থ্রিলার : তৃষ্ণা : ডালিয়া মুখার্জী

স্টেশনের বাইরে এসে প্রিয়াঙ্কা রেইন কোট টা পরে নিলো|বিরক্তিতে ওর মুখটা কুঁচকে উঠছে, ভালো লাগে কি আর এই শীতের সময়ের অকাল বৃষ্টিকে !সাইকেল স্ট্যান্ডের থেকে সাইকেলটা নিয়ে চেপে বসে চালাতে শুরু করল |কি ভীষণ ঠান্ডা লাগছে, হাড় পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠছে ওর |হওয়ার দাপটে ভালো করে সাইকেল চালাতে পারছে না |

রাস্তায় বেশী লোক নেই, এই দুর্যোগের সময় কেই বা থাকবে বাইরে |এই সন্ধ্যে সাতটার সময়ে মনে হচ্ছে যেন অনেক রাত হয়ে গেছে, বড় রাস্তা ছেড়ে প্রিয়াঙ্কা একটা ছোট গলির পথ ধরল|গলিটা পার হলে সামনেই ওর বাড়ি, বড় জোর দশ মিনিট লাগবে সাইকেল এ যেতে|কিন্তু বৃষ্টির জন্য ইলেক্টিসিটির কোনো সমস্যা হয়েছে বোধহয় তাই গলিটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে |প্রিয়াঙ্কা সাইকেল নিয়ে গলিতে ঢুকে পড়ল, আর উপায়ও নেই ওর, এ গলিটা ছাড়া ওর বাড়ি যাবার আর রাস্তা নেই|

মোটামুটি গতিতে সাইকেলটা চালাচ্ছিল প্রিয়াঙ্কা কিন্তু অন্ধকারে হঠাৎ সাইকেলটা রাস্তার গর্তে গিয়ে পড়ল|ব্যালান্স হারিয়ে খুব জোরে পড়ে গেল ও সাইকেল নিয়ে, জল কাদায় সারা শরীর মাখামাখি হয়ে গেল |কোনোমতে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়াঙ্কা, সাইকেলটা টেনে তুললো|কি গেরো !সাইকেল এর সামনের চাকা পুরো বেঁকে গেছে|সাইকেলটা কে টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই আর |প্রিয়াঙ্কা সাইকেলএর সামনের অংশটা উপরে তুলে টানতে লাগলো ওটাকে, বেশ পরিশ্রম সাধ্য ব্যাপার, কিছুটা যাচ্ছে আবার দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে সাইকেলটাকে টানতে লাগলো |

সামান্য কিছুটা যাওয়ার পর প্রিয়াঙ্কার মনে হল কেও যেন ওর পেছনে আসছে, গলিতে জমে যাওয়া বৃষ্টির জলে ছপছপ আওয়াজ হচ্ছে| ওর সারা শরীর ভয়ে কেমন যেন কেঁপে উঠল, এই অন্ধকারে গলিতে যদি কোনো বদমাইশ লোক হয় !আবার পরের মুহূর্তে ভাবল কিছুটা গেলেই তো ওর পাড়া, ওর পরিচিত কেও হতে পারে |প্রিয়াঙ্কা দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালো কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেল না, অদ্ভুত ভাবে ওর পেছনে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে পায়ের আওয়াজ টাও বন্ধ হয়ে গেছে |

ও কি ভুল শুনলো তাহলে একটু আগে? আবার চলতে শুরু করল ও, কিন্তু এ কি !আবার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ছপছপ করে|তারমানে সত্যিই কেও ওর পেছনে আসছে, কিন্তু সে যেই হোক সে ওকে অনুসরণ করছে |প্রিয়াঙ্কা কি করবে ভেবে পেল না!একবার ভাবল সাইকেল ফেলে ছুটে পালিয়ে যায়, কিন্তু পরের মুহূর্তে ভাবল সেটা ঠিক হবে না |সাইকেলটাকে আগের মতই তুলে ধরে ও প্রায় ছুটতে শুরু করল, সামনে পুকুরের ধারের বাড়ীটা ওর বাবার বন্ধু চ্যাটার্জী কাকুর, ও কোনো মতে গিয়ে ওদের বাইরের গেটের কাছে সাইকেলটাকে ফেলে জোরে দরজায় আঘাত করতে লাগলো |

চ্যাটার্জী কাকু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে ঘরের ভিতর থেকে আসা আলোয় ওকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “কি হয়েছে রে? এই বৃষ্টিতে অন্ধকারে তুই? কোনো বিপদ হল নাকি? “প্রিয়াঙ্কা বলল, “কাজ থেকে আসছিলাম, হঠাৎ চাল মিলের গলিটাতে কেও যেন সমানে ফলো করছে !”এর মধ্যে ওনার স্ত্রী সীমা কাকিমা বেরিয়ে এসেছেন, উনি বললেন, “লোডশেডিং এর অন্ধকারে কোনো বদমাইশ মনে হয় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছিলো, তুই ভেতরে আয়, একদম ভিজে গেছিস যে|

“চ্যাটার্জী কাকু একটা জোরালো টর্চ এনে আলো ফেললেন বাইরে, কিন্তু কেও নেই আশেপাশে |উনি বললেন, “লোকজন দেখে পালিয়েছে, চল, তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি |”এবার প্রিয়াঙ্কার লজ্জা হতে লাগলো, বয়স্ক মানুষ দুটো একাই থাকেন কারণ ওদের ছেলে দীপুদা দিল্লীতে থাকে কর্মসূত্রে, এভাবে শীতের বৃষ্টিতে ওদের কষ্ট দিতে খুব খারাপ লাগছে ওর |

প্রথমটাতে ভয় পেলেও এখন ও সামলে নিয়েছে, তাই বলল, “না গো তোমাদের কষ্ট করতে হবে না, আমি যেতে পারবো, আর তোমরা মাকে কিছু বোলো না শুধুশুধু টেনশন করবে|” সীমা কাকিমা বললেন,”সে নাহয় বলবো না, কিন্তু বদমায়েশিটা করছিলো কে?

“প্রিয়াঙ্কা বললো, “আমি কাল পাড়ার সবাই কে বলবো, পাড়ার প্রায় কাছে গলির মধ্যে কে এমনটা করছে জানতে নিশ্চয়ই হবে |

“প্রিয়াঙ্কার জোরাজুরিতে চ্যাটার্জী কাকু না গেলেও নিজের দরজা থেকে টর্চ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, ওনাদের বাড়ি থেকে প্রিয়াঙ্কার বাড়ি কাছেই প্রায় |ওনারা আসলে ওর লড়াইটাকে কদর করেন |

প্রিয়াঙ্কার বাবা যখন ও কলেজের ফাইনাল ইয়ারে পড়ে তখনি হঠাৎ মারা যান, তাই কলেজে পাশ আউট হয়েই নিজের চেষ্টায় একটা চাকরি যোগাড় করতে হয়েছে প্রিয়াঙ্কাকে |চাকরিটা আহামরি কিছু না হলেও প্রিয়াঙ্কা আর ওর মায়ের কোনো মতে চলে যায় |প্রিয়াঙ্কা প্রায় দুইবছর হল এই ভাবে ওদের এই মফঃস্বল শহরটা থেকে কলকাতা যাতায়াত করে প্রতিদিন কাজের জন্য |কিন্তু আজকের মত ঘটনা ওর সঙ্গে আগে ঘটেনি|

প্রিয়াঙ্কা খুবই সাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী মেয়ে, হঠাৎ করে প্রথমে ভয় পেলেও এখন মনকে শক্ত করল |ওর মা ও আজ বাড়ি তে নেই, তিনি গেছেন প্রিয়াঙ্কার দিদি শ্রেয়ার বাড়িতে, বাবা মারা যাবার আগেই ওর দিদির বিয়ে হয়ে যায় |ওর দিদি র এক মাস হলো বাচ্ছা হয়েছে, দিদি শ্বশুরবাড়িতেই আছে কিন্তু দেখাশুনা করার জন্য মা ওখানে আজ সকালেই গেছেন |মা চেয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কাও ওখানেই থাকুক আজ থেকে |

কিন্তু প্রিয়াঙ্কার লোকের বাড়ি থাকা পোষায় না, তাছাড়া দিদির বাড়ি থেকে ওর অফিসটাও দূরে, তাই ও মাকে বলেছিল, “তুমি চিন্তা কোরো না, আমি সব ঠিক ম্যানেজ করে নেবো |”মা তবুও কিন্তু কিন্তু করছিলেন ওর বাড়িতে একা থাকা নিয়েও, প্রিয়াঙ্কা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল|

মা বলেছিলেন, “একটা কমবয়েসী মেয়ে রাতে একা থাকবি তাই ভাবছি|”তবুও শেষে প্রিয়াঙ্কার আশ্বাস বাণীতে গেছেন শ্রেয়ার বাড়ি আজ, কি করবেন বড় মেয়েরও এখন তাকে প্রয়োজন | থাকগে, প্রথমে গলিতে ভয় পেলেও এখন ও নিজের বাড়ি পৌঁছে গেছে, অতএব ভয় নেই আর |

দরজার তালা খুলে সাইকেলটা কোনো মতে ঢোকালো ভেতরে, ওদের ছোট একতলা বাড়ি, সামনে একটুকরো উঠোন যেটা প্রাচীর ঘেরা |উঠে সামনে বারান্দা আর দুটো ঘর, বারান্দার এক পাশে রান্না করে ওরা|ওদের বাথরুমটা উঠোনের একদিকে, এটাই সমস্যা, ঘর সংলগ্ন বাথরুম নয় তাই উঠোন পেরিয়ে আসতে হয় |

প্রিয়াঙ্কা বারান্দার গ্রিল খুলে ঢুকে আগেই চার্জার লাইট জ্বালালো, রুম দুটোর দরজা খুলল|তারপর একটা টপ আর ক্যাপ্রি নিয়ে চার্জারটা হাতে নিয়ে টয়লেটে গেল, বাথরুমে দরজা বন্ধ করে জামা কাপড় গুলো রেখে নিজের নোংরা জামা কাপড় খুলে কাচতে লাগলো, বাড়িতে কেও না থাকলেও দরজাটা বন্ধই করেছে ও, না হলে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে |

ঠান্ডা ভীষণ জল টা, কিন্তু আর গরম জল করতে মন চাইল না| হঠাৎ ওর মনে হল একটা ধুপ করে আওয়াজ হল, কলটা বন্ধ করে স্থির হয়ে গেল ও, কান খাড়া করে শুনলো |বেশ কিছুক্ষন গেল, আর কিছু শুনতে পেল না |ধীরে ধীরে বাথরুমে র দরজা খুলে প্রিয়াঙ্কা বেরোল, ছোট উঠোনটা অন্ধকারে যতটা দেখা যায় দেখল, কেও নেই |

ও ঘরের দিকে এগোলো, বারান্দার গ্রিল পর্যন্ত পৌঁছেছে শুনলো পেছনে কারোর পায়ের আওয়াজ, চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চার্জার আলো সরাসরি ফেললো, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে !প্রিয়াঙ্কার শিরদাড়া দিয়ে হিম স্রোত বয়ে গেল, ভয়ে জড়ানো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কে… কে ওখানে !!”স্পষ্ট উত্তর এল, “আমি “|প্রিয়াঙ্কা শুনলো একটা অদ্ভুত গলার স্বর, সেই স্বর না মেয়েলি না পুরুষের, ভয়ে ছুটে বারান্দায় উঠে গ্রিল লাগাতে গেল ও |

ততক্ষনে আগন্তুক এগিয়ে এসেছে, একটা সতেরো, আঠেরো বছরের ছেলে বোধহয়, লম্বা, একহারা চেহারা |দ্রুত এসে ছেলেটা একটা ধারালো ছুরি দিয়ে প্রিয়াঙ্কার হাতের উপর আঘাত করল, রক্তের ধারা বেরিয়ে এল, প্রিয়াঙ্কা গ্রিল বন্ধ করতে পারল না, ততক্ষনে ছেলেটা গ্রিল ঠেলে ঢুকে এসেছে ভেতরে, দ্রুততার সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার মুখ চেপে ধরেছে !

ঘটনা টা ঘটলো কয়েক মিনিটের মধ্যে, প্রিয়াঙ্কা চিৎকারটুকুও করতে পারল না, ছেলেটার হাতের চাপে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে |ছেলেটা ওকে এক ঠেলা দিয়ে ঘরে ঢোকালো, এতক্ষন চার্জার লাইটটা উল্টে পরেছিল এক পাশে, ছেলেটা প্রিয়াঙ্কার মুখ একটা রুমাল দিয়ে বেঁধে ফেলেছে, হাত দুটো বাঁধলো দড়ি দিয়ে শক্ত করে |চার্জার লাইটটা নিয়ে ঘরে ঢুকলো, প্রিয়াঙ্কা বিস্ফারিত চোখে দেখল এতক্ষন যাকে ও ছেলে ভাবছিল সেটা একটা মেয়ে !

ইচ্ছে করে ছেলেদের মত ছোট চুল কেটেছে আর পড়ে আছে একটা জেন্টস জ্যাকেট আর জিন্স, মুখে কেমন যেন একটা নিষ্ঠুরতা, সব চেয়ে ভয়ঙ্কর ওর চোখ দুটো, কেমন যেন অস্বাভাবিক লালচে আর হিংস্র!কিন্তু একে ও দেখেছে আগে, প্রিয়াঙ্কার মনে পড়ল এই অদ্ভুত মেয়ে টাকে ও প্রায় এক সপ্তাহ আগে ট্রেনে দেখেছিলো, হাওড়া থেকে ওর কম্পার্টমেন্টএ উঠেছিল, এমনকি ও যখন নেমেছিল ট্রেন থেকে তখন মেয়েটাও নেমেছিল পেছন পেছন |

স্টেশনে পরিচিত বন্ধু কৌস্তভ এর সঙ্গে দেখা হতে ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি চলে এসেছিল প্রিয়াঙ্কা, তাই এই মেয়েটা কোনো দিকে চলে গিয়ে ছিল লক্ষ্য করেনি |ভুলেই গিয়েছিল ও মেয়ে টাকে, কিন্তু এখন অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে ওরা মুখোমুখি|মেয়েটা জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল অদ্ভুত ভাবে, ওর মুখের ভেতরে সারিবদ্ধ দাঁত কিন্তু ঠোঁটের দুই পাশের দাঁত দুটো যেন একটু বেশী ধারালো আর তীক্ষ্ণ|কেমন একটা চাপা কিন্তু ভারী স্বরে বললো, “আমার বড় তেষ্টা পেয়েছে, বড় তেষ্টা |”প্রিয়াঙ্কা মুখ বাঁধা অবস্থায় , অবাক চোখে দেখল, মেয়েটা সেই ধারালো ছুরিটা বার করে তাতে লেগে থাকা প্রিয়াঙ্কার রক্ত আঙুলে ডুবিয়ে জিভ দিয়ে চেটে খাচ্ছে |

কি ভয়ানক, ওকি মানুষ না পিশাচ !এদিকে হাতের আহত জায়গায় ভীষণ যন্ত্রনা হচ্ছে, প্রিয়াঙ্কা এক ভয়ানক বিপদে পড়েছে, এ কার পাল্লায় পড়ল ও আজ !মেয়েটা এবার ওর দিকে তাকালো, এগিয়ে এসে ওর কেটে যাওয়া হাতে আবার ছুরি বসিয়ে রক্ত ঝরিয়ে দিল |তারপর হাতটা মুখে নিয়ে চুষে খেতে লাগলো রক্ত, প্রিয়াঙ্কা যন্ত্রনাতে অজ্ঞান হয়ে গেল প্রায় |

হঠাৎ মেয়েটা ওর মুখের বাঁধন আলগা করে তীব্র ভাবে কামড়ে ধরল ওর ঠোঁট, প্রগাঢ় চুম্বন শুরু করল |ঘৃণায় বমি উঠে এল প্রিয়াঙ্কার, কিন্তু কোনো মতে নিজেকে সামলালো ও |মেয়েটা আবার ওর মুখ বেঁধে দিল, মেঝেতে উঁবু হয়ে বসে কাঁদতে আরম্ভ করল, ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে আর বলছে, “আমি তো ছেলে, কিন্তু ওরা কেন মেনে নিলো না সেটা, জোর করে আমায়…. জানো আমার নিজের দাদা জোর করে আমায় রেপ করেছে, এটা প্রমান করতে চেয়েছে যে আমি মেয়ে, কিন্তু আমি একটা ছেলে |

“আবারো এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে প্রিয়াঙ্কাকে, গভীর আদর করতে থাকে আর বলে, “এই তো তুমি কত সুন্দর একটা মেয়ে, আমার তোমাকে খুবই ভালো লেগেছিল, তাই তো সেদিন তোমার পেছন পেছন এসেছিলাম, প্রতিদিন ছায়ার মত ঘুরি তোমায় দেখি দূর থেকে, আজ তুমি আমার তৃষ্ণা মেটাবে, কি মিষ্টি তোমার রক্ত !”

হঠাৎ আদর করতে করতে মেয়েটা সাপের মত হিসহিসিয়ে উঠে ওর গাল কামড়ে ধরলো, প্রিয়াঙ্কা যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠলেও মুখ বাঁধা থাকার কারণে চিৎকার করতে পারল না, একটা গোঙানি বেরোলো শুধু |মেয়েটা যেন এটা উপভোগ করে আরো জোরে কামড়ে ধরলো ওর গাল, তারপর গাল থেকে বেরোনো রক্ত চেটে খেতে লাগলো |

প্রিয়াঙ্কার সারা শরীর পাথর হয়ে যাচ্ছে ভয়ে, রক্ত যেন জল, মেয়েটা ছুরিটা নিয়ে এসে তীক্ষ্ প্রান্তটা আলতো করে ছুঁইয়ে দিতে লাগলো ওর সারা শরীরে |প্রিয়াঙ্কার চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো মা দুর্গার ফটোর দিকে, হঠাৎ ভেঙে পড়া মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠল, মনের জোর হারালে চলবে না|ওর চোখে পড়েছে একটা জিনিস, ও জানে না পারবে নাকি সেটাকে কাজে লাগাতে |

মেয়েটা বারবার ওর মুখের বাঁধন খোলাতে একটু আলগা হয়েছে সেটা,মেয়েটা আবার ঠোঁট নামিয়েছে ওর ঠোঁটে, প্রিয়াঙ্কা মাথা ঠান্ডা রেখে মায়াবী স্বরে বলল, “কে বলেছে তোমাকে কেও ভালোবাসে না, আমি খুব ভালোবাসবো তোমায় |”মেয়েটা থমকে গিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে দেখল ওকে, ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না ও কি বললো !

এমন সময় দুজনকে চমকে দিয়ে প্রিয়াঙ্কার মোবাইল বেজে উঠল দূরে পড়ে থাকা ব্যাগ থেকে, মেয়েটার চোখ জ্বলে উঠল রাগে, প্রিয়াঙ্কা বলল, “আমাকে ফোন টা ধরতে দাও না হলে কিন্তু ওরা আমার খোঁজে বাড়ি চলে আসবে এখুনি|”প্রিয়াঙ্কা মিথ্যে বললো আসলে ও জানে মা ফোন করেছেন নিশ্চিত ও কি খেলো তা জানার জন্য |

মেয়েটা একটু ভেবে ব্যাগ খুলে ফোনটা নিলো তারপর ওর হাতের বাঁধন খুলে ওর হাতে ফোনটা দিল, সত্যিই মা ফোন করেছেন, মেয়েটা ধারালো ছুরি ওর গলায় ধরে থেকে বললো, “বেশী চালাকি করবে না, তাড়াতাড়ি কথা বলো |”প্রিয়াঙ্কা দেখল এই সুযোগ, হয় বাঁচবে নয় মরবে |

ও ফোনটা নিয়ে ধরে জোরালো ভাবে আঘাত করল মেয়েটার থুতনির নিচে, ভারী স্মার্ট ফোনের আঘাতে মেয়েটা ছুরি হাতেই টলমল করে উঠল, প্রিয়াঙ্কা এক লাফে টেবিলের কাছে গিয়ে হাতে নিলো ওর চোখে হঠাৎ পড়ে যাওয়া ওকে বাঁচাবার একমাত্র সামগ্রী টা -জোরে ছুঁড়লো মেয়েটার চোখে|চিৎকার করে উঠল মেয়েটা যন্ত্রনায়, চোখ ঢেকেও তেড়ে আসতে গেল ওর দিকে |প্রিয়াঙ্কা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল বাইরে থেকে |

উফফ, ভাগ্যিস দেখতে পেয়েছিলো মায়ের রেখে যাওয়া লঙ্কার গুঁড়োর কৌটোটা |ওর মা লঙ্কা শুকনো করে মিক্সিতে গুঁড়ো করেন, একদম তাজা আর ভয়ঙ্কর ঝাল |প্রিয়াঙ্কা ছুটে বাইরে গিয়ে চিৎকার করতে লাগলো, “বাঁচাও, বাঁচাও |”ওর চিৎকার শুনে পাড়ার লোকেরা সবাই বেরিয়ে আসল, কোনো মতে প্রিয়াঙ্কা সব বললো ওদের |ক্লাবের ছেলেরাও এসে জুটলো, ওদের মধ্যে কেও একজন পুলিশ কে ফোন করে দিল |

তারপর পুলিশ এসে দরজা খুলে সেই ভয়ানক মেয়ে টাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তখন পাশবিক চেঁচিয়ে যাচ্ছিল ও |সবাই প্রিয়াঙ্কার সাহসিকতার আর উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করছিলো|তবুও কোথায় যেন প্রিয়াঙ্কার খারাপ লাগলো ঐ ভয়ঙ্কর মেয়েটার জন্যও, কোথাও যেন মেয়েটা ভালোবাসার কাঙাল, মেয়েটার যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তার জন্য তো ও দায়ী নয়, তারওপর ওকে কিনা ধর্ষিতা হতে হয়েছে ওর দাদার হাতে !সব মিলিয়ে ও পরিণত হয়েছে এক ভয়ানক মানসিক রুগীতে |সমাজ, সংসার বড় নিষ্ঠুর, ব্যতিক্রমীদের মানতে তারা এমন নারাজ, যে কত শত অপরাধীর জন্ম হয় এই কারণেই |

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: