ঘরে ফেরার গান : পৃথা সিনহা দাস

ভোর চারটের সময় বাইকের হর্নের আওয়াজে রাকা দোতালার ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এল। নীচে তাকিয়ে দেখলো একরাশ কুয়াশা মেখে বিতান দাঁড়িয়ে আছে তার বাইক নিয়ে। ” আসছি… এক মিনিট দাঁড়া”।

রাকা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পিঠের ব্যাগ, ক্যামেরা আর চামড়ার জ্যাকেট টা নিয়ে মা বাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো। আলতো হাতে ভেজানো দরজা ঠেলে বিছানার কাছে গিয়ে আস্তে করে মা কে ডাকলো.. ” মা.. আসছি”। সুধা দেবী জেগেই ছিলেন। ” সাবধানে যাস “.. বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে উঠে রাকার পেছন পেছন বাইরের ঘর পর্যন্ত এলেন। ” কখন ফিরবি? বাইক টা একটু ধীরে ছোটাতে বলিস বিতান কে। কান মাথা ভালো করে ঢেকে নিস। এই ঠান্ডায়, কী দরকার বাপু ফটো তুলতে যাওয়ার ,বুঝিনা । “

” হয়েছে? এবার একটু থামো মা… আমি আর ছোট্ট মেয়েটি নেই। চাকরি করছি। ফোটোগ্রাফির শখ আমার অনেক কালের, জানোই তো। সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসবো। চিন্তা কোরো না। তুমি আর বাবা সাবধানে থেকো”।

বাইক ছুটে চলেছে মিহি সুতোয় বোনা কুয়াশার চাদর ভেদ করে। রাকা আরও একটু আঁকড়ে ধরলো বিতান কে। মোটা চামড়ার জ্যাকেট ভেদ করে ঠান্ডা হাওয়া তার শীতল হাত বোলাচ্ছে যেন রাকার সর্বাঙ্গে।


” আরও শক্ত করে ধর না রাকা। নরমে,গরমে যাত্রা টা বেশ মধুর হবে”.. আলতো করে একটা চিমটি কাটলো রাকা বিতানের কোমোড়ে। “খালি বাজে কথা, মন দিয়ে তোর পক্ষীরাজ ছোটা দেখি… অবশ্য তুই যে স্পীডে বাইক ছোটাচ্ছিস, তিন ঘন্টার পথ, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে মেরে দিবি। ” ” তুই সাথে থাকলে আমার সব স্পীড বেড়ে যায়। শরীরের, হৃদয়ের… সঅঅঅঅব”।
” তুই বহুত বেয়াদপ হয়ে গেছিস বিতান, যা… তোকে বিয়ে করবো না”। আচমকা বিতান বাইক টা দাঁড় করিয়ে দিল। ” কী রে! কী হল? ” রাকা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল।


” এই ঠান্ডায়, ভোরবেলায় লেপের ওম ছেড়ে এত দূর যাচ্ছি তোর ফোটোগ্রাফির শখ পূরণ করতে… কোথায় একটু আদর করে পাঁচ বছরের প্রেমিক তথা হবু বরের তোষামোদ করবি, তা না…. হুমকি দিচ্ছিস? আমি কী ডরাই কভু দেবীর হুমকিরে? আমি তো ডরাই দেবী, আপাদমস্তক আপনিটিরে “।


বিতানের এ হেন নাটুকেপনায় রাকার বেশ মজা লাগছিল। চকাস করে বিতান হঠাৎ রাকার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল… ” সব ভয় পালিয়ে গেল, এই একটি ওষুধের মাধ্যমে “। আকষ্মিক চুম্বনে রাকা একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল, বিতানের পিঠে একটা আলতো কিল মেরে বলল …”এবার চল… ভয় কে জয় করে সামনে এগিয়ে চল”। ” জো আজ্ঞা দেবী ” বলে বিতান বাইক স্টার্ট দিল। মসৃণ, সর্পিলাকার পথে দু চাকা গড়ালো। পূর্বাকাশে লালের পরশ লেগেছে, আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছে শীতের ভোর।

বাইক এসে থামলো একটা সদ্য ঝাঁপ তোলা চায়ের দোকানের সামনে। উনুনে আঁচ দিচ্ছে দোকানি। এতক্ষণ মোবাইল এর একটি অ্যাপের বাতলানো পথেই বেশ আসছিল বিতান। হঠাৎই সেই অ্যাপ বাবাজি ওদের কেবল গোল গোল ঘোরাতে শুরু করল, তাই এই গন্ডগোলের পথে না গিয়ে বিতান স্থানীয় লোকের সাহায্য নেওয়া সঠিক হবে ভাবল।

“ক্ষেপির চর আর কতদূর বলতে পারেন? ” বিতান চায়ের দোকানির কাছে জানতে চাইল।

” সামনের দিকে সোজা গেলি পর একখান মন্দির পাবেন। সেটিরে ডান হাতে রাখি ,পাশের মাটির পথ খান ধরি নাক বরাবর চলি গেলেই পৌঁছি যাবেন ক্ষেপির চরে”।

দোকানি কে ধন্যবাদ জানিয়ে তার বাতলানো পথে বিতান বাইক ছোটালো।
” ক্ষেপির চর নামটা কিন্তু দারুণ। একদম তোর স্বভাবের মত। আমার ক্ষেপিকে নিয়ে চলেছি আরেক ক্ষেপির চরে” বিতান নিজের কথায় নিজেই হেসে উঠল।

মন্দির কে ডান হাতে রেখে মাটির রাস্তা ধরে, শুষ্ক মাটি উড়িয়ে ,রাস্তার শেষে কিছুটা ঘাস জমি পেড়িয়ে বাইক এসে থামল বিশাল এক বিলের সামনে।দৃষ্টির সীমানা ছাড়ানো বিস্তার এই জলাশয়ের। জলের মাঝে মাঝে জেগে আছে আগাছায় ভরা চর। সেই চরে শয়ে শয়ে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসেছে কুয়াশার রঙে রঙ মিলিয়ে। এ যেন এক নিশ্চুপ শান্তি স্থল।

বাইক থেকে নেমে রাকা ক্যামেরার লেন্স ঠিক ঠাক করে, পজিশন নিয়ে গুছিয়ে বসল ঘাসের ওপর।নিবিষ্ট মনে একের পর এক ছবি তুলে চলেছে পাখি দের।বিতান রাকা কেই দেখছিল, মগ্ন মৈনাক যেন।এই পাগলী টাকে ভালোবাসে বলেই আজ রবিবারের সকালের লেপ ঘুমটা এমন জলাঞ্জলি দিতে পেরেছে,একটু মন খারাপ যে নেই,তা বললে ঢপ মারা হবে। আধ ঘন্টা কেটে গেল এ ভাবেই।
” বিলের মাঝে যাবেন নাকি? “
বিতান পেছন ফিরে দেখলো মাঝ বয়সী একটি গ্রাম্য
লোক তাকেই প্রশ্ন করছে।
” নৌকো আছে আপনার কাছে? তা কত দিতে হবে? ঘন্টা খানেক ঘুরবো”।
” এক ঘন্টার জন্যি শ দুয়েক টাকা দিয়ে দিবেন। আমি নৌকা নিয়ে আসতেছি”।

রাকাকে আনন্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ বিতান হাতছাড়া করতে চায় না। পাখিদের কাছাকাছি গিয়ে যদি ছবি তুলতে পারে রাকা….. ওর ঐ আনন্দজ্জ্বল মুখটা কল্পনা করেই লেপের তলায় শীত ঘুম না হওয়ার দুঃখ টা হুশ্ করে উধাও হয়ে গেল।

‘”আ চল কে তুঝে, ম্যায় লেকে চলু, এক এ্যায়সি গগন কে তলে, যাহা গম ভি না হো, আঁসু ভি না হো, বস পেয়ার হি পেয়ার পলে'”… …

কানের কাছে বিতানের গুনগুনানি শুনে রাকা বেশ বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকালো।

” এমন সুন্দর পরিবেশেও তোর ফাজলামি আসে?
কী যে তোর ভালো লাগে কে জানে? “

” তোর ভালো লাগাতেই আমার ভালো লাগা। তোকে ও নিয়ে যাব এমন এক আকাশ তলে, যেখানে তুই আরও নিবীড় ভাবে নিজের ভালোলাগার সাথে একাত্ম হতে পারবি। নৌকো ভ্রমণ করবো বিলের জলে, যাতে তুই আরও কাছ থেকে পাখি দের ছবি তুলতে পারিস। “

রাকা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো নিজের ভালোবাসার মানুষ টার দিকে। ওর এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতির জন্য রাকা ওকে এত ভালোবাসে। ছুটির দিনে এ খানে, ও খানে ঘোরাঘুরি করে ছবি তোলা তে মা বাবা, এমনকি বিতানের মা বাবার ও আপত্তি। কিন্তু বিতান ,রাকার সাপোর্ট সিস্টেম হয়ে ওকে সব সময় সঙ্গ দেয়। ইঁদুর দৌড়ের জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা রাকার শখের ফোটোগ্রাফি হল তার মুক্তাঙ্গন, তার খোলা আকাশ।মাঝে মাঝে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে রাকার তোলা ছবি ছাপাও হয়। খালি চোখে যে সব জিনিস দেখা যায়না… রাকা যেই ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখে… অমনি তার চোখের সামনে এক অন্য জগতের দ্বারোদ্ঘাটন হয়।

” আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা
আমি যে পথ চিনিনা”…

রাকা বিতানের হাত ধরে গেয়ে উঠলো। দুজনেই হেসে ফেলল গান থামলে। গভীর দৃষ্টি তে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখে চোখে কথা হল দুজনার, ভালোবাসার কথা, নির্ভরতার কথা।

নৌকো জল কেটে ধীরে ধীরে বিলের মাঝ খানে চলে এল। কিছুদূরে জলের মাঝে জেগে ওঠা চরে পরিযায়ী পাখির মেলা।
“আরে… দূর থেকে আমি এ গুলো কে বক জাতীয় পাখি ভাবছিলাম, পুরো সাদা রঙের। এ যে দেখি মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো রঙের ঘোমটা দেওয়া। দারুন দেখতে তো”।
” আস্তে কথা বল”…. রাকা ধমকে উঠলো। ফিসফিসিয়ে বলল… ” এগুলো হল ব্ল্যাক হেডেড আইবিস…. “।
রাকা ক্যামেরায় চোখ রেখে একের পর এক ছবি তুলছে। ” একটা সুখী পরিবার, মা বাবা আর বাচ্চা। মা টা কী পরম মমতায় ছানার মাথায় ঠোঁট দিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছে। বাবা টা উড়ে গেল, হঠাৎ কোনো দরকারী কাজ মনে পড়েছে হয়তো। ঐ… ঐ.. ঐযে আবার এসে বসল, খাওয়ার যোগাড় করে আনল সন্তানের জন্য, গুঁজে দিল তার ঠোঁটে। ছানা এখন মা বাবার ডানার মাঝে নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে বসে মা বাপের সোহাগ কাড়ছে।মা বাবা দু দিক থেকে আগলে রেখেছে সন্তান কে। “

রাকা ছবি তোলার সাথে সাথে তার দেখা গল্প টা বিতান কে শুনিয়ে চলেছে, বিতান ও শুনছে মনোযোগ সহকারে।

” সব মা বাপই চায় সন্তান রে আগলি রাখতি…. পারে আর কই? “

রাকা আর বিতান জিজ্ঞাসু চোখে মাঝির দিকে তাকালো।
মাঝি আপন মনে বলে চলল… ” নিজের সন্তানরেও তো আগলাতি পারলেম না…. চেষ্টা তো করেছিলেম। আপনেদের মতো কত লোক আসে, পরিযায়ী পাখি দেখতি।কিন্তু পরিযায়ী মানুষের বেলা…… “

” বিনুউউউউউ… অঅঅ বিনুউউউউউ… কোথায় গেলি মাআআআ…. বিনুউউউউউ.. “

মহিলা কন্ঠের করুন এই ডাক শীতের সকালের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিল। চমকে উঠল রাকাদের নৌকোর মাঝি।

” দিদি! আমারে এক্ষুনি পাড়ে ফিরতি হবে। আমার বউ
সুখী… মাঝে মাঝে মাথার ব্যামো খান ওর চাগাড় দেয়। আমি ছাড়া কেউ নাই ওরে সামলানোর। আপনেরা না হয় টাকা কম দিবেন। আমায় মাফ করেন, কথা দি কথা রাখতি পারলেম না”।

মাঝির এ হেন কাতর অনুনয় রাকা বা বিতান কেউই উপেক্ষা করতে পারলো না। নৌকো ফিরে চলল পাড়ের দিকে।

” কী হল রে সুখী… অমন পারা ডাকিস কেনে বিনু রে?
“আমার বিনু তো পাখি হবে, কয়েছিল…. মনে আছে? এত্ত পাখির ভীড়ে বিনু রে খুঁজে পাইনা যে… তাই তো ডাকি… ও ঠিক সাড়া দি বলি উঠবে… এই তো আমি এখানে… ওওও মাআআআ… ভাত দেবে নি? “
মাঝি সযত্নে জড়িয়ে ধরে বউ কে ” বিনু রে ঘুমাতি দে সুখী, ঘুম থেকি উঠলি পরে ওরে ভাত দিস। এখন ঘরে চল, ভাত রান্না করতি হবে তো”।

মাঝি আর তার বউ এর গমন পথের দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল রাকা আর বিতান। বিলের ধারে ধীরে ধীরে
লোকসমাগম ঘটছিল। রাকা দের ও ভাবে মাঝি আর তার বউ এর চলে যাওয়ার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে স্থানীয় একজন যেচে আলাপ জমাতে এল।

” নমস্কার… আমার নাম রতন বিশ্বাস। পাশের গ্রাম মহুলবনি তে থাকি। যাদের চলে যাওয়া দেখছেন অবাক পারা হয়ে, ওই সনাতন দা আর সুখী বৌদি আমার গ্রামের লোক। মাঝে মাঝে বৌদির মাথা টা বিগড়ে যায়, তখনই মেয়ের নাম ধরে এ ভাবে ডেকে ওঠে, মেয়ে রে খুঁজে ফেরে”।

বিতান বেশ বিরক্ত হচ্ছিল লোকটির এ ভাবে গায়ে পড়ে গল্প শোনানো তে।

” সুখী বৌদির মেয়ের কী হয়েছিল? “

রাকার প্রশ্নে রতন ওদের পাশে বেশ গুছিয়ে বসে সনাতন আর সুখীর অতীত কথা বলতে শুরু করল।

“মহুলবনি থেকে কিছু দূরের এক কারখানায় কাজ করত সনাতন মন্ডল। বউ সুখী আর পাঁচ বছরের মেয়ে বিনু কে নিয়ে তার সুখের সংসার। সময়ের চাকা গড়াচ্ছিল মসৃণ পথে, কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম গল্প লেখার। বেশ কিছু দিন ধরেই সনাতন দার কারখানায় চলছিল শ্রমিক অসন্তোষ। মাইনে বাড়ানোর দাবি, শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে ইউনিয়ন আর মালিক পক্ষের বিবাদ একদিন চূড়ান্ত আকার ধারণ করল। কারখানায় লক আউট ঘোষিত হল। সনাতন দা ও কর্মহীন হল অনেকের সাথে। সুখের সংসারে এ যেন হঠাৎ অশনি পাত।

বেকারত্বের জ্বালা নিয়ে সনাতন দা এ দিক, ও দিক ঘুরে বেড়াতো কর্মসংস্থানের আশায়। কিন্তু চারিদিকে শুধু নাই, নাই আর নাই। একদিন, সে কোথা থেকে ভিন্ন রাজ্যে একটা কাজের সন্ধান যোগাড় করল। গ্রামের লোক, আত্মীয়স্বজন সবার কথা উপেক্ষা করে দু মুঠো ভাতের আশায়, বউ মেয়ে নিয়ে পাড়ি জমালো অন্য রাজ্যে। ইচ্ছে ছিল কিছু দিন সেখানে থেকে, টাকা জমিয়ে ফিরে আসবে নিজ ভূমে।

গাঁ ছেড়ে যাওয়ার আগের দিন দেখা করতে গিয়ছিলাম ওদের বাড়ি। সুখী বৌদির মুখে দেখেছিলাম নতুন পথে , নতুন ভাবে লড়াই করার দৃঢ় প্রত্যয়। সনাতন দা আশাবাদী, আবার ফিরে আসবে আপনার জনেদের কাছে। ছোট্ট বিনু হাসতে হাসতে বলেছিল…. কাকু…. আমি ও পাখি হব। উড়ে উড়ে চলে আসব তোমাদের কাছে, ঠিক ওই ক্ষেপির চরের পাখির মত…..

দিন, সপ্তাহ, মাস বছর কাটছিল। ক্ষেপির চরেও পাখি আসে আর ফিরে যায়, কয়েক মাসের অতিথি হয়ে। বিনুর আর ফেরার সময় হয় না।

হঠাৎ একদিন আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল করাল ব্যাধির ছায়া। পৃথিবীর কঠিন রোগ, মানুষ বড় অসহায়, প্রকৃতির সামনে বিজ্ঞান ও নিরুপায়। মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার আত্মগড়িমা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। চতুর্দিকে কেবল হাহাকার, মৃত্যু মিছিল।কর্মহীন, ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ গৃহবন্দী। নিজবাসে, চার দেওয়ালের রক্ষাকবচ ই তার সম্বল। ভিন রাজ্যের কর্মহীন শ্রমিক ও ফিরতে চায় নিজ ভূমে। সনাতন দা ও সেই দলে। কিন্তু তারা যে তখন ব্রাত্য নিজ রাজ্যের কাছে, দেশের কাছে।

ঘরে ফিরতে চাওয়া আর ফিরতে না দেওয়ার মধ্যে চলতে থাকলো নিরন্তর দড়ি টানাটানি। সামান্য খেয়ে পড়ে বাঁচার জন্য যারা পর ভূমে যাত্রা করেছিল, আজ তারা সেই দোষে দোষী। সনাতন মন্ডল ও সেই দোষী দের দলেরই। তাদের একটা আলাদা গোষ্ঠী ভূক্ত করে দেওয়া হল….. পরিযায়ী শ্রমিক… সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন, অন্ন হীন, বাসস্থান হীন একদল মানুষ সমাজের সাথে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

সনাতন দা ও মেয়ে বউ কে নিয়ে নিজের রাজ্যে ফেরার জন্য পথে নেমেছিল। সম্বল নিজেদের দুটি পা। রাত কেটেছে কখনো গাছ তলায়, কখনো বা কোনো মন্দিরের চাতালে আবার কখনও বা খোলা আকাশের নীচে। ক্ষিদেতে, তেষ্টা তে , ঘরে না ফিরতে পারার হতাশায় ,মানুষ তিনটে তিলে তিলে তলিয়ে যাচ্ছিল ভাঙনের আঁধারে। পরক্ষণেই মনের জোরে এগিয়ে চলছিল সমুখ পানে। দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছিল ঘরের সাথে। জলের জন্য, ভাতের জন্য মেয়ের কাতর আর্তি র কাছে অসহায় মা বাপের দু চোখ উপচে নেমেছিল কেবল নোনা জলের ধারা।

সদ্য আলো ফোটা এক ভোরে, এই ক্ষেপির চরে, বিলের ধারে নিথর বিনু কে মাঝখানে শুইয়ে সনাতন দা আর সুখী বৌদিকে বসে থাকতে দেখেছিলাম আমরা কয়েকজন। “

রাকার হঠাৎ সেই পাখি পরিবারের কথা মনে পড়ল। মা বাবার মাঝে, নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে পক্ষী ছানার কথা মনে পড়ল। রতনের গলার স্বরে রাকা আবার গল্পের মাঝে ফিরে এলো।

“আমি কাছে গিয়ে ডাকতেই সনাতন দা বলল… “মেয়েটা কখন থেকে ভাত দাও, জল দাও বলি অস্থির করতিছিল। সামনে এত জল, তাও মেয়ে চোখ ম্যালে না..”
বিনুর বরফ শীতল দেহে হাত দিয়ে বুঝলাম… ক্ষুধা, তৃষ্ণার উর্ধ্বে উঠে বিনু মা আমাদের এই জড়াজীর্ন,রোগ গ্রস্থ সমাজ তথা দুনিয়া কে দূরে সড়িয়ে মুক্তির পথে যাত্রা করেছে।

” বিনুর বাপ… ঐ দেখো, ঐ দেখো… আমার বিনু কেমনি সাদা ডানা ঝাপটায়ে আকাশ পানে উড়ি চলিছে।অঅঅঅঅ বিনুউউউউউউ…. আয় মাআআআআ… বিনুউউউউউ”।

উন্মাদিনী,সন্তান হারা মায়ের হাহাকার আজও ক্ষেপির চরের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। হয়তো এই সকল পরিযায়ী পাখিদের ভীড়ে মিশে আছে সুখী বৌদির বিনু। সেও যে পাখি হতে চেয়েছিল। দেশ, কালের সীমানায় যাকে বাঁধা যায় না। পরিযায়ী শ্রমিকের কন্যা হয়ে তাকে যে নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হতে হয়েছিল, পরিযায়ী পাখি হলে যুটতো সমাদর”।

বাকরুদ্ধ হয়ে রাকা আর বিতান রতন বাবুর কথা শুনছিল। বছর সাতেক আগের সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি তাদের মনেও বেশ টাটকা। মারণ ভাইরাসের ছোবলে সমস্ত বিশ্ব রোগগ্রস্ত। গৃহবন্দী দশায় কেটে ছিল কতোগুলো মাস। পরিযায়ী শ্রমিক দের করুন কাহিনী তাদের সবারই কম বেশি জানা আছে। কেবল মাত্র খবরের কাগজের পাতার খবর, নিউজ চ্যানেল এর খবর পর্যন্ত ছিল সেই জানার দৌড়। কিন্তু সে যে এত কষ্টের, এত বেদনার তা সম্পর্কে তারা অবগত ছিল না।

রাকা চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালো। পরিযায়ী পাখি দের ছবি তুলতে এসে, এক পরিযায়ী শ্রমিক, এক সন্তান হারা মায়ের হাহাকার কানে নিয়ে, তাদের ভয়াবহ জীবনের ছবি মনে এঁকে নিয়ে চলল।
বেলা পড়ে এসেছে, ঘরে ফিরতে হবে তাদের। বিতান বাইক স্টার্ট করল। রাকা বিতান কে জড়িয়ে ধরে বসল। একটু উষ্ণতার খোঁজে….. বিতান ও একটা হাত দিয়ে ওর হাত টা ধরল। সাদর আহ্বানে। ঘরে ফেরার কালে এই টুকুই তো চায় মানুষ… এক মুঠো উষ্ণ, সাদর আহ্বান। মায়ের অপেক্ষারত মুখ টা মনে পড়ল রাকার। মনে মনে বলল…. ঘরে ফিরছি মা….

বিতানদের বাইক রতন বিশ্বাস কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ওরা শুনতে পেল,উনি আপন মনে কয়েকটি লাইন আওড়াতে আওড়াতে পথ চলছেন…

” পাখি যখন পরিযায়ী দেখতে লাগে বেশ
শ্রমিক ঘরে ফিরতে চাইলে সঙ্গ দেয় না দেশ”……

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: