চিঠি/ সত্যেন্দ্রনাথ পাইন।

চিঠি/ সত্যেন্দ্রনাথ পাইন।

পরম শ্রদ্ধাবতী চির নমস্যা 
      
মা, এখানে রাতের আকাশ আর দিনের আকাশ যেন সমানতালে ঘণঘোর মেঘাচ্ছন্ন। তারাহীন নিঃসীম ঘণ দুপুরে কিং বা বিভিন্ন মাপের অমাবস্যায় রাতের তারারা ও কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কে বা কারা যেন ছায়াহীন অনন্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কেন ? নিবৃত্তি নেই! অসংখ্য বাঁশ ঝাড়ের প্রাবল্য সত্ত্বেও বিরাট বিস্তীর্ণ নিস্তব্ধতা। কোনো ব্যস্ততা নেই; নৈঃশব্দের শূন্যতায় মানুষের দিবাস্বপ্ন সহজ ছন্দকে, স্বাভাবিকতাকে হার মানিয়ে হতাশার প্রহর গুনছে। কেন- কেন-;কেন মা!!?
 
 
    তাই, কিছু নিরীহ সময়ের মাঝে আমি তোমাকে স্মরণ করছি । জন্মজন্মের তুমি যে আমার মা– গর্ভধারিনী না হয়েও মা ধরিত্রী- বসুন্ধরা- আমার জন্মভূমি- আমার পিতৃভূমি -আমার মাতৃভূমি! আমার ইহকাল আমার পরকাল। ” সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/ সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালবেসে”। তবু তুমি আজ আমার দৃষ্টি গোচরে নেই। তোমার স্নেহ, পেলবতা, মধুর হাসি, বৃষ্টির ছাঁট, গ্রীষ্মের দহন, শারদীয়ার উৎফুল্লতা, শীতের রুক্ষতা আর বসন্তের নব কিশলয় যেন লালচে হয়ে গেছে। প্রান্তর ঘিরে শুধু অশান্তির নির্ভেজাল কোলাহল।
 
 
      গ্রাম থেকে শহর হচ্ছে। গাছে গাছে ঝুলছে নানান দৈর্ঘ্যের রঙিন বাল্ব, কোথাও বা নিয়ন, আবার ময়দান হয়েছে শিশু উদ্যান নয়তো নারী পুরুষের জমজমাট প্রেমালাপের তীর্থ ক্ষেত্র। জোনাকিরা উধাও। ভূত পেত্নি শাকচুন্নী রা আর ভয় দেখাতে পারে না। ভয় পাই বোমা পিস্তল আর দাদাগিরিতে। শান্তি এখনো বারান্দায় রোদ্দুর দেখেও তোমার দেখা পায় না। তুমি কোথায় মা??
     আবার ধরো গো অসি/ কেটে যাক অনন্ত মসি মানিয়া সভ্যতার রং।
 
 
     তোমার যে কথামৃত শুনে আমি নিদ্রাসক্ত হতাম সেটা আবার প্রয়োগ করো। সমস্বরে যেন গাইতে পারি— বাংলা আমার মা/ আমরা তোমারই সন্তান/ হাসি কাঁদি কথা বলি/ বাংলা তেই গাই গান।
    মাগো, বৈকুণ্ঠে ও তোমার ডাক এসেছে শুনলাম। ভালো। গর্ব হচ্ছে শুনে জেনে। তোমার গায়ের রং ঈষৎ কালীবর্ণ হলেও সুনয়না, সুকেশীনী, রত্নগর্ভা তুমি। গঙ্গা তোমার জন্য বিনম্র হৃদয়ে প্রদক্ষিণ করে চলেছে অহরহ। এটা আমাদের গর্ব।
 
 
      তোমার সুশীতল স্পর্শে আমরা শিহরিত, চমকিত। এই যক্ষপুরীতেও আমরা বীরদর্পে প্রতিবাদ করতে জানি।
     মাগো ভাবনা কেন/ আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে/ তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি/ তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।
 
      শুনেছি, বিদেশি শত্রুরাও ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছে। আমরাও চুপ করে বসে নেই। তোমার কোনো ক্ষতি আমরা হতে দেব না। মেনে নেব না সামান্যতম অপমানও; আমরা এখন আর ত্রিংশতি কোটি নরনারী ন ই- এখন আমরা একশত তিরিশ কোটি। ধর্মযুদ্ধ হলে তোমার সম্মানে আবার গান্ডীব হাতে তুলে নেব। গীতাকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষ্ণকে রথের সারথি করব। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। লম্ফঝম্প করে গুম্ফ প্রদর্শন করে কেউ আর পার পাবে না আর।
 
 
   তুমি আমাদের প্রেরণা- আমাদের সাহস- আমাদের সঞ্চয়- আমাদের অমিত শক্তি। তোমাকে সাষ্টাঙ্গে হাজারো প্রণাম জানাই।
 
    তুমি আশীর্বাদ করো। যেখানেই থাক সুখে থাকো- জেনো আমরা রবীন্দ্রনাথ- নজরুল-: বিবেকানন্দদের পেয়েছি। পেয়েছি শ্রীকৃষ্ণ শ্রীচৈতন্যকেও। আবার ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই, বিদ্রোহী মাতঙ্গীনী হাজরাকে পেয়েছি। পেয়েছি অসীম সাহসী বালক ক্ষুদিরাম কে, নেতাজীকে এবং বালগঙ্গাধর তিলক ও বিনয় বাদল দীনেশ কে। পেয়েছি বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, রামপ্রসাদকে। এ সবই তো তোমারই দান মা।
   তাই প্রতিধ্বনি করতে ইচ্ছে জাগে”ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।” 
    হাজার কষ্টের মধ্যেও শান্তি পাই তোমার কথা ভেবে। তোমার মত মা যেন জন্মজন্মান্তরেও পাই। শেষ করতে ইচ্ছে করছে না– তবু ও— এবং
                                                  প্রণতঃ
                                              ইতি
                               আশীর্বাদ প্রার্থী তোমার এক
                                   হতদরিদ্র মানবসন্তান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *