কবিতার পাতা – ৬

বেহালাবাদক / সমর সুর

শান্তিনিকেতনে এসে মনে হল তোমাকে দেখেছি

বনরেখা ছুঁয়ে আছে ম্যাজিকআঙ্গুল।

এই সমতলে পড়ে থাকে বিবাহযৌতুক,আত্মসমর্পন।

টিলার মাথায় দূরে হাঁটু গেড়ে বসে আলখাল্লা

পরিত্যক্ত আলপথে হেঁটে যায় জাগতিক ছায়া

আড়াআড়ি দাঁড়ালেই আলোর পাশে তৃষ্ণা।

অন্ধকার প্রসারিত হলে

কুয়োতলার পাশে মুকুট পরিহিত 

সোনার কঙ্কাল বেহালা বাজায় একা।

গৌরভ ভট্টাচার্য্য

কলম ধরো – গৌরভ ভট্টাচার্য্য

জোৎস্না যামিনী ভোর দেখেছি,কলুষিত মায়াজালের আড়ালে।

সোনালী স্বপ্ন দেখেছি,তোমার আমার বিরহের উষালগ্নে।

পুলকিত হাসিমুখ দেখেছি,মানবতার স্বপ্নভঙ্গের হেঁসেলে।

নদীর জল উপচে পড়তে দেখেছি,বন্যা রূপে।

কবরের মাঝে আগুন এর ছোয়া দেখেছি, মানসিকতার অপবর্তনে।

শোষণের মধ্যে উৎফুল্লতা দেখেছি,মানসিকতার পরিবর্তনে।

তোমার মুখের হাসি আজ কান্নার রূপান্তর।

তোমার প্রাণের মায়া আজ বেপরওয়া।

চারিদিকে শুধু নকল হাসিমুখ।

কিছু মায়াজাল ছিন্ন করতে ব্যাস্ত মানুষের সব সুখ।

তলোয়ার নেই হাতে শুধু কলমেই যতেষ্ট।

শক্তি নেই শরীরে শুধু মনের সহসেই যথেষ্ট।

তোমার মনে যে শক্তি আছে, জাগাও তাকে বিভীষিকার রূপে।

নিজের মনের সব প্রতিবাদ জানাও, ধরে নাও কলম হাতে।

নিষিদ্ধ ঝুলন পূণিামা / সমর সুর

রবীন্দ্রসদনে বৃষ্টি হলে

মনে হয় নিষিদ্ধ ঝুলন পূর্ণিমার দেরী নেই।

মাঝে মাঝেই এখানে এসেছি নীলছাতা হাতে একা

ধোঁয়ার শহরে যাচ্ছে ঠেলাগাড়ি,ধুলোমাখা নেই চাকা

আজ ধুলোর বদলে লেগে আছে কাদা, পাশেপাশে চলেছে মিছিল

এশহরে অপরিচিতের মতো ঘুরে বেড়ানোর বয়স হিসেব 

 করিনি অথচ

বিজ্ঞাপনের কিশোরী শুনছে স্লোগান

এক উন্মাদ সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বুদ্ধিজীবির।

দূর থেকে মনে হয় গল্পে মত্ত আছে

চরম মুগ্ধতা ভেঙ্গে অন্ধকার পার হয়ে আসি

সিলিং ফ্যানের নীচে মেলে দিই শার্টপ্যান্ট এবং

ঘামের রংলাগা স্যান্ডোগেঞ্জি।

আমার ঘরেও তখন বিজ্ঞাপনের কিশোরী ঢুকে পড়ে একা।

কবি সমর সুর

বৃষ্টি এলো – নীলাঞ্জন রায়

নীল আকাশ , হাল্কা মেঘ, একটু কালো
অনেকটা তোমার বা গালের ওই যে কালো
বৃষ্টি এলো।
খোলা বারান্দা, পাগলা ঝড়
তোমার খোলা আঁচলে বুকের ঝড়
বৃষ্টি এলো।
অসংগত থাক না কিছু, ইচ্ছে মজা
ওই শুভ্র নাভির পাশে জলের মজা
বৃষ্টি এলো।
অঝোর ধারা পাতার পর
চোখের পাতা জলের পর
বৃষ্টি এলো।
নৌকা ফেরায় বৃদ্ধ জেলে ঘাটের পাশে
এই ফাকে তোর ওড়না লোটায় ঘাসের পাশে
বৃষ্টি এলো।
ইচ্ছেমনটা লাফিয়ে ওঠে আকাশ দেখে
বিনুনিটা টানবো  কখন চোখটা দেখে
বৃষ্টি এলো।
হোক বৃষ্টি ঝাপিয়ে হোক ভেসে
গাল ধরে ভালোবাসায় যাবো ভেসে
বৃষ্টি এলো।
আসলে কি বল পাগল আমরা
আমি, তুই, আমার প্রেমিকা আর তুমি
ভেজা রোদ্দুর গায়ে মেখে আমরা
বৃষ্টি এলো।

কলম্বাসের কম্পাস / সমর সুর

কেন জানি না ধারনা হয়েছে

সোনার কিম্বা অন্য কোন  ধাতুতে বানানো ছিল

কলম্বাসারের নিজস্ব কম্পাস।

ইসাবেলা, অন্য নামে তুমি কোথায় রয়েছে ?

মাছের প্রার্থনা শুনে উষ্ণতা শীতল হয় সমুদ্রের জলে

ডুবুরির গায়ে সোয়েটার দেখেছে আমার বোন 

জলের গভীরে জল,মৃত্যু,ডুবোপাহাড়ের ধাক্কা 

কিম্বা আকর্ষিক ঝড়ের মুকুট। নাবিকের সঙ্গে থেকে

আয়ত্ব হয়েছে শুধু বিপদের মোকাবেলা করা

বিস্মৃত নিদ্রার পাশে রাত্রি জাগে পেঁচা

হয়তো পাহাড়া দ্যায় কলম্বাসের আশ্চর্য কম্পাস।

কবি সমর সুর

রাত্রি  /সমর সুর

বহুবছর আগে একবার মাত্র রাত্রি জেগেছিলাম

বন্ধুর বিবাহবাসর জাগতে গিয়ে।

তারপর আজ 

কি নিবোাধ আমি এতকাল জোৎস্নাই দেখেনি

এত নক্ষত্র ভরে থাকে সমগ্র আকাশ,কোথাও একটু 

অন্ধকার নেই।

অথচ জীবনের ভিতর এত অন্ধকার নিয়ে কাটিয়ে যাচ্ছি 

বছরের পর বছর।

ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে ভোরের ফুল,নতুন আকাশ

পাতা নড়ে ওঠে,পাখিদের বিশ্রাম শেষ হল

ঘর ছেড়ে থাকে দূরে 

আজ আর কোন অভিযোগ নেই 

নার্সিংহোম গিয়ে বন্ধুকে বলবো তুই এলে একদিন

আবার রাত্রি জাগবো আর…….

কবি সমর সুর

হারানো বন্ধুকে / সমর সুর

কতকাল আপনার সঙ্গে দেখাই হয় না

কেমন আছেন ?

এখনও কি আগের মতো কুকুরের ভয়ে পকেটে

বিস্কুট নিয়ে রাস্তায় ঘোরেন।

মতবিরোধ থাকেও মনবিরোধ ছিল না

আমাদের ভালোলাগাগুলো ছিল প্রায় একইরকম।

শুধুমাত্র  সিনেমায় কোন আগ্রহ ছিলনা আপনার

তবুও আন্দ্রে হেপবান প্রিয়।

মাঝেমাঝে ভাবি 

যদি আপনার সঙ্গে আবার দেখা হয় কোন

 সরলরেখায়

জিজ্ঞাসা করবো

এখনও কি ঘুমোবার আগে আরণ্যক পড়েন,লোরকা 

কত কি জানবার আছে

দেখা হলেই বলা ভালো না হলে কি কথার কি মানে হয়ে যায়।

কবি সমর সুর

শীত / সমর সুর

অবশেষে প্যারলে মুক্তি পেল শীত

মাত্র দিন দুয়েকের জন্য।

না হলে তোমার হাতে বোনা সোয়েটার এবছর আর

পরাই হতো না।

মন্টিকার্লোর যুগেও এযেন এক্সট্রা অনুভূতি 

জারুল গাছের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আজও মনে হয়

তোমার সঙ্গেই হেঁটে যাচ্ছি

আরো কিছুদূর যাবার পর যখন চাঁদ নিচু হয়ে এল

ঠোঁটের উপর

ঘরে ফিরে আসি

সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি একদিন ওকে নিয়ে যাবো

জারুল গাছের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর।

কবি সমর সুর

গ্রুফছবি / সমর সুর

না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস হবে না

গ্রুপফটোর ভিতর কি ভাবে একা হয়ে আছি।

তোমাদের কথা আজ মনে পড়ে বিকাশ 

আনন্দ কতদূর থাকে, শুনেছি ওখানে চাঁদমারি আছে

অমল,সেকি এখনো আগের মতোই উদাসীন আর নন্দিতা 

যাকে আমি ফটোর ভিতর থেকে বের করে নিয়েছিলাম

চৈত্রের শেষে জোৎস্নায়।

মনে পড়ে আমাদের ঘিরে কি ভাবে ঝরে পড়তো

শালের মঞ্জরী

ভুলচুকতো হয়েই থাকে

কতবার এসে ফিরে যায় চুর্তদশীর চাঁদ 

আকাশ গোমড়া দেখে।

অতঃপর জোৎস্না নামে মেঘের অনুরাগ ভেঙ্গে গেলে

গ্রুফফটোর ভিতর সবাই ব্যস্ত আছে

আমিই শুধু একা।নতুন বিছানা

তবু কোথা থেকে আসে শালের মঞ্জরী।

কবি শিবপ্রসাদ গরাই 

বসি মুখোমুখি –    শিবপ্রসাদ গরাই 

এখন বড়ো দুঃখের সময় নয়
এখন বড়ো সুখের সময় নয়
এখন ভুল বোঝাবুঝির সময়ও নয়
এখন হাতে হাত রাখার সময় ।

এসো
আমার কাছে
এসো
বসো মুখোমুখি
চোখের দিকে চোখ রাখো
হাতের উপর হাত
এসো
আমরা আলোচনা করি
মানুষকে নিয়ে
তোমাকে নিয়ে
ভালোবাসা নিয়ে
তুমি আর আমি বসলেই পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান ,
একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আমি ।
তুমি আর আমি মিলে সব বাধা ভেঙ্গে খানখান ,
এ কথা ভালো করে জানো তুমি ।

তবে কেন এত দূরত্ব ,এত ব্যবধান
এসো আমরা আবার আগের মতোই বসি
মুখোমুখি
কেননা, হাতের উপর হাত রেখে আলোচনাই
পারে, বিশ্বকে মুক্তির পথ বাতলে দিতে ।

পথ – শক্তিপ্রসাদ ঘোষ

পথ বড় কঠিন

বেঁচে থাকা বড় শক্ত

পায়ের তলা খসে যায়

পথ চলা হয় না বন্ধ

রুটি পরে থাকে

ফিরে আসা লাশ

ক্লান্তি হারমেনে যায়

পথ

বাড়ি ফিরে আসা

বাঁচাতে বাঁচানোর

পথে শেষ হয়ে যায়

চলা

থেমে থাকেনা পথ চলা।

এই পথে হাঁটতে গিয়ে  –       মোঃ রায়হান কাজী 

রাতগুলো অনিদ্রা পিত্তশূলকের মাঝে, 

যাচ্ছে কেঁটে নিরেট অন্ধকারে জেগে। 

ঊষালগ্ন যাচ্ছে সব বেমালুম হাওয়া হয়ে, 

উঠছি জেগে আলো ঘেরা ক্লান্ত দুপুরে। 

গাছপালা সব যাচ্ছে শুকিয়ে একেবারে, 

ঝরাপাতা মরাপাতা পড়ছে লুটিয়ে মাটিতে,

এই দৃশ্য আঁকি মনের চার দেয়ালের আড়ালে। 

কোথায় লুকিয়ে আছে শিশিরচোখ ফুটে,

ভোরের নীল আকাশের বিশালতার মাঝে। 

পাখিরা সব উড়াল দিয়েছে ডানা ঝাপটিয়ে, 

অচেনা অজানা জায়গায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

কিছুক্ষণ পরে উধাও হবে বুঝি দিগন্তের কাছে গিয়ে, 

হয়তো পাখি উড়বে তুমি সীমান্ত প্রাচীর শেষ করে।

এইখানে পাখিরা গান ধরে আপন সুরে ভেসে, 

দিগন্ত জুড়ে উন্মোচিত করে নতুনত্বের সাথে। 

আজ তুমি গান ধরবে আপন মোহনাতে,

যদি না আসে সুর ভেতর থেকে তবে,

কান্নায় ফেটে পড়বে তুমি গগনতলে। 

হাসিকান্নার শহরতলিতে অচেনা রাস্তার মোড়ে, 

বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পায় হাজারো রকমের বাহানাতে। 

কত শ্রেণির লোকজনদের সাথে দেখামিলে, 

এই পথে হাঁটতে গিয়ে জগৎ সংসারে। 

অলোক আচার্য

আবার দেখা হবে – অলোক আচার্য

আবার আমাদের দেখা হবে একদিন

জানি না কবে

কোন শরতের বিকেলে।

জানি না কবে উত্তরের হিমেল হাওয়ায়

শীত লাগা সন্ধ্যায়

কুয়াশার চাঁদর সরিয়ে।

আবার আমাদের দেখা হবে একদিন

শীত পেরিয়ে যেদিন বসন্ত আসবে

বাসন্তী রং মেখে বসন্ত উন্মাদনায়

আবার আমাদের দেখা হবে ।


সুকান্ত মজুমদার

আর একবার – সুকান্ত মজুমদার

কিছু কথা,চর্চিত তুমি সর্বস্বে

গাছেদের শুক্ন পাতায় ধুলোমাখা মায়া হয়ে কবে চির নিদ্রালু হয়েছে,ভাবিনি –

অপ্রাপ্তি নামে নিঃসহায় দীগন্তে জীবন

আবদ্ধ স্প্রীহার বুকে পথ ঘেঁটে দেখিনি 

আক্ষেপের সুচারু কোমল তৃনচর হয়েওঠে

আবারো ফিরে আসবার পদক্ষেপে পিষ্ট 

নতুন পথ একে নেবার স্পর্ধা কাল ক্লিষ্ট, 

অসহ্যের বালিতটে প্রত্যাশার জোৎস্নায় 

কারো এসে ফিরে যাওয়ার পদাঙ্ক গুনি

অবাধ্য মোহরা মিশে বিস্মৃতির জীবাশ্মে।  

স্বপ্নিল ভোম ইচ্ছের সহাস্য তিমিরে

আবারো একবার বাঁচতে শিখি দুচোখে –

অবহেলিত আত্মীয়তার অনন্য নিবন্ধে

অনুভূতিটুকু আর একবার চাইতে সাধহয়

বাঁচবার মত প্রগাঢ় ভালোবাসার সুগন্ধে। 

মোঃ রায়হান কাজী

স্মৃতি স্মারক – মোঃ রায়হান কাজী 

বহু আকাঙ্ক্ষিত এই মূহুর্তে ,

দাঁড়িয়ে আছি পথের মাঝখানে। 

ক্লান্ত, ভ্রান্ত হয়ে ক্ষিপ্ত আমি, 

সন্ধানপর্বের দীর্ঘশ্বাস ফেলে। 

তবুও মুগ্ধ আমি এই পথে হাঁটতে গিয়ে, 

নির্নিমেষ জ্যোৎস্না আলো ছড়িয়েছি চারদিকে। 

নিদ্রার মাঝে শিহরিত হৃদয় জেগে ওঠে,

হাসি,ব্যথা,স্মৃতি অবশিষ্ট যা আছে প্রাণে।

একদিন হয়তো বিদায় নিবো, 

এই ধূসর প্রান্তের কাছ থেকে চিরতরে। 

কোনো এক অচেনা অজানা দেশে বিস্ময় জাগিয়ে,

জানিনা থাকবো কিনা মানবের মনে স্মৃতি হয়ে? 

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: