কবিতা এক মুক্তির প্রয়াস // তৈমুর খান

কবিতা এক মুক্তির প্রয়াস। ছন্দ থেকে মুক্তি, অলংকার থেকে মুক্তি, বিষয় থেকে মুক্তি, আঙ্গিক থেকে মুক্তি। শব্দ, বিশেষ্য, বিশেষণ ব্যবহারের গতানুগতিকতা থেকেও মুক্তি। কবিতার এই রূপান্তর এবং সর্বদা পরিবর্তনশীলতা একমুখী এবং স্থির পাঠক মেনে নিতে পারে না। পাঠকেরও যে গতিশীলতা দরকার সেটা তিনি হয়তো উপলব্ধিও করতে পারেন না।

.

.

কবিতা পাঠের এবং নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা লাভের একটা অ্যাডভেঞ্চার আছে। বিস্ময় ও বিহ্বল হয়ে শূন্যতার অসীমতায় পক্ষবিস্তারের এক ভিন্ন ধরনের আনন্দ আছে। সেই আনন্দ, সেই রহস্যই তো কবিতার কাছে আমাদের প্রাপ্য। জ্ঞানের সংজ্ঞা কি নির্ধারণ করা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই জ্ঞান অসীমতার নিরিখে বিচার্য। তেমনি বিস্ময়কেও সঠিকভাবে প্রকাশের ভাষা নেই। অনুভূতির যেমন প্রকাশ নেই, স্বপ্নের যেমন বাস্তব নেই, মনের যেমন শরীর নেই —কবিতাও তেমনি নিরবধি এক চেতনার জাগরণ। তাকে শব্দরূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।

.

.

যাঁরা কবিতায় বিবৃতি-বর্ণনা, নীতি-নৈতিকতা, তথ্য-তত্ত্ব, বক্তব্য-শ্লোগান তুলে ধরেন তাঁদের কবিতাকে এসময়ের কবিতা বলা যায় না। তা প্রাচীন, গতানুগতিক, প্রতিভাহীন অর্জিত অভিজ্ঞতার কচকচানি মাত্র। আবার কবিতার নামে যাঁরা শুধু কথা আমদানি করতে চান, এলোমেলো শব্দ প্রয়োগে জবরজং শব্দপ্রলাপের কাঠিন্য প্রযুক্ত করেন —সেটাও কৃত্রিম, মস্তিষ্কপ্রসূত ছদ্ম পাণ্ডিত্যের প্রকাশ হয়ে যায়। কবিতার আত্মা সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

.

.

         কবির মনন-দর্শনে নিবেদিত যে আত্মক্ষরণের সম্মোহন সূচিত হয়, সময়ের ভগ্নস্বরে যার যাপনক্রিয়ায় নানা প্রসঙ্গান্তর উঠে আসে ;বহুমুখী পর্যায়ের সুন্দর-অসুন্দর, পূর্ণ-অর্ধ, প্রকৃত-বিকৃত একাকার হয়ে যায় —কবিতা তারই মুহূর্ত সেই সমীক্ষণের প্রাচুর্যে উদ্ভাসিত প্রকৃত স্বর বলে গণ্য হতে পারে। পাঠক সচেতন হলে সহজেই অনুধাবন করতে পারেন কত অমোঘ তার শব্দাবলি, কত নিখুঁত সেই উচ্চারণ।

.

.

       এই সময়ের লেখা নকিব মুকশি-র “হেজিমনিক পোয়েট্রি”-র দুটি অংশে দেখতে পাই :

“ফলখাদক—প্রেম চিনে না

মমিন—কবিতা বুঝে না

নদী—মাছ বেচে না

আর তুমি—আমায় খোঁজ না

পিল—মীন জানে না…

.

.

শ্রী হারানোর পর শুধুই পাই—খাঁটি মৃৎ ও তুমিটুকু….

এইসব বেলেফুল—আধুনিক ভান সংসার…

এবং দোকানদার জানে—কী চায় তোমাদের অন্দরমহল…?”

.

.

সময়, অভিজ্ঞতা, আত্মকথা, সংসার যাবতীয় বিচিত্র কথা কথার ভেতর ঢুকে যায়। কখনও সৌরসেক্স, সেক্স ওয়ার্কারস্, গোলআলু, কর্মশালা, আম্মার ডাক, জাত-ঘৃণা সব এসে যায়। কোনও কোনও কবি বলেছেন “বোকাচোদা চাঁদ। চাঁদ সুন্দর ।” আবার কোনও কবি পৃথিবী শব্দের বানান জানলেও লিখেছেন “পৃথীবি”। এটা তো কবির দেখার পৃথিবী, যা ভঙ্গুর, অনিশ্চিতের উলট দর্শন । বিখ্যাত শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বলেছেন :

.

.

“Poetry surrounds us everywhere, but putting it on paper is, alas, not so easy as looking at it.”(Vincent Van Gogh)  কবিতা আমাদের চারপাশে ঘিরে আছে। কাগজে লেখা হলে তবেই আমরা তা বুঝতে পারি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তা সহজে ধরা যায় না। একজন প্রকৃত কবিই তা ধরতে পারেন।

.

.

.

.

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: