিন্তা করেন না। 

    টিপ টিপ বৃষ্টিতে বিরক্ত বোধ করলো বিনীতা।  ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে মাথায় ফেট্টির মতো বেঁধে নিল আর মোবাইল, ঘড়ি ব্যাগে,যাতে ভিজে না যায় ,তারপর হাঁটা দিল দুই লাইনের মাঝখানের খোয়ার পথ ধরে।  কিছুদূর আসার পর খেয়াল করলো , স্টেশনে থাকা তিনটে লোক ওর পিছু পিছু আসছে। প্রথমে ও ভাবল বাড়ি ফিরছে হবে।লোকগুলোর পোশাক আশাক দেখে মনে হলো এই বস্তিরই কিন্তু তারা যখন বস্তিতে না ঢুকে ওর সঙ্গে রিক্সা স্ট্যান্ডে এলো তখন বিনীতা একটু সতর্ক হয়ে গেল । তারপর পা চালালো একটু জোরে। প্রথমে ভাবল কবরখানার মধ্যে দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে কিন্তু এত রাতে এতটা দুঃসাহসী হওয়াটা ঠিক হবে না, তাই সোজা রাস্তা ধরে তেঁতুল তলা হয়ে লাল বাবা পাড় করে শিবতলা মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে যাবে ঠিক করল।একবার একটু ভেবে নিল শিবতলা মাঠের রাস্তাটাও তো বেশ ফাঁকা ,এত রাতে গুমটি দোকানগুলো নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হয়তো সুস্থ থাকলে নিত্যানন্দ বাবু রাত হয়েছে বলে মেয়েকে নিতে আসতেন কিন্তু উনি অসুস্থ তাই আসার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। 

   রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিনীতা খেয়াল করলো পাশের দোকানপাট সব বন্ধ আর হয়তো টিপ টিপে বৃষ্টির কারণে লোকজনও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে শুধু তেতুল তলার মোড়ে রতনদা তখনও তার চায়ের দোকানের ঝাঁপ দেয় নি ,বাসন-কোসন মাজছে।   

   জামতলা থেকে রাস্তা,একেবারে ফাঁকা । লোক গুলো কিন্তু ওর পিছু ছাড়েনি তখনও। বিনীতা বুঝে গেল যে লোক গুলোর নিশ্চয়ই কোনো কুমতলব আছে । একবার ভাবলো ,বলবে রতন দাকে ?তারপর ভাবলো দেখাই যাক না! এমনও তো হতে পারে ওদের বাড়ি বামন পাড়ার দিকে, একই ট্রেনে নেমেছে ,কারণ ওতো ছিল লেডিসে।

    জামতলা টা পার হতে লোকগুলো ওর সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনলো । প্রথমে বিনীতা একটু নার্ভাস ফিল করল কিন্তু মায়ের কথাটা সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল , “ভয় তো তোমার মনে, ভয় একটা অবস্থা । তুমি পেতে শুরু করলেই হেরে গেলে।”ও সঙ্গে সঙ্গে মনের থেকে ভয় ঝেড়ে ফেলে যেমন চলছিল তেমনি চলতে শুরু করল। যেখানে শীতলা মাঠের গেটটা, সামনে এসে একটা ছোকরা মত ছেলে হঠাৎই বিনীতার ব্যাগটার দিকে হাত বাড়ালো। রাস্তার মৃদু আলো আর টিপ টিপ বৃষ্টিতে যেটুকু দেখা গেল ছেলেটা ওর বয়সীই, বিশ বাইশ বছর হবে । ব্যাগটা ধরে টানতে ঠান্ডা গলায় বিনীতা ছেলেটাকে বলল, “ব্যাগটা ছাড়, বিরক্ত করিস না”। ছেলেটা ভেবেছিল বিনীতা ভয় পাবে বা দৌড়তে শুরু করবে বা চিৎকার করবে ,কিন্তু সেরকম কিছুই না হওয়াতে ছেলেটা নিজেই একটু ঘাবড়ে গেল।তবুও এক ঝটকায় ওর ব্যাগটা ছিনিয়ে নিতে গেলে, বিনীতা ছেলেটার কব্জিটা ধরে উল্টোদিকে দিল একটা মোচড়। সঙ্গে সঙ্গে পাশের লোক দুটো দু পাশ থেকে ওকে চেপে ধরতে এলো । যার হাত মুচড়ে দিয়েছিল সে একটু, “আহ! “বলে চিৎকার করে হাত ঝাড়তে লাগলো আর অন্য একটা লোক ,”শালী সানা  হচ্ছিস? “,বলে ওর কাঁধটা ধরতে গেলে ,ওর ডান হাতের  একটা মোক্ষম ঘুসি গিয়ে পড়ল লোকটার চোখ লক্ষ্য করে । লোকটা চোখ চেপে ধরে বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো, আর অন্য লোকটা বিনীতার পেছন থেকে ওর পেট জাপটে ধরেছে ততক্ষণে। এ সময় মেয়েরা সাধারণত ভাবে একজন পুরুষ শরীর স্পর্শ করেছে তাতে কুঁকড়ে যায়, কিন্তু বিনীতা ও দিকে নজর না দিয়ে তীরের বেগে হাতের ব্যাগটা দিয়ে মারল ছেলেটার নাক লক্ষ্য করে। শরীরের সব শক্তি দিয়ে মারাতে ছেলেটার নাক দিয়ে, গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো । এবার যে লোকটা ওর কোমর ধরে ছিল, পিছন দিয়ে নিজের দুই হাত পেছনে নিয়ে চুলের মুঠি ধরে টানতে লাগলো বিনীতা আর  সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল । লোকগুলো ওকে যে ভাষায় গালিগালাজ করছিল, ওই একই ভাষায় ওই লোকগুলো গলা ফাটিয়ে  গালিগালাজ করতে করতে এমন জোরে চুল টানতে লাগল যেন সব চুল উপড়ে নেবে। লোকটা ওর মুঠো ছাড়ানোর জন্য ওর কোমড় ছাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে চুল ছেড়ে বিনীতা চেপে ধরলো ওর অন্ডকোষ।যত শক্তি আছে সর্বশক্তি দিয়ে প্রাণপণে টানতে লাগল যেন ছিঁড়ে ফেলবে ,লোকটাও গলা ফাটিয়ে চিৎকার জুড়ে দিলো যন্ত্রনায়। তখন অপর লোকটা দৌড়ে পালালো আর অল্পবয়স্ক ছেলেটি সঙ্গী কে  বাঁচাতে আসায় বিনীতা হাটুঁ দিয়ে ওর গোপন স্থানে দিল এক জোর ধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা, “কক্”, করে একটা আওয়াজ করে পড়ে গেল মাটিতে ,পরে কাতরাতে লাগলো । বিনীতার বাঁ হাত তখনো চেপে ধরে আছে অন্য লোকটিকে। তারপর ওই লোকটাকে ছেড়ে দেওয়াটাতে লোকটাও দুহাতে  গোপন স্থান চেপে ধরে বসে পড়ল । এরপর হাঁপাতে হাঁপাতে বিনীতা ফোন লাগাল  ওয়ান জিরো জিরো তে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *