তিয়াসা — কানন কুমার মুখার্জ্জী

তিয়াসা  --  কানন কুমার মুখার্জ্জী

সেদিন তিয়াসার ফোনটা হঠাৎ করেই কেটে দিয়েছিল অনির্বাণ। তার মুডটাও অফ ছিল গত  কয়েকদিন ধরেই। সাথে তিয়াসার অবুঝ বাক্যবাণ অস্থির করে তুলেছিল তাকে। ফোনটা  কেটেইপানিয়ের গ্লাস টা ঢকঢক করে শেষ করে নেয় সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই  নেশার পারদে মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে তার। পরক্ষণেই মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে তিয়াসার অভিযোগপূর্ণ এবং অনুযোগপূর্ণ বার্তা…..কি হলো ফোন টা কেটে দিলে!  তোমার কি কিছু অসুবিধা হচ্ছে আমাকে নিয়ে? তাহলে বলতে পারো। 


কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে তাহলে। তাহলে আমি বাড়িতে বোলবো। তোমার এরকম ব্যবহারে আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। এরকম করে তো আর সংসার চলে না।  হ্যাঁ সত্যি! দিনকে দিন কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে অনির্বাণ। জীবনের হাসি গুলো হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সুখের তরঙ্গগুলো নিস্তরঙ্গ হয়ে গেল অজান্তেই।  তারভালোলাগা, ভালোবাসা বা সেন্টিমেন্ট গুলো যেন কেউ অনুভব করতেই চায় না। তাই সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তে নিজেকে সরিয়ে নিতে।


কিন্তু আজ তাকে বলতেই হবে নিজের অনুযোগের কথা। তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে সম্মান যেখানে ভূলুণ্ঠিত সম্পর্ক সেখানে মূল্যহীন। অস্ত্রের আঘাত একদিন শুকিয়ে যায়, কিন্তু কথার আঘাত কুরে কুরে মানুষকে শেষ করে দেয়। তাই নেশার ঘোরে কাঁপাকাঁপা হাতে মুঠো ফোনটা তুলে নেয় সে। শুরু করে  তার প্রত্যুত্তর। আমার কোথাও কোনো অসুবিধা নেই তিয়াসা। তুমি শুধু আগে নিজের দিকটা দেখো। তোমার করা অপমানে আজ আমি ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত। 

তবুও নিজের মান অপমানকে জলাঞ্জলি দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছি সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার। যেদিন থেকে আমিনিজ ভূমে পরবাসীহয়ে গেছি সেদিন থেকে সব আশাআকাঙক্ষা শেষ হয়ে গেছে। একরাশ কষ্ট  আর অভিমানের জ্বালা নিয়ে সরে আসতে চেয়েছি অনেক দূরে। নিজের কষ্টকে বুকে চেপে  রেখেও চেষ্টা করেছিলাম জীবনটাকে হাসিমুখে শেষ করতে। কিন্তু বার বার সন্দেহ,  অবিশ্বাস আর অপমানের জ্বালায় শেষ হয়ে গেলাম। আর পারলাম না। 

তাই হার স্বীকার করে নিলাম। তবে ঈশ্বরের নামে শপথ করে গর্বের সাথে আজও আমি বলতে পারি তুমিই  আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা, ভালোলাগা। সেই সম্পর্কের পবিত্রতা আজও আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। যাইহোক, অপমানিত হতে হতে সমস্ত হাসি আনন্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। বদলে ফেলার চেষ্টা করলাম নিজেকে। তবে কথা দিচ্ছি তোমাদের প্রয়োজন সব সময় পূরণ করার চেষ্টা করব।

না অনির্বাণ! এসব তুমি কি বোলছো?তুমি জানো আমি তোমাকে কত ভালোবাসি? আমি জানি তুমি এরকম হতে পারো না! কিন্তু  নিজের অভিমান কে বুকে নিয়ে তুমি নিজেকে এতটা বদলে ফেলবে আমি বুঝতে পারিনি।  তুমি আবার আগের মত ফিরে এসো অনির্বাণ। তোমাকে এরকম দেখতে আমার ভালো লাগেনা।


সরি, অনির্বান সরি। আমার ভুল হয়ে গেছে। এমনি করো না প্লিজ। এসো আমার কাছে  এসো। আবার আমাকে কাছে টেনে নাও। তোমার সাথে আমি আছি সব সময়।প্রত্যুত্তর দেয় অনির্বাণ।আমি এখন অনেক খারাপ হয়ে গেছি তিয়াসা। আমাকে বিশ্বাস কোরো না। ঠকে যাবে। এসব আমি লিখছি কারন পরবর্তী পদক্ষেপে তোমার এগোতে সুবিধা হবে। প্রমাণ করতে পারবে যে আমি এখন খারাপ হয়ে গেছি। প্রত্যেকটা রাত আমার কাছে এখন বিভীষিকা। হতে পারে আমার কৃতকর্ম আমার জীবনটা শেষ করে দিল। তোমাদের প্রতি করা অন্যায় পারো তো মাফ করে দিও।


এসব তুমি কি বোলছো অনির্বাণ? আমি চাই আমার উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে ভরিয়ে দিতে। ভুলে যাও অন্ধকার অতীত। এসো আমরা নতুন করে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি।ওপার থেকে ভেসে আসে তিয়াসার বার্তা।

অপমানিত হতে হতে আমার আর কিছু ভালো লাগে না তিয়াসা। ভুলতে চাইলেও আমি ভুলতে পারি না। আজ আমি একা, বড্ড একা তিয়াসা। তাই একা একাই গুমরে মরি। এভাবেই হয়তো

বাকিটা জীবন শেষ হয়ে যাবে। তবুও আমি কাউকে কিছু বুঝতে দিই না। অনেক অভিশাপ আমার মাথার উপর। হতে পারে আমার শেষের সেদিন আরো ভয়ঙ্কর। জানিনা কপালে কি লেখা আছে। তবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আমি যদি কোনদিন নাও থাকি, তোমরা ভালো থেকো। আমার কথাগুলো আজ তোমার নাটক মনে হতে পারে। কিন্তু ঈশ্বরের নামে দিব্যি করে বলছি কত বড় আঘাত আর অভিমান আজ আমার মুখ বন্ধ করে দিল তা বলে বোঝাতে পারবো না তোমাকে।এসব তুমি কি বোলছো অনির্বাণ? পাগল হয়ে গেলে নাকি? এসব কথা বলো না।তোমার পাশে আমরা আছি তো।আই লাভ ইউ অনির্বাণ। এরকম বোলো না।বিশ্বাস কর আমি হেরে গেছি তিয়াসা। আর পারলাম না জীবনটাকে গোছাতে। নিজেকে বড্ড একা লাগে। নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি সবার কাছ থেকে।” 

কেন অনির্বাণ? এরকম কেউ ছেলেমানুষী করে? আমার বিশ্বাস তুমি ঠিক পারবে নিজেকে আবার আগের মত করে সাজিয়ে নিতে।বিশ্বাস ভরা বার্তা ভেসে আসে তিয়াসার।জীবনটাকে আবার নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারবে নাকি অনির্বাণ জানে না। সে তো আজও অজানা পথের পথিক। গতানুগতিক জীবনে চলার পথ আজ সে হারিয়ে ফেলেছে। মুখের ভাষা স্তব্ধ হয়ে গেছে। গড়াতে গড়াতে চোখের জলও আজ শুকিয়ে গেছে। অনির্বাণ সত্যিই আজ জীবন পথেরপথ ভোলা এক পথিক‘”


Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: