জলতরঙ্গ – পর্ব ১১ : সুব্রত মজুমদার

পরদিন সকালেই চঞ্চল গেল চক্রবর্ত্তীর কাছে। চক্রবর্ত্তী তখন তার ভাঙ্গা বিএসএ সাইকেলখানা নিয়ে যজমান বাড়ি বেরোবার জন্য প্রস্তুত। চঞ্চল তার সঙ্গ নিল। দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে চলল। চক্রবর্ত্তী বলল, “বলো হে প্রেমিক পুরুষ সকাল সকাল আমার কাছে কি মনে করে ?”


                     চঞ্চল খুলে বলল সমস্ত কথা। সব শুনে খ্যাকখ্যাক করে হেসে চক্রবর্ত্তী বলল, “তা বাপু যাতে যার মন মজেছে। তোকে সরলার পছন্দ নেই, বিকাশকে ওর পছন্দ। এই তো ক’মাস আগেই জগুদাদার খড়ের গাদায় যা কীর্তি করলো ওরা ! হা রে এরপরও তোর ওই মেয়েটাতে রুচি হয় ?”


          চক্রবর্ত্তী এরকমই মানুষ। রেখেঢেকে কথা বলতে পারে না। যে কথাগুলো মানুষ পেটের ভেতর রেখে দেয়, লোকে কি ভাববে বলে বলে না সেই কথাগুলো অনায়াসে বলতে পারে এই চক্রবর্ত্তী। তাই মনের কথা খুলে বলা যায় তার কাছে। চঞ্চলও এসব বোঝে। আর বোঝে বলেই সোজা চক্রবর্ত্তীর কাছেই এসেছে পরামর্শ নিতে।
    চঞ্চল ব্যগ্র হয়ে বলল, “না কাকা কিছু একটা বুদ্ধি দিতেই হবে। ওই সরলাকেই আমার চাই।”


                 সামনে রাস্তার উপর একটা ছেলে টায়ার নিয়ে খেলা করছিল। ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দে বেল বাজিয়ে ছেলেটাকে সতর্ক করল চক্রবর্ত্তী। ছেলেটা পাশে সরে গেল। এবার চক্রবর্ত্তী সামনের দিকে তাকিয়েই বলল, “আগেরবার হলধর ঘোষের বড় মেয়েটার ব্যাপারে এসেছিলি, তা আমার বুদ্ধি নিয়েও তো কিছু করতে পারলি না বাবা। নিজের কাজ দ্যাখ । আমাকে ছাড়। অনেক বেলা হয়ে গেল শালগ্রামশীলা উপোষ পড়ছে।”          সাইকেলে উঠে গেল চক্রবর্ত্তী। তার সাইকেলখানা একটু এগিয়েই গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো চঞ্চল। তবে চক্রবর্ত্তীকে সে ছাড়বে না। আবার বিকেলে আসবে। বিকেলে না হলে সন্ধ্যাবেলায় দূর্গামন্দিরে গাঁজার আসরে। বিকেলেও চক্রবর্ত্তীকে পাওয়া গেল না। অগত্যা সন্ধ্যাবেলায় গাঁজার আসরে এলো চঞ্চল। তাকে দেখে অনেকেই অস্বস্তিতে পড়ল। এই অস্বস্তিতে পড়া লোকেদের মধ্যে চঞ্চলের বাপ বসন্ত একজন। সে বলল, “হতভাগাটা এখানে কি করছে ?”


                  চক্রবর্ত্তী বাঁকা হাসি হেসে বলল, “ভয় নেই দাদা ও তোমাকে ডাকতে আসেনি। ও এসেছে আমার খোঁজে।” -“তোমার খোঁজে ? তোমার খোঁজ তো ভদ্রলোকে করে না বাপু।” একটা আঁতেল হাসি হেসে চক্রবর্ত্তী বলল, “এ কি বলছো দাদা, এতটা খারাপ আমি নই। গাঁয়ের আর পাঁচটা লোকের মতো তুমিও যদি আমার সম্মন্ধে এরকম কথা বলো তবে…. “-“বলি কি আর সাধে হে তোমার কীর্তিকলাপ তো আমার না জানা নেই। নারদের যদি কোনও অবতার থেকে থাকে তো সে তুমি। ঝগড়া কি করে লাগাতে হয় তা জানো। এছাড়াও যে গুনগুলো তোমার আছে…. কি আর বলবো…। সে যাই হোক চঞ্চলের সাথে তোমার দরকার কি ?”-“সব কথা কি আর খুলে বলা যায় দাদা। ছেলে তোমার বড় হয়েছে, ওর সব কথা তোমার না জানলেও হবে।”


               বসন্ত মণ্ডলের চোখ কপালে উঠে গেল। সে চিৎকার করে বলল,”আমার ছেলের কোনও সর্বনাশ হলে তোমার ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে আসব আমি এই বলে দিলাম।”বসন্তের কথার জবাব না দিয়ে দূর্গামন্দিরের আটচালা হতে নেমে এলো চক্রবর্ত্তী। তাকে দেখে চঞ্চলের সে কি আনন্দ। চঞ্চল বলল,”বাবা কি বলছিল গো কাকা ? আমাকে নিয়ে কিছু ?”


চক্রবর্ত্তী বলল,”দুজনকে নিয়েই। তোমাকে যে পথে নিয়ে চলেছি সে পথে তোমার বাবাকে একদিন নিয়ে গিয়েছিলাম কিনা, তাই ওর ভয় হচ্ছে।” -“মানে ?” -“মানে কিছুই না। ওসব তুমি বুঝবে না বাবা।” চক্রবর্ত্তী না বললেও বসন্ত মণ্ডলের ঘটনা গ্রামের বহুলোকই জানে। চক্রবর্ত্তী বসন্ত হতে বছর পাঁচেকের ছোটো। কিন্তু বয়স একটা সংখ্যামাত্র। আর কারোর কাছে সেটার মানে থাকলেও চক্রবর্ত্তীর কাছে নেই। তাই আট থেকে আশি সবারই বন্ধু সনাতন চক্রবর্ত্তী। সবার সাথেই সমান বন্ধুত্ব তার।


আজ যেমন চঞ্চল এসেছে সনাতনের কাছে তেমনি একদিন বসন্তও এসেছিল। নমিতাকে তার চাই। বদন মণ্ডলের মেয়ে নমিতা মন কেড়েছে তার। “কিছু একটা কর ভাই। তোর এসব বিষয়ে খুব বুদ্ধি। তুইই পারবি।” পাদুটো চেপে ধরেছিল সনাতনের। সনাতন দুটো হাত ধরে পা হতে উঠিয়ে বলেছিল, “ছাড়ো দাদা ছাড়ো।”


বসন্ত ছাড়েনি। আর তার ফলও হাতেনাতে পেয়েছিল সে। সনাতন চক্রবর্ত্তীর বুদ্ধিতে নমিতাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিল সে। সে অনেকদিন আগের কথা। আজ বসন্ত আর নমিতার সুখের সংসার। তবে সেই বসন্তই বিয়ের সময় সনাতনকে নেমন্তন্ন করতে ভুলে গেল। এ নিয়ে বহুদিন বাক্যালাপ করেনি সনাতন। পরে গাঁজার আসরে নতুন করে মেলমহব্বত হয়।


         সনাতন চক্রবর্ত্তীর বুদ্ধি নিয়ে কাজে নেমে পড়ল চঞ্চল।  ‘মিশন সরলা’ সফল করতেই হবে। সে যে করেই হোক। সাম দাম দণ্ড ভেদ সবরকমের বিদ্যাতেই পারদর্শী এই চক্রবর্ত্তী। তার শিষ্য হয়ে অসফল হবার প্রশ্নই নেই। জয় চকরবতি বাবার জয়।


                                  পাঁচ

          বৈশাখ মাস শেষ হতে চলেছে। প্রচণ্ড দাবদাহে ঝলসে যাচ্ছে গাছপালা। বাতাসে  যেন আগুন ছুটছে। এই প্রখর দাবদাহের হাত হতে নিজেদের রক্ষা করতে  একটা ছায়াঘেরা সুশীতল আশ্রয়  খুঁজে বেড়াচ্ছে সবাই। আমগাছের পাতার ঝোপে কোকিল ডেকে চলেছে পঞ্চম সুরে। কোন মাপদণ্ডের মাপে সেটা পঞ্চম তা জানা নেই তবে সপ্তমের সঙ্গে কিছু ফারাক আছে বলেও মনে হয় না।


গ্রামের রাস্তাঘাট সব শুনশান। কেবল দু’একটা ছেলেমেয়ে মাথায় ভিজে কাপড় চাপিয়ে পুকুর হতে স্নান করে ফিরছে। গ্রামের শেষে সবুজ মাঠের ধারে গাছের তলায় বাঁধা একটা গরু রোদ সহ্য করতে না পেরে হাম্বা হাম্বা রবে চিৎকার জুড়েছে। গাছের ছায়া ছোটো হয়ে কাণ্ড ঘেঁষে চলে আসায় এই বিপত্তি। গরুর মালিক এক্ষুনি এলো বলে।

এরই মধ্যে সাইকেলে করে লাল রঙের টিনের বাক্স নিয়ে হাজির হয়েছে আইসক্রিমওয়ালা। তার ভেঁপুর পিঁক পিঁক আওয়াজে গোটা পাড়া মুখর করে তুলেছে। দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে কচিকাঁচার দল। পাঁচ পয়সা দশ পয়সা দিয়ে কিনছে লাল হলুদ আর সাদা আইসক্রিম।


একটা প্রায় আয়তগোলাকার স্যাকারিন দেওয়া বরফের টুকরোর পেছনে একটা ছোট্ট বাঁশের কাঠি । জল আইসক্রিম। দাম পাঁচ পয়সা। এর চেয়েও দামি আইসক্রিমের নাম মালাই। এর বরফে মেশানো থাকে বেল, চিঁড়ে, আর নারকেলের মতো উপাদান। নামগুলোও খাসা, – বেলমালাই, নারকেলমালাই…।


আইসক্রিমওয়ালার ভেঁপুর আওয়াজ পেয়েই  দিদা শশীবালার কাছে ছুটে যায় রাজীব। শশীবালা তার কাপড়ের খোঁট খুলে একটা অ্যালুমিনিয়ামের কুড়ি পয়সা বের করে রাজীবের হাতে দেন ।

(চলবে )

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: