কবিতার দাবি সহৃদয় হৃদয়সংবাদী // তৈমুর খান

কবিতার কি সমালোচনা হয়?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমি খুঁজে পাইনি। অথচ যুগে যুগে কবিরা সমালোচিত হয়ে আসছেন। কবিতার কৃমি কীট ঘেঁটে সমালোচকরা ঝড় তুলেছেন। পোস্টমর্টেম করেছেন কবিতাকে। কীটস, শেলি, ওয়ার্ডস্ ওয়ার্থ থেকে রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ সকলেই সমালোচিত হয়েছেন।

.

.

সৌন্দর্যের কবি, বিদ্রোহের কবি, প্রকৃতির কবি, রোমান্সের কবি, বাস্তববাদী কবি কত অভিধা দেওয়া হয়েছে। আজকেও হচ্ছে। কিন্তু সমালোচনা তো ব্যক্তি নিরিখের ব্যাপার। নিজেদের বোধ ও বোধিতে তার বিচার বিবেচনা চলে। সমালোচক সত্যিই যদি কবির উপলব্ধির সমান্তরালে না আসতে পারেন তাহলে তিনি কি কবিতার রসাস্বাদনে যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন?

.

.

          এ প্রশ্নেরও সংশয় উত্তর। সমকালে কোনও কবির নিন্দুক এবং স্তাবক দুইই তৈরি হয়। আমরা অনেকেই জানি কীটসের Hyperion বেরোনোর পর সমকালীন সময়ে পত্রপত্রিকায় প্রশংসা নয়, নিন্দা করেই লেখা হয়েছিল :  “One of the cockney school of poet.” আর তাঁর পরবর্তীকালে এই কীটস সম্পর্কেই কবি পি বি শেলি শেক্সপীয়ারের সঙ্গে তুলনা করে, বিশেষ করে তাঁর Ode সম্পর্কে লিখেছিলেন : “He is among the Greeks.”শেলিও যে কবি হিসেবে সহজে মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছিলেন তা নয়, তাঁকেও নিন্দামন্দ কম শুনতে হয়নি।

.

.

সেকালের বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক Mathew Arnold কীটসকে যেমন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তেমনি শেলিকে ততখানি খোলামনে মেনে নেননি। শেলি সম্পর্কে বলেছিলেন : “He is a beautiful and ineffectual angel, beating in the void his Luminous wings in vain.”

.

.

           ম্যাক্সিম গোর্কির “মা” প্রকাশের পর কতটা তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছিল নিশ্চয়ই তাঁর পাঠকরা আজও শিউরে ওঠেন। মধুসূদনের “মেঘনাদ বধ” কাব্যের ব্যঙ্গ করে প্যারোডি লেখা হয়েছিল “ছুছুন্দরী বধ”। নজরুলের “বিদ্রোহী”র প্যারোডি লেখা হয়েছিল “ব্যাঙ”। এসব নিন্দাবাদ কি কবিপ্রতিভাকে ম্লান করতে পেরেছে?

.

.

জীবনানন্দ দাশকেও দুর্বোধ্যতার কবি বলে এড়িয়ে চলা হত। নজরুলকেও অন্ধ আবেগের কবি বলা হত। আসলে জনপ্রিয় প্রাপ্ত কবি মননদর্শী কবি এক নন। কোনও কবি আমজনতার কাছে নানা কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন, আবার যুগোত্তীর্ণ কবিতা লিখেও কোনও কোনও কবির ভাগ্যে অবহেলা নামক পুরস্কার জোটে। সাহিত্যে এরকমই নিয়তি ।তাকে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা কারও নেই।

.

.

        কবিতা দু-রকমভাবে সমালোচিত হতে দেখা যায়। এক ধরনের সমালোচনায় রসোপলব্ধির ব্যাপারটি বলা হয়। কবির সৃষ্টি-সংকেতের ভেতর সমালোচক তাঁর নিজস্ব অনুভূতি, কল্পনা স্বপ্নচারিতা অথবা যন্ত্রণা, হতাশা, নিঃসঙ্গতার দেখা পান। শিল্পটি সেখানে খুব বড়ো হয়ে ওঠে না। মুখ্য বিষয় কবির সমবর্তী হওয়া। এই রকম সমালোচনাকে পর্যালোচনা বলাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ সমালোচকের সহৃদয় হৃদয়সংবাদী হয়ে ওঠার একটা পরিসর থাকে।

আত্মোপলব্ধির মাত্রা যোগ করে কবিতাকে আর পাঁচজন পাঠকের অনুভবের কাছে পৌঁছে দেন। অনেক ব্রাত্য কবিও তখন প্রতিভাদীপ্তিতে চিহ্নিত হতে পারেন। এপথে বেশিরভাগ কবিরাই হাঁটেন। যাঁদের অ্যাকাডেমিক মনন থাকে না। অধ্যাপকীয় সুলভ আলোচনার পরিধি থাকে না। তাঁরা স্রেফ নিজস্ব দৃষ্টির আলোকে ও আন্তরিক স্পর্শে কবিতার মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করেন। যেমন জয় গোস্বামী বিনয় মজুমদারের একটি কবিতা উদ্ধৃতিসহ এভাবে আলোকপাত করেন :

“অসীমের বড়দাদা সসীম এবং দুজনের

বোন সীমা, এই তত্ত্ব প্রায় প্রতিদিন আমি ভাবি।

ফলে আমি ভাবি আগে সসীম ছিল এ বিশ্বে পরে ক্রমে ক্রমে

অসীম হয়েছে, তবে বেশিদূর যেও না গো এ সীমা ছাড়িয়ে

এই সীমা বিবাহও করেছিল স্বামীর বাড়িটি

সীমার বাবার বাড়ি ঠাকুরনগরে।”

তারপরে কবিতার শেষ অংশটিও লিখলেন :

“সীমা যেই চলে যায় শ্বশুরবাড়িতে সেই ঠাকুরনগর

সীমাহীন হয়ে যায় সীমাহীন হয়ে যায়…..”

এর আলোচনায় লিখলেন :

“সীমা শব্দটি নিয়ে খেলতে খেলতে কীভাবে বিনয় তাঁর ঠাকুরনগর গ্রামটিকে অনন্তে স্থাপন করে দিলেন? শেষ লাইনটিতে কোনও কমা নেই। ছন্দও দু-মাত্রা কম রাখা হয়েছে। একই বাক্য দু’বার ব্যবহার হল এখানেও। অর্থাৎ ওই লাইনটি কোনওদিন শেষ হবে না, আমরা চিরকাল ধরে পড়ে চলতে বাধ্য থাকব : সীমাহীন হয়ে যায় সীমাহীন হয়ে যায়। বিনয়ের অক্ষরবৃত্তের যে স্বভাব তাতে তিনি শেষ লাইনে দু-মাত্রা কম রাখেন না কখনও। এখানে কম থাকায় কী হল? গ্রামটি মাঝখানে আর তার চারপাশের দিগন্ত কেবলই ছড়িয়ে যেতে লাগল দূরে দূরে।”

শেষে লিখলেন :

“সীমা নামের মেয়েটির গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার শূন্যতা যেমন কখনও ঘুচবে না, তেমনই ওই দু-মাত্রাও পূরণ হবে না কখনও –—আমাদের জীবনের ছোট কিন্তু তীব্র সব অসম্পূর্ণ চাওয়ার মতোই।”

       তখন বিনয় মজুমদারের কবিতা পাঠকের কাছে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। যে কবি দীর্ঘদিন অবহেলিত, সারাজীবন জীবনপাত করে গেলেন একাকিত্বে, ভেঙে যেতে যেতে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন ;এই আলোচনা কবিকে আমাদের আরও কাছাকাছি এনে দিলে। একেবারে স্পর্শ করার মতো। আর তখনই আমরা কীটসের সেই কবিতার পংক্তিটি স্মরণ করে বলতে পারি : “The Poetry of earth is never dead.”

          কিন্তু আর এক ধরনের সমালোচক আছেন যাঁরা অধ্যাপকীয় বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। অনেক সময় কবিতার রসোপলব্ধির দিকটি তাঁদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। কবিতার শিল্প-প্রকরণ নিয়েই তাঁরা বেশি মাস্টারি করতে ভালবাসেন। তাঁদের আলোচনায় হৃদয় ও মনন একই সঙ্গে উপস্থিত হয় না। বাহ্যিক রীতির সঙ্গে মেধার সামঞ্জস্যে তাঁরা শিল্পকে খণ্ডন করেন। তাই অনেক সময় কবির প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

অর্জিত বিদ্যায় অনুপম বাচনরীতিতে কিছুটা অভিজ্ঞতার কারণে তাঁদের পাঠপ্রবণতা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। স্কুল-কলেজের সিলেবাস মার্কা পদ্ধতিতেই এসব আলোচনা সীমাবদ্ধ। ডিগ্রিধারী মানুষেরাই এ-পথে বেশি হাঁটেন। কখনও কখনও নামের আগে “ডঃ” (ড.) অথবা “ডক্টর”লিখতে ভালবাসেন। জীবনানন্দ দাশ এঁদের উদ্দেশ্যেই “সমারূঢ়” কবিতাটিতে বলেছিলেন :

“‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা –’

বলিলাম ম্লান হেসে ; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর ;

বুঝিলাম সে তো কবি নয় —সে যে আরূঢ় ভণিতা :

পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের প’র

বসে আছে সিংহাসনে —কবি নয় —অজর, অক্ষর

অধ্যাপক, দাঁত নেই —চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি ;

বেতন হাজার টাকা মাসে —আর হাজার দেড়েক

পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি ;”

এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় কবি সমালোচকের বিভাজন। কবিসত্তা এবং সমালোচক-সত্তা এক নয়। বাস্তব এবং কল্পনা, কল্পনা এবং বাস্তব দুইয়ে যেমন ফারাক, তেমনি কবি ও সমালোচক ।একটার সঙ্গে আশ্রয় ও আনন্দের সংযোগ যা স্বপ্ন-সত্যে সদর্থক প্রত্যয় অন্বেষণ করে ; অপরটির সঙ্গে জীবিকা ও স্থূল পাণ্ডিত্যের সংযোগ যা রূঢ় ও জর্জর বাস্তব। কবি স্বপ্নের দরজা খোলেন ; সমালোচক ঘরের দরজা খোলেন। তাই কিছুতেই মেলে না ওঁদের।

        সুতরাং কবিতা আজও ব্যক্তিগত ভালো লাগা না-লাগার পর্যায়ে থেকে গেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ সৃষ্টি আজও তা পাঠের দাবি নিয়ে চর্চিত হচ্ছে পৃথিবীতে। মানুষের মনের সীমানায় পৌঁছাবার অপেক্ষায়।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: