ছবি : অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )

আমি বাবুল । এটা আমার ডাক নাম । বাড়িতে , পাড়ায় , স্কুলে – সবাই আমায় বাবুল বলেই ডাকে । তবে স্কুলের খাতায় আমার নাম পূর্ণেন্দু বিকাশ সিদ্ধান্ত । আশ্চর্যের বিষয় স্কুলের স্যার রাও আমাকে বাবুল নামেই ডাকে । একমাত্র যেদিন বার্ষিক পরীক্ষার ফল বের হয় সেদিন হেডস্যার প্রত্যেক ক্লাসে গিয়ে প্রথম দশ জনের নাম পড়ে শোনান । তখন বলেন পূর্ণেন্দু বিকাশ , তুমি প্রথম হয়েছ । বছরে ওই এক দিনই আমার স্কুলের নাম ধরে ডাকা হত ।


আমি যখন হাইস্কুলের প্রথম ধাপে মানে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলাম তখনি স্কুলে আসলেন দিলীপ সমাদ্দার স্যার । নতুন ড্রইং টিচার । লম্বা , স্বাস্থবান , দেখতে খুব সুন্দর । দেখে মনে হয় স্পোর্টস ম্যান । প্রতিদিন পড়ে আসতেন সাদা হাফ শার্ট আর সাদা ট্রাউসার । ক্লাসে প্রথম দিন এসে বলে দিলেন ছবি আঁকার জন্য কি কি সরঞ্জাম কিনতে হবে । কোনো অজুহাত শুনবেন না । বাড়িতে অভ্যাস করতে হবে রোজ । ড্রইং ক্লাসে প্রথমেই দেখাতে হবে বাড়িতে করা কাজ । পারিনি , হচ্ছে না , বাজে হচ্ছে – বলা যাবে না । যা হচ্ছে হোক । চেষ্টাটাই দেখাতে হবে ।


আমার ছবি আঁকার হাতে খড়ি মায়ের কাছে । মা খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে । প্রতিদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে মা বসত আমাকে নিয়ে । কিন্তু মা শুধু পেন্সিল স্কেচ করত । কখনো রঙের ব্যবহার করে নি । এখনতো স্যার বলেছে প্রথমে প্যাস্টেল কালার । তারপরে ওয়াটার কালার ব্যবহার করতে শেখাবেন । নতুন নতুন কথাগুলো মার একদম অজানা । অজানা মানে মা কখনো করে নি ।

লাইট , শেড , শ্যাডো , পার্সপেক্টিভ এরকম আরো কত কি । তাহলে উপায় ? উপায় বাতলে দিল অংকের স্যার , নীহার কাকু । বাবার বন্ধু । সপ্তাহে তিন দিন করে বাড়িতে আসত আমাকে অংক শেখাতে । কাকু বলল , তার জানাশোনা একজন আছে কিন্তু বাড়িতে এসে শেখাবে কিনা সেটা বলতে পারবে না । তবে চেষ্টা করে দেখবে । চেষ্টায় কাজ হল ।


বিভাস স্যার । আমার নতুন ড্রইং টিচার । প্রতি রবিবার সকাল দশটা থেকে সাড়ে এগারটা । বিভাস কাকুর মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে । খুব কথা বলতে পারেন । কোনো আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেন নি । ছবি আঁকতে ভালোবাসেন । নিজে নিজেই শিখেছেন । চাকরি না পেয়ে বড় রাস্তার মোড়ে ভাড়া নিয়েছেন একটা দোকান ঘর । ।

স্টেশনারি দোকান | মূলত খাতা , পেন , পেন্সিল -এইসব । নীহার স্যার বলেছিল খুব মজার মানুষ এই বিভাস । দোকানে যাই কিনতে যাবে বলবে , এই মাত্র ফুরিয়ে গেল । কালকে এস | পেয়ে যাবে । কিন্তু ওই কালটা আর আসত না । প্রতিদিনই এক কথা ।

ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো কেটে কেটে পোস্টকার্ডের সাইজে করে রাখে । পাতাগুলোর পেছন দিকটা সাদা । দোকানে স্কুলের ছাত্র ছাত্রী এলেই তাকে দাঁড় করিয়ে রাখবে । বলবে , দিচ্ছি । তারপর এক টুকরো পোস্টকার্ডের মত রাখা কাগজ কাউন্টারের ওপর রেখে বলবে , দেখ একটা ম্যাজিক দেখাচ্ছি । একটা ফাউন্টেন পেনের ক্যাপটা খুলে এক ড্রপ কালি ঝাঁকিয়ে ফেলবে কাগজের ওপর । আঙ্গুল দিয়ে কালিটা কাগজের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বলবে , বল তো কী এঁকেছি ?

স্বাভাবিক কারণেই সে বলবে , বুঝতে পারছি না । তখন বিভাস ব্যাখ্যা করবে ছবিটার বিষয় বস্তু যার বিন্দু বিসর্গ উপস্থিত শ্রোতার বোঝার উপায় নেই । একদম পাগল । কিন্তু বিভাস স্যার যে পাগল নয় সেটা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগে নি । শেখাটা যে একটা আনন্দের বিষয় সেটাই প্রথম শিখলাম বিভাস কাকুর কাছে । আস্তে আস্তে বিভাস কাকুই হয়ে উঠলো আমার ছবি শিক্ষার গুরু । সে কথা পরে ।


পরের রবিবার বিভাস কাকু এলেন ড্রইং শেখাতে । সাদামাটা চেহারা । বয়স বেশি না কিন্তু দেখতে একটু বুড়োটে মত । মাথার প্রায় সব চুলই পাকা । এক মুখ সাদা কালো দাড়ি । একদম অবিন্যস্ত । এক কথায় অযত্নে বর্ধিত দাড়ি । তবে খুব মজার মজার কথা বলে । ছবি আঁকার ধরনটাই আলাদা ।

প্রথমেই বললেন , আমি তোমাকে একটা নতুন ধরনের ছবি আঁকা শেখাবো । স্কুলে অবশ্য শেখাবে রঙ তুলির ব্যবহার । স্কুলের আঁকায় অনেক নিয়ম আছে । আর যত কষ্ট ওই নিয়ম মানায় । ঠিক আছে এক কাজ কর , আমি আসার পনের মিনিট আগে আকঁতে বসে যাও । তোমার সামনে থাকবে একটা টেবিল ঘড়ি । প্রথম পাঁচ মিনিট সোজা দাগ টানা শিখবে । পরের পাঁচ মিনিট গোল্লা পাকানো আর শেষ পাঁচ মিনিট আঁকাবাঁকা ।


এরপর ডবল লাইন করবে । মাঝে হাফ ইঞ্চি গ্যাপ । গ্যাপের ভেতর ঘষে ঘষে রঙ করবে । খেয়াল রাখবে যাতে রঙ দাগের বাইরে না যায় । এগুলো শিখবে স্কুলের জন্য । আমি শিখাবো অন্য জিনিস । তার নাম ফিঙ্গার পেইন্টিং । আঙুলের সাহায্যে রঙ দিয়ে ছবি আঁকা ।
আমি তো অবাক কাকু বলে কী । আঙ্গুল দিয়ে আবার রঙ করা যায় নাকি ?


কাকু বলল , ফিঙ্গার পেইন্টিং শিখতে আমাদের কতকগুলো জিনিস লাগবে । এক , একটা খবরের কাগজ । দুই , সেলোটেপ । তিন , স্ক্র্যাপ বুক । চার , পেন্সিল ,ইরেজার , ওয়াটার কালার আর একটা প্লাস্টিকের বাটিতে কিছুটা জল । ও হ্যা , একটা ন্যাকড়া বা ছোট ছেঁড়া তোয়ালে ।
বললাম কাকু , সবগুলোই আছে শুধু স্ক্র্যাপ বুকটা নেই ।
ঠিক আছে । সামনের সপ্তাহের মধ্যে ওটা কিনে ফেলবে । আজকে আমরা ড্রইং খাতার পাতায় করি ।
সমস্ত জিনিসগুলো আনা হয়ে যাওয়ার পর কাকু খবরের কাগজটা টেবিলের ওপরে পাতলো । বলল , টেবিলটা যাতে নোংরা না হয়ে যায় সেজন্য কাগজটা বিছালাম । ড্রইং খাতা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে রাখলো বিছানো কাগজটার ওপর । কাকুর হাত এবং মুখ এক সাথেই চলছে ।
বলল , এই ড্রইং শিট টার ওপর ফিঙ্গার পেইন্টিং হবে । কিন্তু ফ্যানের হাওয়ায় কাগজটা উড়ে যেতে পারে । কিংবা মনে কর আমরা বেড়াতে গেছি । একটা দারুন কিছু দেখে তোমার আঁকতে ইচ্ছে করল । সমস্যা হাওয়া । সেই জন্য সেলোটেপ দিয়ে চার কোনা আটকে দিতে হবে । ঠিক এই ভাবে । এবার রঙের শিশির মুখগুলো খুলে ফেলি । আমরা রেডি ? না , রেডি না । প্রশ্ন হোল কী আঁকবো ? উত্তর হবে যা খুশি । যা ভালো লাগবে তাই । তবে শুরুতেই সহজ কিছু একটা দিয়ে অভ্যাস করাই ভালো ।


বলো , কী আঁকবে ?
বললাম , ফুল কিংবা সূর্য ।


ভেরি গুড । একটা ফুল দিয়েই শুরু করা যাক । প্রথমে পেন্সিল দিয়ে খুব হালকা করে একটা ফুল আঁকি । এবার ফুলটাকে রঙ করতে হবে ।একটা জিনিস মনে রাখবে আঙুলে রঙ লাগাবার আগে আঙ্গুলটাকে ভালো করে মুছে নিতে হবে । এবারে দেখ , কিভাবে আমি আঙুলে একটু একটু রঙ নিয়ে ফুলটাকে রঙিন করে দিই । রঙ করা হয়ে গেলে ছেঁড়া ন্যাকড়া দিয়ে আঙ্গুলটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিলেই হবে ।


দেখতে দেখতে ফুলটা রঙ করা হয়ে গেল । খুব সুন্দর লাগছে । এবার আমার পালা । করলাম । কিন্তু বিচ্ছিরি হলো । কাকু কিন্তু আমাকে খুব উৎসাহ দিল ।
বলল , ভালোই হয়েছে । সবচেয়ে আসল কথা তুমি আনন্দ পেয়েছ কি না ?
বললাম , খু উ ব ।
কাকু বলল , আজ এইটুকু থাক । আবার সামনের রোববার ।
পড়াশুনোয় আমি বরাবরই ভালো । মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করে জয়েন্টে বসলাম । সেখানে দারুন রাঙ্ক । ভর্তি হলাম কলকাতা মেডিকেল কলেজে । সেখান থেকে এম বি বি এস করে এম ডি করতে চলে গেলাম চন্ডিগড়ে ।

পড়া শেষ করে কলকাতায় ফিরে এসে বসলাম চাকরির পরীক্ষায় । যোগ্যতা প্রমান করে পেয়ে গেলাম চাকরি । প্রথম পোস্টিং মালদার জেলা হাসপাতালে । বছর তিনেক সেখানে ছিলাম । সেখান থেকে পাঠালো পুরুলিয়ায় । বাড়ি থেকে চাপ দিল বিয়ে করার জন্য ।
মা জিজ্ঞেস করল , মেয়ে দেখবো না তোর দেখা আছে ।
বললাম , দেখা নেই ।
মা বলল, ঠিক আছে । সব ঠিক করে তোকে জানাবো ।


সারা দিনের ব্যস্ততা । রুগীর ভিড় সামলাতে সামলাতেই বেলা যায় গড়িয়ে । তারই মাঝে সময় করে দু মুঠো যা হোক কিছু খেয়ে নেওয়া । গ্রামের সমস্ত মানুষেরই অত্যন্ত আস্থাভাজন । না , আমার এতটুকু বিরক্তি নেই । হাসি মুখে দেখে যাই একের পর এক রুগী । শুধু কি তাই রাত বিরেতে যখনই ডাক পড়ে , ছুটে যেতে হয় ব্যাগ হাতে । ভিসিট নেওয়ার তো প্রশ্নই নেই । এই গরিব মানুষগুলো কোথা থেকে দেবে ভিসিট ? ওষুধ কিনতেই পারে না ।

কিন্তু তা বললে তো আর হবে না । ওষুধ না খেলে সারবে কি ভাবে ? অগত্যা , নিজের পকেট থেকে টাকা দিই ওষুধ আর পথ্য কেনার । এত কিছুর মাঝেও একটা কিন্তু আছে । কিন্তুটা হল রবিবার দিন ডাকা চলবে না । সপ্তাহে ওই একটা দিনই থাকে নিজের জন্য । ছুটি কাটাতে নয় । ছবি আঁকতে । প্রতি রবিবার নিয়ম করে বসি ফিঙ্গার পেইন্টিং করতে ।

সকাল দশটা থেকে সাড়ে এগারটা । যেমন করতাম বিভাস স্যারের কাছে । অভ্যাসটা রয়ে গেছে । জানি না স্যার কোথায় আছেন ? কেমন আছেন ? এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই । কিন্তু অভ্যাসের যে বীজ আমার মধ্যে পুঁতে দিয়ে গেছেন , সেই অভ্যাস এখন সুবিশাল মহীরুহ । এক দিনের জন্যেও বন্ধ করি নি ছোট বেলার সেই অভ্যেস ।

প্রতি রবিবার মুখোমুখি শুধু আমি আর আমার ক্যানভাস । প্রকৃতির রঙের সাথে নিজের মনের রং মেলানয় যে এত আনন্দ বিভাস কাকু না থাকলে জীবনে তা মনে হয় উপলব্ধি করতে পারতাম না । জীবনের সব সুখ খুঁজে পেয়েছি এই একটা জিনিসেই । রবিবার সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরা । আঁকার সরঞ্জাম , লাঞ্চ বক্স ,কফির ফ্লাস্ক তুলে নিই ডিকিতে ।

চলে যাই কোনো নির্জন পাহাড়ে , ঝর্ণার ধারে কিংবা সবুজে মোড়া জঙ্গলে । প্রকৃতির কোলে আমি আর আমার ফিঙ্গার পেইন্টিং । স্কুলে দিলীপ স্যার শিখিয়ে ছিলেন তুলির ব্যবহার । সেটা আমার পরে কাজে লেগেছিল । ফিঙ্গার পেইন্টিংয়ের সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রাশ ইউস করতাম । এর সাথে ছিল এক্রিলিকসের প্রয়োগ । কখনো কখনো এফেক্ট আনার জন্য ছড়িয়ে দিতাম বালি , চিনি , কাঠের গুঁড়ো কিংবা মশলা পাতি । সত্যি কথা বলতে পরবর্তী কালে দিলীপ স্যার আর বিভাস কাকুর দুটো আলাদা ফিল্ড কে একত্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করে ছিলাম ।

একটা নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা । তবে আমি বরাবরই প্রচার বিমুখ । খুব কাছের দু-চার জন বন্ধু জানে যে ছবি আঁকা আমার প্যাশন । ছবির মধ্যে আমি খুঁজে পাই আমাকে । কোনোদিন ভাবিনি ছবি বিক্রি করবো | ওরা চায় আমি একটা আর্ট একজিবিশন করি । বিক্রির ও সুযোগ থাকবে । এখন হচ্ছে প্রচারের যুগ । নিজেকে বিক্রি করা শিখতে হয় । আর এ তো ছবি বিক্রি । কেন জানি না তাও আমি উৎসাহ বোধ করিনি । ছবি আঁকাতেই আমার উৎসাহ বেশি ।


একদিন ডাক পড়লো এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে । কৃষকের স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ । এই যায় সেই যায় অবস্থা । হাসপাতালে যাওয়ার পথে দেখতে গেলাম । আগে হলে কষ্ট পেতাম । এখন গা সওয়া হয়ে গেছে । ভেতরে ভেতরে ছটপট করি এদের জন্য কিছু একটা করতে । এই হত দরিদ্র মানুষগুলোর পাশে থাকতে হবে । কিন্তু কী ভাবে ?

আমার তো বদলির চাকরি । তিন চার বছর পরে আবার কোথায় পাঠিয়ে দেবে । পালাতে হবে এদের মাঝ পথে ফেলে । ভাবনা টা রয়েই গেল । পেশেন্টকে দেখলাম । কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ আমার ব্যাগে সব সময় থাকে । সেখান থেকেই দিলাম । শুধু ওষুধে কাজ হবে না । অপুষ্টিতে ভরা শরীর । দুদিন ধরে কচু সেদ্ধ খেয়ে আছে । বিছানা থেকে উঠবার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নেই ।

উনার স্বামীর হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট ধরিয়ে বললাম , কিছু ফল আর ডিম কিনে আনতে । কেঁদে ফেলল লোকটা ।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমার পা জড়িয়ে ধরে বলল , ডাগদার বাবু , তুই আমাদের দেউতা আছিস ।
দু হাত দিয়ে ওকে টেনে তুলে বললাম , নারে রে বাবা , আমি দেউতা টেউতা কিছু নই । কান্না থামিয়ে যাও যা বললাম সেগুলো কিনে আনো |


হাসপাতালে যাব । তাড়া আছে । দরজার বাইরে পা রেখেছি | দেখি উঠানের এক কোনে একটি মেয়ে । কাঠ জ্বালিয়ে মাটির হাঁড়িতে কিছু একটা সেদ্ধ করছে । আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো ।
এ কে ? এ তো শিল্পীর হাতে গড়া সৃষ্টি । এত নিখুঁত , এত সুন্দর ।
মনে পরে গেল একটা ঘটনা ।
আমি তখন ছোট । ক্লাস সেভেনে পড়ি ।


বিভাস কাকু বাবাকে বললেন , বাবুলের ছবি আঁকার যখন এত শখ চলুন না একবার শান্তিনিকেতন থেকে ঘুরে আসি । সময় পেলেই আমি যাই । মনে হয় ভিন্ন একটা জগতে এসে পড়েছি । খুব কাছ থেকে প্রকৃতিকে দেখা যায় , ছোঁয়া যায় , অনুভব করা যায় । ভারতবর্ষে শিক্ষা ও শিল্পের এত উৎকর্ষ স্থান আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই ।


মা ও রাজি । দু দিনের একটা প্রোগ্রাম করা হল । প্রথমে ঠিক হয়ে ছিল ট্রেনে যাওয়া হবে । পরে জানি না কী কারনে গাড়িতেই যাওয়া হল । স্টিয়ারিংয়ে বাবা , পাশে বিভাস কাকু , পেছনের সিটে আমি আর মা । বিভাস কাকুর এক আত্মীয়ের বাড়ি ওখানে । বেশ বড় দোতালা বাড়ি । অবস্থাপন্ন আত্মীয় । খুব আদর যত্নেই রেখে ছিলেন আমাদের ।

শান্তিনিকেতনে আশ্রম পরিদর্শন করে গেলাম কলা ভবনে । বিভাস কাকু বলে যেতে লাগলো , আমরা এখানে যে সমস্ত শিল্প কলা দেখবো তাদের স্রষ্টা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিল্পী । তবে গোড়া পত্তনে যে চারজন ছিলেন তারা হলেন সর্ব কালের সেরা । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । রামকিঙ্কর বেজ , বিনোদ বিহারি মুখোপাধ্যায় আর নন্দলাল বসু । একটা কুচকুচে কালো কষ্টি পাথরে নির্মিত আদিবাসী মহিলাকে দেখে আমি বলেছিলাম , মা , দেখ কী সুন্দর !


বিভাস কাকু বলল , এটা সাঁওতালি মেয়ে । সৃষ্টি কর্তা রামকিঙ্কর বেজ । বিকাশ কাকু আরও অনেক কিছু বলেছিল কিন্তু আমি শুনছিলাম না । অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম এক নিখুঁত ,নিটোল নারী মূর্তি ।
এত জীবন্ত মূর্তি যে তৈরী করা যায় তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন ।


দীর্ঘ বছর বাদে ঠিক সে রকমই এক নারী মূর্তি দেখলাম । না , রামকিঙ্কর বেজের সৃষ্টি নয় । বাস্তব এবং জীবন্ত । মনে হচ্ছে কলা ভবন থেকে তুলে এনে কেউ এখানে স্থাপন করেছে । হুবহু এক । আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না । বেশ কিছুক্ষন বাদে হুঁশ এল । লজ্বা পেয়ে গেলাম । ছিঃ ছিঃ , কী ভাবলো মেয়েটি । এভাবে ওকে দেখাটা আমার ঠিক হয় নি । তাড়াতাড়ি করে সাইকেলে উঠে পালিয়ে বাঁচি ।

বাঁচলাম বটে । কিন্তু সারাদিনে কাজে মন বসাতে পারলাম না । চোখের সামনে ভেসে উঠছে কালো কষ্টি পাথরে খোদাই করা এক নারী মূর্তি যে জীবন্ত , চলমান । রক্ত মাংসে গড়া । অনুভূতি সম্পন্ন লজ্জ্বাবতী এক নারী । বাড়ি ফিরে বসে পড়লাম ক্যানভাস নিয়ে ।

ফিঙ্গার পেইন্টিংয়ের সাথে আমার নিজস্ব ঘরানার সংমিশ্ৰণে ফুটিয়ে তুললাম আমার মানসীকে । ঠিক যেমন দেখেছি তেমন । টানা টানা চোখ ,নাক , কোমড় ছাপিয়ে পড়া ঘন কালো চুলের ঢেউ , লাল পেড়ে শাড়ি । শরীরের খাঁজ এবং ভাঁজ তাতে এতটুকু ঢাকা পড়ে নি । আমি যখন তৃপ্ত হলাম ঘড়িতে সকাল ছ ‘টা । টেবিলে ঢাকা পরে আছে রাতের খাবার ।


হাত মুখ ধুয়ে এসে এক কাপ কফি বানিয়ে বসলাম বারান্দায় । তখনি মাথায় এল একটা অসাধারন আইডিয়া । আমার স্বপ্ন সফল করার সুযোগ । গ্রামের মানুষ চায় একটা হাসপাতাল । অনেকেই আগ্রহী জমি দিতে । কাগজে কলমে সমস্ত পরিকল্পনা করা আছে । সরকারি স্তরে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলে কাজ অনেকটা এগিয়ে ছিল ।

থেমে গেল টাকার অভাবে । প্রচুর টাকার প্রয়োজন । কে দেবে অত টাকা ? এখন ঠিক করলাম ছবিগুলো বিক্রি করবো । একজিবিশন কাম সেল । বিক্রি হবে অকশনে । আমি নিশ্চিত হাসপাতাল গড়ার ক্ষেত্রে টাকাটা খুব একটা কম হবে না । কলকাতায় বন্ধু মনতোষ কে ফোন লাগলাম । সংক্ষেপে বললাম আমার ইচ্ছার কথা । লাফিয়ে উঠলো মনতোষ । সাতদিন সময় চাইল । সব ব্যবস্থা করে সে আমায় জানাবে ।


দিন আর কাটে না । ছটফট করছি । ফোন বাজলেই ছুটে যাই । একটাও মনতোষের না । বাবার ফোন এল । মেয়ে দেখা হয়ে গেছে । দিন ঠিক হয়েছে ১৭ই মাঘ । সরস্বতী পূজোর একদিন পরে । পাল্টি ঘর । একদম ঘরোয়া মেয়ে । মা এবং বাবার দু জনেরই পছন্দ । তবুও ওদের ইচ্ছা ছেলে নিজে একবার মেয়েকে দেখুক । কথা বলুক । সামনের সপ্তাহে দু দিন ছুটি নিয়ে যেতে বলল । ভালোই হেয়ছে । রথ দেখা আর কলা বেচা এক সাথে হয়ে যাবে । ছবির ব্যাপারটা বাড়িতে কিছু বলিনি ।


মেয়ে দেখে এলাম মনতোষকে নিয়ে । ঠিক ঠাক আছে । শুধু বললাম , একটা কথা বিয়ের আগেই পরিষ্কার করে নিতে চাই । পরে যেন এই বিষয় নিয়ে খিটিমিটি না লাগে । পুরুলিয়ার গ্রামে থাকা এবং হাসপাতাল গড়ার কথা বললাম । ওদের পাশে থেকে ওদের সেবা করতে চাই । মেয়ের বাবা মা একটু আপত্তি করছিলেন । মেয়ে একদম সোজা সাপ্টা । বলল , আমার কোনো আপত্তি নেই । আমাকেও আপনার সাথে কাজ করার সুযোগ দেবেন । ডাক্তারের তো একজন সেবিকার প্রয়োজন ।

আমি হব আপনার সেই সেবিকা । আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম । ওদের বাড়ির সবাই অবাক । তাড়াতাড়ি করে ওকে ছেড়ে সরে দাঁড়ালাম । বললাম , সরি । আনন্দের চোটে ভুল হয়ে গেছে । আপনি কিছু মনে করেন নি তো । মেয়েটি মুচকি হেসে বলল , না। আমি কিছু মনে করি নি । এ রকম স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছেলেই আমার পছন্দ ।


একাডেমি অব ফাইন আর্টসের গ্যালারি বুক করলাম । সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল মনতোষ । এমন কী ছবির বেস প্রাইস পর্যন্ত । যা ভেবে ছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পেলাম । প্রথম সারির শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন উপস্থিত ।

বাহবা দিলেন সবাই । শহরের উচ্চবিত্ত থেকে খ্যাতনামা ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশই অংশ নিয়ে ছিলেন অকশনে । আমার মতে সমস্ত কৃতিত্বের দাবিদার মনতোষ । এ জিনিস আমার দ্বারা সম্ভব নয় । এতজন ক্রেতাকে এক জায়গায় জড়ো করা মুখের কথা নয় । অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিচয় করিয়ে দিল আমার সাথে উপস্থিত দর্শক তথা ক্রেতাদের । কেন এই অকশন এবং শিল্পীর কী উদ্দেশ্য খুব অল্প কথায় অসাধারন ভঙ্গিতে বুঝিয়ে বলল ।


একজন দক্ষ অকসনিয়ারের ভূমিকা পালন করলো মনতোষ । প্রত্যেকটা ছবিই খুব ভালো দামে বিক্রি হলো । তবে সবার নজর কেড়েছে আমার মানসী । পুরুলিয়ার গ্রামের সেই হত দরিদ্র পরিবারের অভাগিনী । যার বরাতে জোটে শুধুই কচু সেদ্ধ । উপেক্ষার অন্ধকারে পড়ে আছে একাকি । জুটবে না তার কোনো রাজপুত্র । ঘুরবে না তার ভাগ্যের চাকা । সদয় হবে না কেউ । কিন্তু কী আশ্চর্য , সবচেয়ে দামী তার ছবি ! ক্যানভাসে আঁকা । ছবি কেবলি ছবি ।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: