ঝরে যাওয়া শিউলি -পরেশ নাথ কোনার

শিউলিরা দুই বোন এক ভাই।আগে অবস্থা ভালো ছিল । অভাবের তাড়নায়,কিছুটা বুদ্ধি হীনতার জন্য জমি জমা যা ছিল তা বিক্রি করতে করতে কয়েক কাঠাতে এসে ঠেকেছে।কোন রকমে দিন চলে যায়।পর পর কয়েক বছর বন্যায় মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিউলি দের অবস্থা দীন থেকে দীনতর হতে থাকে।

বাড়ির অবস্থা খারাপ থাকায় তিনজনের লেখাপড়া হয়নি। দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগানো যেখানে কষ্টকর সেখানে লেখাপড়া করা দুঃস্বপ্ন। এখনকার মতো সরকারী সুযোগ সুবিধা তখন ছিল না। মাথার উপর দু দুটো মেয়ে, আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হলো যে শিউলি র বাবা চিন্তা করতে করতে মারাত্মক অসুখে পড়লেন।বাড়ির কর্তা অসুস্থ হলেবাড়ির লোক তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না।

যে দু এক কাঠা জমি ছিল সেটুকু বিক্রি করে শিউলির বাবার চিকিৎসা করানো হলো কিন্তু চিকিৎসায় সে ভাবে সাড়া পাওয়া গেল না। শিউলির বাবা অকালেই মারা গেলেন। শিউলি রা একেবারে সর্ব শ্রান্ত হয়ে গেল। অবস্থাএতটাই খারাপ হলো যে একবেলা ভাত জোটে তো অন্য বেলায় জোটে না।

পাড়ার লোকে প্রথম প্রথম কিছু কিছু করে সাহায্য করছিল তারপর তাও বন্ধ হয়ে গেল।কথায় আছে–” নিত্য নেই তো দেয় কে ,নিত্য গাই তো শোনে কে !” দারিদ্র্য এতটাই প্রকট হলো যে পরা কাপড় কেচে সেই কাপড়কে রোদে শুকিয়ে তবেই পরতে পারতো। এভাবে তো চলতে পারে না।তখনকার দিনেগ্রামের লোকে বাড়িতে ই মুড়ি ভেজে খেতো।

শিউলির মা লোকের বাড়িতে মুড়িভাজার কাজ নিল।এভাবে তাদের দিন কোন ভাবে কাটতে লাগল। মাথার উপর দু দুটো বিবাহ যোগ্য মেয়ে থাকলে দিন যে কী ভাবে কাটে তা তারাই বোঝে যাদের তা আছে।শিউলিদের চিন্তায়শিউলির মায়ের ঘুম আসে না। 

       শিউলিদের পাড়াতে শিউলিদের জাতের এক ধনীগৃহস্থের বৃদ্ধ মা ছিলেন।ঐবৃদ্ধাঅত্যন্তদয়াবতীছিলেনসবাই তাকে “কত্তা মা”বলে ডাকতো। শিউলির মা কত্তা মা র বাড়িতে ও মুড়ি ভাজতো।লোক মুখে তিনি শুনলেন শিউলিদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শিউলির মা একদিন কত্তা মার বাড়িতে মুড়ি ভাজতে গেলে কত্তা মা বললেন,”জালপাড়ার বৌ তুই যদি কিছু মনে না করিস তাহলেএকটা কথা বলি ।

“——-  “বলুন।”——- “বলছিলাম কী, চরণের মায়ের বয়স হচ্ছে ও আর কাজ করতে পারছে না । তুই যদি তোর মেয়ে দুটোকে আমায় দিস। বাড়ির মেয়ের মতো থাকবে আর সময় সময় টুকটাক চরণের মাকে সাহায্য করতে পারবে।

“শিউলির মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।চোখের জল মুছতে মুছতে বললো — “সে তো খুব ভালো প্রস্তাব মা,নাও না আমার মেয়ে দুটোকে।”—— ” সারা দিন থাকবে খাবে,যা পাওনা তোকে তা দেবো, রাতে খেয়ে তোর বাড়ি যাবে। সোমত্তমেয়েদেররাতেথাকার ঝুঁকি নেবো না।”—— “তাই হবে কত্তা মা ।”——- “তবে কাল থেকে পাঠিয়ে দিস।” 

         এভাবেই কত্তা মার বাড়িতে দুই বোন থাকে খায় টুকটাক ফাইফরমাস খাটে। বড়লোকের বাড়ির জল পেটে পড়ায় সর্বোপরি কত্তা মার স্নেহে দুই বোনের চাপা পড়া যৌবনের দ্যুতি আবার বেরিয়ে আসে। এতদিনে হিল্লেএকটা হলো বটে তবু মেয়ের মা তো চিন্তা যায় না।পরিচিত যাকেই পায় তাকেই বলে দু বোনের জন্য পাত্র দেখতে। 

           বৈশাখমাসেপাড়ারসরকারদেরবাড়িতেমেয়েরবিয়ে,নূতন নূতন আত্মীয়দের আনাগোনা।কে আসে কে যায় কে কার খবর রাখে। সেই দিন সন্ধ্যায় দিগনগর থেকে শিউলির এক দূর সম্পর্কিত দিদির বোন যে মোগলসরাই তে থাকে তিন জন লোক নিয়ে হাজির।দুজন বয়স্ক, একজনের বয়স তিরিশ পয়ত্রিশ মতো।

এই তিরিশ বছর বয়স্ক লোকটি পাত্র।ওরা উত্তর প্রদেশের ব্রাক্ষ্মণ ।প্রথমে শিউলি তো রাজি হয় নি।ওর মা এবং ঐ দূর সম্পর্কিত মাসি অনেক করে তাকে রাজি করায়।ওরা শিউলির মাকে নগদ কয়েক হাজার টাকা দেয়।যারা এই সব ঘটকালি করে তাদের ব্রেন ওয়াশ করার অদ্ভুত ট্যাকটিক তেস থাকে।মা বোন ভাইয়ের মুখ চেয়ে শিউলি শেষ পর্যন্ত একপ্রকার বাধ্য হয়ে এ বিয়েতে রাজি হয়। 

        শোনা যায় শিউলির এই মাসির চরিত্র ভালো নয়।অসৎ লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করে।এরা গ্রাম বাংলায় একটা র্্যাকেট চালায়। অসহায় গরীব মানুষ দের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে অর্থের লোভ ধরিয়ে অপকর্ম করে। দারিদ্রতা নদী ভাঙ্গনের মতো একবার ভেঙ্গে গেলেসর্বগ্রাসী রূপলাভ করে। শিউলির মা কে অভাবের সেই করাল গ্রাসে পড়তে হয়েছিল। ওদের ভাষা অন্য ,সংস্কৃতি আলাদা ।

শিউলি বাংলা ছাড়া কিছুই জানে না ।যে গ্ৰাম ছেড়ে একটি দিনের জন্যও বাইরে কোথাও যায় নি তাকেযেতে হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য ভাষা অন্য সংস্কৃতি র অজানা এক দেশে। কতটা বিপন্ন হলে মানুষ আত্মবলি দেয় তা সহৃদয় পাঠক মাত্রেই অনুমান করতেপারছেন। 

          পরদিন সকালে পাড়ার লোকেরা জানতে পারলো গতকাল রাতে শিউলির বিয়ে হয়ে গেছে উত্তর প্রদেশ থেকে আসা লোকটার সাথে।একদিকে সরকার বাড়িতেবিয়ের আড়ম্বর পাড়ার ই অন্য ঘরে নিস্তব্ধে ঘটে গেল জন্মান্তর কেউ টেরটি পলো না।

উত্তর প্রদেশের লোকগুলো সাথে করে নিয়ে এসেছিল নূতন জামা কাপড়। সেই নূতন কাপড় পরে বউ সেজে মুখ নীচু করে শিউলি সেই যে গেল গ্ৰাম ছেড়ে (শুধু কত্তা মা কে প্রনাম করেছিল) আর একটি দিনের জন্যও গ্রামের মুখ দেখে নি।যে গ্ৰাম বিপন্ন নারীকে আশ্রয় দিতে পারে না সে গ্ৰামেফিরে হবে টা কী?

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: