জনতা কারফিউ – সুবীর মণ্ডল

সকাল ছ’টা, ব্রেসব্রিজে রেলের একটি ব্রিজের রাতভর মেরামতির কাজ শেষে বাড়িতে ফেরার তাড়া, প্রথম জনতা কারফিউ, জীবনে প্রথম চাক্ষুষ করতে চলেছেন রেলকর্মী বিবেক বাবু, টেনশন না থাকেলও ধকল আছে নিশ্চিত জানতেন ব্রেসব্রিজ থেকে মাঝেরহাট পৌনে চার কিলোমিটার পথে। ঘোষণামত মাঝেরহাট থেকে দুটি ট্রেন সারাদিনে যাবে শিয়ালদহে একটা সকাল সাতটা ত্রিশ, পরেরটা এগারোটা ত্রিশ।

তাই যেনতেন প্রকারে সাড়ে সাতটার ভেতর মাঝেরহাট পৌঁছানো চাই। তবে শিয়ালদহ থেকে কানেক্টিং ট্রেনে নিজের বাড়ি পৌঁছাতে পারবেন। নইলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। বিবেক বাবু যতবার শিয়ালদহ বজবজ সেকশনে গিয়েছেন ততবারই ট্রেনে করে।

পাবলিক রোড ও লোকালয় সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই। যাই হোক ভাবলেন কোন সাধন না পাওয়া গেলে নিজের এগারো নাম্বার বাসের ভরসা করে দেড় ঘণ্টায় মাঝেরহাট পৌঁছে যাবেন। মনের জোর নিয়ে ষ্টেশানের বাইরে আসার পর দু’একজন প্রাতঃভ্রমণকারীকে জিজ্ঞেস করাতে উত্তর এলো


— জানেন না আজ জনতা কারফিউ? কোন গাড়ি পাওয়ার চান্স নেই। তবুও দেখুন সামনে দু’পা হেঁটে অটোস্ট্যাণ্ডে যদি অটো পান?

বিবেক বাবু তাই করলেন দু’তিন মিনিট পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলেন অটোস্ট্যাণ্ডে পৌঁছে দেখলেন কোন অটো নেই। দুটো হলুদ রঙের ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। বিবেক বাবু জেনেই জিজ্ঞেস করলেন ট্যাক্সির ড্রাইভার দের, মাঝ বয়সী এক চালক খৈনি টিপছেন, আরেক জন ট্যাক্সির বেনয়েটে ঠেস দিয়ে গল্প করছে।
— দাদা অটো স্ট্যাণ্ডটা কোন দিকে?

— দেখতে পারছেন না বোর্ড লাগানো আছে?

অটো স্ট্যাণ্ড লেখা বোর্ড দেখিয়ে বললেন বেনয়েটে ঠেস দেওয়া যুবকটি।

— না, দাদা আমি মাঝেরহাট যেতাম।

— জানেন না আজ জনতা কারফিউ, কোন অটো পাবেন না।

— আপনারা কেউ যাবেন?

— যাব তবে ভাড়া চারশো টাকা।

— কি বলছেন? এখান থেকে তো মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা। এতো টাকা চাইছেন?

— জনতা কারফিউ ব্যাপারটা বোঝেন না? আমরা কি এমনি এসেছি?

— তাই বলে চারশো টাকা? একটা বিচার আছে তো?
দু’শো টাকা দেব যাবেন?

— হেঁটে চলে যান, কোন টাকা লাগবে না।

— সে তো আমিও জানি। কিন্তু সাড়ে ছটা বেজে গেল, সাড়ে সাতটায় ট্রেন, তার উপর সারা রাত জেগে, পা চলছে না। দয়া করে একটু পৌঁছে দিন না ভাই?

— চারশো টাকার নীচে যাওয়া যাবে না।

অগত্যা বিবেক বাবু হাঁটতে শুরু করলেন। অচেনা রাস্তাটা দূরত্বটা একটু বেশিই লাগছে। তবুও এক কিলোমিটারের মত পথ হাঁটার পর পরের মোড়ে দেখলেন একজন রিক্সাওয়ালা রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বিবেক বাবু বললেন
–দাদা যাবেন না-কি? একটু মাঝের হাট পৌঁছে দেবেন?

— যাব তবে দু’শো টাকা লাগবে।

— কি বলছেন আড়াই কিলোমিটার রাস্তা দুশো টাকা?

— তবে নয়তো কি? বিনা পয়সায় যাবেন?

— না, একশো টাকা দেব যাবেন?

–না,

বিবেক বাবু আর কথা বাড়ালেন না। আবার কিছু দূর হাঁটার পর পেছন থেকে একটা খালি এ্যাপক্যাব আসছে দেখে হাত দিয়ে দাঁড়ানোর ইশারা করলেন
–কোথায় যাবেন স্যার?

— এইতো সামনের রেল ষ্টেশান মাঝের হাট।

–উঠে পড়ুন।

— ভাড়া?

— আগে উঠুন না।

বিবেক বাবু ক্যাবে উঠে বসলেন।ভাবছেন জানি না আবার কোন ফেরায় পড়লাম? পকেটে কত আর হবে! ঠিক আছে যা আছে দেখা যাবে আগে গন্তব্যে পৌঁছাই তো!

পাঁচ মিনিটের ভেতর গাড়ি মাঝের হাট পৌঁছে গেল।
বিবেক বাবু ক্যাব থেকে নেমে একশোটাকার একটা নোট বের করতেই ড্রাইভার বিনয়ের সঙ্গে বললেন
— স্যার খুচরো নেই?

— কত দিতে হবে?

— দিন না,

— কত?

— কুড়িটা টাকা দিন, চা সিগারেট খাব…

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: