তিন্নির অসুখ – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

ছোটখাটো ঝামেলা লেগেই থাকত

অনুসূয়া আর বিক্রমের মধ্যে।

ঝামেলার পাহাড়টা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হল,

ছোট্ট তিন্নির কতই বা বয়স তখন,

চার কি পাঁচ,

এই ঝামেলার মাঝে তিন্নির বিচিত্র শৈশব।

তিন্নির ঠাম্মি সাথে পাঁচে নেই,

তিন্নির ঐ একটাই আড়াল।

বাবার অফিসে মিটিং, খুঁজে না

পেয়ে ফাইল, ছুঁড়ল এ-দিক ও-দিক,

অগ্নিতে ঘি দিল, মা অনুসূয়া,

ধুন্ধুমার কান্ড, ছোট্ট তিন্নি কোথায় পালায়?

বাগানের একপাশে চুপ করে বসে,

দ‍েখে পায়রার সংসার, মিলেমিশে আছে বেশ,

এমন যদি ভাব হোত তার বাবা মা-র,

উঁহু – -কি ভীষন কান্না আসে তার।

অফিসের পার্টিতে মদ গিলেছে বাবা তার,

বাড়ি এসে যত রাগ মায়েরই ওপরে,

খাটের তলাতে তিন্নি ভয়তে লুকোয়;

ইডিয়েট,বাস্টার্ড কি যে সব নাম,

তিন্নি ভাবে ওগুলো কি তার মায়ের আসল নাম।

এইভাবে দিন কেটে যায় তিন্নির

পেন্সিলে, কাগজে- প্রজাপতি উড়িয়ে;

ঘুড়ি আঁকে মন দিয়ে, আকাশ আরও ভাল।

রাস্তার কত কি মন দিয়ে দ‍েখে,

স্কুলবাসটা বড় ভাল লাগে;

দাদা-দিদি, হাসি-খুশি, গান গেয়ে,

হেসে-খেলে রাস্তা ফুরোয়।

ড্রয়িং-এর দিদিমণি বললেন ওদের,

ভাল কে আঁকতে পারে, দেখাও তো বেশ,

বাবা-মার ছবি আঁকো, সাথে তুমিও।

লেগে পড়ে তিন্নিরা কাগজে, তুলিতে,

এর আঁকা ও দ‍েখে লুকিয়ে -চুরিয়ে।

মন দিয়ে তিন্নি আঁকতে থাকে,

বাহ্! কি সুন্দর দিদিমণি বলে,

প‍্যালেটের জল আর চোখের জলেতে

খাতায় আঁকা শেষ হল।

একে একে সবাই বাড়ালো খাতা,

মাথা নীচু করে তিন্নি বসে থাকে ঠায়।

দিদিমণি কাছে এসে খাতা খুলে দ‍েখেন,

বাবা-মা আছে তবে উল্টো মুখে,

মাঝখানে তিন্নির দুখী দুখী মুখ,

তিন্নির নীচু মাথা, চোখের জল,

ড্রয়িং দিদিমণিকে উৎসুক করল,

কথায় কথায় কথাটা স্টাফরুম অব্দি গড়াল,

তিন্নির কাউন্সেলিং হল।

ফোঁপানো কান্নার সঙ্গে ঘরের কথাটা বাইরে এলো।

ডাক পড়ল বাবা-মায়ের, তিন্নির আঁকা দেখে

স্থির চোখ বদমেজাজি বিক্রমের,

ভেঙেচুরে যাচ্ছিল মুখ, লালচে চুলে

জাগছিল ঢেউ, তিন্নির মা স্থির;

জোড়াতালি দেওয়া জীবনটা হাঁ হয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

তাদের এই ফাটল, তিন্নির কচিমনে

যে কতটা ফাঁক তৈরী করেছে, তা

তিন্নির আঁকা ছবি চোখে আঙুল

দিয়ে দেখাল, লজ্জায় নিথর হল বাবা।

তিন্নি ভাবছে সব দোষ বুঝি তার,

করেছে কান্ডকারখানাটা এমন-ই সে,

বাড়ি এসে ঠাম্মির পেছনে লুকালো মুখ।

আশ্চর্য হয়ে দেখল, এই প্রথম বাবা বন্ধু হল,

তার ও মায়ের, আদর করল খুব, যেমনটা

ছিল ঐ পায়রাদের সুখ;

ঠাম্মির চোখে খুশির জল,

যাক, অসুখের অলক্ষ্মী বুঝি হল দূর।

নরম হাতে ফাটল ঢেকে,

এই প্রথম ঘুম গাঢ় হল

বাবা-মায়ের আদরে, পাশে ওর

টেডি, যেন মিটি মিটি হাসে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top