তিনি আসবেন // ২ // সুব্রত মজুমদার

————
তিনি আসবেন // ২ // সুব্রত মজুমদার

বিক্রম কিছু না বলে হা হা করে হেঁসে উঠল। অমনি মারিয়া বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমানে গাল ফুলিয়ে বলল,” আমি জানতাম আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না ! ” মারিয়ার চোখে জল এসে গেল। বিক্রম উঠে এসে মারিয়ার মাথায় হাত রাখল।

বিক্রম বলল,” আমি সবসময়ই তোমার সাথে আছি। আর অবিশ্বাস আমি করছি না, অন্তত যতক্ষণ না আমার তদন্ত শেষ হচ্ছে। তুমি শান্ত হও।”

———–

রাত্রের খাবারটা নেহাত মন্দ ছিল না। স্টার্টার হিসাবে সালসা সহ চিপস, স্যালাড, চিকেন দিয়ে বানানো টাকো, ইয়োলো রাইস, ওয়াইন, সুইটস।বিক্রম ড্রিঙ্ক করে না। মারিয়ারও পানদোষ নেই। তবুও বিক্রমের সন্মানে ওয়াইন আনা হয়েছে। খাওয়া দাওয়া সেরে বিক্রম শুয়ে পড়ল, অনেক জার্নি হয়েছে তার। ক্লান্তি সত্ত্বেও ঘুম আসতে চাইছে না। এটা অনেকেরই হয়, নতুন জায়গায় শুলে ঘুম আসে না। কিন্তু বিক্রমের তো সেরকম কিছু নেই, – সে তো সব জায়গাতেই সাবলীল।——–

               বিক্রম বিছানা হতে উঠে বাথরুমে গেল। ছোটবেলায় খুব গরমে যখন ঘুম আসত না তখন মা বলত, ” হাত পা মুখ ভালো করে ধুয়ে আয়। এক্ষুনি ঘুম চলে আসবে।”  বিক্রম কুয়োতলায় গিয়ে হাত পা মুখ ভালো করে ধুয়ে আসত। একটু পরেই দু’চোখ জুড়ে নেমে আসত ঘুম। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। টেবিলে রাখা জাগ হতে একটা কাঁচের গ্লাসে জল ঢেলে নিল বিক্রম। এরপর বাথরুমে গিয়ে হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল।———-

          বিছানায় শুয়ে মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল সে।

প্রবল একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল বিক্রমের। চোখ খুলে তাকাতেই বিক্রমের স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে এল। একটা ছায়ামূর্তি হাঁটুগেড়ে তার বুকের উপর বসে আছে, বিচিত্র এক গন্ধে গা গুলিয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিক্রমের সম্বিত ফিরে এল। বিক্রম এক ঝটকায় উঠে বসল। ছায়ামূর্তি বিক্রমের দুই কাঁধে চাপ দিয়ে ফের শুইয়ে দেবার চেষ্টা করল, কিন্তু সফল হল না। বিক্রম কষে লাথি লাগালে ছায়ামূর্তির পেটে।————

ধস্তাধস্তিতে যখন চরম পর্যায়ে উঠেছে ঠিক তখনই ঘরের লাইট জ্বলে উঠলো। আর ম্যাজিকের মতো ছায়ামূর্তি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। হাঁই তুলতে তুলতে বিক্রমের দিকে এগিয়ে এল মারিয়া। বিক্রম কিছু বলার আগেই মারিয়া নৈশব্দ ভাঙল।————-

” রাতে ঘুম আসছিল না। যদিবা একটু তন্দ্রা এল তো সেই উপদ্রব । কপালে একটা বরফ শীতল স্পর্শ পেয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। টর্চ হাতে বাইরে আসতেই তোমার রুম থেকে একটা ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেলাম। দরজা ভেজানোই ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা কি ?”———-

বিক্রম এবার বেশ অবাক হল, ” ব্যাপার কি মানে ! আমাকে প্রাণে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। অ্যান আননোন কালপ্রিট ! অ্যান আননোন স্মেল। এখনো বাতাসে আছে গন্ধটা। “

মারিয়া হাঁসল,” নো মাই ডিয়ার, কোনো গন্ধ আমি পাচ্ছি না। আর আমি ঢুকে ঘরের ভেতরে কাউকেই দেখিনি। তুমি কাল্পনিক কারোর সাথে লড়াই করছিলেন। “————

মারিয়া জলের জাগটার কাছে গিয়ে কি যেন লক্ষ্য করল। তারপর বলল,” এ মা তোমার জাগে জল নেই তো ! কাজের লোকগুলো আজকাল খুব ফাঁকিবাজ হয়ে উঠেছে। কোনো ব্যাপার নেই আমি এনে দিচ্ছি। ”     বিক্রম বলার চেষ্টা করল যে জাগে যথেষ্ট জল আছে কিন্তু তার আগেই মারিয়া জাগ আর গ্লাস নিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে গেল।————

বাকি রাতটুকু আর ঘুম হয়নি। মারিয়া এল মিনিট পনেরো পরে। বিক্রম বলল,” ঘুমের বারোটা বেজে গেছে। চল বাইরে গিয়ে বসি। “

বিক্রম আর মারিয়া গিয়ে বসল রাস্তার ধারের বেঞ্চে। স্ট্রিট লাইটের আলোতে জায়গাটা মোহময় লাগছে। মৃদু মৃদু হাওয়ায় শরীর ও মন দুটোই শীতল হয়ে এল। মারিয়া বিক্রমের কাঁধে হাত রাখল। তারপর স্থানীয় কোনো ভাষায় গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল। ভাষা বোঝা না গেলেও বেশ বোঝা যায় যে এটা কোনো প্রেমসঙ্গীত।—–

বিক্রমের মনকে  এখনো তোলপাড় করে চলেছে আজকের রাতের সেই ঘটনা।  কে ওই ছায়ামূর্তি  ?  আর ওই বিচিত্র গন্ধটাই বা কিসের ? না মাথা কাজ করছে না। এরকম দিন যে আসবে সেটা বিক্রম স্বপ্নেও ভাবেনি। বিখ্যাত গোয়েন্দা বিক্রম মুখার্জির মাথা কাজ করছে না…… হরিবল !!

————-

           ভোরের দিকে বিক্রম ঘুমোতে গেল। ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল আটটা। উঠে ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসতেই দেখল মারিয়া কফির পট নিয়ে বসে আছে। মারিয়া হাঁসিমুখে উঠে দাঁড়াল, ” গুড মর্নিং বিক্রমবাবু।”

————

বিক্রম একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। মারিয়া দুটো কাপে কফি ঢালল। কফির সঙ্গে অ্যাপিটাইজার ও স্ন্যাকসেরও কমতি নেই। কর্ণ ডিপ, অ্যাভক্যাডো সালসা, নাচোস, ম্যাক্সিকান পিনহুইল আরো কত কি। কফি খেতে খেতে মারিয়া বলল, ” চলো, সাইটে যাব।”

বিক্রম বলল,” সেই সাইট, যেখানে মমিটা পাওয়া গেছে ?”

————

মারিয়া মাথা নেড়ে সন্মতি প্রকাশ করে বলল, “হ্যাঁ, কাজ এখনো কিছুটা বাকি আছে। আশা করছি দু’একদিনেই কাজটা শেষ হয়ে যাবে।”

————-

পাহাড়ের সানুদেশে শহর। দু’পাশে বাড়িঘর আর মাঝখানে পাকা রাস্তা। গাড়ি ছুটে চলেছে সেই রাস্তা দিয়ে। স্পিড লেখা বোর্ডগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে একটা ডানাওয়ালা মূর্তি বসে আছে। গাড়িটা সেই মূর্তিটিকে পেরিয়ে ছুটে চলেছে শহর থেকে দূরে।

———-

শহর পেরিয়ে গাড়ি যখন সবুজ প্রান্তরে প্রবেশ করল তখন গোটা দৃশ্যপটটাই বদলে গেল। মাঝে রাস্তা আর তার দু’পাশে সবুজ প্রান্তর। মাঝে মাঝে সবুজে ঘেরা অনুচ্চ হতে মাঝারি আকৃতির টিলা। মাঝে মাঝে মোবাইলের টাওয়ার আর উচ্চ বিদ্যুৎবাহী তার।————

কিছুদূর যাবার সামনে দেখা গল কালচে সবুজ রঙের পাহাড়ের শ্রেণী নীল আকাশের সাথে মিশেছে। পাহাড়ের কাছাকাছি   যখন গাড়ি পৌঁছল তখন সকাল সাড়ে নয়টার মতো। এ অঞ্চলে আগেও খননকার্য্য হয়েছে বলে পর্যটকদের ভিড় লেগে আছে।————

গাড়ি হতে নেমে পড়ল বিক্রম আর মারিয়া। মারিয়ার টিম সাইটেই আছে। পাহাড়ের কাছাকাছি অনেকগুলো দোকান। দোকানগুলোতে ইনকাদের মুখোশ, আর্টিফ্যাক্ট ইত্যাদির নকল বিক্রি হচ্ছে। ওসব কেনার জন্য পর্যটকদের ভীড় যথেষ্টই।————-

হঠাৎ একটা দোকানের সামনে  একটা পরিচিত মুখ নজরে পড়ল বিক্রমের। আরে উনি কে ? অঘোরবাবু ? হ্যাঁ, অঘোরবাবুই তো। কিন্তু যে অঘোরবাবু জীবনে কোনোদিন দার্জিলিং গেলেন না তিনি এই বিদেশ বিভুঁইয়ে !———–

সামনে এগিয়ে গিয়ে অঘোরবাবুকে পাকড়াও করল বিক্রম। বিক্রম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল, “আপনি এখানে !”

অঘোরবাবু তার পেটেন্ট করা হাঁসি হেঁসে বিক্রমকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, “চলে এলাম মশাই। আপনি বাড়িতে নেই, কেমন খাঁ খাঁ করছিল পাড়াটা।”————-

বিক্রমের মুখ হাঁ হয়ে এল। সে বলল, “কবে এলেন ? আর ধুতি পাঞ্জাবী পরেই।”

অঘোরবাবু বললেন, “বাঙালি ধুতি পাঞ্জাবী পরবে না তো কি ঘাঘড়া চোলি পরবে মশাই !  সুজ্জি দেবতার ব্যাটার মমি দেখলেন ?”

————

অঘোরবাবুর কথায় বিক্রমের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। এ কি করে হয়, মমির কথা অঘোরবাবু জানলেন কিভাবে ? ”  বিক্রমের চিন্তাসূত্রে ছেদ পড়ল ।কাঁধে হাত রেখেছে মারিয়া। কিন্তু অঘোরবাবু গেলেন কোথা ?

     মারিয়া বলল, “এখানে বসে হাওয়ার সাথে কি কথা বলছ ? অ্যানি প্রবলেম ? “

————

.. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *