ছোট্ট বাদল — ডঃ ময়ূরী মিত্র

ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র
ছবি :  ডঃ  ময়ূরী মিত্র
পরিচিতি
———-
  ডঃ ময়ূরী মিত্র | নাট্যগবেষক , প্রাবন্ধিক , অভিনেত্রী , নির্দেশক শিশুশিক্ষিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডঃ পবিত্র সরকারের তত্বাবধানে PhD. ।


ছোট্ট বাদল   --   ময়ূরী মিত্র
বড়দের তো বুঝিয়ে পারা গেল না | তাই এবার আমার শিশু বন্ধুদের জন্য কিছু টোটকা । টোটকাই বললাম | কারণ আমি চিকিৎসক কিংবা বিজ্ঞানী নই | বরং অঙ্ক বিজ্ঞানের ধারাবাহিক ফেলু ছাত্রীআমি কেবল তোমাদের মত কিছু মিঠেমিঠাই খোকাখুকুদের পড়াই মাত্র | যা বলব সবটাই আমার ক্লাস observation থেকে | তোমরা সোশ্যাল ফোরামে নেই | আশা রাখিতোমাদের বাবা মায়েরা আমার কথাগুলো তোমাদের পড়ে শোনাবেন | তোমাদের কাজ শুধু মনে রাখা মুখস্থ করা | ক্লাসে রাইমস পড় তো গড়গড়িয়ে  | এটাও পারবে
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র
সকাল , দুপুর , বিকেল কোনো সময়েই খেলার মাঠে যাবে না | বাড়ির কাছের পার্ক যেখানে রোজ স্লিপ কাটো দোলনা দোল সেখানেও না | ঢেঁকি , ঢেই কুচকুচ এবং লোহার ঘূর্ণি ঘোড়ার পিঠে চড়া একদম নয় কেমন ? ওগুলো আমরা সবাই মিলে পরে খেলবযখন এই পার্কের স্লিপগুলো থেকে দুষ্টু পোকাগুলো মরবে | উড়বে কেবল পাখি আর পাখি | কিন্তু খেলতে না পারলে তো খুব মন খারাপ হবে আমার পুতুলগুলোর | তাহলে কী করবে তোমরা সেই সময় ? — সুন্দর সুন্দর ছবিওয়ালা বই যা এতদিন বাড়িতেই পড়েছিল সেগুলো পড়বে | আর মেয়েরা সাজাবে ন্যাকড়া পুতুলের সংসার | ব্যাস | হয়ে গেল বিকেল কাটানো | হাতদুটো তারপর ভাল করে ধুয়ে নেবে | নিজে ধোবে কিন্তু | ফিসফিস করে আরেকটা কথা বলি ? হিসু হাগু করার পর নিজে নিজে পরিষ্কার করবে সবটাপরিষ্কার জল সাবান দিয়ে | তোমরা বড় হয়ে গেছ তো ! না হয়ে থাকলে এখুনি বড় হয়ে যাও | বড় না হলে সেই দুষ্ট পোকাগুলোর সাথে লড়বে কী করে ? কী করে বাঁচাবে স্লিপ ঢেঁকি আর পাখিকে ?
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র

আইসক্রিমের বদলে খাবে লেবু আর চিনির শরবত | সঙ্গে দই | মাকে বলবে –” মা এস | তুমি আর আমি দু গ্লাস খাই ” | — একটু বিটনুন আর গোলমরিচ | উফ যা লাগবে না খেতে |
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র
বন্ধুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করবে | কিন্তু বন্ধুকে বাড়িতে ডেকো না সোনারা | বন্ধুর বাড়িও যেও না | মায়ের ফোনটা পরিষ্কার গেঞ্জি কাপড়ে মুছে কথা বলবে | বাকি কাজটা করবে পাখি , গাছে দুলতে থাকা প্রশাখা | তারাই দুই বন্ধুর খবর চালাচালি করবে ক্ষণ | অত ভেব না তো বাপু
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র

ছবি আঁকবে কেবল একটি নির্দিষ্ট পেন্সিলে | মানে ওই একটা পেন্সিল দিয়েই রোজ নানা ছবি | তবে শুধু পেন্সিল স্কেচ করবে | মানে সাদা খাতায় কেবল উড পেন্সিলের ছবি | তারপর যখন বাঁদরদের তৈরি করা পোকাগুলো সব মরে যাবেমরে যাবে ফটাফট করেতখন সব বন্ধুরা এক হয়ে ওই সাদা কালো ছবিগুলোয় রঙ লাগাবে | জলরঙ , মোম রঙ , প্যাস্টাল | আরো কত কী ! সাদা পাতায় তোমাদের আঁকা কালো ফুল হয়ে যাবে লালনীলহলুদ
আর সবিজগুলো ? সব সবুজ | সবুজ আর সবুজ | মুহূর্তেই লাগবে রঙ | একটু শুধু সবুর কর বাপ
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র

রাতে মাকে জড়িয়ে না শুলে ঘুম আসে না | আরে আমি জানি তো সে ব্যাথা | তাই বলি কীএকটি হাত কেবল রাখো মায়ের গায়ে | মায়ের বুকে ডুবিও না তোমার ছোট্ট মুখ | কদিন তো মাত্তর | ঘুম না এলে চাঁদ তারারা আছে কী করতে ? নেমে এসে ঝুপ ! ঝুপ করে বসবে তোমার চোখে |
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র
যদিও স্কুল নেই | তবু বই খাতা পেন্সিল রাবার সব নিজে গোছাবে | পেনসিলগুলো বারবার কাপড়ে মুছে রাখবে | নাহলে পোকারা ঢুকবে গ্রন্থে | নষ্ট করবে বর্ণমালা |

অক্ষরগুলো বাঁচাতে হবে তো তোমাদের ! বাঁধাই হবে নতুন সব বই | কত বই আর কত খোকা
সবাই মিলে পোকাগুলোকে এমন মার লাগাবো না ! —হাসব হি হি হি হি
   

সেদিন মাতৃদিবস ছিল না | ছিল এক উথালপাথাল বাদলবেলা | বিয়ের বেশ কবছর কেটে গ্যাছে তখন আমার | জনাকীর্ণ পৃথিবীতে আমি যে বিনা সন্তানে থাকব , এই বোঝাটাও বুঝে গিয়েছি | কড়ায়গন্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার | তবে সে বোঝা কখনো ভার হয়ে চাপেনি আমাতে | থিয়েটার গবেষণায় তখন এমনই মত্ত , না পাওয়ার তাপ বয়নি শরীর মনে | তবু কেন যেন সেদিন না পাওয়ার বিষ জমে উঠছিল অনেকখানি | এক একটা দিন আসে যখন অকারণেই আবেগ ছিটকে পড়ে এদিকসেদিক | ফুটো পিচকিরির রঙ ছড়াবার মত

তো সে বাদলদুপুরে ঠাকুরদাকে জাপটে বিশাল এক কান্না কাঁদছিলাম | ধরে নিন ,
বর্ষার দিনে কাজের অভাবেই আমার এমন অকাজ | কান্নার কারণ বলিনি ঠাকুর্দাকে | জীবনে কোনো সুখ বা কোনো দুখের কারণ বলতেও হয়নি ওঁকে | ঠাকুরদা অশোকের বিশেষত্বই ছিল কারণ না খোঁজা | কারণ বোঝা | আমার সেই ব্যাকুল কান্নায় বিন্দুমাত্র বিচলন না দেখিয়ে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন জানলায় | দেখি প্রবল বৃষ্টিতে গাছ পাখি সব ঝাপসা | আর সেই ঝাপসা বৃষ্টিতে ঝাপসা সবুজ মাঠের কালচে কালচে ঘাসে লাফাচছে ল্যাংটা বাচ্চা | অবাক চোখে দেখছিলাম ঠাকুর্দাকে | দেখি তো ! একটিও সান্ত্বনা বাক্যি না বলে কী করে আজ স্নিগ্ধ করেন তাঁর মহাক্রোধী নাতনিকে |
বৃষ্টি বাড়ছে | বৃষ্টির চোটে ঝাপসা হয়ে আসছে বৃষ্টি নিজেও | ঠাকুরদার চোখ চলে যাচ্ছে কত কত দূরে ! ভাবলাম ,নখ দিয়ে গেলে দেব নাকি বৃদ্ধের বিশুষ্ক চোখ ? —-‘দুঃখ আমার অথচ দৃষ্টি তোমার চরাচরে ! আমার দিকে যে তাকাচ্ছই না বড় ! “

রাগতে রাগতে দেখলাম কখন যেন আমি বুকে বেঁধে গেছি তাঁর | বলতে লাগলেন —‘ আজ থেকে ওই ঝাপসা জিনিসগুলো তোর | ওরা তোর ছেলেপুলে | ওই ঝাপসা নিমগাছ, বর্ষায় দ্রবীভূত কাক, ওই দূরের খেলুড়ে ভিখারী সব তোর ! এমনকি না গুনতে পারা অস্পষ্ট বর্ষার দানা , সেও তোর ! ”
সেদিন যে শব্দ তিনি আমার হৃদয়ে পাঠিয়েছিলেন ,বিশ্বাস করুন,আজো হেলাফেলা করিনি | লোকে পাগল বলেছে ,নেকি ভেবেছে | নিজেও ইচ্ছে হারিয়েছি ওদেরকে আমার ভাবার | ফের ভেবেছিদাঁতে দাঁত চেপে ভেবেছিনাহ এরা আমারই | আমার ছাড়া আর কার ? জগতের যত অন্ধ কানা খোঁড়া পাপী চোর ভিখিরি ছেলে —-যত যত বাচ্চা রয়ে গিয়েছে দূরে বহুদূরে আমার অগোচরেসব কটা গুনে গুনে আমার |

তোদের জন্য কিছু করতে পারবে না রে এই অপদার্থ মা | তবু তোরা না খেতে পেলে,খাদ্যের কষ্টে চোর ডাকাত হলে বড্ড কান্না কান্না লাগবে রে তার | তাই তোরা বেচেঁ থাক ! অল্প করে বাঁচ | বিরাট হয়ে বাঁচ | রাস্তা চেন | উজ্জ্বল হোক ময়ূরার ঝাপসা বাদলকনা |
ছোট্ট বাদল   --   ডঃ  ময়ূরী মিত্র

ছোট্ট বাদল গল্পটির একটি ভিডিও রূপ – লিঙ্কটি ক্লিক করুন ।
https://youtu.be/oBvFPoe9K7g

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: