গড় পঞ্চকোট — অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )

গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
বল্লাল ঢিপিদেখে আসার পর থেকেই আমার মধ্যে কেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি এর জন্য দায়ী ছোটকাকা এত সুন্দর ভাবেবল্লাল ঢিপি ইতিহাস এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বুঝিয়েছে যে আমি শুধু মুগদ্ধ হই নি , একটা অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করছি ইতিহাসকে ফিরে দেখার
খুঁজে খুঁজেএরকম আর একটাস্থানের সন্ধানপেলাম পুরুলিয়াজেলার উত্তর পূর্বেপঞ্চকোট পাহাড়েরপাদদেশে অবস্থিতগড় পঞ্চকোট এখনো কিছুধংসাবশেষ দেখতেপাওয়া যায় এর পরে গেলেহয়তো আর কিছুইপাওয়া যাবে না উঠলো বাইতো কটক যাই
ছেলে এবংমেয়ে যেহেতু বাইরেথাকে তাই বেড়াবারজন্য আমার সাথীআমার স্ত্রী ওর একটা মজাহলো কোনো স্থানেরইইতিহাস , ভূগোল নিয়েওর কোনো মাথাব্যাথা নেই বেড়াতে যাচ্ছে এতেইআনন্দ সাজবেগুজবে , একটু ফটোতুলবে আর বন্ধুদেরসাথে শেয়ার করবে
দারুন পার্টনার ডিসেম্বর মাসেরমাঝামাঝি সময়েবেড়িয়ে পড়লাম ঠিক করলাম জয়চন্ডীপাহাড় যুববাসে থাকবো ওখান থেকেযাবো গড় পঞ্চকোট গাড়িতে ট্যাংকভর্তি করে তেলনিয়ে যাত্রা শুরুকরলাম ঠিক সকালসাড়ে সাতটায় মাঝে দুবার থেমেছিলাম একবারব্রেকফাস্ট আরএকবার টি ব্রেক
পরেরদিন সকাল এগারটারমধ্যে লাঞ্চ সেরেগাড়িতে স্টার্ট দিলাম গন্তব্যস্থল গড়পঞ্চকোট আদ্রারঘুনাথপুর রোডধরে খানিকটা যাওয়ারপর আসানসোলপুরুলিয়ারোডে উঠে চলতেলাগলাম একদম সোজা প্রায় ১৪/ ১৫ কিলোমিটার যাওয়ারপর একটু ডানদিকবেকে তারপর বাদিকে পেয়ে গেলামগড় পঞ্চকোটধারা রোড এই রাস্তা ধরেদু কিলোমিটার মতোগেলে পৌঁছে যাওয়াযায় গড় পঞ্চকোট টোটাল ২১/২২ কিলোমিটার সময় লাগে চল্লিশমিনিট মতো
পার্কিং লটেগাড়ি পার্ক করেবাইরে এসে দেখিদূরে পঞ্চ কোটপাহাড় সবুজেরআস্তরনে সবটাইঢাকা
গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
 অবিন্যস্ত ভাবে কিছু ভ্রমণার্থী এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে স্টলগুলোতে মাছির মতো ভনভন করছে অনেকে চলছে রাস্তা মেরামতির কাজ একটু দূরে ধংস প্রাপ্ত মন্দিরের ক্ষয়িষ্ণু পঞ্চরত্নের একটি রত্ন আগাছার জঙ্গলে একাকী দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী বহন করে এগিয়ে এসে খুব কাছ থেকে দেখ্লাম এইটিনথ সেঞ্চুরির জেগে থাকা ইতিহাস
গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
শুধু এইটুকু ? এতে কী মন ভরে ? এতো পথ ঘুরে , এতো ব্যয় করে ,এতো আশা নিয়ে এলাম কী এইটুকুর জন্য ? আর কী কিছুই অবশিষ্ট নেই ? যখন খুবই হতাশ গ্রস্ত হয়ে পড়েছি , দেখি আমার সামনে হঠাৎ আবির্ভূত এক ছেলে

কে বাবা তুমি ? আমি জিজ্ঞেস করলাম
আমার নাম অশোক কৈবর্ত আমি পাশের গ্রামে থাকি এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম আপনাকে দেখে মনে হলো আপনি কিছু খুঁজছেন
আমি তো অবাক ছেলে আমার মুখ দেখে বুঝে গেল যে আমি কিছু খুঁজছি শহুরে মানুষ তিরতির করে দানা বাঁধতে লাগলো সন্দেহ এর নিশ্চই কোনো বদ মতলব আছে একটু ধমকের সুরেই বললাম :
তুমি কী করো ? এখানকার গাইড নাকি ?
আমি ছাত্র ক্লাস নাইনে পড়ি বাবা চাষী তবে আপনি যা ভাবছেন আমি তা নই

অনেক আশা করে এসেছেন কিন্তু আশা পূরণ না হয়াতে একটু বিমর্ষ তাই বলছি আসুন আমার সাথে

অবাক হয়ে ভাবছি ছেলেটা কে ? কি থট রিডার ? ক্লাস নাইনে পড়ে আমার মনের কথা বুঝলো কী করে ? আর কথা না বাড়িয়ে ওকে অনুসরণ করলাম হাঁটতে হাঁটতে অশোক বলা শুরু করলো
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এখানেই ছিল পঞ্চকোট প্রাসাদ সিং দেও বংশ দীর্ঘ বছর এখানে রাজত্ব করে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা দামোদর শেখর দেও উনি ছিলেন একজন রাজপুত পঞ্চকোটে শুধু প্রাসাদ বানিয়েই তিনি ক্ষান্ত হন নি এর রক্ষনা বেক্ষনের জন্য এক সুচতুর উপায় বের করলেন
কথা থামিয়ে অশোক বলল : এদিকে দেখুন এখানেই ছিল মূল কল্যাণেশ্বরী মন্দির এখন মাইথনে যে কল্যাণেশ্বরী মন্দির দেখেন সেটা প্রথমে ছিল এখানে পরে মা কল্যাণেশ্বরীকে মাইথনে নিয়ে যাওয়া হয় এবারে ওই দিকে চলুন
গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )

অশোককে বললাম : তুমি রাজপ্রাসাদ রক্ষনা বেক্ষনের কথা কী যেন বলছিলে ? , হ্যা প্রাসাদকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে এক গভীর পরীখা কাটা হয়েছিল পেছন দিকে পঞ্চকোট পাহাড় মূল প্রবেশ পথের সামনে মানে পরিখার ঠিক মাঝখানে ছিল আসাযাওয়ার ব্যবস্থা নৌকার মাধ্যমে এর দুপাশে ছিল ঘন জঙ্গল এক বিশেষ ধরনের বাঁশ গাছের ।এর ঘনত্ব এতই যে মানুষ কেন একটা মাছিও গলতে পারতো না এরপর ছিল পাথরের দেওয়াল যাকে বলে সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স

এই যে সামনে একটা মন্দির দেখতে পারছেন এটা জোড় বাংলা মন্দির ।যদিও আগাছায় ঢেকে গেছে তবুও এবার ভালো করে দেখুন মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ এটা বিষ্ণুপুর ঘরানা মানে বিষ্ণুপুরে টেরাকোটা বিখ্যাত প্রথমে আপনারা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওখানে ছিল পঞ্চরত্ন মন্দির
গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
এখন নতুন ভাবে একটা মন্দির করা হয়েছে যেখানে রাধাকৃষ্ণের পুজো হয় অনেকের মতে রাজারা ছিলেন শাক্ত কালীর উপাসনা করতেন এবার দেখাব কঙ্কালী মন্দির একটু ভেতরে সাবধানে আসবেন
আগাছার জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে চলেছি আমরা জঙ্গল পেরিয়ে একটা ফাঁকা মাঠের মতো অনেকটা খোলা জায়গা আরো কিছুটা যাওয়ার পর অশোক বলল : বা দিকে এই যে ঝোপে ঘেরা মন্দিরটা দেখতে পারছেন এটাই কঙ্কালী মন্দির পুরো মন্দিরটাই পাথরের তৈরি
দুটো মন্দির দুরকম আর্কিটেক্চারাল স্টাইলে নির্মিত একটা বিষ্ণুপুরিয়ান স্টাইল তো অন্যটা পাথরের ব্লকে এবার মন্দিরের ওপর দিকটায় তাকিয়ে দেখুন ঠিক মাঝখানে একটা কালো পাথরের স্ল্যাব ওর ওপরে রুপো দিয়ে রাজার নাম লেখা ছিল পরে সব খুলে নিয়ে গেছে
মন্দিরের ভেতরটায় দেখুন লম্বা আর্চের মতো প্রবেশ পথ ওপর দিকটা গম্বুজ আকৃতির শুন্য বেদী বেদীর সামনে ঘট ঘটে আম পল্লব দেবী নেই কাশীপুরের রাজবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বছরে একবার এখানে পুজো হয় তখন পরিষ্কার করা হয় মন্দির আরো একটা মন্দির আছে
সেটা জৈন মন্দির আলের পথ দিয়ে যেতে হবে আপনারা শহরের মানুষ অভ্যাস নেই এভাবে আলের ওপর দিয়ে হাঁটার নীচের দিকে তাকিয়ে চলুন কোনো অসুবিধা হবে না
তুমি তখন সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স পর্যন্ত বলেছিলে তারপর ?
পুরো রাজপ্রাসাদকে নজরদারিতে ঘিরে ফেলা হয়েছিল পাহাড়ের বুকে প্রায় ৬০০ ফুট ওপরে ছিল সশস্ত্র প্রহরীদের কোয়াটার্স এরা প্রত্যেকেই ছিল দক্ষ যোদ্ধা কোয়াটারের দুপাশে লম্বা ঘর ছিল ওখান থেকে নীচে রাজপ্রাসাদটা পুরো নজরে থাকতো মাঝখানে ছিল একটা রাম মন্দির ।প্রহরীরা ছিল সব রামের ভক্ত পুরো কোয়াটার্স ফোর্ট বা গড়ের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল একদম দুর্ভেদ্য গড় পঞ্চকোটের এটাই ছিল গড় এই গড় থেকেই লক্ষ্য রাখা হতো নীচে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ কিন্তু এতো করেও শেষ রক্ষা হলো না
কেন ?
সে কথায় পরে আসছি এখন দেখুন সেই জৈন মন্দির মন্দির না বলে মন্দিরের ধংসাবশেষ বলাই ভালো এখানে একটা অন্য জিনিস দেখাব একটু এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে দেখুন কী দেখতে পারছেন ?

গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
একটা গুহা

এই গুহাটার দুটো পথ দুদিকে চলে গেছে একটা গেছে পাহাড়ের দিকে আর একটা গেছে রাজপ্রাসাদের দিকে ।পাহাড়ের দিকেরটা প্রায় সাত কিলোমিটার অপরটা দু কিলোমিটার মতো লোকে বলে বর্গী আক্রমনের সময় রাজা নাকি এই গুহা দিয়ে পালিয়ে গেছিলেন
রাজা পালিয়ে ছিলেন কেন ?
১৭৪৭ থেকে ১৭৫৭ এমন একটা সময়ে বাংলার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খাঁ আলীবর্দী খাঁকে খতম করে সরফিরাজ খাঁর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল তার এক নিকট আত্মীয় সেই উদ্দেশে সে মারাঠাদের সাথে গোপন আঁতাত করে এই পঞ্চকোট পথ ধরেই মারাঠারা বাংলা আক্রমন করেছিল এই মারাঠা দস্যুরাই ইতিহাসেবর্গীনাম খ্যাত গড় পঞ্চকোটের প্রহরীদের হত্যা করে লুঠতরাজ চালায় প্রায় দশ বছর ধরে চলে বর্গীদের ধংস হত্যালীলা প্রাণ ভয়ে ভীত রাজা এই সুড়ঙ্গ পথেই পালিয়ে যান
এবার চলুন আমরা রাস্তার ওপাশটায় যাব রাজবাড়ীর প্রবেশ পথের দিকে এখন আমরা এগিয়ে চলেছি তবে মূল ফটকের দিকে যাওয়ার আগে আপনাদের একটা কুয়ো দেখাব যদিও ঠিক বোঝা যাবে না যে ওখানে একটা কুয়ো ছিল কিন্তু ছিল আর ছিল কুয়োর সাথে যুক্ত একটা স্যাড স্টোরি
স্যাড স্টোরি কেন ? আমি জানতে চাইলাম
আসলে যে কোনো মৃত্যুই তো স্যাড বুজে যাওয়া এই কুয়ো ভয়ংকর মৃত্যুর স্মৃতি বহন করে আছে
মৃত্যু ! কার মৃত্যু ?
রানীদের নৃশংস বর্গীদের হাত থেকে নিজেদের সম্ভ্রম বাঁচাবার আর তো কোনো উপায় ছিল না তাদের তাই আত্ম হননের মধ্যে দিয়েই তারা রক্ষা করেছিল তাদের সম্ভ্রম মর্যাদা
লোক মুখে শোনা যায় যে রাজার নাকি ছিল ১৭ জন স্ত্রী এর সত্য মিথ্যা জানি না ১৭জন স্ত্রী এই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে মাটি জমে জমে আজ কুয়ো বুজে গেছে কিন্তু স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এখনো কুয়ো খুঁড়লে রানীদের পরনের গহনা পাওয়া যাবে
এবার এদিকে আসুন আগাছার ভেতর দিয়ে একটু ভালো করে দেখুন এই হলো রানী মহল এগুলো রানী মহলের প্রবেশ দ্বার প্রবেশ দ্বারের ওপর দিয়ে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় সিংহ দুয়ার দুয়ারের মাথায় দুটো সিংহের মুখ যদিও ক্ষয়ে গেছে তবুও অস্পষ্ট হলেও বোঝা যায় এই সিংহ দুয়ার ছিল রাজ্ প্রাসাদে প্রবেশের একমাত্র পথ

অনেকক্ষন একভাবে কথা বলে হাঁপিয়ে গেছিল অশোক থামল একটু মনে হয় দম নেবার জন্য অন্যমনস্কভাবে আগাছার একটা শুক্ন সরু ডাল দুটো আঙুল দিয়ে টুক করে ভেঙ্গে কান চুলকাতে চুলকাতে বলল :

জানেন , এখন যেটা বলব সেটা হয়তো বিশ্বাস করবেন না কিন্তু সত্যি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি এই রাজবাড়িতে এসেছিলেন কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্ত চাকরি করতে নিযুক্ত হয়েছিলেন এস্টেটের ম্যানেজার এখানেই তিনি লিখেছিলেন তিনটি কবিতা প্রথমটাপঞ্চকোট গিরি ” , দ্বিতীয়টাপঞ্চকোটোসিও রাজশ্রীএবং তৃতীয়টাপঞ্চকোট গিরি বিদ্যা সংগীত কিন্তু দুঃখের কথা কি জানেন , উনি থাকতে পারেন নি এখানে
আমি জিজ্ঞেস করলাম , কেন ?
চোর অপবাদ দিয়ে উনাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল
এটা কী বিশ্বাস যোগ্য ? মহান কবির এতবড় অসম্মান মানুষ কোনোদিন এই মিথ্যা অপবাদ বিশ্বাস করবে না বাঙালির হৃদয়ে মহাকবির আসন যুগ যুগ ধরে অটুট এবং অম্লান থাকবে
এবার আমি আসি আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন
গড় পঞ্চকোটে যা কিছু দেখার সবটা দেখিয়েছি যতটুকু জানি সবটা বলেছি ভুল কিছু বলে থাকলে মার্জনা করবেন ক্লাস নাইনে পড়ি বলে অবজ্ঞা করবেন না আশাকরি আপনার ভালো লেগেছে আমার প্রণাম নেবেন আমি আসছি

গড় পঞ্চকোট    ---   অসীম  কুমার চট্টোপাধ্যায়  ( ভবঘুরে )
চলে গেল অশোক প্রচুর কথা বলতে পারা মানুষও ঘটনাচক্রে বোবা হয়ে যায় ঘটনার আকস্মিকতায় হারিয়ে যায় সব কথা শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফ্যাল ফ্যাল করে সম্বিৎ ফিরলে শুধুই ভাবে এতক্ষন যা যা শুনলাম সে সব সত্যি না মিথ্যা ? 
সমাপ্ত
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: