ঝড় // বন্য মাধব // পর্ব – ২

ঝড় //    বন্য মাধব  //  পর্ব - ২

মানুষ প্রথমে ঘোরের মধ্যে পড়ে। তারপর ঠিক ভুল গুলিয়ে যায়। শেষে সাঁ সাঁ করে ঝড় আসে। বোধবুদ্ধি সব গুবলেট মেরে যায়। একটা ঝড়ের দাপট থামতে না থামতেই আর একটা ঝড়ের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। 
 
টুবলু, পুপলু, মিকিদি আর আমি, এই চারজনের হৈ হল্লায় বাড়ি একেবারে যাকে বলে মাথায় উঠে যেত। একসঙ্গে ঘুমানো, ওঠা, হাতমুখ ধোওয়া, খাওয়া, খেলা। মিকিদির আদরযত্নও বেড়ে গেল। প্রথম প্রথম অতোটা বুঝতাম না। শুধু শরীরটা শিরশির করে উঠতো। সেদিন দুপুরে সবাই ঘুমাচ্ছি, মিকিদি ডেকে তুলল। ওর একটা নতুন জামা আমাকে পরিয়ে দিল। হাসছে আর ফিসফিস করে বলছে, তোকে একদম মেয়ে মেয়ে লাগছে রে। আমার লজ্জা লজ্জা করছে। মিকিদি আমাকে ওর কোলে বসাল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। মুখের মধ্যে জিভ ঢুকিয়ে দিয়ে কি যেন করতে লাগল। আবার আমার জিভটাও চুষতে লাগল। আমার যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। ছাড়ে আর না।
 
সেই শুরু। এতদিন শুধু যখন তখন জড়িয়ে ধরত, জামা পরা, ছাড়া ইচ্ছে করে দেখাত। নিজে পারে কিন্তু ইচ্ছে করে বলত, পিঠের চেনটা একটু টেনে দে না রে, অথবা বুকের আর উরুর তিল দেখাতো, ফিসফিস করে বলতো হাত দে। হাত দিলে হাত চেপে ধরে অন্য জায়গায় টেনে নিয়ে যেত। আমার এত লজ্জা লাগত! হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে যেতাম। মিকিদি আমাকে লক্ষ্য রাখতো। তক্কে তক্কে থাকতো। আজকে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নাইটির মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে নিল, ফিসফিস করে বলল, খা। বলে নিজেই আমার মুখে পুরে দিল। আর আদর আর থামে না। আমার আর পালাতে ইচ্ছে করল না। ভাল লাগছে, শরীর শিরশির করতে লাগল। 
অনেকক্ষণ এসব চলার পর মিকিদি ফিসফিস করে বলল, আমার সোনা সোনা, বাকিটা রাতে। আমি অবাক হয়ে বললাম, কি? মিকিদি হাসলো, বললো তখন দেখবি সোনা।
টুবলু পুপলু ঘুমাবার পর আমি নিজেই উঠে পড়লাম। মিকিদি যেন এটারই অপেক্ষা করছিল। আলতো করে উঠে আমাকে মরণ জড়ান জড়িয়ে ধরলো। দীর্ঘক্ষণ চুমো খেল, আমাকে খেতে বললো, আমার আড়ষ্টতা যেন কাটতেই চায় না! আমি বললাম, মিকিদি রাতে কি দেখাবে বলেছিলি, দেখাবি না। হুম বলে আলতো করে মিকিদি মেঝেতে মাদুরটা পাতলো। বালিশও নামালো, তারপর মিকিদির কি আদর কি আদর! একলাফে মিকিদি আমার দশবছর বয়স বাড়িয়ে দিল। ফিসফিস করে মিকিদি কত শপথ নিল, আমিও।
 
এদিকে হাতটা বড় বেহিসাবি হচ্ছে। এক ঝটকায় উঠে পড়লাম। বড় মায়া হয়। ও মিকিদি, সেভ হার! পরের বগিতে গিয়ে বসলাম।
 
মিকিদি বলে, প্রেম কি আর গাছে ফলে! এসব কপাল রে, কপাল! 
 
তাহলে বলছিস তোর কপাল ভাল? 
 
মিকিদির সেই হাসি, দু’গালে চার চারটে টোল! এত নিষ্পাপ লাগে না! বললে বলে, তাই? একটু তির্যক তাকিয়ে বলবে, তোরও তো একটা টোল পড়ে, তবে তোকে কিনা……। 
 
কি? 
 
বলি? 
 
মাথা নাড়ি। 
 
বুড়ো বুড়ো লাগে, বলেই হি হি হা হা….। 
 
আর বলবো? 
 
বল না পেটে যা আছে। 
 
মুখ দেখলে সব ফিলিংস উড়ে পালায়। 
 
ও তাই! কাজের সময় দেখি না তো! 
 
ওটা তো অভ্যাস। 
 
ভাল ভাল, হেসে বলি, এই যে কালই যে বললি, আয় নদী হবো? 
 
মিকিদি আদুরে গলায় বলে, ও তুই বুঝবি না, 
 
বলেই চোখের তারা নাচায়। বয়স যত বাড়ছে মিকিদির চোখও তো টানা টানা হচ্ছে, তাকালেই মনে হয় এই তো আমার পৃথিবী। 
 
মিকিদি শুনে হাসে, বলে আজকাল খুব মন দিয়ে দেখছিস তালে? ভালো ভালো, তাই ভাবি এতো তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখে সোনা আমার!
 
আবার ঘোষণা, অনুগ্রহ করে শুনবেন….। আর অনুগ্রহ! দু’ঘন্টা হয়ে গেল, এখনও অনুগ্রহ? লোক ক্ষীপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এবার কি ভাঙচুর শুরু হবে? হতেও পারে। একশ্রেণির লোক আছে, এমন সুযোগে দারা সিং হবেই। এমনি তে লিকপিকে, বউ এর দাবড়ানি খেলে কেঁচো, তারাও ভিড়ে মিশে, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা করে, ভিড়ের পিছন থেকে চেঁচায়, মার শালাকে ধর শালাকে, সুপ্ত বাসনা যাকে বলে চাগাড় দিয়ে ওঠে। ঘোষণা শোনা হয়ে গেলে আবার শোরগোল শুরু হয়ে গেল। এখন আর খিস্তি ছাড়া কথা বেরচ্ছে না  কারো। 
 
মিকিদি, ভাগ্যিস তুই স্টেশন মাষ্টারের চাকরিটা নিস নে, এ পরিস্থিতিতে পড়লে তোরও কুড়ি পুরুষ জেগে উঠতো গালাগালির ঠ্যালায়। শালারা সব মাগিবাজ, বেজন্মার জাত, কেবল ঘুষ খাবে, ওভার হেডের তার দেখভাল করবে তোর মার নাঙ, শালা খানকির বাচ্চা, তোদের জন্যে আমরা ভুগবো কেন? ইত্যাদি প্রভৃতি….।
 
এককথায় বলা যেতে পারে, এসব শব্দগুলোর অধিকাংশই এখনও অভিধানে ঢোকে নি, যদিও এ জাতীয় শব্দের একটা অভিধান বেরিয়েছে। পড়েছি, মন ভরে নি, অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। 
 
দিদির, আমার স্যার বলেন, ভাষা তো ভাষা, তার শ্লীল অশ্লীল দু’টোই যখন চালু আছে সমাজে, দু’টোরই অভিধান থাকা খুব জরুরী। 
 
দিদি বলে, আপনি লিখুন না। 
 
হুম, বলে স্যার আর এগোন না। 
 
তবে কেউ কোথাও এসব শব্দ বললে খাতায় নোট করে রাখেন। মাঝেমধ্যে দু’একটা ছাড়েন।
 
দিদি রেগে যায়, এসব এখানে বলেন কেন? বই লিখুন না। 
 
আমি, দিদি, মিকিদিও মাঝে মাঝে এখানে ওখানে শোনা এধরণের কথা স্যারকে এনে দিই। তবে দু’ একটা বাদে ওগুলো স্যার আগেই সংগ্রহ করে ফেলেছেন বলেন। 
 
দিদি ঠাট্টা করে বলে, তাতো হবেই, যার কান যা শুনতে চায় তাইই তো শুনবে না! 
 
স্যার হাসেন। দিদি বলে, ওসব ছাই পাঁশ না ঘেঁটে গল্প উপন্যাস লিখতে পারেন না? 
 
তারপর নিজেই বলে, না, না, থাক, আপনি লিখলে তো আবার ঐসবই লিখবেন। 
 
স্যার বলেন, তা’লে তুমিই লেখ।
 
হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচি, ঐ শুরু হলো অফিস ভাঙচুর। সব জায়গায় একদল লোক এধরণের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটা বড় আকারের গণ্ডগোল বাধায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। শোরগোল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির মধ্যে লোকজন ঠেলাঠেলি করে উঠতে শুরু করলো। জানালাগুলো ধপাধপ বন্ধ হতেও লাগল। দরজাও। এতক্ষণ যারা রেলকর্মীদের গুষ্টির ড্যাশ করে ছাড়ছিল তারাও এখন স্পিকটি নট। মেয়েরা উদ্বেগে এই কেঁদে ফেলে তো সেই কেঁদে ফেলে। বাচ্চারা তো ট্যাঁ ভ্যাঁ করছেই। বাইরে গণ্ডগোল বেড়েই চলেছে। গাড়িতেও দমাদ্দম পাথর পড়তে লাগল। হঠাৎ একটানা গুলির আওয়াজ।
 
 
চোখ জ্বালা জ্বালা করতে লাগলো। কাঁদানে গ্যাস। এবার পাথর মারা বন্ধ। ঈশ্বরের আগমন ঘটলো কামরায়। স্বেচ্ছাবন্দী মানুষের একটু যেন সাহস এলো। হালকা করে জানালা তুলে হাবভাব বোঝার চেষ্টা করতে লাগল।  মাইকে বারবার ঘোষণা হতে লাগলো, যাত্রী সাধারণকে বিশেষ অনুরোধ করা হচ্ছে কোন  গুজবে কান দেবেন না ……। বাইরে আর কোন গণ্ডগোলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। দমবন্ধ অবস্থায় ঘন্টাখানেক চলার পর এ্যানাউন্স শোনা গেল ১১ নং প্ল্যাটফর্ম থেকে….,  ১২ নং থেকে……  দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটা ট্রেনের গন্তব্যস্থল জানাল। দরজা খুলে ভাল করে উঁকিঝুঁকি মেরে কিছু লোক নেমে গেল, উঠলোও কিছু। সব ট্রেনগুলিই স্পেশাল। আমাদেরটা ডায়মণ্ডহারবার লোকাল। চলতে শুরু করল গাড়ি। পাক্কা ৬ ঘন্টা পর। আস্তে আস্তে মুখে কথা ফুটতে লাগলো মানুষ জনের।
 
পুরনো কত কথা আজ ভেসে আসছে। কিন্তু এখন তো আমাকে নামতে হবে। একটা গা ঝাড়া দিলাম, যা স্মৃতি আবার পরে আসবি, যা। শিয়ালদা আসছে। এবার বি আর সিং হাসপাতাল থেকে বাস ধরবো। হুম, ফেরার পথে একবার মিকিদির কাছে যাব। একটু আগেভাগেই বেরবো। সারপ্রাইজ দেব। কিছু একটা কিনতে হবে। ১১ নভেম্বর আসছে। দেখি কি করা যায়।
 
১১ নভেম্বর!
 
আশ্চর্য মিকিদি, আগে থেকে ওকে বোঝাও যায় না। একদিন সকালবেলা হঠাৎ চলে এলো আমাদের বাড়ি। দিদি অফিস যাবে, রেডি হচ্ছে। একটা গাড়ি কিনলে হয়, কিনবে না। বলে ধ্যুস, এই তো চলে যাচ্ছে। গাড়ি ফাড়ি বহুৎ ঝামেলা। আরো বেশি পর ভরসার জীবন ইত্যাদি ইত্যাদি। সকালবেলা যাও আর রাতে ফেরো। তাও এখন কাছাকাছি ব্রাঞ্চে আছে বলে কিছুটা রেহাই। মিকিদি এলেই দিদি খুব খুশি হয়। আমার দিকে তাকায় আর মিচমিচ করে হাসে। মানে আমি সব জানি। জানো তো জানো! 
 
আমিও জানি, বলিও, স্যারও তোকে….। 
 
দিদি বলে, বলে ফ্যাল, বলে ফ্যাল…..চুপ করলি কেন? তারপর গম্ভীরভাবে নিজেই বলে, উনি চাইলেই সব হবে? আমার কোন ইচ্ছে অনিচ্ছে নেই? সমাজ মানবে? তুই মানবি? ওসব স্বপ্নেও ভাবিস নে ভাই। তোর যদি অসুবিধা হয় বল, এক্ষুণি বলে দিচ্ছি, উনি আর আসবেন না আমাদের বাড়ি। উনারই বা আর কি দরকার? আমি দাঁড়িয়ে গেছি, তুইও কাল ভাল একটা কিছু পাবি। একবার এটাও ভাব উনি না থাকলে তুই আমি আজ এ জায়গায় আসতে পারতাম? 
 
তুই তা’লে ওনার সাথে ঝগড়া করিস যে! 
 
ও তুই বুঝবি না। 
 
আমি চুপ করে যাই। মিকিদি বলে, এটা বুঝিস না, সব ভালবাসার মাত্রা কি এক হয়? 
 
হুঁ, তা হয় না ঠিক।
 
দিদি যেন বেরবার জন্যে ছটপট করছে। মিকিদি এটা ওটা এগিয়ে দিল। দিদি প্রতিদিনের মতোই মার ফটোতে, স্যারের এনে দেওয়া মা তারার ফটোতে আর ঠাকুমা, বাবাকে প্রণাম করে আমাকে টাটা দিল। মিকিদি একটু এগিয়ে দিতে গেল।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *