তিনি আসবেন // সুব্রত মজুমদার // ১

sahityautsab.com

“হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ স্যার !”  একটা সুরেলা নারীকণ্ঠে সম্বিত ফেরে বিক্রমের।  বিমানসেবিকাটি এখনো তার দিক ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি গলায় কথাগুলো আবার আওড়ে গেল মেয়েটি। বিক্রম বলল, ” আই’ম স্যরি। ইটস জাস্ট এ মিস্টেক।”  মেয়েটি একগাল হেঁসে চলে গেল।

  বিক্রম চলেছে হুয়াকোপা। হুয়াকোপা হল মেক্সিকোর চিয়াহুয়াহুয়া রাজ্যের একটা আর্কিওলজিক্যাল এলাকা। কাল রাত্রেই স্কাইপেতে কল করেছিল মারিয়া । মারিয়ার পুরো নাম মারিয়া দেল ইসাবেলা। সে স্থানীয় আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামের ডিরেক্টর। বছর চারেক আগে দিল্লির  একটা আর্কিওলজিক্যাল সামিটে অংশনিতে এসেছিল মারিয়া, সেখানেই বিক্রমের সাথে তার পরিচয়।

   সময়টা ছিল  পৌষ মাসের এক সকাল বেলা। পা হতে মাথা পর্যন্ত লেপমুড়ি দিয়ে  সুখনিদ্রা যাচ্ছিল বিক্রম। হঠাৎ করে মোবাইলটা বেজে উঠতেই খুব বিরক্ত হল বিক্রম, লেপের ভেতর হতেই সে হাত বের করে মোবাইলটা তুলে নিল।

“হ্যালো, বিক্রম মুখার্জি স্পিকিং…. “

অপর দিক হতে  একটা পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেঁসে এল। “আমি নিউ ডেলহি আর্কিওলজিক্যাল সামিট এর কনভেনর জিগনেশ দেশাই বলছি।”

-“আপনি কি এর আগে কলকাতায় পোষ্টিং ছিলেন ? “

-” হ্যাঁ, আমি আগে ক্যালকাটায় পোষ্টিং ছিলাম। কিন্তু আপনি কিভাবে জানলেন বলুন তো ! “

-” এটা এমন কিছু রকেট সাইন্স না, জাস্ট দুইয়ে দুইয়ে চার। আপনি পরিস্কার বাংলা বলেন আর এটা সম্ভব বাংলার কোথাও অথবা কলকাতায় যদি জীবনের অনেকটা সময় কাটে তবেই। এক্ষেত্রে আপনার ক্ষেত্রে চাকরি সূত্রে কলকাতায় বহুদিন বসবাসের ব্যাপারটাই প্রাওরিটি পাচ্ছে। সে যাই হোক আপনার কথা বলুন। “

ওপার হতে একটা কাশির আওয়াজ এল। দেশাই সাহেবের বোধহয় খুব ঠান্ডা লেগেছে। তিনি বললেন,” এখানে একজন সুইডিশ পুরাতাত্ত্বিক মারা গেছেন, ছুরিবিদ্ধ হয়ে। সে সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন আরেকজন পুরাতাত্ত্বিক মারিয়া দেল ইসাবেলা। পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মারিয়া অ্যারেস্ট হলে গোটা সামিটটাই বরবাদ হয়ে যাবে। তাই আমি চাইছি আপনি আসুন। আসল খুনিকে খুঁজে বের করে আমাদেরকে বাঁচান। “

     বিক্রম দিল্লি গিয়ে কেসটা সলভ করেছিল। আর মিঃ দেশাইয়ের কথাটাই সত্যি, মারিয়া খুনি নয়। বিক্রম আসল খুনিকে খুঁজে বের করে মারিয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিল। ( পরবর্তী কোন সময় এই কেস নিয়ে লিখব। )

যাবার সময় মারিয়া ছলছল চোখে বলেছিল,” আমি কিভাবে আপনার ঋণ শোধ করতে পারবো জানি না তবে আশা রাখব আপনি আপনার এই বন্ধুটিকে ভুলবেন না।”

বিক্রম বলেছিল, “ভারতীয়রা একবার যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার হাত ছাড়ে না।”

আজকে সময় এসেছে সেই কথা রাখার। কাল রাতে কথা বলার সময় মারিয়াকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বিক্রমকে মারিয়া বলেছিল,” তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন বিক্রম। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হুয়াকোপায় চলে এসো। সব খরচা আমার। “

” কিন্তু সমস্যাটা কি সেটা বলবে তো। ” বিক্রম উদ্বিগ্ন হয়।

মারিয়ার নির্লিপ্ত উত্তর, “এখানে এসো, সাক্ষাতে কথা হবে।”

বিমান হতে নেমে ট্যাক্সিতে করে সোজা হুয়াকোপা। হুয়কোপার যে অংশে বিক্রম এসেছে সেটা একটা শহরতলী মতো এলাকা। চারপাশে কাঠ ও কংক্রিটের বাড়িঘর, বেশিরভাগই টিন দিয়ে ছাওয়ানো। একটা বড়সড় বাড়ির সামনে ট্যাক্সিটা থেমে গেল। এটাই হুয়াকোপার প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ও সেই বিষয়ক অধিদপ্তর।

মারিয়া সদর দরজার সামনেই অপেক্ষা করছিল। বিক্রমকে গাড়ি হতে নামতে দেখে সে হাসিমুখে এগিয়ে এলো । শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বিক্রমকে নিয়ে গেল মিউজিয়াম সংলগ্ন তার  কোয়ার্টারে। বিশাল হল, প্রমাণ সাইজের তিনটে ডেকোরেটেড বেডরুম, কিচেন, স্টাডি – – মোটকথা বিলাসবহুল।

এখানকার তাপমাত্রা অনেক কম। কিন্তু আর্দ্রতা অনেকটাই বেশি। মারিয়ার হলে এসি চলছে। একজন মোটাসোটা লোক বিক্রমের লাগেজ নিয়ে সর্বদক্ষিণের রুমটাতে রাখল। মারিয়া বলল, “দক্ষিণের রুমটায় তোমার থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে নাও ঝটপট। কফি খেতে খেতে কথা হবে।”

কফিতে চুমুক দিতে দিতে বিক্রম বলল, “এবার বলো, এত তড়িঘড়ি করে আমাকে তলব কেন।”

মারিয়া বলল, “আমি একটা জটিল সমস্যায় পড়েছি বিক্রম। অন্য কাউকে বললে সে চোখ বন্ধ করে বলে দেবে এটা একটা সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম। আমি আশা করব তুমি আমার সমস্যাটা বুঝবে। “

বিক্রম পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বলল, “কিন্তু সমস্যাটা কি ? “

মারিয়া শুরু করল,” তুমি নিশ্চয় জান যে হুয়াকোপা একটা প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। ইনকা সভ্যতার অনেক চিহ্নই এ এলাকা খননের খলে আবিষ্কৃত হয়েছে। কিছুদিন আগে আমি ও আমার টিম একটা এলাকায় খননকার্য্য চালাই। সেখানে গুহার ভেতরে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুর সঙ্গে একটা মমি পাওয়া যায়।

একদম অবিকৃত মমি। মমিটার মাথার উপর সোনার শিরোবন্ধনিতে উৎকীর্ণ ছিল – “ইনটিপ ছুরিন” যার অর্থ সূর্যের সন্তান। যেদিন মমিটা আবিষ্কৃত হয় সেদিন সন্ধ্যায় এসে বাথরুমে ঢুকেছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম বাথরুমের দেওয়ালে একটা ছায়া। মানুষের ছায়া। কিন্তু বাথরুমে মানুষের ছায়া কিভাবে আসবে ? তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম, কোথাও কিচ্ছু নেই। এর পর হতে ছায়ামূর্তিটা আমাকে সবজায়গায় ফলো করছে। বিক্রম তুমি কিছু একটা করো। “

…. চলবে

Facebook Comments

Published by Story And Article

Word Finder

0 0 vote
Article Rating

Leave a Reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
%d bloggers like this: