জরিমানা – দেবদাস কুণ্ডু

রতন বাসে উঠে বুঝতে পারলো লোকটা তাকে অনুসরন করছে। থানার সামনে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল। সে ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরছে। এখন দেখছে, লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখছে। কে লোকটা? কেন তাকে দেখছে? কি চায়? কিছুই রতন বুঝে উঠতে পারল না।  একটা ভয় তার ভিতর দেখা গেল।

          খেলার মাঠ স্টপে নামল রতন। না। এখন কেউ নেই। এই অঞ্চলটা এখনও গ্রাম্য ভাব ধরে রেখেছে। ধানখেত। পুকুর গাছ গাছালি সব আছে। মিউনিসিপালের বাল্ব টিম টিম করে জ্বলছে। অশথ গাছটার কাছে আসতে রতন চমকে উঠলো। লোকটা তার সামনে দাঁড়িয়ে। যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এলো।লোকটা তার আগে এলো কখন? তাহলে কি সে যখন চায়ের দোকানে চা খাচ্ছি, তখন লোকটা এসে এখানে অপেক্ষা করছিল? রতন ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কে আপনি?’

আমার নাম দাশু সামন্ত।

‘কি চান আপনি?

‘ টাকা।

‘কিসের টাকা?

‘ ঘুসের টাকা।

‘ঘুসের টাকা মানে?

‘ গত পরশু দিন তুমি আমার কাছ থেকে একশো টাকা নিয়েছো। ‘

‘ সে তো অনেকের কাছ থেকে নেই। অত মনে আছে নাকি?

“আমি একটা F. D সার্টিফিকেট হারিয়ে ফেলে ছিলাম। তার জন্য ডাইরি করেছি।

‘হ্যাঁ। তাতে কি হয়েছে?

‘তাতেই তো হয়েছে। FD নম্বরটা ভুল দিয়েছিলাম। 9 দিয়ে শুরু হবে। আমি দিয়েছি 6।সেটা কারেকশন করে দিয়ে তুমি আমার কাছ থেকে ঘুস নিয়েছো।

‘হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে। এ রকম তো আমরা ঘুস খাই। তা কি হয়েছে এখন?

‘ আমি আসতাম না। জানি ভিখিরি কে দিয়েছি।

‘ আমি ভিখিরি? ‘

‘ ভিখিরির চেয়ে অধম। আমার বউ এই ঘটনা শুনে  আমাকে বলেছে কাপুরুষ। আমি তা সহ্য করতে পারছি না। বউ বলেছে, তুমি খুন করেছো

তুমি ডাকাতি করেছো? তুমি চুরি করেছো? আমি বলেছি, না। তখন বউ বলল, তাহলে তুমি ঘুস দিলে কেন? আমি বলেছি, চাইলো যে। বউ বলেছে, ওরা তো চাইবে। তুমি মুখের ওপর বলতে পারলে না, আমি ঘুস দেবো না। সৎ সাহস নেই? কাপুরুষ। একথা শোনার পর থেকে দুদিন আমি ঘুমাতে পারিনি। আমি কাপুরুষ? দুদিন থানায় এসেছি। তুমি আসো নি। আজ ধরেছি।

‘তা আপনি কি এখন একশো টাকা চাইছেন?

‘ আলবাৎ।সেই টাকা আমি বউয়ের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে দেখিয়ে দেবো, আমি কাপুরুষ নই। 

‘ঠিক আছে।’ পার্স থেকে একশো টাকা দিল রতন। ভাবলো এই রকম ঘটনা তার জীবনে প্রথম হলো। আজ দশ বছর ধরে ঘুস খাচ্ছে, কেউ কখনো ঘুসের টাকা চাইতে এতো দূর এসেছে, এ বড় আশ্চর্য ঘটনা। কাউকে বলাও যাবে না। সে দিতো না। লোকটার হাতে একটা ছুরি রয়েছে।  ওর হাত কাঁপছিলো। কিছু বলা যায় না, কখন ছুরি পেটে বা ঘাড়ে বসিয়ে দেয়। কোন বিশ্বাস নেই। লোকটা তো সুস্থ নয়। না হলে কেউ ঘুসের টাকা ফেরত চায়? তাও আবার এতো দূর এসে?

     রতন পা বাড়িয়েছে।

দাঁড়ান। লোকটা ভারী গলায় বললো। 

‘আবার কি হলো?’

‘হিসেব এখনও বাকি আছে যে।’

‘কিসের হিসেব? আপনার টাকা তো দিয়ে দিয়েছি।

‘ সব টাকা আমি পাই নি। ‘

‘ আবার কিসের টাকা? ‘

‘ আজ থেকে কুড়ি বছর আগে তুমি আমার কাছ থেকে একশো টাকা ঘুস নিয়ে ছিলে। মনে পড়ে?

‘আপনি কি পাগল? আমার বয়স 35।কুড়ি বছর আগে আমর বয়স ছিল পনেরো বছর। তখন তো আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি সবে।

‘দেখ মিথ্যে কথা একদম বলবে না। আমি তখন বাবার বাড়িতে থাকি। বাবার মিটার ব্যবহার করি। এতে ইউনিট বেশি আসে। বিল অনেক বেশি হয়। তাই আমি নতুন মিটারের এ্যপলাই করেছিলাম। ইনসপেকশনে এসে ছিলে তুমি । বাবা বলেছিল, বলে, আমি তোমাকে একশো টাকা দেই। তুমি প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘুস নিয়ছিলে। ‘আমি? আপনি ভুল করছেন?

‘ হ্যাঁ। তুমি ।তুমিই। তুমি আটশো টাকা দেবে। তখন পাঁচ বছরে ডাবল হতো?

রতন বুঝতে পারলো, সে একটা পাগলের 

পাল্লায় পড়েছে। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়া মুশকিল। হাতে যে ছুরি। অন্ধকারে চক চক করছে। মানে বেশ ধারালো। এখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলে কেউ আসবে না। নিজের পার্স খুলে দুটো পাঁচশো নোট দিল। তারপর হাঁটা দিল।

‘দাঁড়ান’

‘আবার কি হলো? 

‘ এই  নাও দুশো টাকা। 

     টাকা নিয়ে রতন হাঁটতে লাগলো। কি পাগল মানুষ রে। কে না কে ওর কাছ থেকে ঘুস খেয়েছে। তার জরিমানা আমায় দিতে হলো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top