তোমার হলো শুরু // সুবীর কুমার রায়

1

সকাল বেলা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আমি তো অবাক। ছয় বছরের নাতনি তার স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে মায়ের সাথে এতো ব্যস্ত, যে আমার আগমনে দু’জনের কেউই বিশেষ খুশি হলো বলে মনে হলো না। একটা খাতায় পাঁচটা ফল, পাঁচটা ফুল, ও পাঁচটা পাখির ছবি এঁকে রঙ করে আগামীকাল স্কুলে নিয়ে যেতে না পারলে নাকি দেশ, দশ, তার, ও তার স্কুলের ভবিষ্যৎ এক্কেবারে অমাবস্যার মতো অন্ধকার হয়ে যাবে।

আজ কপালে এক কাপ চাও জুটবে না বুঝে, চুপ করে বসে, তাদের কর্মযজ্ঞ অবলোকন করতে লাগলাম। বাচ্চাটা এই বয়সেই বেশ ছবি আঁকে। গোলাপ, জবা, ও পদ্ম ফুল আঁকা ও রঙ করা হয়ে গেছে, এখন গাঁদা ফুল আঁকার পর্ব চলছে। ছবি দেখে আমি তো রীতিমতো বিষ্মিত। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, যে হাজার চেষ্টাতেও ওই গোলাপ আমি আঁকতে পারতাম না। আমার আঁকা গোলাপকে লাল বা গোলাপি রঙ না করে সাদা রঙ করলে, স্বচ্ছন্দে গন্ধরাজ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

মেয়ের উদ্বিগ্নতা দেখে মনে মনে ভাবলাম, ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’। কিছু কিছু কাজ আছে, যা ন্যায় বা অন্যায় যাই হোক না কেন, অবস্থা ও পরিস্থিতির চাপে নতি স্বীকার করে আমাদের বাধ্য হয়ে করে যেতেই হয়। চোখের সামনে অনেকগুলো বছর আগের ঘটনাগুলো এক এক করে ভেসে উঠলো।

কর্মসূত্রে আমি তখন অন্য একটা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকি। প্রতি শনিবার রাতে বাড়ি এসে, সোমবার কাক ডাকার আগেই ফেরার বাস ধরতে হয়। আমার স্ত্রী, তার ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে একাই থাকে। এক শনিবার রাতে বাড়ি ফিরতেই মেয়ের কান্না শুরু হলো। কারণ, তাকে নাকি সোমবার হাতের কাজ স্কুলে জমা দিতেই হবে। একটা টবে রঙিন কাগজ দিয়ে একটা গাছ তৈরি করে লাগাতে হবে, যাতে শুধু পাতা থাকলেই চলবে না,

 

একটা ফুল ও একটা কুঁড়ি থাকাও বিশেষ প্রয়োজন। আমার স্ত্রী আবার ভারত স্বাধীন হলে, মালদা স্বাধীন হবেই, জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী। সে খুব ভালো করেই জানে, যে এহেন বিপদ, ত্রাতা হিসাবে আমাকেই সামলাতে হয়, তাই গাছ ফুল লতা পাতা তৈরি তো দূরের কথা, ওগুলো তৈরি করার উপকরণগুলো পর্যন্ত যোগাড় করে রাখার প্রয়োজনবোধ পর্যন্ত করেনি।আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, পথশ্রমে শরীরও বড় ক্লান্ত, মেয়েকে আগামীকাল তৈরি করে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্বস্ত করে কোনমতে কান্না থামালাম।

পরদিন সকালে উঠে সারা সপ্তাহের আমিষ ও নিরামিষ বাজারসহ, মুদিখানা, স্টেশনারি, দশকর্মা, ইত্যাদি দোকানপাট সেরে, গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো মেয়ের জন্য বিভিন্ন রঙের কাগজ, সরু তার, আঠার টিউব, মাটির ছোট্ট টব, ইত্যাদি কিনে বাড়ি ফিরলাম। চা জলখাবার মাথায় উঠলো, শুরু হয়ে গেল ফুল গাছ সমেত ফুলের টব তৈরির কর্মযজ্ঞ।

মাটির টবে আঠা দিয়ে রঙিন কাগজ সেঁটে, সুন্দর একটা টব, ও তিন চারটে সরু তার পাকিয়ে গাছের কান্ড ও শাখা প্রশাখা তৈরি সমাপ্ত। কারুশিল্পে নিজের এতো প্রতিভা ও নৈপুণ্য দেখে নিজেই অবাক হয়ে, নতুন উৎসাহে একদিকে আঠা মাখানো সবুজ রঙের সরু কাগজ দিয়ে তারের তৈরি গাছের কান্ড ও শাখা প্রশাখা মুড়তে গিয়ে, প্রথম ধাক্কাটা খেলাম।

আঠা মাখানো সবুজ কাগজ, তারের তৈরি গাছের কাঠামোয় জড়িয়ে হাত সরিয়ে নিতে গেলেই, হাতের সাথে অর্ধেক কাগজ উঠে চলে আসছে। শেষে আধুনিক প্রযুক্তির তৈরি দামি আঠা ছেড়ে, পুরাতন ও সনাতন পদ্ধতি, ভাত দিয়ে দিব্য একটি তরতাজা গাছ তৈরি করে, শুকাতে দিয়ে অন্য কাজে মন দিলাম।

সন্ধ্যার পর টিভিতে একটা ভালো সিনেমা দেখে, নতুন উদ্দমে কয়েকটা পাতা, ফুল, ও কুঁড়ি তৈরির কাজে হাত দিয়ে, বেশ রাতেই মিশন ফুলগাছ পর্ব সমাপ্ত হলো। আমার হাতের নিপুণ কাজ দেখে, সব কাজে খুঁত ধরা স্ত্রী পর্যন্ত মুগ্ধ, নিশ্চিন্ত আমার ছয় বছরের একমাত্র সন্তান।

পরের দিন কাকভোরে তৈরি হয়ে বিদায় নেবার আগে লক্ষ্য করলাম, যে ফুলের একটা পাপড়ি, ও ফুল ফোটার আগেই ফুলের কুঁড়িটা ঝরে পড়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। অফিস যাওয়া মাথায় উঠলো। অত ভোরে শুরু করে, ফুল ও কুঁড়ি মেরামত পর্ব যখন সম্পন্ন হলো, তখন আমার বাস আমায় ফেলে অনেক দূরে চলে গেছে।

স্কুল থেকে ফিরে পলিথিন ব্যাগ থেকে ফুলের টব বার করে মেয়ে জানালো, “দিদিমণি বলেছেন কাল দেখবেন”। দেখলাম ফুল পাতা ও কুঁড়ির বেশিরভাগ অংশই, গাছের সঙ্গ ছেড়ে পলিথিন ব্যাগে আশ্রয় নিয়েছ। সারাদিন ধরে সবকিছু আবার মেরামত করে আগের অবস্থা ফিরিয়ে এনে, চড়া সুরে মেয়েকে বললাম, যে কালও যদি দিদিমণি না দেখে, তাহলে দিদিমণিকে বলবি বাড়িতে এসে দেখে যেতে। যাহোক পরের দিন আর নতুন করে কোন সমস্যা হয়নি।

তখন কি ছাই জানতাম, যে কারও পৌষমাস কারও সর্বনাশ কথাটা কতটা সত্যি। একটু ঠান্ডা পড়তেই হুকুম হলো, উলের বটুয়া তৈরি করতে হবে। সারা বছর কোন উলের কাজ স্কুলে হয়েছে বলে তো মনে পড়লো না, কারণ আমাকে অন্তত কোন উলের গোলা কিনে দেওয়ার কথা ফরমাশ করা হয়নি। আমার কপাল ভালো, স্ত্রী জানালেন যে ওটা কোন ব্যাপার নয়, দুটো সোজা একটা উলটো ঘর বুনে আমি করে দেবো। তুমি শুধু দু’টো উলের কাঁটা ও উল কিনে এনে দিও। নির্দেশ মতো উল ও কাঁটা কিনে এনে দিয়ে, পরের দিন ভোরে নিশ্চিন্ত মনে অফিস চলে গেলাম।

পরের শনিবার ফিরে এসে দেখলাম বটুয়া তৈরি হয়ে গেছে, তবে স্কুল থেকে জানানো হয়েছে, যে বটুয়ার গায়ে চুমকি দিয়ে কাজ করতে হবে, আর বটুয়ার মুখ বন্ধ করার উলের দড়ির দু’পাশে উলের ফুল করতে হবে। শাস্ত্রে পরিস্কার বলা আছে, ‘সংসার সুখের হয় ভাঙা কুলোর গুণে’, কাজেই কোন বাড়িতে আমার মতো একজন ভাঙা কুলো থাকলে, সেই বাড়িতে দুশ্চিন্তা, ঢুকবার প্রবেশদ্বার পর্যন্ত খুঁজে পায় না।

যথারীতি এবারেও দায়িত্বটা, এই অধমের ওপরেই বর্তালো। তাছাড়া জামা প্যান্টের বোতাম ছিঁড়ে গেলে আমি যখন নিজেই লাগাই, তখন বটুয়ায় চুমকি লাগানোটা আমার কাছে স্রেফ নস্যি। তবে বটুয়ার উলের দড়ির দুপাশের উলের ফুলটা কাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়, ভেবে দেখতে হবে।

পরদিন বাজার থেকে ফেরার পথে, ঠোঙায় করে বেশ খানিকটা চুমকি কিনে বাড়িতে ফিরে এলাম। এবারের হাতের কাজের সিংহভাগ তো শেষ হয়েই আছে, কাজেই বাকি সামান্য অসমাপ্ত কাজের জন্য, হাতে অনেকটাই সময় আছে। ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে চা জলখাবার খেয়ে, প্রফুল্ল মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে কাজে বসলাম। কাজ শুরু করার আগে চুমকি জিনিসটা কি একবার পরখ করে দেখার জন্য চুমকির ঠোঙাটা খুলে, আনন্দে মন ভরে গেল।

 

চুমকি যে আবার এতো রঙের হয়, জানা ছিল না। সত্যি কতো কিছুই না, জানার ও শেখার আছে। এই জন্যই ছোট্ট বয়স থেকে আর কিছু শিখুক না শিখুক, হাতের কাজ শেখানোটা, অন্তত করানোটা বাধ্যতামুলক হওয়া উচিৎ। আমাদের সময় আমরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায়, বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই হয়ে জীবনখানা ষোল আনাই মিছে করে বসে আছি।

বটুয়ায় একটা ফুলগাছ এঁকে, গাছের কান্ড ও পাতা সবুজ রঙের, ফুলগুলো লাল রঙের, ও কুঁড়িটা হালকা গোলাপি রঙের চুমকি দিয়ে করবো ঠিক করে ফেললাম। পরিকল্পনা মাফিক একটা হলুদ রঙের খড়ি দিয়ে মেরুন রঙের বটুয়ার ওপর ফুলগাছ আঁকতে গিয়ে এবার প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। মেঝেতে বটুয়াটাকে টানটান করে রেখে যদিও বা অনেক পরিশ্রম করে একটা আবছা ফুলগাছ আঁকা সম্পন্ন হলো, কিন্তু তাকে হাতে করে ওপরে তুললেই, গাছের চেহারার আমুল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

 

অবশেষে ফুলগাছের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে, সস্তায় পুষ্টিকর একটা তারা এঁকে, তাতেই চুমকি লাগাবার জন্য সুচে মেরুন রঙের সুতো পড়িয়ে চুমকি লাগাতে গিয়ে, দ্বিতীয় ও মক্ষম ধাক্কাটা খেলাম। চুমকিতে আবার বোতামের মতো দু’টো বা চারটে ফুটোর পরিবর্তে একটা মাত্র ফুটো থাকে, এই গোপন রহস্য কে জানতো? ফলে চুমকির একদিক দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে অপরদিক দিয়ে বার করে আনলেই, সুতো সমেত সুচ বটুয়ামুক্ত হয়ে হাতে ফিরে আসছে।

 

ভুলটা আমারই, রিক্সা চালাতে পারলেই যে এরোপ্লেন চালানো যায় না, এটা আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। শেষে আর সময় নষ্ট না করে, চুমকির ফুটো দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে, চুমকির পাশ দিয়ে সুচকে ফিরিয়ে এনে, আবার সেই চুমকির একমেবাদ্বিতীয়ম ফুটো দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে, কোনরকমে সেলাই করে করে, নির্দেশমতো বটুয়াকে চুমকি দিয়ে তারকাখচিত করলাম। সান্তনা একটাই, একটু মন দিয়ে ও কবির দৃষ্টি দিয়ে দেখলেই, সেটাকে একটা তারা বলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যাহোক আমার স্ত্রীর অনুরোধে, নীচের ফ্ল্যাটের নন্দী গৃহিণী দু’পাশে উলের ফুল লাগানো বটুয়ার মুখ বন্ধ করার উলের দড়ি তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ায়, পরদিন আমি চিন্তামুক্ত হয়ে গ্রামে ফিরে গেলাম। ওম শান্তি ওম।

কথায় বলে সুখ স্বপনে, শান্তি শ্মশানে। সংসারও করবো, আবার শান্তির মুখও দেখবো, তাই কখনও হয় নাকি? কয়েক বছর পরে, তখন আমি একটা একতলা বাড়িতে থাকি। যদিও কর্মসুত্রে বর্ধমান জেলার শেষ প্রান্তে, তখনকার বিহার, বর্তমানের ঝাড়খন্ড রাজ্যের ঠিক পাশে একটা কোলিয়ারি অঞ্চলে সোম থেকে শুক্রবার থেকে, শনিবার রাতে বাড়ি ফিরি। এক শনিবার রাতে বাড়ি ফিরে মেয়ের কাছে সুসংবাদটা শুনে বুঝলাম, হাতের কাজের উৎপাত এবার প্রকৃতিকে জানার উৎপাতের রূপ ধরে, হাসিমুখে আমার সংসারে ফিরে এসেছে। একটা প্র্যাকটিকাল খাতা দেখিয়ে মেয়ে জানালো যে, এই খাতায় সাত আট রকমের গাছ ও পাতা সেলোটেপ দিয়ে লাগিয়ে, পাশে সেই গাছ বা পাতার বিবরণ লিখতে হবে। কোন্ কোন্ গাছ বা পাতা, তাও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে, তবে গাছ বা পাতাগুলো শুকনো হওয়া বাঞ্ছনীয়।

 

পরদিন বাজারে গিয়ে গ্রাম থেকে শাকপাতা বিক্রি করতে আসা বয়স্কা মহিলাদের কাছ থেকে মটর শাক ছাড়া, আর সব প্রয়োজনীয় শাকপাতা পেয়ে গেলাম। মটর শাক না পাওয়ায় চিন্তায় পড়ে গেলাম, হাতে সময় থাকলেও নাহয় মটর ভিজিয়ে মাটিতে পুঁতে মটর শাকের ব্যবস্থা করে নেওয়া যেত, কিন্তু এখন তো হাতে সে সময়ও নেই। এছাড়াও সমস্যা দেখা দিলো দু’টো। প্রথমত, স্বাভাবিক ভাবেই আমি ছাড়া ভূভারতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি শুকনো শাকপাতা কিনতে রাজি হবে না, তাই বাজারের সব শাকপাতা কীটনাশক বা বিষাক্ত সার দেওয়া হলেও, টাটকা।

 

আর দ্বিতীয়ত, আমার চাহিদা মতো তারা আমায় শাকপাতা দিলেও, আদপে সেগুলো সত্যিই সেই শাক কী না, আমার সঠিক জানা নেই। যাইহোক নেই মামার চেয়ে কানা মামা যদি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে শুকনো শাকপাতার চেয়ে টাটকা শাকপাতার ভালো হওয়া আটকায় কোন হালায়? সবকিছু গুছিয়ে কিনে ফেরার পথে একজনের দয়ায় মটর শাকের সন্ধানও পাওয়া গেল।

ছোলা ও মটরগাছ, এবং লাউপাতা ও বেলপাতা, বাজার থেকে ফেরার পথে নিয়ে এসেছি। দূর্বা, তুলসী গাছ, ও জবা পাতা বাড়ির সামান্য জমি থেকেই সংগ্রহ করে, শুকোনোর জন্য, ছাদের চড়া রোদে রেখে এলাম। বিকালের দিকে গাছ ও পাতা নিয়ে এসে দেখলাম, সেগুলো একটু নেতিয়ে পড়লেও, শোকাবার কোন লক্ষণ নেই। তখন বাধ্য হয়ে বেশ মোটা করে খবর কাগজ নিয়ে তার মধ্যে সেগুলোকে রেখে, ভালো করে অনেকক্ষণ গরম ইস্ত্রি চালিয়ে, মোটামুটি একটা বাসি বাসি অবস্থায় নিয়ে আসা গেল। মানে ড্রাই শাকপাতা না হলেও, রোস্টেড শাকপাতা অবশ্যই বলা যায়।

সমস্যা সমস্যা সমস্যা, সমস্যার কি আর শেষ আছে? প্র্যাকটিকাল খাতার পাতায় সেলোটেপ দিয়ে সাঁটতে গিয়ে দেখা দিলো নতুন সমস্যা। ছোলা, মটর, তুলসী, ও দূর্বার ক্ষেত্রে নাকি শিকড় সমেত লাগাতে হবে। পাতার ক্ষেত্রে অবশ্য এই কঠোর ধারা প্রযোজ্য নয়। বাজার থেকে আনা এক আঁটি ছোলাগাছে শিকড় থাকলেও, মটর শাকগুলো শিকড়হীন। বেল পাতা, লাউ পাতা, জবা পাতা, খাতার পাতায় সেলোটেপ দিয়ে সেঁটে, শিকড় সমেত দূর্বা ও ছোলা গাছও লাগানো হয়ে গেল। পড়ে রইলো মটর গাছ। তবে দৈনন্দিন চলার পথে যেমন সমস্যা আছে, সমস্যার সমাধানও আছে।

 

খাতার পাতায় মটর গাছকে শুইয়ে, শিকড়ের জায়গায় নিপুণ হাতে দূর্বার শিকড়কে রেখে, সেলোটেপ মেরে দিলাম। অবশ্য তার আগে শিকড়গুলোকে কাগজের তলায় রেখে বারকতক ইস্ত্রি করে নিতে ভুল করিনি। পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরে শুনলাম খাতা জমা দেওয়াতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি।

এরও বেশ কয়েক বছর পরে, আবার নতুন সমস্যা দেখা দিলো। এবারের হাড়হিম করা সমস্যার ধরণটা একটু অদ্ভুত, ও অন্যরকম। এবার একটা চওড়া ফিতে দেওয়া কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি ব্যাগ, বর্তমানের কবিদের কাঁধে যে ব্যাগ শোভা পায়, তৈরি করতে হবে। তবে ব্যাগটার দুপাশেই রঙিন সুতো দিয়ে কাঁথা স্টিচের কাজ করা ছবি থাকতে হবে, আর ব্যাগের মুখে চেন লাগাতে হবে। হাফ্ ইয়ার্লি পরীক্ষার সময় ব্যাগের একপিঠে রঙিন সুতোয় সেলাই করা ছবি জমা দিতে হবে। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় অপর পিঠের ছবি, কাঁধে ঝোলানোর ফিতে, ও চেন লাগিয়ে সম্পূর্ণ সমাপ্ত ব্যাগটা জমা দিতে হবে।

 

ঈশ্বরের অশেষ কৃপা, অনেক সময় পাওয়া গেছে, ও মেয়ে অনেকটা বড় হয়ে যাওয়ায়, মোটামুটি গোটা অধ্যায়টা সে নিজেই সামলাতে পারবে, কাজেই আমি চিন্তামুক্ত। ব্যাগের দু’পাশে কি ছবি আঁকা হবে ঠিক হওয়ার আগেই, অতি উৎসাহে মেয়ে নিজেই একটা গোলাপি রঙের কাপড়, বিভিন্ন রঙের কয়েকটা শিল্ক জাতীয় নরম সুতো কিনে নিয়ে আসলো। বুঝলাম ছবির সাথে মানানসই রঙের সুতো আবার কিনে দেওয়া ছাড়া, আমার আর কোন ঝামেলা নেই, ওটা মেনে নিতেই হবে।

পরের সপ্তাহে এসে দেখলাম আমার এক বৌদিকে দিয়ে কাপড়টাকে দু’ভাঁজ করে মানানসই জায়গায় দু’টো ছবি আঁকিয়ে এনে অনেকটাই রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করা হয়ে গেছে। কাপড়ের একপিঠে নির্দিষ্ট জায়গায় নীল রঙের পেন্সিল দিয়ে বেশ বড় বড় ছবি। শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন আঁকা ছবি দু’টো সত্যিই বেশ সুন্দর হয়েছে। কাঁথা স্টিচ না কম্বল স্টিচ জানি না, তবে বেশ সুন্দর সেলাই করেছে সন্দেহ নেই।

এইভাবে একদিন একপিঠের ছবি সেলাই শেষ হলো। হাফ্ ইয়ার্লি পরীক্ষায় সেই হাতের কাজ জমাও দেওয়া হলো, এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর স্কুলের রাবার স্ট্যাম্প লাগানো সেই অর্ধসমাপ্ত ব্যাগ স্কুল থেকে ফেরৎও দেওয়া হলো। আমি মনে মনে ভাগ্যদেবতাকে ধন্যবাদ জানালাম।

শুরু হলো দ্বিতীয় পিঠের ছবিতে সেলাই করা। এবারের গতি অনেকটাই কম, তবে অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগেই সুতোর কাজ শেষ, এবার শুধু কাঁধে ঝোলাবার ফিতে ও ব্যাগের মুখে চেন লাগিয়ে স্কুলে জমা দেওয়া। কাপড়টা দু’ভাঁজ করে ফিতে লাগাতে গিয়ে, নজরে পড়লো সেই ভয়ঙ্কর ত্রুটিটা। কাপড়ের দুই মাথার দিকে দুই কৃষ্ণের মাথার দিক আঁকা উচিৎ ছিল, অর্থাৎ কাপড়ের ওপরের দিকের কৃষ্ণ আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে মাটির দিকে পা, ও নীচের দিকের কৃষ্ণ মাটির দিকে মাথা করে আকাশের দিকে পা।

 

কিন্তু কাপড়ে নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে পরপর দুটো সোজা কৃষ্ণ আঁকায় কাপড়টা ভাঁজ করলেই একদিকের কৃষ্ণের মাথা ওপরে ও অপর দিকের কৃষ্ণের মাথা মাটির দিকে হয়ে যাচ্ছে। উলটো দিকে মাথা করে থাকা কৃষ্ণ যেহেতু এবারের পরীক্ষার ভাগে পড়েছেন, তাই সমস্যাটা আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এখন নতুন করে আর একটা ব্যাগ তৈরি করার সময়ও নেই, আর করলেও হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার স্কুলের রাবার স্ট্যাম্প দেওয়া অংশটার কি হবে?

শেষে আর কোন উপায় না থাকায় অগতির গতি, এই আমাকেই হাত লাগাতে হলো। কাপড়টাকে সমানভাবে দু’ভাঁজ করে মাঝখান থেকে ধারালো কাঁচি দিয়ে কেটে, দ্বিতীয় পিঠটা উলটো করে নিয়ে, দুটো অংশ খুব মজবুত ও সুন্দর করে সেলাই করে দিলাম। এমনভাবে সেলাইটা করা হলো, যাতে সেলাইটা ব্যাগের ভিতর দিকে থাকে, বাইরে থেকে দেখা বা বোঝা না যায়। এবার ব্যাগের বাকি কাজ সমাপ্ত হলে সেলাই করে জোড়া অংশটা খুব ভালো করে ইস্ত্রি করে দিলাম। আমি নিশ্চিত ব্যাগটা ওপর ওপর দেখে, ছবির সেলাইটা ভালো করে দেখা হবে, কাজেই এই ত্রুটি ধরা পড়ার সম্ভবনা প্রায় নেই। বাস্তবে হলোও তাই।

মেয়েকে আজ বোঝাবার ইচ্ছা ছিলো, যে অতটুকু বাচ্চাকে নিয়ে অহেতুক এতো টেনশন না করাই ভালো। এতে বাচ্চারও মনের ওপর অত্যধিক একটা চাপ পড়ে। প্রাকৃতিক নিয়মেই বাচ্চারা ঠিক সময় সবকিছু শেখে, আমরা হয়তো সেটা একটু ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চাকে রাতারাতি একাধারে রবীন্দ্র নাথ, যামিনী রায়, লতা মঙ্গেশকর, শচীন তেন্ডুলকর, চুনী গোস্বামী, বা মেরিকম তৈরি করতে গেলে, মঙ্গলের থেকে অমঙ্গলই দেখা দেবে বেশি, ফল ভালো হবে না, হতে পারে না।

 

কিন্তু শুনছেটা কে? অধিকাংশ বাচ্চার অভিভাবকরা দোকান থেকে কিনে বাচ্চার হাতের কাজ হিসাবে স্কুলে জমা দেন। স্কুলও কোন বাচ্চার নিজ হাতে তৈরি করা কোন জিনিসের থেকে, দোকান থেকে কেনা জিনিসটির সৌন্দর্যের মানের তুলনা বিচার করে, তাদেরই অধিক নম্বর দেন। অনেক আগে এক ডাক্তার ভদ্রলোককে এই ব্যাপারে খবরের কাগজে একটি বাচ্চার হয়ে তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখেছিলাম। তাঁর দাবি ছিল তিনি ওই বাচ্চাটাকে সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যাবেন। সেখানে বাচ্চাটা তার জমা দেওয়া হাতের কাজটা সকলের সামনে বসে করে দেখাবে।

যারা সুন্দর হাতের কাজের জন্য অনেক বেশি নম্বর পেয়েছে, তাদেরও ডাকা হোক, তারাও সকলের সামনে বসে করে দেখাক। তাঁর কথা স্কুল শোনেনি, শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকরাও শোনেনি। কেউ শোনে না, মেয়েই বা শুনবে কেন? এক কাপ চা খেয়ে মনের কষ্ট মনেই রেখে ফিরে এলাম।

 

 

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: