ঝড় // বন্য মাধব // পর্ব – ১

ঝড় //   বন্য মাধব  //  পর্ব - ১


ক’দিন থেকে মনটা ভারী ভারী লাগছিল আর শরীরটাও, কেমন যেন দমবন্ধ দমবন্ধ ভাব। আমি কি আবার ঝড় দেখবো? ঝড়? সবকিছু আবার উলোটপালোট হয়ে যাবে? জুলাই এর শুরুতে প্রকৃতিরও কেমন একটা গুমরানো ভাব, ভ্যাবসা ভ্যাবসা সবকিছু। দরদর করে ঘামছি।

অটো চলছে। আমার মন কূ গাইছে। সেবারও ছিল এমন দিন। মেঘলা মেঘলা, চাম গুমোটে শরীর মন ওষ্ঠাগত, একটা অস্থির অস্থির ভাব। রাতেও ভাল ঘুম হল না। ভোরের দিকে চোখটা জুড়ে এল কি এলো না অমনি ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ছুটে গেল। কি হল কি হঠাৎ!

ঠাকুমা ডাকছে, ওঠ ওঠ দ্যাখ তোর মা কেমন করছে দ্যাখ দ্যাখ। আর দ্যাখ! ঘুমের মধ্যেই নাকি স্ট্রোক হয়েছে। বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। ডাক্তার দেখে জবাব দিয়েছে। দিদি মাকে কোলে নিয়ে কান্না কান্না গলায় ডাকছে। মার কোন সাড়াশব্দ নেই। দিদির হাতের ওষুধ হাতেই ধরা। মা আর চোখ মেললো না।

ঝড় কাকে বলে সেই প্রথম  চাক্ষুস করা। সবকিছুই এলোমেলো হয়ে গেল। বাবা যেন কেমন হয়ে গেল। কোনকিছুতে মন নেই। কিছুদিনের মধ্যে আমরা সামলে উঠলাম। আমরা মানে ঠাকুমা, দিদি আর আমি। বাবা আর পারলো না। ঠাকুমা কিছু বললেই বাবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো শুধু। দিদিও বোঝাতো, দিদির আর আমার স্যারও বোঝাতেন।

বাবা বেঁচে রইলো, না বেঁচে থাকার মতোই। মাঝে মাঝে শুধু আপন মনে বলে ওঠে, পাখি উড়ে গেল, হায় হায়, আমার সোনার ময়না উড়ে গেল। আমি কিচ্ছুটি জানতে পারলাম না, হায় হায়!! মাঝে মাঝে লালনের খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায় গানটি বারবার শোনে। চোখে ধারা নামে। ঠাকুমা বোঝায়, দিদিও। সব বিফলে যায়। কখনও কখনও অ্যালবাম খুলে পুরানো দিনের ছবিগুলো দ্যাখে।

মাঝেমধ্যে আপন মনে হাসে। কিন্তু নিয়মিত স্কুল করেছে। সময় মতো চান খাওয়াও, কাউকে ঠ্যালা মারতে হয়নি। তবুও এক অভেদ্য ঘেরাটোপে বাবা নিজেকে বন্দী করে রাখতো। সেখানে কারো ঢোকবার অনুমতি ছিল না। এমনকি ঠাকুমারও না।

দিদি যখন প্রথম মাসের মাইনে পেল আর বাবার ঘরে ইয়্যা বড় বড় মার বিভিন্ন সময়ের বাঁধানো ফটো টাঙিয়ে দিল, সেদিন আমরা বাবাকে হাসতে দেখেছিলাম। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ব্যস! বাবা আবার নিজের গড়া দুনিয়ায় স্বমহিমায়। দেওয়ালের ছবিগুলোর দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে। তাঁর মনোজগতের তল আমরা তো পেতামই না, মামারা মাসিরাও হার মেনে গেল। ডাক্তার দেখাবার চেষ্টাও যে হয় নি তা নয়।

এই এক মুশকিল! চটকা ভেঙে গেল। পাশের মহিলা পরের সহযাত্রীকে কটুকথা বলছে, কারণটা সহজে অনুমান করা যায়। পাশের জন নিজেকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে মহিলাটি আরও উত্তেজিত, মুখের লাগাম খুলে দিল। এই এক ক্যাচাল, যানবাহনে, রাস্তাঘাটে এই নিয়ে নিত্য অশান্তি। মধ্যস্থতা করার লোকেরও অভাব নেই।

তবে আমি দেখেছি, এসব ক্ষেত্রে জোর যার মুল্লুক তার। আর যারা ঘাগু, কথায় তাদের হারানো খুব কঠিন, আর পাবলিকের মতটা কোন দিকে ঝুঁকছে সেটাও একটা বড় ব্যাপার। দু’টো ঘটনা আজও আমি ভুলিনি। প্রথমটি ট্রেনের দ্বিতীয়টি ফুটপাতের। দু’টো ক্ষেত্রেই অসভ্যতার বিচার মিলেছিল।

সেদিন ডায়মন্ডহারবার লোকাল শিয়ালদা ছাড়তে না ছাড়তেই ভিড়ে ঠাসা। এর উপর পার্কসার্কাস, বালিগঞ্জেও ভিড় আরো বাড়ল। রীতিমতো গুঁতোগুঁতি শুরু হলো। এটা আরো বাড়ল ঢাকুরিয়ায়। ক’টি ইয়াং ছেলে গুঁতিয়ে উঠেই চ্যাঙড়ামো শুরু করল। এ্যাই মারো ঠাপ জোরসে জোর / ঠাপে ঠাপে কাঁদাবো তোর / থাকবি বেঁচে বরাতজোর…….  ইত্যাদি ইত্যাদি……

একটা ছেলে এক লাইন বলে পরেরটা আরেক লাইন। লিমিট ছাড়া। প্রথমে হাল্কা করে প্রতিবাদ উঠলো, পরে জোরালো। তবুও থামার নাম নেই। গুঁতোগুঁতির ওখানে একটি বউও ছিল। সেও প্রতিবাদ করল। তাকে লক্ষ্য করে দলের একজন চেঁচাল, কেন তোমার কি ন’মাস? পাবলিক আরো ক্ষেপে গেল।

আমার সামনে এক গুলিতোলা ইয়াং ছেলে ছিল, সে তিড়িং করে লাফিয়ে বলল, কে বললি?
বুক চিতিয়ে একজন বলল, আমিই বলেছি, কী করবি? মারবি? 
তড়িৎগতিতে গুলির মালিকের পেশিবহুল একটা হাত ছেলেটার কলারে আর অন্যহাত দিয়ে তলপেটে সজোরে দমাদম পাঞ্চ!

ভিড়টাও যেন একটু সরে গেল। এবার কাতরানি শোনা যাচ্ছে।সব্বাই বাহবা দিল। এই তো চাই!
যতক্ষণ ট্রেনে ছিলাম তার কাতরানি শুনেছি। ভেবেছি আহা, যদি আমার গায়ে এত শক্তি থাকত।
এদিকে এখন আপাত শান্তিকল্যাণ। একজন প্রাণপণ চেষ্টা করছে ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার, অপরজনের প্রতিবাদী মুখটা আরও রাগী রাগী। প্রায় প্রতিদিনই এই খেলা চলে। কেউ হারে না, কেউ জেতে না। অথবা এভাবেও ভাবা যায় কেউ কেউ জেতে। পরাজিতরা কালমেঘের বড়ি চিবিয়ে খাওয়া মুখে চুপ হয়ে যায়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গোপন কম্মটি গোপনেই থাকে, যাকে বলে সমঝোতা, আন্ডারস্ট্যাডিং!

তড়িঘড়ি ভাড়া মিটিয়ে স্টেশনে এলাম। আটটা বিয়াল্লিশের সোনারপুর লোকাল ধরবো। যা ভিড় বাব্বা! বারুইপুর লোকালও ধরার সাহস পাই না। কুত্তা ট্রেনে যেতে যেতে এখানে চোট ওখানে ব্যথা নিয়ে এখন শেষ স্বীদ্ধান্ত নিয়েছি, অফিস যাবো না সেও ভি আচ্ছা, কিন্তু কুত্তা ট্রেনে নেহি ওঠেগা। এখানে যে শান্তি মেলে তা নয়, তবে উঠে বসার জায়গা মেলে। আর জায়গা রাখা নিয়ে নিত্য অশান্তি। আর তাস পেটা নিয়েও। কিছু কিছু গ্রুপ আছে জোর গলায় যৌন ইস্যু তুলবেই আর মহা মূল্যবান টিপ্পনিসহ মন্তব্য ছুঁড়বে। ভাবখানা এই, এই কামরায় যারা উঠেছে সবাই এসব শুনে, এসব হুল্লোড়বাজিতে উদ্বাহু হয়ে সাধুবাদ জানাবে। অসহ্য লাগে বলে এইসব দলগুলো থেকে দূরে থাকি।

কত আর কম্পার্টমেন্ট পাল্টাবো! এখন আরেক সমস্যা। ক্যানিং লোকালকে সোনারপুর লোকালের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ফল হাতেনাতে, এটাও কুত্তা ট্রেন হয়ে গেল। আর সোনারপুরের সেরা সেরা বাবুবিবিরা ডাউনের লোকদের ছুতোনাতায় হ্যাটা করবেই। তাদের ধারণা নদীর ওপারের লোকেরা মনুষ্য পদবাচ্যই নয়। খাপে খাপে পড়লে হাতাহাতি অবশ্যম্ভাবী। সোনারপুর লোকালের সুখ রাক্ষসে খেল। অসুস্থ আর শিশুরা সবচেয়ে বেশি এর শিকার হচ্ছে।

অনেকদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। সবে কলেজ থেকে বেরিয়ে লোটাস মোড়ে এসেছি, দেখি কি, একটা স্লিম ফর্সা মেয়ে নিজের জুতো হাতে তুলে মাঝবয়সী একজনকে শাসাচ্ছে। এই মারে কি সেই মারে। কোণায় একটা মুচি বসতো, মেয়েটিকে নিরস্ত করার চেষ্টা করছে। কিছু কিছু লোক আছে একলা মেয়ে চলার পথে দেখলেই ইচ্ছে করে ধাক্কা মারে। এটিও সেই কাণ্ড করেছে। কিন্তু তেজি মেয়ের পাল্লায় পড়ে তখন তার খুব করুণ অবস্থা। লোকও জড় হয়েছে। সবার সামনে নতজানু হয়ে ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রা সে ছাড়া পেল।

ঘটনার মধ্যে ঢুকলেই একই ধরণের অন্য ঘটনাগুলোও বলতে থাকে, ও ভাই কথকবাবু, আমিও আছি আমার কথাটাও একটু বলো, বলবে না বুঝি! ভিড়ে ভিড়াক্কার, কাকে ছেড়ে কাকে ধরি! 
এই ধরা যাক, ফুলদির কথা। মাসখানেক হয়েছে এ অফিসে যোগ দিয়েছি। 
হঠাৎ ওয়াশ বেসিনের দিক থেকে ফুলদির চিৎকার, ছিঃ ছিঃ, আপনি এত ছোটলোক, ছিঃ ছিঃ….

হাত জোড় করে মুর্তিমান মিনমিন করে ক্ষমা চাইছে। মাঝবয়সী-রোগে ভোগা অনেককেই দেখেছি কলেজে, অফিসে এসব কাণ্ড করে, ইচ্ছে করে গায়ে গা লাগানো, যৌন আলাপ আলোচনা, বদ ঠাট্টা, একটু এটা ওটা কাজ করে দেওয়ার অছিলা ইত্যাদি ইত্যাদি। ইনি আরেক কাঠি উপরে। এক্কেবারে পিছন থেকে ফুলদিকে বিচ্ছিরিভাবে জড়িয়ে ধরেছে। সুতরাং জল অনেকদূরই গড়াল।

মান অপমানের একশেষ। এসব ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর সংখ্যাও নেহাত কম থাকে না। তাদের ‘বিবেচক’ হস্তক্ষেপে ধীরে ধীরে অনড় ফুলদি নরম হলো। অপরাধীর বউ বাচ্চার ভাবনাও তাকেই তো ভাবতেই হবে! আর অপরাধী চোপসানো চরিত্তির রিপেয়ার করার অভিনয়ে ঢুকে পড়ল। তবে সেদিন থেকে ফুলদি  অফিসে একটা বিশেষ সম্মানের জায়গায়। আজও।
এসব ঘটনার বিপরীতও আছে।

একবার কলেজ থেকে শিয়ালদায় এসে দেখি সব বন্ধ। না, কি কাণ্ড, কি কাণ্ড? ওভার হেডের তার ছিঁড়ে যাবার জন্যে আপ ও ডাউন গাড়ি চলাচল বন্ধ। কখন চলবে কেউ জানে না, বা জানলেও জানায় না। ক্রমাগত শুধু একই ঘোষণা…..। আমরা যারা নিত্যযাত্রী তারা জানি, এসব জট ছাড়তে কমসে কম দু’চার ঘন্টা। তার মধ্যে ভাঙচুর হলেও আশ্চর্য কিছু নয়।

চারদিকে লোক থিক থিক করছে। প্রতিটা প্ল্যাটফর্মে গাড়ি দাঁড়িয়ে। একটায় উঠে পড়লাম। জায়গা নেই। তবে বসে বসে বিরক্ত হয়ে এক দু’জন নেমেও যাচ্ছে। আমি বসবার ধান্দায় আছি।
একটা সুযোগ এল। বসে পড়লাম। শীতকাল ফলে একটু ঘেঁষাঘেঁষি। জানলার ধারে, আমার ঠিক পাশে বসা মহিলাটির কত কথা, ক’টা বাজে থেকে শুরু করে রেলওয়ের গুষ্টির পিণ্ডি চটকানো পর্যন্ত, বিরাম নেই। এক একজন এমন থাকে আনাড়ি ধানাড়ি বকম বকম। কিন্তু চাদরটা বারবার আমার গায়ে ফেলছে কেন? হুঁ, বোঝা যাচ্ছে, ধীরে ধীরে চাদরের মধ্যে থেকে হাতটা আসছে, এখানে ওখানে কিছু খুঁজছে, আর ঠোঁটের কোণে হাসি! ঝড় উঠছে!

ঐ তো, আমার হাত দখল, চলছে সুড়সুড়ি দেওয়া। আর আমি চলেছি সেই মা মারা যাবার বছরে। কাজ মিটে গেলে সেবার মামা সঙ্গে করে নিয়ে গেল। ঠাকুমাও মত দিল। আর দিদি তো দেবেই, স্যার আসবেন না! তখন কি ছাই অত বুঝতাম? মাঝেমাঝে শুধু রেগে যেতাম। এত কি! বাবা তো বাবাতেই নেই। সুতরাং মামার বাড়ি যেতে কোন বাধা নেই। গেলাম, এখানেও লোকজন।

……….. চলবে 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *