টিকটিকি : অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( ভবঘুরে )

টার্মিনাস থেকে বাসটা ছেড়ে দিয়েছিল । রাস্তায় ভিড় থাকায় স্পিড তুলতে পারেনি । অনেকটা ছুটে এসে কোনো মতে হ্যান্ডেলটা ধরে এক লাফ দিয়ে উঠে পড়েছিল সীতাংশু । কন্ডাক্টর দাঁড়িয়েছিল ফুটবোর্ডে । দরজা খোলা । ব্রিজে ওঠার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে দরজা । একটা সিট ফাঁকা পেয়ে ধপ করে বসে পড়লো । বসেই লক্ষ করলো পাশেই বসে আছে একটি যুবতী মেয়ে । কানে হেডফোন লাগিয়ে মনে হয় গান শুনছিল ।

কিন্তু সীতাংশুর বসার ধরনে একটু বিরক্ত । মুখের ভঙ্গিতে সেটা বোঝা গেল । নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সীতাংশু বলল , সরি । রুকস্যাকটা চালান করে দিল সিটের নিচে । যথাসম্ভব সহ যাত্রিনীর স্পর্শ বাঁচিয়ে ওয়ালেট থেকে বের করে রাখলো বাসের ভাড়া । বাসের পেছন দিকের সিট থেকে কন্ডাক্টর ভাড়া নেওয়া শুরু করেছে । সীতাংশুর গন্তব্য স্থল উলুবেড়িয়া ।

বাস জার্নি করার সময় বই পড়া বা মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করা তার একে বারেই পছন্দ নয় । জানলার বাইরে দিয়ে প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখতেই তার ভালো লাগে । জানলার পাশের সিটে বসে আছে মেয়েটি । বয়স কতই বা হবে ? চব্বিশ কি পঁচিশ । দেখে মনে হয় বড় লোকের মেয়ে । চকচকে চেহারা কিন্তু কাঠিন্য নেই । একটা প্রিন্টেড টপ আর থ্রি কোয়াটার্স জিন্স ।

পায়ে সবুজ স্নিকার । মোজা ছাড়া । চুলটা পনি টেল করে বাঁধা । গলায় একটা সরু সোনার চেন । সাথে এম আকৃতির পেনড্যান্ট । কানের মাঝে আর লতিতে পরপর দুটো ছোট সোনার রিং । পিঠ ব্যাগটা বা দিকে জানলায় ঠেস দিয়ে রেখেছে । মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা সিট্ আর জানলার গ্যাপে পেছন দিকে ঝুলছে । যে কোনো মুহূর্তে নিচে পড়ে যেতে পারে ।

মেয়েটির কানে হেডফোন । কিন্তু ফোনটা দেখা যাচ্ছে না । মনে হয় ব্যাগের সামনের পকেটে । আর একটা ফোন দু হাতের মাঝে । বুড়ো আঙুল দুটো ঝড়ের গতিতে টেক্সট ম্যাসেজ লিখে চলেছে । ম্যাসেঞ্জারে । আর তাতেই মুখে ফুটে উঠছে হাসির রেখা । কন্ডাক্টর দুবার ভাড়া চেয়ে গেল । মেয়েটির হুঁশ নেই । সীতাংশু একবার ভাবল ডেকে বলে কন্ডাক্টর ভাড়া চাইছে । পরক্ষনেই মনে পড়লো তার বসার সময় ওর মুখ ভঙ্গিমা ।

দরকার নেই বাবা । ওরটা ও বুঝে নেবে । হঠাৎ বাসটা খুব জোরে ব্রেক কষলো । সবারই অল্প বিস্তর লেগেছে । শুরু হয়ে গেল শোরগোল । চিৎকার চেঁচামিচি । একটা মোটরসাইকেল আচমকা ইউ টার্ন নিতেই বিপত্তি । মোটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতেই ড্রাইভারকে সাডেন ব্রেক মারতে হয়েছে ।

ড্রাইভারকে ছেড়ে সবাই পড়লো মোটরসাইকেলের ছেলেটাকে নিয়ে । যে যার মত মন্তব্য করতে লাগলো । এই ঝাকুনিতে মেয়েটিও পড়ে যাচ্ছিল । সামলে নিয়েছে । আবার এসেছে কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে । ব্যাগ প্যাকের বড় জিপটা খুলে বের করলো একটা ছোট পার্স । ভাড়া দিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিল । হাতের মোবাইলটাকে রেখে দিল ব্যাগের ভেতর । এরপর জল খেতে গিয়ে খেয়াল করলো বোতলটা নেই ।

নিশ্চয়ই ঝাঁকুনিতে পড়ে গেছে । এদিক ওদিক খুঁজতেই পেছনের সিটে বসা একটি ছেলে বোতলটি তুলে বলল , এটা কি আপনার ? মেয়েটি বলল , হ্যা । থ্যাংকস । ছেলেটি বলল , ওয়েলকাম । মেয়েটি জল খেয়ে আবার বোতলটি রেখে দিল জায়গা মত । বাস ছুটে চলেছে বোম্বে রোড ধরে । ঝাঁ চকচকে রাস্তা । মাঝে মাঝেই ফ্লাই ওভার । ওয়ান ওয়ে হওয়াতে গাড়ির গতিবেগও বেশি । হঠাৎ মেয়েটি কান থেকে ইয়ার প্লাগ দুটো খুলে ব্যাগের ভেতর রেখে সীতাংশুর দিকে ফিরে বলল , একটা কথা বলবো ?

বলুন । আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি ? কি অদ্ভুত প্রশ্ন ? আচ্ছা , কোনো মানুষ কি বলে যে সে খুব অবিশ্বাসী । বলল , আজ পর্যন্ত অবিশ্বাসের কোনো কাজ করেছি বলে মনে করতে পারছি না । আমার শরীরটা ভালো লাগছে না । একটু ঘুমাবো । তা আপনাকে কী আমি ঘুমাতে বারণ করেছি ? সে কথা নয় । আমার ব্যাগটা আছে । ব্যাগের ভেতর দুটো মোবাইল ফোন , আমার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর ওয়ালেটটা আছে ।

ঘুমিয়ে পড়লে আমার কোনো হুঁশ থাকে না । তাই বলছিলাম ব্যাগটা আপনার কাছে রাখবেন ? আমি সি আই পি টি তে নামবো । আপনি তো লাইব্রেরি মোড়ে । একটু ডেকে দেবেন , প্লিজ । ঠিক আছে দিন ব্যাগটা । যদি বিশ্বাস করেন তাহলে রাখতে পারি । অনেক ধন্যবাদ । আর একটা কথা । বলুন । আপনার কাঁধে একটু মাথা রেখে শোবো ? শরীরটা খুব খারাপ লাগছে । কী রকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে । ঠিক বলে বোঝাতে পারছি না ।

প্লিজ , কিছু মনে করবেন না । মেয়েটি নিশ্চিন্ত মনে সীতাংশুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো । দেখতে দেখতে রাণীহাটি ছাড়িয়ে বাস ছুটে চলেছে উলুবেড়িয়ার দিকে । উলুবেড়িয়া চেকপোস্ট আসতেই সীতাংশু ডাকতে লাগলো মেয়েটিকে । এর পরেই সি আই পি টি স্টপেজ । আপনি নামবেন তো । উঠে পড়ুন । মেয়েটির কোনো সাড়া নেই । গভীর ঘুমে আছন্ন । বাস থামলো কলেজ মোড়ে । অনেকেই নেমে গেল | পেছনের ছেলেটি যে জলের বোতল তুলে দিয়ে ছিল মেয়েটির হাতে সেও নেমে গেল । কয়েকজন প্যাসেঞ্জার ওঠার পরেই বাস আবার ছেড়ে দিল ।এরপর সীতাংশুর নামার পালা ।

নামবে লাইব্রেরী মোড়ে । কুলগাছি যাওয়ার পরেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল । ব্রিজটা ক্রস করেই নামবে । মেয়েটিকে ডাকতে লাগল । কোনো সাড়াশব্দ নেই । গভীর ঘুমে আছন্ন । বাধ্য হয়ে একটু ঠেলা দিল । তাতেও উঠলো না । একটু জোরে ঠেলতেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো । হাত দিয়ে ধরে ফেলল শক্ত করে । আর একটু হলেই পড়ে যেত ।

সারা শরীর ঠান্ডা । কেমন নেতিয়ে পড়েছে । কন্ডাক্টরকে ডাকল । বলল , আমি নামবো । কিন্তু এই মহিলাতো উঠছে না । ইনার নামার কথা ছিল কলেজ মোড়ে । তখন থেকে ডাকছি উঠছেন না । এর ব্যাগ আবার আমার কাছে । দেখুন তো একটু । বাস থামলো । কন্ডাক্টরের হাঁকডাকে ছুটে এল পাশের সহযাত্রীরা । একজন বলল , আমি ডাক্তার । আমাকে দেখতে দিন । ভিড় সরিয়ে তিনি মেয়েটিকে ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন , অনেক্ষন আগেই মারা গেছে । মৃত্যুর কারন বোঝা যাচ্ছে না ।

মনে হয় হার্টফেল । সবাইতো অবাক । গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল যাত্রীদের মধ্যে । সীতাংশুর তো ভয়ই ধরে গেল । এতক্ষন একটা মৃতদেহ তার কাঁধে মাথা রেখে এসেছে । একজন বলল , পুলিশ কেস । বাস থানায় নিয়ে চল । পুলিশের নাম শুনে সীতাংশুর রক্ত হিম । কেন জানি না ছোট বেলা থেকেই পুলিশের নাম শুনলেই সীতাংশুর টেনশন হয় । খুব ভয় লাগে । ডাক্তার ভদ্রলোক বললেন ,তার মতে প্রথমে নিকটবর্তী হাসপাতালে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া উচিত । যদি বাঁচানো যায় । তার কথায় সকলেই সায় দিল ।

অহেতুক ঝঞ্ঝাটে পড়ায় বিরক্ত অনেক প্যাসেঞ্জার । বিপদে পড়লে সীতাংশুর আবার বুদ্ধি কাজ করে না । কিরকম বোকা হয়ে যায় । যে যা বলে মনে হয় সেটাই ঠিক । এবার মেয়েটিকে ছেড়ে সবাই পড়লো সীতাংশুকে নিয়ে । তাদের প্রশ্ন পাশে বসে থেকেও সে বুঝতে পারল না কেন ? হঠাৎ এখন কী করে বুঝল ? মেয়েটি তার পরিচিত কি না । তা না হলে তার কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছিল কী ভাবে ? নিশ্চয়ই সে জানে । এখন ধরা পড়ে ন্যাকা সাজছে ।

যত শুনছে ততই সে ঘাবড়ে যাচ্ছে । কী বিপদে পড়ল রে বাবা । কার মুখ দেখে সকালে ঘুম থেকে উঠে ছিল কে জানে ? বাস হাসপাতালে ঢোকার আগেই থানায় ফোন করে দিয়েছেন ডাক্তারবাবু । আগেই পুলিশের জীপ এসে গেছে । পুলিশের জীপ দেখে সীতাংশুর হার্ট বিট গেছে বেড়ে । যে কোনো মুহূর্তে তার প্রেসার ফ্লাকচুয়েট করতে পারে । ব্যাগের থেকে প্রেশারের শিশিটা বের করে একটা ট্যাবলেট মুখে পুরে দিল ।

জল খেতে গিয়ে খেয়াল করলো মেয়েটির ব্যাগ তার কাছে । জলের বোতলটা নেই । বাস থেকে নামার আগে ভালো করে দেখল সিটের নিচে । কোনো বোতল চোখে পড়লো না । ভাবতেই অবাক লাগছে একটু আগে যে মেয়েটা তার পাশে বসেছিল সে এখন মৃত । কিন্তু হঠাৎ মারা গেল কী ভাবে ? হার্ট ফেল করলো ? বাসের প্যাসেঞ্জারদের যা দেখল সবাইতো নির্ঘাৎ তাকেই বলির পাঁঠা বানাবে । আর পুলিশে ছুলে সে তো আঠারো ঘা । উহ ! কী কুক্ষনেই আজ বেরিয়ে ছিল । জানে না শেষ পর্যন্ত ভাগ্যে কী আছে ।

হাসপাতালের গেটের কাছে চার পাঁচজন পুলিশ । একজন অফিসার বাসের ড্রাইভারকে নির্দেশ করছে বাসটাকে কোথায় দাঁড় করাতে হবে । বাস থামতেই উঠে পড়লেন ভেতরে । বললেন , নিচে নেমে সবাই এক এক করে লাইন দিয়ে দাঁড়ান । তারপর কন্ডাক্টরকে বললেন , ডেডবডি কোথায় ? মেয়েটিকে ওর সিটেই বসিয়ে রাখা হয়েছে । দুজনে মিলে ধরাধরি করে মেয়েটিকে নিয়ে গেল ইমার্জেন্সিতে । সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে ।

মিনিট পনের বাদে ফিরে এসে বললেন , মেয়েটি মারাই গেছে । তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না মৃত্যুর কারন কি । এনি হাউ , উনার বাড়ির লোক কে আছেন ? কেউ নেই । একাই যাচ্ছিলেন । প্রথমে কে দেখেছেন ? সবাই সীতাংশুর দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল , উনি । উনার সাথেই মেয়েটি কথা বলছিল । আমাদের তো মনে হয় দুজনেই পরিচিত । কী ভাবে বুঝলেন ? মেয়েটি উনার কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছিল ।

এবার অফিসার ভদ্রলোক সীতাংশুর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন , আপনার পরিচিত ? ফ্যাস ফ্যাসে গলায় সীতাংশু বলল , না । উনাকে আমি চিনি না । তাহলে আপনার কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছিলেন কেন ? উনি বললেন যে উনার শরীরটা খারাপ লাগছে । একটু ঘুমাবেন । তাই তাই একজন অপরিচিত পুরুষের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমালেন । তাইতো করলেন । চুপ করুন । বেশ বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে পারেন তো ।

ঠিক আছে আপনাকে পরে দেখছি । ইতিমধ্যে ভালো ভিড় জমে গেছে । উৎসাহী লোকের অভাব নেই । টুকরো টাকরা কথা যা ভেসে আসছে তাতে সবাই ধরেই নিয়েছে যে মেয়েটির মৃত্যুর জন্য সীতাংশুই দায়ী । দু ঘা পিঠে পড়লেই সুর সুর করে সব সত্যি কথা বেরিয়ে যাবে । বাই -দি বাই ,মেয়েটির বাড়ির লোককে কী ভাবে খবর দেওয়া যায় ? সীতাংশুকে দেখিয়ে কন্ডাক্টর বলে উঠলো , স্যার , উনার কাছে মেয়েটির ব্যাগ আছে । মেয়েটির ব্যাগ আপনার কাছে ? এতক্ষন বলেন নি কেন ? প্রমান লোপাটের চেষ্টা ? প্রায় কেঁদে ফেলল সীতাংশু । বলল , না স্যার ।

আমি কিছু করিনি । বিশ্বাস করুন । সেটা পরে দেখছি । ব্যাগটা দিন । ইতিমধ্যে রিপোর্টাররা এসে হাজির । টিভি চ্যানেলের জার্নালিস্টরা লাইভ দেখাতে ব্যস্ত । অফিসার সবার সামনে একটা একটা করে জিনিস বের করছেন ব্যাগের ভেতর থেকে আর একজন কাগজে লিখে নিচ্ছেন । মোবাইল থেকেই বাড়ির ফোন নাম্বার পাওয়া গেল । ফোন নাম্বারটি মেয়েটির মার । কিছু কথা হল । ফোন রাখার একটু বাদেই মেয়েটির বাবা ফোন করলেন । অফিসার উনাদের আসতে বললেন । বডি সনাক্ত করতে হবে ।

অনেকেই ব্যস্ততার কারনে অধৈর্য হয়ে পড়ছিল । তাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে । একজন দুম করে বলেই বসল , স্যার , আমরা কী তাহলে এখন যেতে পারি ? কে বললেন ? আজ্ঞে , আমি স্যার । একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন । না । এখন কাউকে ছাড়া যাবে না । যেহেতু আপনারা সকলেই বাসের ভেতর ছিলেন সে জন্য সকলেই সন্দেহের তালিকায় ।

আপনাদের প্রত্যেকের আই কার্ড দিন । সবার এই কার্ড নিয়ে একজন পুলিশকে বললেন সবগুলো ফটোকপি করে আনার জন্য । সে ছুটলো জেরক্সের দোকানে । বিপদ যে ঘাড়ের ওপর থাবা বসিয়েছে সেটা বুঝতে আর অসুবিধা নেই সীতাংশুর । প্রথমে ফোন করলো বাড়িতে । স্ত্রী ঋদ্ধিমা তখন টোটনকে ভাত খাওয়াচ্ছিল । খবর শুনে তো সে কেঁদেই ফেলল। সীতাংশু বলল , তোমার দাদাকে একটা খবর দাও ।

পারলে সে যেন এখানে চলে আসে । তারপর ফোন করলো নিজের বড়দা কে । বড়দা উচ্চ পদস্থ সরকারি অফিসার । এরপর উলুবেড়িয়ায় যে বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছিল তাকে ফোন করে সব জানালো । সবাই মোটামুটি জানিয়ে দিল যে তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসছে । উলুবেড়িয়ার বন্ধু এল সবার আগে । সাথে করে নিয়ে এসেছে এক উকিলকে । প্রায় ঘন্টা দেড়েক বাদে এল মেয়েটির বাড়ির লোকজন । সীতাংশু ঠিকই ভেবে ছিল ।

বড় লোকের মেয়ে । দুটো এস ইউ ভি আর দুটো সেডান এসে থামলো । নেমে এল বাড়ির লোকজন । মেয়ের বাবা এসে পরিচয় দিলেন যে তিনি মেয়ের বাবা । জানতে চাইলেন মেয়ে কোথায় । পুলিশ অফিসার উনাকে নিয়ে গেলেন ডেড বডির কাছে । বাড়ির সবাই গেলেন । একটু বাদেই ভদ্রলোক ছিটকে বেরিয়ে এলেন । জানতে চাইলেন মেয়ের সঙ্গে কে ছিল । সবাই দেখিয়ে দিল সীতাংশুকে । ক্রোধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সীতাংশুর ওপর ।

চিৎকার করে বলতে লাগলেন , হারামজাদা , শুয়ার ,তুই আমার মেয়েটাকে মেরে ফেললি । এই তোর ভালোবাসা ? তোকেও আমি শেষ করবো । এর জন্য আমায় যদি জেলে যেতে হয় যাবো । এই বলে সীতাংশুকে ফটাফট চড় মারতে লাগলেন । সঙ্গের আত্মীয় স্বজনরাও যে যার মত কিল ,চড়, ঘুষি ,লাথি দে দার মারতে লাগলো । মাটিতে পড়ে গেল । জামা প্যান্ট ছিঁড়ে রক্তারক্তি অবস্থা । পুলিশ অফিসার দৌড়ে এলেন ।

অন্য পুলিশদের সহায়তায় সরিয়ে দিলেন সবাইকে । বললেন , আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবেন না । আমাদের কাজ করতে দিন । বডি মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছি । ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে রিপোর্ট আসতে । আপনারা সবাই আমার সাথে থানায় চলুন । ড্রাইভার ,কন্ডাক্টরকে বললেন ,তোমরা বাসটা ভালো করে ধুয়ে ডিসইনফেক্ট করো ।

মালিককে খবর দাও । বাস নিয়ে থানায় চলে এস । দুজন পুলিশকে বাসের সাথে আসতে নির্দেশ দিলেন । থানা থেকে পুলিশ ভ্যান চলে এল । বাসের সমস্ত প্যাসেঞ্জারদের ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হল থানায় । সীতাংশুকে নেওয়া হল পুলিশের জীপে । সুন্দর মুখটা কী কদর্য লাগছে । চোখের নিচে কালশিটে । হনু দুটো ফুলে ঢোল । ঠোঁটের কস বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত । ধুলোয় মাখা মুখ । অবিন্যস্ত চুল । ছেঁড়া জামা ।

ভেতরের গেঞ্জিটাও ছিঁড়ে গেছে । বিধস্ত অবস্থা । কেঁদেই চলেছে । থানায় পৌঁছানোর আধ ঘন্টার মধ্যেই সীতাংশুর বড়দা আর স্ত্রীর দাদা মানবদা এসে হাজির । সীতাংশুকে ঢুকানো হলো থানার লক আপে । মেয়ের বাবা এফ আই আর করলেন সীতাংশুর বিরুদ্ধে । । একগাদা অভিযোগ । মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে খুন করা পর্যন্ত । চার্জশিট তৈরী হলো । সীতাংশুর বড়দা এবং বন্ধুর সাথে আসা উকিল পুলিশ অফিসারকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন । ওদের থামিয়ে দিলেন অফিসার ।

বললেন , যা বলার কালকে কোর্টে বলবেন । উকিল ভদ্রলোক বললেন , আমি ওর সাথে একটু কথা বলতে চাই । আমাকে অন্তত সেই অনুমতিটুকু দিন । বড়দা বললেন , আমরা গরাদের বাইরে থেকে কথা বলবো । প্রয়োজনে আপনার সামনে । ওর মুখ থেকে শুনতে চাই পুরো ঘটনাটা । পুলিশ অফিসার বললেন একমাত্র উকিলবাবুকে কথা বলার অনুমতি দিলাম । আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন । থানার সামনে শুধু কালো মাথার ভিড় ।

দুই পরিবারের লোকজনতো রয়েইছে তারপর মিডিয়া এবং স্থানীয় লোকজন । আরও একঘন্টা বাদে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসে গেল । পুলিশ অফিসার বললেন , পাকস্থলীতে বিষ পাওয়া গেছে । এর মানে বিষ ক্রিয়ায় মৃত্যু । পানীয় কোনো কিছুর সাথে বিষ মিশানো হয়ে ছিল । ঘন্টা খানেক বাদে ডেড বডি পেয়ে যাবেন পোস্টমর্টেম থেকে । তার মধ্যে আমরা অফিসিয়াল কাগজপত্র রেডি করে রাখছি । আবার একপ্রস্থ কান্না কাটি হৈ চৈ । অফিসার খুবই দক্ষ এবং অভিজ্ঞ । ফোন করে অতিরিক্ত ফোর্স এনে রেখেছেন ।

প্রয়োজনে ব্যব্যবহার করে যাবে । অদ্ভুত ভাবে ঘটনা সেই দিকেই ঘুরলো । আচমকা মেয়েটির বাড়ির লোকেরা সীতাংশুর বাড়ির লোকেদের ওপর চড়াও হলো । একদম অপ্রস্তুত অবস্থায় আচমকা আক্রমন । প্রথমে মুখে । তারপর হিংস্র্র ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া । কিন্তু গন্ডগোল দানা বাঁধার আগেই বিশাল বাহিনী সরিয়ে দিল দু পক্ষকে । এবার কিন্তু আমি আপনাদের এরেস্ট করতে বাধ্য হব । চিৎকার করে উঠলেন পুলিশ অফিসার ।

দেখুন , আমি মানছি ঘটনাটা দুঃখ জনক । দুর্ভাগ্য জনকও বটে । কিন্তু এখনো প্রমাণিত হয় নি যে অভিযুক্ত অপরাধী । কোনো এভিডেন্সও এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই । সুতরাং ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হটকারিতা করা নিশ্চয়ই শোভনীয় নয় ।আপনাদের যার যা কিছু বলার সব বলবেন কোর্টে । এরপর , একটা সাদা কাগজে বাসের প্যাসেঞ্জারদের দিয়ে কিছু গদ বাদা কথা লিখিয়ে নিলেন । তারা মুচ লেখা দিল এই লিখে যে যখনই ডাকা হবে তখনই তারা থানায় হাজিরা দেবে । সবার নাম , ঠিকানা ফোন নাম্বার , লিখে রাখা হল ।

এই কাগজের সাথে সবার আই কার্ডের সেলফ এটাস্টেড ফটো কপি অফিসার স্টেপল করে রাখলেন । রিলিজ করে দিলেন সমস্ত প্যাসেঞ্জারকে । সীতাংশুর তরফে যে উকিল ঠিক করা হয়েছিল সে ধরেই নিয়েছে এই কেস জেতা অসম্ভব । এমন কিছু খুঁজেই পাচ্ছে না যে সীতাংশুকে নির্দোষ প্রমান করবে । সমস্ত কিছুই তার বিরুদ্ধে । এটাতো কোর্ট কিছুতেই বিশ্বাস করবে না যে অপরিচিত কোনো মহিলা একজন পর পুরুষের কাঁধে সচেতন ভাবে মাথা রেখে ঘুমাবে । তার মূল্যবান সামগ্রীতে ভরা ব্যাগ অজানা ,অচেনা একজনকে দিয়ে বলবে তার কাছে রাখতে কেন না সে ঘুমাবে ।

এই সব কথা কি বিশ্বাস যোগ্য ? সমস্ত এভিডেন্স ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে । যেভাবেই হোক জামিনটা করাতেই হবে । কী ভাবে যে জামিন করাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না । মানব বাবু বললেন , আপনি যে ভাবে পারুন জামিনের ব্যবস্থা করুন । তরপর দেখছি কী করা যায় । যদি প্রয়োজন মনে করেন অন্য কোনো এডভোকেটের সাথে কনসালট করতে পারেন । তার ফিজ আলাদা ভাবে দিয়ে দেব । মনে বল পেলেন উকিল বাবু । বললেন , ঠিক আছে । আমি দেখছি । পরের দিন কোর্টে তোলা হল সীতাংশুকে ।

এক রাতেই চেহারা র আমূল পরিবর্তন । দেখেই বোঝা যাচ্ছে সারা রাত যথেষ্ট শারীরিক অত্যাচার হয়েছে । ভদ্রলোকের ছেলে । জীবনে গুন্ডামি বা মস্তানি করে নি । খুন খারাবি তো দূর অস্ত । ভাগ্যের পরিহাসে আজ সে অত্যাচারিত । মান সম্মান ধুলুন্ঠিত । মুখ তুলে চাইতে পারছে না নিজের বাড়ির মানুষদের দিকে । কোর্ট ভর্তি লোক এসেছে মজা দেখতে । না মজা নয় , তার যাবজ্জীবন জেল দেখতে । এর মানে সুস্থ জীবন যাপনের পরিসমাপ্তি ।

একটা সুন্দর সুখের পরিবেশ থেকে স্থানান্তরিত হবে দাগী আসামীদের রাজ্যে । তার নাম , পরিচয় সব যাবে পাল্টে । পরিবর্তে সে হয়ে যাবে একটা নম্বর । পিতৃ পরিচয় হারিয়ে সে হবে জেলের কয়েদী । তার পরিচয় হবে শুধুই নম্বর । নিজের অজান্তেই টস টস করে ঝরে পড়তে লাগলো চোখের জল । কোর্ট রুমের একপাশে বসে আছে তার স্ত্রী ঋদ্ধিমা আর পুত্র টোটন । আর মনে হয় দেখা হবে না ওদের সাথে । অফিস থেকে বাড়িতে ফিরলে বাপি বলে কোলে ঝাপিয়ে পড়বে না কেউ ।

ছুটির দিনে বেড়াতে নিয়ে চল বলে আর কেউ আবদার করবে না । তার না হয় যা হবার হবে । কিন্তু ওরা বাঁচবে কী ভাবে ? কোন পরিচয়ে ? সমাজে ওদের পরিচয় হবে খুনির স্ত্রী আর খুনির ছেলে । স্কুলে কী আর যেতে পারবে টোটন ? বন্ধুরা ওকে বলবে খুনির ছেলে । ঋদ্ধিমাকে শুনতে হবে যে সে থাকতেও তার দুশ্চরিত্র স্বামী বড়লোকের মেয়ের সাথে ফস্টিনস্টি করে বেড়াত । শেষে কি না তাকেই খুন করলো । পাবলিক প্রসিকিউটর জানালেন অপরাধী ভারতীয় দন্ডবিধির ৪৯৮ ,৫০৬, ৩৭৮ , ৩০৭ ,৩৫৪ ,৫০৯ এবং ২৯৯ ধারায় অভিযুক্ত । অর্থাৎ অপহরণ , টেলিফোনে পরিবারের লোককে হুমকি দেওয়া , বিশেষ ভাবে বাড়ির মহিলাদের এবং নিহত মালবিকা দেবীকে ।

এছাড়া , আছে চুরি , খুনের ষড়যন্ত্র এবং খুন । এই জাতীয় অপরাধীর কঠিন সাজা হওয়াই বাঞ্ছনীয় । ডিফেন্স ল ইয়ার মুরুলীবাবু বললেন , অভিযুক্ত সীতাংশু বাবু মানে আমার মক্কেল একেবারেই নির্দোষ । ভাগ্যের পরিহাসে আজ উনি কাঠগোড়ায় । অত্যন্ত ভদ্র , শান্ত , শিক্ষিত । একজন সরকারি কর্মচারী । কোনো রকম অপরাধের পাস্ট রেকর্ড নেই । তার পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী , বন্ধুবান্ধব এমন কি অফিসের কলিগরা পর্যন্ত ভালোবাসেন আমার মক্কেলের মিষ্টি ব্যাহারের জন্য ।

ধর্মাবতার , আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা ধারাগুলো সবই উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে । একটাও প্রমাণিত হয় নি । সুতরাং আমার মক্কেলের জামিনের জন্য আবেদন করছি । সীতাংশুর জামিন হয়ে গেল । সাথে পড়লো পরবর্তী ডেট । জামিনে ছাড়া পাওয়ার দিন ই সন্ধ্যে বেলায় মুরুলীবাবুর চেম্বারে দেখা করলেন সীতাংশু ,সীতাংশুর বড়দা ,মানববাবু এবং উলুবেড়িয়ার সিতাংশুর বন্ধু মনোজ মন্ডল । সকলেই তাকে ধন্যবাদ জানালো ।

পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আলোচনা করতে আসা । সীতাংশুকে নির্দোষ প্রমান করার জন্য প্রয়োজন তথ্য এবং প্রমান । একই সাথে খুঁজে বের করতে হবে খুনের রহস্য । এই ব্যাপারে উকিল বাবুকে সাহায্য করার জন্য তারা এক প্রাইভেট গোয়েন্দা নিয়গ করবে । আগামী দশ দিনের মধ্যে প্রমান সহ সমস্ত তথ্য সে এনে দেবে । মুরুলীবাবু শুনে খুশি হলেন । তার কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল । যোগাযোগ করা হল এক গোয়েন্দার সাথে ।

বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে বন্ডেল রোডে বাড়ি । শখের গোয়েন্দা গিরি করতে করতে এখন এটাই তার প্রফেশন । যথেষ্ট নাম করেছেন । পুলিশ মহলে খুবই পরিচিত নাম । অর্ঘদীপ ব্যানার্জী । তবে বাড়ির দরজার ওপরে একটা টিকটিকির ছবি আঁকা । নিজেকে পরিচয় দেন টিকটিকি বলে । সীতাংশু অবশ্য টিকটিকিকে চিনতেন না । জামিন পাওয়ার পর গতকাল সন্ধ্যে বেলায় অফিসের কলিগরা সব এসেছিল । বারো জন | তার মধ্যে তিনজন ম্যাডাম । সীতাংশুর সবচেয়ে ভালো লেগেছে ডিপার্টমেন্টের হেড মিস্টার শ্রীবাস্তব স্যারও এসেছিলেন । বললেন , চিন্তা করো না ।

আমরা তোমার সাথে আছি । যে কোনো সাহায্য লাগলে আমাদের জানাতে দ্বিধা করবে না । ভালো মানুষের সাথে ভগবান সব সময় থাকেন । কথা প্রসঙ্গে গোয়েন্দার কথা উঠলো । শ্রীবাস্তব স্যার গোয়েন্দা টিকটিকির নাম ও ঠিকানা শুধু বলে দিলেন না । নিজের থেকেই একটা এপয়েন্টমেন্ট চেয়ে নিলেন | টিকটিকির মানে অর্ঘদীপ ব্যানার্জীর সহকারী রুস্তম দরজা খুলে বললেন ভেতরে আসার জন্য । অর্ঘদীপ তখন একটা ইন্টার ন্যাশনাল জার্নাল খুব মন দিয়ে পড়ছিলেন । সীতাংশুদের আসতে দেখে জার্নালটা সোফার একপাশে রেখে রুস্তমকে বললেন চার কাপ কফি পাঠিয়ে দিতে ।

গভীর মনযোগ দিয়ে শুনলেন সমস্ত ঘটনা । কফির কাপে চুমুক দিয়ে ধরালেন একটা সিগারেট । প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন । সীতাংশু অবশ্য সিগারেট খায় না । তবে বন্ধু বিতান একটা নিয়ে ধরালো । সিগারেটটা দুটো ঠোঁটের মাঝখানে রেখে হাত দুটো কচলাতে কচলাতে টিকটিকি বললেন , আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে । বলুন । সীতাংশু , আপনার কী বিবাহ বহির্ভুত কোনো সম্পর্ক ছিল ? প্রতিটা তথ্যই আমার কাছে খুবই গুরুত্ব পূর্ণ । সীতাংশু বলল , না । পার্টিকুলারলি এই কেসটার ক্ষেত্রে বলছি , বাসে ওঠার আগে পর্যন্ত উনাকে কোথাও দেখি নি । পরিচয় তো দূরের কথা ।

ঠিক আছে । আচ্ছা সীতাংশু , আপনি খুব ভালো করে মনে করে একদম ডিটেল্সে বলুন আপনি বাসে ওঠার পর থেকে বাস থেকে নামার আগে পর্যন্ত যা যা ঘটেছে । রুস্তমের দিকে তাকিয়ে বললেন , রুস্তম নোট করে নাও । রুস্তম শর্ট হ্যান্ড খাতা পেন্সিল নিয়ে প্রস্তুত । সীতাংশু বলে চলেছে আর রুস্তম নোট করে নিচ্ছে । যখন পুরোটা বলা হয়ে গেল রুস্তম চলে গেল কম্পিউটার টেবিলে । ঝড়ের গতিতে টাইপ করে প্রিন্ট আউট দিল টিকটিকির হাতে । টিকটিকি সীতাংশুকে বলল কাগজের নিচে সই করতে ।তারপর এক ঝলক পুরো লেখাটা পড়ে নিয়ে বলল , ঘুমাবার আগে মালবিকা দেবী জল খেয়েছিলেন ।

রাইট ? হ্যা । নিজের বোতল থেকে ? হ্যা । বোতলটা পড়ে গেছিল | পেছনের সিটের একটি ছেলে তুলে দেয় । হ্যা । আচ্ছা , বোতলটা যে পড়ে গেছিল সে ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত ? মানে কেউ তুলে নেয় নি তো ? কারন আপনি বললেন যে বোতলটা ব্যাগ থেকে পেছন দিকে ঝুলছিল । যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারতো । হ্যা । কিন্তু কেউ তুলেছে কিনা আমি তো দেখি নি । না ,তা দেখেন নি । শুধু মাত্র তুলে দিতে দেখেছেন ।

ছেলেটির মুখ দেখেছিলেন ? তখন দেখি নি । কারন সিটের ব্যাক রেস্টটা খুব উঁচু ছিল । দুটো সিটের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে বোতলটা এগিয়ে দিয়েছিল । তবে যখন ও নেমে যায় তখন দেখেছি । একটা হুড তোলা ফুল স্লিভ গেঞ্জি পড়া ছিল । মুখের অর্ধেকটাই ঢাকা । কী করে বুঝলেন ওই ছেলেটাই সেই ছেলেটা ? নামার সময় ওর হাত টা আমার মাথায় লেগে যাওয়াতে ও বলেছিল ,সরি । তাহলে আপনি ওর মুখ দেখতে পান নি ? তবে দাড়ি আছে ।

রোগা , লম্বা । ডান হাতে একটা স্টিলের বালা ছিল । ওই বালাটাই আমার মাথায় লেগেছিল । আচ্ছা , নামার সময় বোতলটা ভদ্র মহিলার ব্যাগে ছিল ? না । কারন ব্যাগটা ছিল আমার কাছে । ব্যাগটা আপনি কোথায় রেখেছিলেন ? কেন , আমার কোলের ওপর । বোতলটাও ? না । বোতলের মুখটা ঠিক মত আটকানো ছিল না বলে প্যান্টে জল পড়ছিল । মুখটা ভালো করে আটকিয়ে দুটো সিটের ফাঁক দিয়ে পেছন দিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছিলাম । যাতে গায়ে জল না পড়ে । তাহলে বোতলটা কোথায় গেল ? সিটের নিচে পড়েছিল ?

না । নামার সময় আমি লক্ষ করলাম কিন্তু সিটের নিচে কোনো বোতল দেখতে পেলাম না । ঠিক আছে । ও , বাই -দি-বাই । মেয়েটির বাড়ির ঠিকানাটা আমার লাগবে । বাড়ি গিয়ে ওটা আমায় হোয়াটস আপ করে দেবেন । একটা কথা , আপনার ফিস টা যদি বলেন ? কেসের ওপর নির্ভর করে । আপনি ২৫০০০ টাকা দেবেন । তবে এখন না । সময় মত আমি চেয়ে নেব । নমস্কার । ভদ্রলোক অসম্ভব পেশাদারি । প্রয়োজনের বেশি একটাও কথা বলেন না । অহেতুক কথা বলে সময় নষ্ট করা তার স্বভাব বিরুদ্ধ ।

পয়সার জন্য যে কোনো কেস হাতে নেন না । কেসের মেরিট বুঝে ময়দানে নামেন । পাস্ট রেকর্ড বলছে এখনো পর্যন্ত একটা কেসও সমাধান করতে ব্যর্থ হন নি । বাড়ি ফিরে উকিলবাবুকে ফোন করে জেনে নিল মেয়েটির বাবার নাম এবং বাড়ির ঠিকানা । হোয়াটস আপ করে পাঠিয়ে দিল টিকটিকিকে । এরপর সাতদিন কোনো খবর নেই । আট দিনের দিন টিকটিকি ফোন করে বললেন উকিলবাবুর চেম্বারে সবাই মিলে বসা হবে রবিবার দুপরে ।

সেখানে অতিরিক্ত থাকবেন লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মিস্টার সুমন্ত বটব্যাল । এক এক করে সকলেই এসে গেলেন । সবার শেষে এলেন টিকটিকি আর তার সহকারী রুস্তম । কোনো রকম ভনিতা না করে টিকটিকি সরাসরি মূল কথা শুরু করলেন । তার জবানিতে – সমস্ত ঘটনাটা শুনে এবং অন্যান্য তথ্যের ওপর নির্ভর করে আমি নিশ্চিত হলাম যে সীতাংশুবাবু খুন করেন নি । প্রশ্ন হলো তাহলে খুনি কে ?

সীতাংশু বাবুকে বাদ দিলে হাতে থাকছে একজন । পেছনের ছেলেটি যে জলের বোতল তুলে দিয়েছিল । এবার প্রশ্ন হলো সে কেন খুন করবে ? খুনের মোটিভটা আমায় জানতে হবে । তারও আগে জানতে হবে ছেলেটির সাথে মেয়েটির কী পরিচয় । নিশ্চয়ই পূর্ব পরিচিত । কিন্তু যাতে মেয়েটি ছেলেটিকে চিনতে না পারে সেই জন্য এই গরমেও হুড তোলা ফুল হাতা গেঞ্জি পড়েছিল আর হুড টা তুলে রেখেছিল । বোতল সেই তুলে নিয়েছিল । কিন্তু যে বোতলটা সে দিয়েছিল সেটা অন্য বোতল । একই রকম দেখতে ।

জাস্ট বদলা বদলি । কারন বাসের মধ্যে কিছু মিশাতে গেলে পাশের যাত্রী দেখে ফেলতে পারে । আগের থেকেই বিষ মেশানো জল ছেলেটির বোতলে ছিল । এখানে দুটো প্রশ্ন আছে । এক , ছেলেটি একই রকম বোতল আনলো কী ভাবে ? মেয়েটির কাছে কিরকম বোতল আছে সেটা তো ওর জানার কথা নয় । দ্বিতীয়ত , মেয়েটি যে বাসের মধ্যেই জল খাবে সেটা ও আগের থেকেই বুঝলো কী ভাবে ? এমন হতে পারে মেয়েটি হয়তো বাসে ওঠার আগে কিছু একটা খেয়েছিল । খাওয়ার পর জল খাওয়ার অভ্যাস নেই ।

অন্তত আধ ঘন্টা পরে জল খাওয়া অভ্যাস । তাই যদি হয় , তাহলে তৃতীয় কেউ আছে যে মেয়েটির সব কিছু জানে । বাড়ির লোক ছাড়া এসব অন্য কারোর পক্ষ্যে জানা সম্ভব নয় । তাহলে কী বাড়ির লোক যুক্ত ? সমস্ত প্রশ্নগুলোকে পরপর সাজিয়ে প্রায়োরিটি অনুযায়ী উত্তর খোঁজা শুরু করলাম । একটা clue পেলাম । ছেলেটি ও মেয়েটির একই স্টপেজে নামার কথা । CIPT কলেজ মোড়ে । খোঁজ লাগলাম । সীতাংশু বাবু ছেলেটির যেরকম বর্ননা দিয়েছিল সেরকম ছেলের সন্ধান পেলাম ।

মেয়েটা মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে গবেষণা করছিল । বিষয়বস্তু ছিল ওয়াটার মাইক্রো বায়োলজি এবং পাবলিক হেলথ । ছেলেটাও ওখানে গবেষণা করতো । খুব স্কলার ছেলে । মেয়েটি প্রচুর সাহায্য নিত ছেলেটির কাছ থেকে । পরিচয়ে সূত্র থেকেই প্রেম এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত । বাড়িতে জানা জানি হয়ে যায় । ছেলেটিকে মেয়েটির মা অপমান করে তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় । ছেলেটি প্রেমে অন্ধ ।

মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে পারছিল না । ফোন করে বাড়িতে । মেয়েটি ইতি মধ্যে অন্য একটি ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে । এই ছেলেটিকে পরিষ্কার না বলে দেয় । ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ছেলেটি মেয়েটিকে আর তার বাড়ির লোকেদের থ্রেট করতে থাকে । মেরে ফেলার হুমকি দেয় । মেয়েকে গুন্ডা দিয়ে তুলে নিয়ে খুন করবে বলে শাসায় ।

এইখানে যুক্ত হয় মেয়ের সৎ বাবা । মেয়েটি তার সৎ বাবাকে মানতো না । প্রকাশ্যে অপমান করতো । পরিবারে প্রচন্ড অশান্তি । মেয়েটি ঠিক করে গবেষণার কাজ শেষ করেই দ্বিতীয় ছেলেটিকে বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যাবে । দ্বিতীয় ছেলেটি আছে আমেরিকার শিকাগোতে । কিন্তু সৎ বাবার ইচ্ছা তার এক বন্ধুর ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়ে ওই বন্ধুকে বিজনেস পার্টনার করে নেওয়া । তার বহুদিনের স্বপ্ন এইভাবে বানচাল হয়ে যাওয়ায় সে ঠিক করলো মেয়েটিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে ।

গোপনে প্রথম ছেলেটির সাথে যোগাযোগ করে প্রচুর টাকার লোভ দেখালো । প্ল্যান করলো ছেলেটি । সাহায্য করলো মেয়ের সৎ বাবা । মেয়েটি যে বোতলে জল খায় হুবহু ওই রকম দেখতে আর একটা বোতল কিনে দিলেন ছেলেটিকে । আর বলে দিলেন কোনো কিছু খাওয়ার আধঘন্টা পরে জল খাওয়া তার মেয়ের অভ্যাস । বাড়ি থেকে লাঞ্চ করে বেরিয়ে ছিল মেয়েটি ।

হিসাব মত আধ ঘন্টা বাদে সে বাসেই থাকবে । প্রয়োজন শুধু বোতলটা পাল্টিয়ে দেওয়া । ছেলেটি ওয়াটার মাইক্রোবায়োলোজির ওপর কাজ করেছে । ওয়াটার পলুশনের ব্যাকটেরিয়াগুলো তার জানা । এইখানে বলে রাখি , কলকাতার এক বিখ্যাত ল্যাবে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি “বটুলিনাম টক্সিন ” নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া এক ন্যানো গ্রাম ব্যবহার করলেই একজন মানুষকে মারা যায় । সেটাই করে ছিল ছেলেটি ।

সবটা ভেবে নিয়েই আমি প্রথমে গেছিলাম কলেজ মোড়ে যেখানে ছেলেটি বাস থেকে নেমেছিল । কিছুটা হাঁটার পরই রাস্তার ধারে আগাছার জঙ্গলে ফেলে দেওয়া বোতলটা পেয়ে গেলাম । এটাই সে বোতল কিনা জানার জন্য সীতাংশু বাবুকে বোতলের ছবি হোয়াটস আপ করি ।

উনি কনফার্ম করেন । এরপর ছেলেটিকে চিহ্নিত করি । খুব কায়দা করে ছেলেটির সাথে ভাব জমাই । ওর হাতের ছাপ সংগ্ৰহ করি আমার পেনে । সাবধানে আমার পেন আর বোতল দুটোই পাঠাই ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্টের কাছে । রিপোর্ট আসে দুটোই এক জনের । এরপর লালবাজারে আমার দাদা স্থানীয় মিস্টার বটব্যালকে সব বলি । উনার সাহায্য চাই । এর আগেও অনেক ব্যাপারে উনি আমাকে সাহায্য করেছেন ।

উনি রাজি হয়ে যান । ছেলেটিকে তুলে আনা হয় লালবাজারে । থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করতেই সমস্ত কিছু স্বীকার করে । এরপর তুলে আনেন মেয়েটির সৎ বাবাকে । মুখোমুখি বসানো হয় দুজন কে । প্রথম দিকে খুব হুঙ্কার ছাড়লেও পরে ঝিমিয়ে পড়েন মেয়েটির বাবা ।

স্বীকার করেন তার অপরাধ । সমস্ত এভিডেন্স এই প্যাকেটে রয়েছে । ছেলেটি এবং মেয়েটির সৎ বাবা এখন লালবাজারের লক আপে । খুনের পরিকল্পনা ,খুন , পুলিশকে মিথ্যা স্টেটমেন্ট দেওয়া এবং সর্বপরি আদালতকে ভুলপথে চালিত করার জন্য তারা অভিযুক্ত ।

আশাকরি , মুরুলী বাবু , এখন আর আপনার কোনো অসুবিধা থাকলো না সীতাংশুবাবুকে নির্দোষ প্রমান করার । মাই ওয়ার্ক ইজ ডান । এবার আমার ফিজ টা দিয়ে দিন । সকলকে ধন্যবাদ ।

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: