দুলু দাদুর বাগান হানা — মান্তু বর্মন

 দুলু দাদুর বাগান হানা  --  মান্তু বর্মন
লখাই, পটাই দা, ভণ্ডা দা আর আমি পায়ে হেটে ফিরছিলাম স্কুল থেকে। আমাদের গ্রাম থেকে স্কুল প্রায় এক কিমি দূরে।গ্রামের মেঠো পথ ধরে আমরা স্কুল যাওয়া আসা করি।,পাকা রাস্তা নেই।সাইকেল অবশ্য আমাদের আছে।কিন্তু পায়ে হেটে সবাই এক সাথে  স্কুল যাওয়া আসার মজাটাই আলাদা।তাই আমরা সবাই সাইকেল নিয়েই স্কুলে যাতায়াত করি।

গ্রামের বহু ছেলেমেয়েরা অবশ্য অনকেই সাইকেল নিয়ে যায় বটে।কিন্তু আমাদের দলের আমরা সবাই একসাথেই যাই।ভণ্ডা দা আমাদের দলের ক্যাপ্টেন।লখাই আর আমি পড়ি ক্লাস সিক্সে, পটাই দা সেভেন আর ভণ্ডা দা দুই বছরের চেষ্টায় এবার ক্লাস এইট।ভণ্ডা দার লম্বা ছিপ ছিপে চেহেরা।কোঁকড়ানো চুল।চোখ গুলো দেখলে মনে হয় যেন কোন গোয়েন্দা।অজানা কোনো ছেলেছোকরা ভণ্ডা দা কে দেখলে তো ভয় পেয়ে যায়।কিন্তু ভণ্ডা দা আসলে খুবই রসিক ছেলে,তবে হ্যাঁ পাকামো বুদ্ধিতে কিন্তু ভণ্ডা দা কে অতিক্রম করা কঠিন।এদিকে পটাই দা হল যুক্তিবাদী।

পড়াশোনায় বেশ নাম ডাক।অনেক ভেবে একটা করে প্রশ্নের উত্তর দেবে কিন্তু যা দিবে তা সঠিক।পটাই দার উপস্থিত বুদ্ধি আমাদের বিগত অনেক অভিযান সফল করতে সাহায্য করেছে।ওদিকে লখাই আর আমি একেবারে নিচের সারিতে। হাঁটতে হাটতে আমরা এতক্ষনে আসে পৌঁছেছি আমাদের গ্রামের সম্মুখে।ওরে ,থাম, থামবলে ভণ্ডা দা হটাৎ চেচিয়ে উঠলো।আমরা ভণ্ডাদার অকস্মাৎ চিৎকারে হত ভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।কি ব্যাপার ভণ্ডা দা কোনো সাপ টাপ দেখলো নাকি? কি হল ভণ্ডা দা? ভণ্ডা দা দুলু দাদুর বাগানের দিকে হা করে তাকিয়ে বলল‘:পটাই, গুবলু ওরে দেখ রে দেখ কি পাকা পাকা পেঁপে রে,খেতে যে ভারী মজা হবে রেআমি আঙ্গুল উঁচিয়ে কিছু বলতে যাবো অমনি পটাই দা আমার হাত দুটি নামিয়ে দিয়ে বলল‘:আঙ্গুল তুলিস নে গুবলু,কেউ দেখে ফেলবে,পেঁপে গুলো যে আমাদেই সাবাড় করতে হবে।


একেবারে গ্রামের সম্মুখে ডান দিকটায় যে মস্ত মাটির প্রাসাদ টা ওটাই দুলু দাদুর বাড়ি। বাড়ির পাশেই রয়েছে এক মস্ত বড় বাগান।বাগানে রয়েছে গোলাপ,সাদাবাহার,করবী গাদা জুঁই আরো হরেক রঙের ফুল,সেই সাথে রয়েছে আম, লিচু কলা,পেয়ারা, পেঁপে আরো কত ফল!দুলু দাদুর এক ছেলে,এক মেয়ে।ছেলে বিদেশে গিয়ে মোটা মাইনের চাকরি নিয়েছে।


বছরে দুই একবার এসে গ্রামে কাটিয়ে যায়।মেয়ের বিয়ে হয়েছে শহরে।মেয়েও মাঝে মাঝে এসে দেখাশোনা করে যায়।তাই ওই মস্ত বাড়িটাতে দুলু দাদু আর ওনার পত্নী ব্যাতীত কেউ বাস করে না।কিন্তু তাতে কি @₹!দুলু দাদু যে সারাদিন জোঁকের মতো বাগানে পরে থাকে।বুড়ো সারাদিন গাছ গুলোর পরিচর্যা করবে। গাছ গুলো তে জল দিবে,কোন ফল টা বেশি পেকেছে সেটাতে কাপড় বেঁধে দিবে,কোন গাছ টা শুকিয়ে যাচ্ছে,তার যত্ন নেবে,এমন নানান কাজ নিয়ে বুড়ো বাগান টা তে বিচরণ করবে। 

গাছের পাকা আম,কলা,  পিয়ারা গুলো মটি তে গড়া গড়ি খায়।কিন্তু বুড়ো কিছুতেই বেচবে না।চাইতে গেলেই বলবেআমার গাছের ফল পড়ে থাকে তাতে তোদের কিমনে হয় গাছের ফুল ধরা,ফল ধরা, পাকা ফল এসব দৃশ্য উপভোগ করবার জন্যই বুড়োটা বাগান টা তৈরি করেছে।কিন্তু তাতে কি পাড়ার ছেলেরা লুকিয়ে চুপিয়ে যে কত ফলই খেয়ে নিচ্ছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

আমি বললাম:সে কি ভণ্ডা দা ধরা পড়লে তো বুড়োর লাঠির বাড়ি খেতে হবে।পটাই দা বলল:ধুর বোকা চুরি করে ফল খাবো,ধরা পড়ব কেন? ভণ্ডা দা বলল:’শোন, কাল রবিবার আছে,কাল আমাদের একটা লাঠি,একটা হাসিয়া আর কিছু দড়ি জোগাড় করতে হবে।তারপর সন্ধ্যার দিকে বাগানে ঢুকবো চুপি চুপি।পটাই দা বলল:তা তো বুঝলাম ভণ্ডা দা কিন্তু এসব আনবে কে? সবাই সবার মুখের দিকে তাকাতে থাকলো যেন কেউ এই দায়িত্ব নিতে রাজি নয়।অগত্যা লখাইয়ের দায়িত্ব পড়লো হাসিয়া আনা,আমার দায়িত্ব পড়লো দড়ি আর লম্বা লাঠি আনা। 

পটাই দা বলল:বেশ,তা হলে ওই কথাই রইলো,কাল দুপুরে সবাই বট গাছ তলার কালি মন্দিরে চলে আসিস, লাঠির মাথায় হাসুয়া বেঁধে রেডি করে রাখতে হবে তো। আমরা সবাই সম্মতি জানালাম, ভণ্ডা দা আবার একটা সাবধানী বাক্য প্রয়োগ করে বলল:”সাবধান এই খবর যেন কেউ না জানে,না হলে সব পন্ড হয়ে যাবে কিন্তুসবাই ঘাড় নাড়িয়ে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলাম।


পরের দিন যথা সময়ে আমরা এসে পূর্বপরিকল্পিত জায়গাতে এসে হাজির হলাম।আমাদের আনা লাঠি আর দড়ি দিয়ে হাসুয়া টা শক্ত করে বেঁধে দিলো ভণ্ডা দা।বাধা সমাপ্তি হলে বলল:’যে যেখানেই থাক সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই এখানে চলে আসিস সবাই।লখাই বলল:’ঠিক বলেছ ভণ্ডা দা, ওই সময় টা তে দুলু দাদু বাবলু কাকুর দোকানে চা খেতে যায়।ততক্ষণে ভণ্ডা দা নিজেই হাসুয়া বাধা লাঠি টা একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে আসলো। তারপর আমাদের যে যার মতো বাড়ি চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বাড়ি চলে গেল। তখন সন্ধ্যা ক্রমেই ঘনিয়ে আসছিল।

সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হতে বারণ।বাবাকে বললাম পটাই দার কাছে ইংরেজি বুঝে নিতে যাবো।বাবা সম্মতি দিতেই খাতা আর ইংলিশ বইটা নিয়ে দৌড় দিলাম।গিয়ে দেখি সবাই অভিযানে জন্য প্রস্তুত, শুধু আমার আসার বাকি ছিল।আমি পৌঁছতেই ভণ্ডা দা বলল:’লখাই তুই থাকবি ঠিক বাগানের গেট টার কাছে,যেই দিক দিয়ে দুলু দাদু বাগানে প্রবেশ করে,আর গুবলু তুই থাকবি বাগানের পিছনে আর আমি আর পটাই বেড়া ডিঙিয়ে ওপারে গিয়ে পেঁপে গুলো পেড়ে তোর হাতে দেব,’

আমি বললাম‘:আচ্ছা তাই হবে ভণ্ডাদাভণ্ডা দা আবার বললঃদুলু দাদু কে বাগানের দিকেআসতে দেখলেই গান ধরবি লখাই,কি রে পারবি তো? ‘ঠিক পারবো ভণ্ডা দা ‘:লখাই বলল।। তারপর পরিকল্পনা মতো আমরা যে যার মতো ঠিকানায় দাঁড়িয়ে পড়লাম।ভণ্ডা দা প্রাচীর ডিঙিয়ে পেঁপে পাড়তে লাগলো আর পটাই দা পেঁপে গুলো কুড়িয়ে আমার হাতে দিতে লাগলো।আমাদের কারো কাছেই কোনো আলো ছিল না।তাই সন্ধ্যায় চাঁদের আলোয় যে টুকু দেখা যাচ্ছিল তাই দিয়েই আমাদের অভিযান চলছিলো। এমন সময় কে রে ?কে রে?চোর ,চোর বলতে বলতে কে যেন সন্ধ্যার অন্ধকার ভেদ করে ভণ্ডা দার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো।তবে ওমন কর্কশ গলা যে দুলু দাদুর এই তা বেশ ঠাওর করা যাচ্ছিল।কিন্তু দুলু দাদু হলে তো লখাইয়ের সিগনাল দেওয়ার কথা।নিশ্চয় লখাই দুলু দাদুকে দেখে ভয়ে আগেই পালিয়েছে।


.আওয়াজ শুনে বাঁশের বেড়া ডিঙাতে গিয়ে পটাই দার প্যান্ট টা গেল বেড়ার একটা বাতার ছু চলো মাথায়।এদিকে দুলু দাদু তখন কাছে চলে এসেছে প্রায়।কোনো কারণবশত বুড়ো আজ চা খেতে যায় নি।পটাই দার প্যান্ট টা ওই বেড়াতে আটকে থাকলো।উলঙ্গ হয়েই পটাই দা দৌড়তে থাকলো। আর পিছু পিছু আমি।ঐ দিকে ভণ্ডা দা ডান দিকে বেড়ার পরেই যে পুকুর টা রয়েছে সেটাতে দিল লাফ।উলঙ্গ পটাই দার পিছে পিছে আমিও দৌড়তে শুরু করলাম।


দূর থেকে ভেসে আসছিল অসহায় ভণ্ডা দার গলা:’ওরে ,পটাই ,ওরে গুবলু বাঁচা ভাই, আমি যে পুকুরে ডুব দিয়ে নিলুমইত্যাদি ,ইত্যাদি। এই দিকে এই ঘোর আতঙ্কের মধ্যেও পটাই দার এই অসহায় অবস্থা দেখে হাসি থামাতে পারলুম না। পটাই দা গেঞ্জি খুলে প্যান্ট বানিয়ে বসে রইল মন্দিরের পিছনে ।আমি দৌড়ে গিয়ে পটাই দার বাড়ি থেকে প্যান্ট আনতে গেলাম।এসে দেখি ভণ্ডা দা কাদামাখা শরীরে পটাই দার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।ভণ্ডা দা আর পটাই দার এমন মূর্তি দেখে আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না।
ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: