নজরুলের গানের জগত : কিছু কথা -আবদুস সালাম

নজরুল বাংলা গানে যখন ঝড় তুলতে শুরু করেছেন তখন সমালোচনার ঝড় ও কম ওঠেনি। তিনি যখন গান নিয়ে মেতে উঠেছেন তখন তার সামনে বিখ্যাত তিনজন সঙ্গীত স্রষ্টা পথ রুদ্ধ করে বসে আছেন যেন।

 ১৯২০সাল তখন । ইতিমধ্যেই সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতে আসন পেতে শুরু করেছেন। এমনকি চারিদিকে ঝড়ের গতিতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছেন। এটা তখন অনেকেই  ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। এখানে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর মন্তব্য কেমন ছিল জানবো।”এই বৎসর কলকাতায় এসে দেখছি যে কাজী নজরুল ইসলামের গান দেশ ছেয়ে ফেলেছে।তার সুর ঠুংরী ও না গজল ও না । তাঁর দেওয়া অনেক সুর শুনতে ভালো লাগলেও সুর হিসেবে উচ্চশ্রেণীর নয়।”

     অচিরেই  কাজী সাহেব বিশিষ্ট কবি হিসেবে প্রসিদ্ধতা অর্জন করেছেন ।১৯৩০ সালে র পর থেকে তিনি কাব‍্যজগত থেকে সরে এসে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করতেই চারিদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

 অনেক ই বলেছেন “আমাদের সময় কাজীর গান বলতে বোঝাতো কতিপয় বাংলা গজল। কিন্তু জনপ্রিয়তা তাঁর কাল হল। তিনি দ্রুত গতিতে আর্টসৃষ্টি থেকে সরে  এসে রেকর্ড কোম্পানির নির্দেশিত লঘুরীতির গানে মনোনিবেশ করলেন।”রাজেশ্ব‍্যর মিত্র

আবার কেউ বলছেন “সুর সংযোজনার দিক থেকে নজরুলের ভাবনার অবকাশ বেশি ছিল না। সুরকার হিসেবে নজরুলের গভীরতা ও বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করা যায় না। কিছু রচনা আবেগ প্রধান, কতগুলো চটুল রূপান্তর।”সুকুমার রায়

 আবার কেউ বলছেন” আসলে নজরুলের কাব‍্যও গানে প্রজ্ঞা ও মননের অভাব আছে। ইতিহাস চেতনা ও আধুনিক জীবন বিক্ষোভের তেমন গূঢ় চিহ্ন নজরুলের গানে নেই।এই গানের সুর ও  গায়নভঙ্গী কিছুটা হালকা ও চটুল।”সুধীর চক্রবর্তী

১৯৩০থেকে ১৯৪২সাল দীর্ঘ তের বৎসর কাব‍্যজগত থেকে সঙ্গীত জগতে নিজেকে মগ্ন রাখলেন। তার যে কতো বড় আত্মত্যাগ তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। রুবাইয়্যাত ই ওমর খৈয়াম অনুদিত গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লেখেন “(১৯৩৩সাল) কাব্য লোকের গুলিস্তান থেকে সঙ্গীত লোকের রাগিনী দ্বীপে আমার দীপান্তর হয়ে গেছে। সঙ্গীত লক্ষী, কাব্য লক্ষী দুই বোন বলেই বুঝি ওদের মধ্যে এতো রেষারেষি। একজন কে পেয়ে গেলে আরেকজন বাপের বাড়ি চলে যান। দুই জনকে খুশি করে রাখার মতো শক্তি রবীন্দ্রনাথের মতো লোকের আছে।আমার সে সম্বল ও নেই শক্তি ও নেই।

“আবার ১৯৩৬সালে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনী তে সভাপতির অভিভাষনে তিনি বলেছিলেন”আমি বর্তমানে সাহিত্যের সেবা থেকে, দেশের সেবা থেকে,কওমের খিদমতগারী থেকে অবসর গ্রহণ করে সঙ্গীতের প্রশান্ত সাগরদ্বীপে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দন্ড গ্রহণ করেছি”। আত্মনিবেদনের আত্মবিগলিত উচ্চারণ থেকে অনুভব করতে পারি তিনি সঙ্গীত জগতের কোন সমুদ্রে ডুবে যেতে চেয়েছিলেন।

তবে এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে তার উদ্দাম ও বেহিসাবি জীবন যাপন নিষ্ঠা সহকারে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করার মতো সময় ও ধৈর্য কোনটাই  তার ছিলোনা। এমন কি তার নিজের রচিত গান গুলোর প্রতি ও উদাসীন ছিলেন।এমন কঠোর সমালোচনা ও তাকে শুনতে হয়েছে। এসবের তিনি তোয়াক্কা কোনো দিন করেন নি।

কবির ঘনিষ্ঠ সহচর জগৎ ঘটক বলেছেন  “কবির সম্পর্কে অনেকেই একটা ভুল ধারণা পোষণ করে এসেছেন, কবি যেন আড্ডা আর মজলিসের মধ্যে গানের জন্ম দিয়ে ক্ষান্ত হতেন, সঙ্গীত সম্পর্কে তার কোনো নিভৃত চিন্তা বা নেপথ্য প্রস্তুতি কিছু ই থাকতো না।

 কবিকে আমি তন্ময় হয়ে সঙ্গীত গ্রন্থ পাঠ করতে দেখেছি, দেখেছি  নির্জন পরিবেশে মনের মতো সুর উদ্ভাবনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম, দেখেছি আহার নিদ্রা বিশ্রাম ভুলে সঙ্গীতের ধ‍্যানে মগ্ন অবস্থা, একদিন শুধু নয় দিনের পর দিন!” নজরুল গীতি অন্বেষা  _ জগৎ ঘটক

তার গানের খাতার অসংখ্য কাটাকুটি প্রমাণ করে যে তিনি দায়সারা ভাবে গান লিখতেন না । যতক্ষণ গানের কথা তার সুমিতিবোধকে তৃপ্তি না দিতো । একই গানের বিভিন্ন কথা তার প্রমাণ ( সাময়িক পত্রিকার পাতায়, গীতি সংগ্রহে এবং রেকর্ডের গানে)। জগৎ ঘটক আবার বলেন তার ছিল অনেক খাতা, একটা শেষ হলে আরেক টা নিতেন। একটা ড্রাফট খাতা অন‍্যটি ফেয়ার খাতা।সাথী ছিল একটা চামড়ার ব্যাগ।

তিনি আরো বলেন খাতাগুলো যত্ন করে বাড়িতে রাখা ছিল। আকষ্মিক অসুস্থতার কারণে ও পারিবারিক বিপর্যয় কবির গানের প্রতিভার স্বীকৃতি হারিয়ে যায়। এগুলো কে নিয়ে অনেকেই নিজের বলে চালিয়ে ও দিয়েছেন। অনেকে তার থেকে টাকা উপার্জন ও করেছেন।

নজরুলের গান প্রসঙ্গে অনেক আলটপকা মন্তব্য করেন যে নজরুলের বোহেমিয়ান চরিত্র নাকি এর জন্য দায়ী। আরো বলেন গানের সংরক্ষণে অবহেলা ও সুরের চটুলতা গান   হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। বিশের দশকে নজরুল গীতির প্রচার তখন তুঙ্গে। বিভিন্ন সাময়িক পত্র পত্রিকায় তাঁর প্রশস্তি মুক্ত কন্ঠে করে চলেছেন। সবাই তখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

নজরুলের সুরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা যেতে পারে তাঁর সুরের কাঠামো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (  রাগসঙ্গীত )প্রবর্তনায় গঠিত। তিনি রাগ সঙ্গীত শৃঙ্খলার মধ্যেই বাংলা কাব্য সঙ্গীতের মুক্তি খুঁজছেন। একদিক থেকে দেখতে গেলে বাঙলা সঙ্গীতের মুক্তি ঘটেছে নজরুলের হাত ধরে রাগমিশ্রণের মধ‍্য দিয়েই।

এখানে কৃষ্ণধন বন্দোপাধ্যায় এর মত অনুযায়ী বলা যেতে পারে “একরাগে একটা গানের সকল রস প্রকাশিত হতে পারে না , কারণ  অনেক স্থলে একটি কলির মধ‍্যেই বিবিধ ভাবের সমাবেশ হয় ,তাহা একাধিক রাগ ব‍্যাতিত উচিত মতো পরিব‍্যাপ্ত হইতে পারে না। কিন্তু কলাবিৎ সঙ্গীত বেত্তারা এক কলির মধ্যে বহু রাগের সংযোগ নিতান্ত দুষ‍্য মনে করেন।”

 সেযুগের ওস্তাদদের গোঁড়ামির অচলায়তন থেকে বাঙলা গানের মুক্তি ঘটাতে রবীন্দ্রনাথ , নজরুলের  মতো পথীকৃতদের প্রয়োজন ছিল। কবিগুরু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়মকে লঙ্ঘন করতে দ্বিধাবোধ করেন নি । কিন্তু কাজী সাহেব শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা মেনেই বাংলা গানের  মুক্তি ঘটাতে পেরেছিলেন। নজরুলের উদ্ধৃতি এখানে তুলে দিলাম।”তিনি বলেন আধুনিক গানের সুরের মধ্যে যে অভাবটি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি তাহলে হচ্ছে সিমিট্রি (সামঞ্জস্য)ইউনিফরমিটি( সমতা)র অভাব ।কোন‌ রাগ বা রাগিনীর সঙ্গে অন‍্য রাগরাগিনর  মিশ্রণ ঘটাতে হলে সঙ্গীত শাস্ত্রে যে সুক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার তিনি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলেন ।

রাগরাগিনী যদি তার গ্রহ ,ন‍্যাস এবং বাদী বিবাদী ও সংবাদী মেনে নিয়ে বিচরণ করে তাহলে তাতে কখনো সুরের সামঞ্জস্যে অভাব হবে না”।এই উদ্ধৃতি থেকে সহজেই আমরা বাংলা গানের পরিপাটি সাধনে তিনি কতো বেশি সচেতন  ছিলেন। কবিগুরু বাংলা গানের মুক্তি সংগ্রামে গানের ভাব অনুযায়ী বিভিন্ন রাগের সংমিশ্রণের কথা ভেবেছেন ।কিন্তু নজরুল ভেবেছেন রাগরাগিনী কে সঙ্গে নিয়ে বাংলা গানের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। এবং তার করে ও দেখিয়েছেন। সংগ্রাম যেন তার পিছু ছাড়ছে না।

চলার প্রতি পদক্ষেপে শুধু সংগ্রাম , কবিতা, গান এমনকি সাংসারিক জীবনে চলার প্রতি পদক্ষেপে লেপ্টে আছে। পুরাতন ভাবনা কে ভেঙে নতুন পথে চলতে চেয়েছেন।এর জন্য কবিকে মূল্য ও কম দিতে হয়নি।রাগ সঙ্গীতে যেহেতু সুরের সামঞ্জস্য বেশি সাধিত হয় তাই তিনি সুনির্দিষ্ট প্রকরণ মেনে, সুসামঞ্জস‍্যের পরাকাষ্টা হিসেবে রাগ সঙ্গীত কে মডেল হিসেবে ধরতে চেয়েছিলেন। নজরুল রাগের সুনির্দিষ্ট প্রকরণ মেনে সামঞ্জস্যতা যদি খুঁজে পান তবে দোষের কি হতে পারে । আর এজন্য প্রয়োজন বহু রাগ রাগের মিশ্রিত রূপ। এগুলো কে তো সঙ্গীত শাস্ত্রে” ছায়ালগ” ও  “সঙ্কীর্ণ “বলা হয় পন্ডিত সোমনাথ এ কথা বলেছেন।

তিনি যেটা সাফল্যের সাথে করতে পেরেছিলেন তা হলো আবির্ভাব ও তিরোভাব। দুটি রাগ কে মিশ্রিত করে ছায়ালগ ও দুই এর বেশি রাগকে মিশিয়ে সঙ্কীর্ণ , সংকীর্ণ শ্রেণীর রাগের অপূর্ব সমাবেশ তিনি ঘটাতে পেরেছিলেন।সবক্ষেত্রেই রাগ মিশ্রণে সুরের সামঞ্জস্য বিধান জরুরি,যা তিনি অবলীলায় করে গেছেন।রাগ সঙ্গীতের অন‍্যান‍্য ধারা যেমন ( রাগমালা ,ঠুংরী, রাগসাগর ,ধুন) এগুলো কিন্তু সবই মিশ্রিত রাগের ফসল।

       তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কাব্য গীতির সুর সৃষ্টির প্রধান উপায় হলো সার্থক রাগ মিশ্রণ যা তিনি অবলীলায় তার প্রয়োগ করেছিলেন।এই উদ‍্যেশ‍্য সাধনের জন্য রাগসঙ্গীতের বহু পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এগিয়ে গেছেন । নজরুল তাঁর সুরের সৃষ্টিতে তিন টি প্রধান উপায় কে অবলম্বন করে এগিয়ে গেছেন।এই তিন টি উপায় হলো রাগমিশ্রণ, নির্দিষ্ট রাগের রূপ গ্রহণ ও নবরাগ সৃজন ‌।

    রাগ মিশ্রণে কবি অতীব দক্ষ ছিলেন। ১৯২০ সালে রচিত “বাজাও প্রভু বাজাও ” গানে “বসন্ত ও সোহিনী “এই দুই রাগের অপূর্ব সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।১৯২৭সালে রচিত “কেন কাঁদে প্রাণ কি বেদনায়”গানে তিনটি রাগের মিশ্রিত রূপ অবলীলায় গ্রহণ করেছেন।এই রাগ গুলো হলো বেহাগ,তিলককামোদ ও খাম্বাজ।

এই গানের  স্বকৃত স্বরলিপি প্রকাশ করেন বিখ্যাত সঙ্গীত সমালোচক দিলীপ কুমার রায়। এটি প্রকাশিত হয় ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যা তে ১৯২৮সালে( ১৩৩৫)।এই সংখ্যা তে তিনি প্রথম নজরুল ইসলামের গান নিয়ে আলোচনা করেছেন। (লিখেছেন প্রথম লাইনে তিলককামদের ছায়া অতীব মনোরম। দ্বিতীয় লাইনে তৎসঙ্গে বেহাগ বড়ো সুন্দর মিশিয়াছে।

তার পর “সে থাকে   —–ঘুরে মরে “অংশে একটি উর্দু গজলের সুরের আমেজ চমৎকার আসিয়াছে। বাংলা গানে এরূপ গজলের সৌরভের আমদানির জন্য সত‍্য সঙ্গীতানুরাগী মাত্রই কবি কাজী নজরুল ইসলাম মহাশয়ের নিকট কৃতজ্ঞ বোধ করিবেন। “কাজল করি—- সে চুরি ” অংশে বিশুদ্ধ খাম্বাজের মিশ্রণে মধুরতা হৃদয় স্পর্শী হইয়াছে।) এখানে তিনি সুরের কাঠামো ওস্বর সমারোহের পদ্ধতির উপর জোর দিয়েছেন বেশী। নজরুলের কথায় ক্লোজ ক্রিটিসিজিম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

 ১৯৩৪ সালে র এপ্রিল মাসে মিস লীলা গেয়েছেন “উঠেছে কি চাঁদ সাঁঝ গগনে” এখানে পিলু,ভীমপলশ্রী, আবার পিলু আবার মুলতানি  এগুলো সবই নজরুলের নিজস্ব ভাবনা র প্রকাশ। তিনি বাংলা গানের মুক্তি দিতে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলেছেন। বিভিন্ন রাগের মিশ্রিত রূপ কে ব‍্যবহার করেছেন। জাহাঙ্গীর নাটকের “রং মহলের রং মশাল মোরা, আমরা রূপের দীপালি”গানটি তে ভৈরবী ,আশাবরী ও ভূপালি রাগের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন অবলীলায়। ‘পাষাণের ভাঙালে ঘুম’ গানটি সুন্দর।

স্বয়ং নজরুল গেয়েছিলেন ১৯৩২এর সেপ্টেম্বর মাসে মেগাফন কোম্পানি তে । এতে ভীষণ,যোগ রাগ , পাহাড়ী র ছায়া ,যোগ ছিল।সবকে ধরে এনে এক ঘাটে জল খাওয়াতে গেলে যে এলম এর দরকার তা তার ছিল বলেই এমন দূরুহ কাজ  করতে পেরেছিলেন। এখানেই নজরুলের বিশেষত্ব।

 নির্দিষ্ট রাগের ভিতরে ও গতানুগতিক রূপকল্প থেকে বেরিয়ে এসে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে  বিবাদীস্বর বা আগন্তুক স্বরকে অভিনব ভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। আবার তিনি কখনো কখনো বিরল ঘরানার অপ্রচলিত রাগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। “আজি এ শ্রাবণ নিশি কাটে কেমনে “

গানটি মিয়া কি মল্লার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুরুতে মিয়া কি মল্লার এর শুদ্ধতা বজায় রাখেন নি ।ব‍্যতিক্রমি বিন‍্যাস অবলম্বন করেছেন। অনেক গুনী জন গানটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন তিনি রাগ ভ্রষ্ট হয়েছেন।এই অপবাদ তাকে হজম করতে হয়েছে। দরবারী কানাড়া রাগ সংযোজন করেছেন ,মিয়া কি মল্লার কে টেনেছেন। এই রকম অজস্র গানে যখন খুশি  যেমন খুশি যে কোন রাগরাগিনীকে নিজের গৃহিণীর মতো ব‍্যাবহার করেছেন। এখানেই নজরুলের বিশেষত্ব।

   নজরুল তাঁর জীবনের শেষ পর্বে প্রায় সতেরটি নতুন রাগ তৈরি করেছিলেন। তিনি কেন যে নতুন রাগ সৃষ্টির উল্লাসে মেতে ছিলেন তা নিয়ে অনেক মতভেদ থাকলেও প্রচলিত রাগের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে মৌলিক ছাঁদ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তা  কিন্তু স্পষ্ট। সুরের সন্ধানে সম্পূর্ণ মৌলিকত্ব আনার চেষ্টা করে গেছেন। কবিগুরুর ঘরানা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আঙ্গিকে তিনি যে গানের জগত আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন তার গানের ইতিহাসে বিরল । 

তার গানের জগতে বিচরণ নিয়ে আলোচনা অনেক অনেক হওয়া জরুরী। তাঁর অবদান আমাদের কে ভাবতে প্রেরণা যোগায়। প্রায় ৪০০০চারহাজার গান আমাদের উপহার দিয়েছেন।১৭০০সতেরশো গান রেকর্ড করা হয়েছে।যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

 তার নিজের কথায় ১৯৩৮সালে জনসাহিত‍্য সংসদের ভাষনে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন “সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তার আমার জানা নেই তবে এটুকু মনে আছে, সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি। সঙ্গীতে যা দিয়েছি সে সম্বন্ধে আজ কোন আলোচনা না হলে ও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে তখন আমার কথা সবাই মনে করবেন ___এবিশ্বাস আমার আছে। “

১৯৩৮সাল ।অখন্ড বাংলা র প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক সাহেব দৈনিক নবযুগ পত্রিকা প্রকাশ করেন। সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ভার দেন নজরুল ইসলামের উপর। এই সময় তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা স্কুলের হেডমাস্টার মশাই বরদা চরণ মজুমদার কে গুরু ধরেছেন। তিনি নজরুল কে তন্ত্রমতে কুলকুন্ডলীর জাগরণ শেখাচ্ছিলেন । পরিণামে তিনি ভারসাম্য হারালেন এবং নির্বাক হয়ে গেলেন। আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে আমরা বিরল প্রতিভাধর এক ব‍্যক্তিকে অকালে হারালাম।

 

তথ্য সূত্র____

নজরুল গীতি অন্বেষা     জগৎ ঘটক

নজরুল স্বরলিপি          ব্রহ্মমোহন ঠাকুর

বাঙলা গানের ক্রম        দিলীপ কুমার রায়

আজকাল কার গান       ধুর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়

আমার দেখা বাঙলা গানের জগৎ       রাজ‍্যেশ্বর মিত্র

নজরুল গীতি সংকটের উৎস             সুধীর চক্রবর্তী

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: