কোট : আশিস চক্রবর্তী

স্টেশনে পৌঁছে স্টেশন মাস্টার এর কাছে জানতে পারলাম, দশ মিনিট আগে ট্রেনটা বেড়িয়ে গেছে। নেক্সট ট্রেন সেই রাত একটা পাঁচে।প্যাসেঞ্জার শুন্য গোটা প্ল্যাটফর্ম।অগত্যা ওয়েটিং রুমে রেস্ট ।হাতের ব্যাগটা নামিয়ে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে পড়লাম। খানিক দূরে জনা পাঁচেক কুলি তাস খেলছে, রেলের হলদে আলোয় মুখ গুলো অস্পষ্ট । গলার স্বর নেশায় ভেজা।

হাত ঘড়ি টা স্লো যাচ্ছে। রেলের সময় এর সাথে ম্যাচ করতে যাবো , ঝট করে লোডশেডিং। একমুহূর্ত গোটা ঘরটা চুপসে গিয়ে ছোট হয়ে আমার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে থেমে গেলো। অফিস থেকে স্টেশন মাস্টার এর বিরক্তিকর শব্দ ভেসে আসলো- গনশা, আরে এই গনশা, ইলেকট্রিক এর তার টা একবার দেখতো। নেশায় জড়ানো-” জি বাবুজি”- কানে এলো।

খানিক বাদেই এদিক ওদিক পায়ের আওয়াজ টর্চের তীক্ষ্ণ আলো আর তীব্র হাসির শব্দ,,,, কি হলো কি- আবার বললেন স্টেশন মাস্টার। গনশার নেশা খানিক কেটেছে। বললে- বাবুজি ইলেকট্রিকের তারে চামগাদার ফাঁস গিয়া। পুরা জ্বল গায়া, ইস্কা মু তো দেখিয়ে হাসি থামবে না বাবুজি। একটা ফটো তুলে রাখেন ,, আবার গনশা হাসিতে ফেটে পড়লো। ওটা ফেলে মেন সুইচ তুলে দে, এভাবে আর কতক্ষন,- বলল স্টেশন মাস্টার।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটা উৎকট পোড়া গন্ধ নাকের পাস দিয়ে চলে গেলো, বুঝলাম গনশা পোড়া বাঁদুড় জানালার নীচে দিয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে গেল। পরক্ষনেই আলো জ্বলে উঠলো। আলো ফিরে এলে দেখি আমার ঠিক পিছনে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে এক ভদ্রলোক। আশ্চর্য, এতক্ষন তো লক্ষ্য করিনি। অন্ধ কারে এসে বসবার সময়ও সামান্যতম কিছু আমার ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়েনি।এসমস্ত ভাবছি ‘ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-ট্রেন ফেল করেছেন?? বললাম – হ্যাঁ।

অল্পের জন্য। তা আপনিও কি তাই! জিজ্ঞাসা করতেই উনি বললেন- এই ট্রেন আমি হামেশাই ফেল করি। -মানে? আমি এ লাইনের নিত্য যাত্রী। কাঁচা মালের ব্যবসা আছে। তা ট্রেনের সময়ের সাথে আজঅব্দি তাল আমি মেলাতে পারলাম না ।তবে পরের ট্রেন টাই আরাম পাবেন। নো গ্যাঞ্জাম বুঝলেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

বললাম- ফাঁকা দরকার নেই। একটু বসার জায়গা পেলেই হলো। এই ফাঁকে ভদ্রলোক,উল্টো দিকে থেকে আমার পাশে খানিকটা টা তফাতে বসলেন।পড়নে চকচকে কালো কোট, পায়ে পালিশ করা কালো জুতো,। চশমার ফ্রেম টা পর্যন্ত হাল ফ্যাশনের এবং পোশাকের সঙ্গে ম্যাচ করা। বেশ স্থূলকায়, চেহারাতে অতিপ্রসন্ন তার ছাপ। এধরণের পোশাক পরে কেউ কাঁচামালের ব্যবসা করে বলে আমার জানা নাই।

হতেও পারে নিমন্ত্রণ বাড়ি থেকে আসছেন। কিংবা আমার ধারণার বাইরে বিরাট মাপের কোনো সব্জি ব্যবসায়ী।এও হতে পারে ভদ্রলোক অতি মাত্রায় সৌখিন,। এসব কথা কেবল মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ভদ্রলোক অবাক করে দিয়ে ফস করে বলে বসলেন- কোটের কথা ভাবছেন?? আমি রীতিমত অথর্ব। খানিক সামলে বললাম আপনি কি করে জানলেন? কথা টা এই মুহূর্তে আমার মাথায় এলো!! ভদ্রলোক গলার স্বর খাদে নামিয়ে অল্প অল্প হাসলেন।

তবে পরিস্থিতি র সঙ্গে বেশ বেমানান সে হাসির শব্দ। যেন উনি গলা টা পরিষ্কার করলেন, যেন উঁচু কোন স্থান থেকে কোন নিশাচর খাদ্যর সন্ধান পেয়ে সতর্ক হচ্ছে। আর পাখার ঝাপ্টানি তে তার দিকে ছুটে যাচ্ছে। হাসি থামলো। স্টেশনের নিস্তব্দ কাঁপানো সামান্য হাসিটা আস্তে আস্তে বাতাসে ভর করে মিলিয়ে গেল।

কুলি দের শোর গোল আর নেই। কেবল অপরিচিত ওই ভদ্রলোক আমি আর কয়েক টা হলদে পড়া আলো ছাড়া মনে রাখবার মতো কিছু নেই। প্রায় এই কথা ট্রেন মিস করা কোনো না কোন যাত্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করে থাকে, তাই একটা অনুমান মাত্র- বললেন ভদ্রলোক।

আরো বললেন- ভাবছেন বেটা করে পাঁচ টাকার সব্জি ব্যবসা, আর গায়ে চড়িয়েছে দামি কোট প্যান্ট জুতো . .. ।আবার সেই খস খসে হাসির শব্দ। এবারের ওনার হাসির শব্দ টা স্টেশনের দেয়ালে যেন ঠোকর খেয়ে ঘুরে ফিরে কানে ফেরত আসতে লাগলো। নরকের মতো রাত । এই আগন্তুক এই রাতের থেকেও বিশ্রী ভাবে আমাকে ক্রমশ চেপে ধরছে।

লোকটা গাল প্রসারিত হাসি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলো- কটা বাজে? বললাম – পৌনে এগারো।উত্তর দেবার ইচ্ছা শেষ হয়ে আসছে। একজন সঙ্গী হিসেবে লোকটি আমার ভীষণ অপছন্দএর , তা ছাড়া একটা ঝিমুনিও আস্তে আস্তে রাতের সঙ্গে তাল রেখে বাড়ছে। কোটের কলার হাত দিয়ে নাড়িয়ে লোকটা বললেন- এই কোটের একটা ইতিহাস আছে। ঝিমুনির মধ্যে বললাম- কি রকম? সে অনেক বেয়াড়া কাহিনী, আপনার পোষাবে না। হোক না। এখনো ট্রেন আসতে বেশ দেরি। শোনায় যাক না , কোটের ইতিহাস।

লোকটি উৎসাহে ফেটে পড়ে – শুনবেন, আপনি শুনবেন। বলে গুটি সুটি মেরে বসে পড়লেন । আমি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম। কাঁচা বয়েস থেকেই আমার সস্তায় কিংবা কাউকে ঠকিয়ে কিছু কিনে ফেলবার বাতিক ছিল। ঘরে আমার এসব জিনিস পত্তরের কমতি ছিল না। ফোন টাও একজন জুয়ারী কে ঠকিয়ে কিনি কিছু দিন আগেই। কম দামে মানুষ ঠকিয়ে কিছু আয়ত্ত করতে পারলে শরীরে অদ্ভুত আনন্দ হতো।

একটা শিহরণ হতো।খুশিতে গলা দেবে আসতো। আর মনের ভেতর বসে কে যেন চিৎকার করে বলতো আমি জিতে গেছি, জিতে গেছি আমি। তবে বিশ্বাস করুন সেই আওয়াজ আমি বাইরে আস্ তে দিইনি।গ্রাম গঞ্জের মানুষ, সস্তার জিনিস আর কত দেখেছি বলুন। শেষ টাই মাঝ পথে লেখা পড়ার পাঠ চুকিয়ে এই লাইনে ডেলি পাসেঞ্জারি করে কম দামে মাল কিনে আড়তে বেঁচে দু পয়সা কামায়। এই একই সময়ে একটা অল্প বয়েসের ছোকরা আমার সঙ্গে কাজে যোগদেয়।প্রথম প্রথম খুব কম কথা বলতো।জাতে মুসলমান। বাড়ি ঘর ঠাঁই ঠিকানা কিছুই কখন ও বলেনি।

হুট করে কোন স্টেশনে নেমে পড়তো ঠাওর করতে পারিনি। হটাৎ হঠাৎই ওকে চোখে পড়তো প্যাসেঞ্জার ভেঙে ভেঙে মাথায় বোঝা চড়িয়ে এগিয়ে আসছে। দিব্যি চেহারা, শরীরে মেদ এর চিহ্ন নেই।নাম বলেছিল মনসুর। আমি মনসুদ বলে ডাকতাম। এই নামে ডাকতাম ছোকরার ব্যবসার এলেম দেখে।কয়েক মাসেই ব্যবসায় হাত পাকিয়ে ফেললো। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে ছিলাম বুঝলেন- এই অব্দি বলে ভদ্রলোক আমার দিকে চুপ করে চাইলেন। বললাম – কি লক্ষ্য করছিলেন। আসলে ভদ্রলোক আমার গল্পের প্রতি আগ্রহ কত টা সেটা যাঁচায় করবার জন্য থামলেন।

আমার ঝিমুনি তখন নেই। সত্যি বলতে ভদ্রলোক আর যাই হোক ঘটনা বলবার কৌশল টা ভালো জানেন। আবার বলতে শুরু করলেন- ভাদ্রের গুমোট গরম। দু পা হাঁটলেই গা থেকে ঘাম ঝরে পড়ে। অথচ মনসুদকে কখনো ঘামতে দেখিনি।বেশ খোস মেজাজেই হাতে মাথায় বোঝা নিয়ে হাঁটতো। আমি তো মজুর দিয়ে মাল বহাতম। ওর ওসব বালাই নাই।

দিব্যি মাল আড়তে নিয়ে হাজির। এরই মধ্যে আরো একটা ঘটনা নজরে পড়লো। ছেলে মানুষ, তবু হিসেবি। বেপরোয়া পয়সা ওড়াতে ওকে কখনো দেখিনি, এবারে দেখলাম। হাল ফ্যাশনের জুতো জামা ঘড়ি টুপি পরে ও কাজে আসতে থাকল।শখ কখন কার কিভাবে মাথায় চড়ে, এ নিয়ে ওকে কিছু বলিনি। কেবল একবার বলে ছিলাম- মনসুদ এতো সেজে গুঁজে তোমাকে তো আগে দেখিনি, তাছাড়া এভাবে কাজে আসলে সব তো নষ্ট হয়ে যাবে।

মনসুদ হেসে জামার খুঁট টা হাতে ধরে নেড়ে বলল- এ নষ্ট হলে ক্ষতি নেই। খুবই সস্তা , কিনেছি অনেক গুলো। পড়বার সময় কই, কাজ থেকে রেহাই নাই। তাই ভাবলাম এই পরে কাজ করবো। মনসুদের এত কথার মাঝে সস্তা কথা টা আমার কানে আটকে গেলো। চোখে ভাসলো মন সুদের জিতে যাওয়া মুখ টা।কোথায় যেন একটা হেরে গেছি ভাবে মন টা ভারী হতে থাকলো। ছোট বেলা থেকে সস্তায় জিনিস কেনার স্বভাব।

শেষ কিনা এই ছোক রার কাছে হেরে যাবো। লোভ কে কিছুতেই লাগাম দিতে পারলাম না।ঠোঁটের আগায় কথাটা আপনে আপ চলে এলো- কোথায় পেলে এতো সস্তায়? মনসুদ হেসে জবাব দিলো- মৌলালীর মোড়ে। শিয়ালদা স্টেশন থেকে হাঁটা পথে কিছুটা। সে রাতে কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি। চোখ বুঝলেই মনসুদের জিতে যাওয়া মুখ টা ভেসে উঠছে। ভোর রাতে একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখলাম। আমি মৌলালীর ফুটপাত দিয়ে হেটে চলেছি।

রাস্তার দু পাশে রাশি রাশি জিনিস বিক্রি হচ্ছে । কিন্তু আমি একটাও কিনতে পারছি না। যখনই দাম দর করে পছন্দএর জিনিস নিতে যাচ্ছি, কে জানি চট করে দাম চুকিয়ে আমার জুতা জামা টুপিটা কেরে নিয়ে কেটে পড়ছে। হেরেই চলেছি। চোখ খুলে দেখি ভোর পাঁচটা। ভেতরে কে বলে উঠলো এই মৌলালি যাওয়ার সঠিক সময়, দিক বিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে ট্রেনে চড়ে বসলাম।

শহরে পৌঁছে একটা সস্তার হোটেলে উঠে সন্ধ্যের দিকটায় ঢুঁ দিলাম মৌলালীর মোড়ে। পৌঁছে দেখি আমার স্বপ্নের থেকেও অনেক বেশি জিনিস ওখানে বিক্রি হচ্ছে। এটা সেটা সস্তায় কিনে জিতে যাওয়া আলো ভরা মুখ নিয়ে দেখি একেবারে কোনার দিকে একটা হকার চিৎকার করছে- দোশো রুপিয়া মে কোট, সিরফ দোশো রুপিয়া মে কোট লে জায়িয়ে।

ইস সে কম মে কাহি নেহি মিলে গা। বিশ্বাস হলোনা। দেশে অনেকের মুখে শহরে লোক ঠকানোর গল্প শুনেছি। আবার বুকের ভেতর জিতে যাওয়ার একটা লোভ ধড়পড় করে উঠছে। হকার টা ইশারা করে আমাকে কাছে ডাকলো। নেড়ে চেড়ে দেখলাম। একদম নতুন। ফাটা ছেড়া পর্যন্ত নেই। বাতিক টা মাথায় চড়ে বসলো। গায়ে দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলাম। হকার ভায়া এত সুখ্যাতি করলো জিনিস টার যে দাম মিটিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

ঢুকতেই হোটেল মালিক বললো আজকেই কিনলেন-? কোথা থেকে? বললাম মৌলালীর মোড়। লোকটা মিচকি হেসে বললেন -পারেন বটে আপনারা। আপনাদের জন্যই ওরা আছে। দাম কম শুনলে হুট করে কিনে নিলেন। বললাম ঠকে গেলাম নাকি দাদা? দেখুন কদিন পড়ে, জিতলেন কি হারলেন। এতো দূর শুনে দীর্ঘ ক্ষনের বিরতি ভঙ্গ করে আমি বললাম — তাহলে এই হলো আপনার কোটের ইতিহাস। সোজা কথায় বললেই পারতেন মৌলালীর থেকে সস্তায় কিনেছেন। এতে গৌরবের তো কিছু আমি বুঝলাম না।

ভদ্রলোক বললেন- থামুন মশায়। এতেই ধৈর্য হারা হলেন। আগে পুরো টা শুনুন। সেই রাতে হোটেলে কিছু তেই আমার ঘুম এলো না। খারাপ স্বপ্ন দেখেই রাত কাটলো। কি রকম খারাপ স্বপ্ন – জিজ্ঞাসা করলাম। এই ধরুন বেখাপ্পা। দেখলাম সাপে ব্যাঙ ধরেছে সে কি ভীষণ কুৎসিত আওয়াজ। ফট করে দেখছি লাশ কাটা ঘরে আমাকে শোয়ানো। আমার জামার বুকের বোতাম গুলো কেউ খুলছে বুক পেট কেটে দেখবে বলে।

ধরপরিয়ে উঠে দেখি বিছানায়। আবার এপাশ ওপাশ করে খানিক চোখ বুজে দেখি শ্মশানে আমাকে পোড়ানোর পর নাভি পিন্ড টা গঙ্গায় ছুড়ে ফেলে উঠে আসছে সেই হকার। বীভৎস অভিজ্ঞতা মশায়। আমি বললাম–এরম হয়। কোট নিয়ে নেগেটিভ চিন্তা করেছেন তার থেকেই এই দুঃস্বপ্ন। তারপর কি হলো? বাড়ি ফিরে এলাম।বাড়িতে ঢুকতেই আমার বছর দুয়ের ছেলেটা আমাকে দেখেই কেঁদেই চলেছে। সেই সাপে ব্যাঙ ধরার মতো কান্নার শব্দ। কখনও ইনিয়ে বিনিয়ে, আবার কখনো খুন,, খুন,,,খুন,, করে।

এরম কান্না , ও আগে কখনো কাঁদেনি।কালো কোট পড়ে আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে বলে নিজেকে সান্তনা দিলাম। নিজের ঘরে ঢুকে গা থেকে কিছুতেই কোট খুলতে পারিনা। এঁটে বসে রয়েছে। স্বাস ফুলে ফুলে উঠছে।আগে কোনো দিন এসব পড়ার অভ্যাস নেই, তাই গিন্নি কে ডেকে ,টেনে হিঁচড়ে খুলে কোনো মতে রেহাই পেলাম। এখানে আবার থামলেন ভদ্রলোক।

এবারে আমার কৌতূহল একটু বাড়ল। বললাম এরপর কি হলো? ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- তারপর আরকি , এই পোশাকের মোহ এড়াতে পারলাম না। এখন সব সময় আমার গায়ে উঠে থাকে ,এই সস্তার কোট।মনসুদের সঙ্গে দেখা হতেই ওকে সব টা জানিয়ে বললাম – তোমার বাতানো ঠিকানা থেকেই কিনেছি। কেমন হয়েছে?

আমার তো একদম ফিট হচ্ছে , কি বলো ভালো হয়নি? মনসুদ একে বারে কাছে ঘেষে ওর শক্ত আঙ্গুল দিয়ে কোট টা পরীক্ষা করে বললো- ঠগেছেন। ঠকে ছি!! বলে কি। মাত্র দুশো টাকার কোট। দামি কোম্পানির লেবেল আটা। এই ভু-ভারতে কোথাও আছে? আসলে আমার জিতে যাওয়াতে ওর হিংসে হচ্চে। দেশে নিজের জাত ভাই দের খালি গা দেখা অভ্যাস, সেকি কোটের মর্ম বোঝে? তবে ঠগে যাওয়া কথা টাই খটকা লাগাতে বললাম- কি দেখে বুঝলে আমি ঠগেছি? আমার প্রশ্নের উত্তরে মনসুদ চাবি দেয়া পুতুলের মতো অনেক কথায় বলেছিল।

যার একটিরও অর্থ আমি বুঝিনি। এই বলে ভদ্রলোক ঘটনার ইতি টানতে চাই ছিলেন। আমার মন কিন্তু অতৃপ্তিতে ভুগছে। এভাবে আধা খ্যাচড়া একটা বৃত্তান্ত শুনে ,ভেতরে প্রশ্নের ঝড় উঠলো। বললাম – কি এমন বলেছিল মনসুর আপনাকে? ভদ্রলোক এবারে প্রসঙ্গ উড়িয়ে দেবার মত করে বললেন- যাক গে ওসব কথা। ওসব আজগুবি কাহিনী, আপনার মতো শিক্ষিত লোকের কাছে অমূলক। বাদ দিন ।

ট্রেন আর কত দেরি দেখুন তো! জেদ টা আমাকে পেয়ে বসলো। এর শেষ টা যেন না শুনলেই নয়। এটা সেটা অনেক কথা বলার পর ভদ্রলোক বাকি ঘটনা শোনাতে রাজি হয়ে শুরু করলেন- মনসুদ সেদিন চাষা ভাষায় তার অভিজ্ঞতার কথা আমাকে শুনিয়ে ছিল। যা তার দেশের লোকেরা জুবু থুবু হয়ে বসে আগ্রহের সাথে শুনবেও আবার মানবেও।

আমার আপনার মতো শিক্ষিত মানুষের কাছে তা নিছক কাল্পনিক কাহিনী ছাড়া কিছুই নয়।ব্যাটা বলে নাকি ফুট পাতে ওই হকার এর দোকান দেখেও একজন , প্রতি রাতে কেনেও একজন। ওকে যে দেখে ,সেই মরে অপঘাতে। ও মৃত্যুর ব্যাপারী। ওর যত পোশাক সব মরার পোশাক। আবার সেই তীক্ষ্ণ হাসি ।একবারও মনুষ্য লোকের মতো হাসিটা মনে হয়নি।

আমি এসবের কিছুই বুঝলাম না। বললাম- তার মানে? ওর ভাষায় মানে টা খুব সহজ। দেশে বিদেশে কত দুর্ঘটনা ঘটে। কত বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায়। ওসব মৃতের শরীর থেকে খুলে নেয়া পোশাক, জুতো, বিভিন্ন অলংকার , আরো কতকি ধোলাই সাফাই হয়ে চলে আসে ওই ফুটপাত ওয়ালার কাছে। সেগুলো সস্তায় কিনলেই বিপদ। অপঘাতে মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুর সময়ের শেষ সম্বল টুকুর মায়া নাকি ছাড়তে পারে না। দেহের তো বিনাশ হয়।

কিন্তু অতৃপ্ত আত্মার ?!! অতৃপ্ত আত্মা ঘুর ঘুর করতে থাকে তার প্রিয় বস্তু টির আসে পাশে। এমনকি বস্তুটির ভেতরেও আশ্রয় নেয়। আত্মা তো নিরাকার। একপ্রকার বায়ুর স্তুপ। কোন কিছু উপভোগ করা সম্বব নয় ওর পক্ষে। উপভোগ করার জন্য চাই একটা দেহ। আর ওই কোট ওয়ালা ওই অতৃপ্ত আত্মা গুলো কে পাইয়ে দেয় এক একটি দেহ। আমার এই কোটের আড়ালে কোনো এক অতৃপ্ত আত্মা নাকি নিজের বাসনা কে উপভোগ করছে।

ভাবুন এ পাড়া গায়ের গুলিখোর গল্প ছাড়া আর কি হতে পারে?? আমার ভেতর কার শিক্ষা ,সংস্কার কথা গুলো অস্বীকার করছে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। তবে প্রায় ছ হাজার বছরের পুরনো এক বিশ্বাস এবং ঘটনার সঙ্গে এর হুবহু মিল রয়েছে। মিশরীয় বাসীরা , বিশ্বাস করত মৃত ব্যক্তির পুনরাগমন এর কথা। পিরামিড এর ভিতর মৃতব্যক্তির নিথর দেহে নানা রকম পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করত। যাতে তার আত্মা পুরোন দেহ ফিরে পায়।

এমন কি পিরামিডের ভেতর প্রবেশ করতো তার ব্যবহার এর সমস্ত সরঞ্জাম। খাদ্য বস্তু থেকে শুরু করে তার পোষ্য পর্যন্ত। তার প্রিয় জিনিস বা অতৃপ্ত বস্তু থেকে সে যেন কোন রকম ভাবেই বঞ্চিত না হতে পারে তাই এই ব্যবস্থা ছিল। আজও এই বিশ্বাস বা সত্য জীবিত আছে ,এরম হতেও পাড়ে। না-না সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। দেশে বিদেশে মৃত ব্যক্তির আত্মার পুনরাগমন, লুক্কায়িত সম্পপ্তির হদিশ দেয়া, অপরাধী কে চিনিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে । এগুলি কি সব ই কাল্পনিক? নাকি প্রমান এর অপেক্ষায় বিজ্ঞান অস্বীকার করছে?

মাথার ভেতর টায় একটা বিশ্বাস অবিশ্বাস এর খনন কার্য ঘটেই চলেছে। এমতবস্থায় ভদ্রলোক ফের বলে উঠলেন- ও মশায় বুঝলেন, এসব কাহিনী মনসুদ কে কোথা থেকে জোগাড় করেছে ,জানতে চাইলে, ব্যাটা তার উত্তরেও ভিমরি খাবার মতো একটা গুল ঝাড়লো। বলে কিনা এই কোট সেও নাকি একবার কিনে ছিলো। আর ওতেই নাকি ওর নৌকাডুবি তে মৃত্যু হয়, ওর লাশ নাকি বেওয়ারিশ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

পরে কোট বিহীন ওই দেহ টাই ওনাকি ফিরিয়ে নেয়। ওর অতৃপ্ত বাসনা ছিল ব্যবসা করে পরিবার কে দাঁড় করাবে। এখন সে ওটাই করছে। ভাবুন কত বড় মাপের গুলিখোর। দিব্যি ডেলি পাসেঞ্জারি করছে আর বলে কিনা… ! হা হা হা হা যতসব। আমার সর্বাঙ্গে মৃদু মৃদু ঘামের প্রলেপ।শিরদাঁড়া তে একটা শীতল স্রোত যেন বইছে। ঝট করে উঠে মেঝে থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে প্রায় শক্তি শূন্যের মতো করে বললাম- আর আপনার !

আপনার কি পরিনতি হয়েছে? ভদ্রলোক সেই নিশাচরের মতো বিকট শব্দে খানিক হেসে বললেন- দেখতেই তো পাচ্ছেন! বলছি আপনার হাত ব্যাগে তো বেশ খানিক টা জায়গা আছে বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আমি কিছু বলতে যাবো, সেই মুহূর্তে প্রচণ্ড শব্দ করে স্টেশনে ট্রেন এসে ঢুকে পড়লো। ভদ্রলোক আমার পিছু পিছু কামড়ায় উঠে জানলার ধারে বসলেন । আমি ওনার পাশে খানিক টা তফাতে। ট্রেন ফাঁকা। ট্রেন হুইসেল দিয়ে বেড়িয়ে পড়লো।

ভদ্রলোক আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন- দেখবেন এই কামরায় তৃতীয় কেউ এসে বসলে ফস করে আমার পরিচয় দিয়ে বসবেন না যেন। আমি খুব সীমিত মানুষ জন পছন্দ করি। সবার সঙ্গে ঠিক বনে না। আমি মাথা নাড়লাম। ভেতরে একটা চিন্তার বাষ্প কেবল বুদবুদ কাটছে। ট্রেন একের পর এক স্টেশন ছুটে চলেছে। প্যাসেঞ্জার তেমন নেই। টিম টিমে আলো। চারিদিকে ধাতব শব্দ করে অন্ধকার চিরে বেড়িয়ে যাচ্ছে।

কিছু ক্ষনের ভেতর নেক্সট স্টেশন এসে পড়ল। জন কোলাহল। প্রচুর মানুষ বাক্স প্যাটরা নিয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠছে। মুহূর্তে ট্রেনের কামরা ভোরে উঠলো।এক ভদ্রলোক ভিড়ের মাঝে আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন- দাদা একটু চেপে বসুন। আমি বললাম -দেখছেন না লোক বসে আছে কোথায় সরবো। ভদ্রলোক মেজাজ দেখিয়ে বললেন কোথায় লোক !!

নেশা করেছেন নাকি? দিব্যি জানলার দিক ফাঁকা। ভদ্রলোক কোনো অপেক্ষা না করে হুট করে জানলার সিটে বসেপড়লেন। তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে দেখি-আরে সেই আগন্তুক গেলেন কোথায়? কখন নামলেন। এদিক সেদিক কোথাও নেই। নাম্ বার আগে একবার আসছি পর্যন্ত বললেন না। হয়তো ঠিক ই বলেছেন আমি অন্যমনস্ক থাকয় মিস করে গেছি।

একদম ভোরে বাড়ি পৌঁছে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। নিদ্রাহীন ক্লান্তি কিছুতেই পিছু হটছে না। সকাল সকাল স্নান সেড়ে ব্যাগ থেকে পোশাক বার করতে গিয়ে দেখি একি!! এ কি করে সম্ভব!!!!বিস্ফারিত চোখ নিয়ে দেখলাম- সেই চকচকে কালো কোট ব্যাগের ভেতর ভাঁজ হয়ে পড়ে আছে।

আশিস চক্রবর্তী
মুর্শিদাবাদ

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: