নতুন রহস্য ধারাবাহিক —শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // পর্ব – ৫

Subrata Majumdar
বিক্রম অঘোরবাবুর দুটো হাত চেপে ধরে একদম নরম গলায় বলল,” রাগলে কিন্তু আপনাকে দিব্যি লাগে। ”  বিক্রমের কথা শুনে আমি আর হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। আমার হাসির আফটারশকে অঘোরবাবু আরো খাপ্পা হয়ে গেলেন। দেবলীনা তখন মুখ খুলল।
” আসলে আপনি যা ভাবছেন তা নয় কাকু,ক্রিস্টাল ড্রাগনটা যার যার কাছে ছিল রহস্যজনকভাবে তার  তার শরীরেই ওই মিস্ট্রিয়াস ড্রাগটার ট্রেস পাওয়া গেছে । অবশ্য বিক্রমের মুখে কেসটার সন্মন্ধে যা শুনেছি তা হতেই আমার এই ধারণা।”
 
দেবলীনার কথায় সন্মতি জানিয়ে বিক্রম বলল, “একদম ঠিক। আমি ড্রাগনটারও টেস্ট করিয়েছি, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। দাশগুপ্তর মতে এই ড্রাগনটার উপাদানের সাথে পরিবেশের বিশেষ কিছু উপাদানের বিশেষ বিশেষ শর্তে বিক্রিয়া ঘটে ড্রাগটার সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও সবটাই অনুমান।”
এতক্ষণে অঘোরবাবু শান্ত হয়ে বসলেন। দেবলীনা বলল,”তোমরা কথা বল, আমি ভেতরে গিয়ে মাধবদাকে একটু হেল্প করি। “
 
দুপুর বেলায় জমিয়ে ভোজ হলো। উঁহু ভোজেরও বড়বাবা। বড়লোকের আদুরে মেয়ে হলেও রান্নায় হাত যথেষ্টই ভালো দেবলীনার। খাওয়া দাওয়ার শেষে একটা পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে অঘোরবাবু বললেন, “মা আমার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, অনেকদিন পর এমন তৃপ্তি করে খেলাম। “
 
 
                                              –তিন–
 
             টানা দু’দিন পর বিক্রমের বাড়িতে এলাম। এক বন্ধুর বিয়েতে ব্যস্ত ছিলাম এ দু’দিন। বন্ধু ছাড়তে চাইছিলো না। আমিও বেশ আরাম আয়েশেই দিন কাটাচ্ছিলাম। ঠিক এমন সময় অঘোরবাবুর ফোন এল।
“কে, সায়ক ? “
 
“হ্যাঁ, অঘোরবাবু আমি সায়ক বলছি। কেমন আছেন বলুন।”
অঘোরবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “ভালো নেই। এখানকার খবরাখবরও ভালো নয়। কাল রাতে বিক্রমের ঘরে চোর পড়েছিল, ড্রাগনটা নিয়ে গেছে। তুমি পারলে একবার এস।”
আমি আর দেরি করিনি, সোজা চলে এসেছি এখানে। এসে দেখি বিক্রম একমনে খবরের কাগজ পড়ছে । আমি বললাম,” বাড়িতে নাকি চুরি হয়েছে শুনলাম।”
 
“ঠিকই শুনেছ, তবে চুরি নয় ডাকাতি। ” বিক্রম পেপার হতে নজর না সরিয়েই জবাব দিল। আমি অবাক হয়ে বললাম,”ডাকাতি ! কিন্তু অঘোরবাবু যে বললেন চুরি।”
বিক্রম এবার পেপারটা টেবিলের উপর নামিয়ে টেবিলের উপর হতে একটা কাগজের টুকরো আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,” পড়ো, পড়লে সব বুঝতে পারবে। ” 
 
 
হাত বাড়িয়ে কাগজটা তুলে নিলাম। লাইনটানা খাতা হতে ছিঁড়ে নেওয়া একটা পাতায় বেশ স্পষ্ট করে লেখা। আমি পড়তে শুরু করলাম।
বিক্রমবাবু,
 
 
             বিজয়ার চিঠি আমি লিখতে বসিনি তাই প্রণাম ভালোবাসার আদিখ্যেতা আর করলাম না, সরাসরি আসল কথায় আসি। আপনি আমাকে না চিনলেও আপনার খবরাখবর ইদানিং আমি রাখি। সিকিম ভ্রমণ আপনার জন্য সুখকর হলেও আমার জন্যে যথেষ্টই লোকসানদায়ক ছিল। মৃগাঙ্ক সেনের কি পরিণতি হয়েছে সেটাও আমার অজানা নয়। আপনার আর আমার পথ একটাই, যদিও দুজনের উদ্দেশ্য দু’রকম। আমি চাই আপনি তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। শুভেচ্ছা রইলো।
 
 
পুনশ্চঃ- এটা জানাতে আমার কষ্ট হচ্ছে যে অঘোরবাবুকে আমার লোকেরা অপহরণ করেছে। আপনি সঠিক পথে অগ্রসর হলে সঠিক সময়ে অঘোরবাবুকে আমরা ছেড়ে দেব।  এই চিঠির সঙ্গে একটা চিরকূট পাবেন যেটা আপনাকে রহস্যের কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে যাবে। “
 
 
চিঠিটার সঙ্গে একটা  চিরকূট পাওয়া গেল। এটাকে চিরকূট বলা ভুল, কারন এটা  একটা কাগজের টুকরোর উপর কোন তালপাতার পুঁথির একটা পাতার জেরক্স। পাতাটির উপর একটা গোল চক্র আঁকা, চক্রের উপর কতগুলো সংখ্যা ও চিহ্ন আঁকা আছে। চক্রের নিচে একটা ছোট্ট ছড়া। 
      ছলনার ছন্দে মায়ার মায়ায় 
      বিশ্বের বিশ্বাস লুটায় ধুলায়। 
      মুগ্ধ দু’খানি পশু বহ্নি ছড়ায়, 
      মুন্ড কাটিয়া দেখিলে মড়ায়। 
 
 
বিক্রম আমার দিকে কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কিছু বুঝলে ?”   আমি বললাম, “এ তো সত্যি সত্যিই ডাকাতে চিঠি। কিন্তু অঘোরবাবুকে ওরা আটকে রেখে থাকলে আমাকে ফোন করল কে ?” 
বিক্রম বলল, “অবশ্যই অঘোরবাবু। ডাকাত সর্দার যথেষ্টই জ্ঞানী ও বিচক্ষন, উনি চান তুমি এই কেসে আমার সহকারী হও। তাই অঘোরবাবুকে দিয়ে তোমাকে ফোন করিয়ে দুটো উদ্দেশ্য সাধন করছেন। এক, তোমাকে ডেকে আনা ; দুই, অঘোরবাবু যে বহাল তবিয়তে আছেন তা জানিয়ে দেওয়া। “
” কিন্তু তাহলে অঘোরবাবুকে দিয়ে তোমাকে ফোন করালো না কেন ? “
 
 
বিক্রম  বলল,” তাহলে তো ডাকাত সর্দারের অনেক তথ্য আমার হাতে চলে আসত, ডাকাত সর্দার সেটা ভালোকরেই জানেন। অঘোরবাবু কথার মাঝে কোন ক্লু দিলে সহজেই বুঝতে পারতাম, বা ধরো পারিপার্শ্বিক আওয়াজ হতে জায়গাটা সন্মন্ধে একটা ধারণা আসত। তাই মহানুভব রিস্ক নেননি ।
 
বিক্রম এবার উঠে দাঁড়াল, এরপর বার দুয়েক পায়চারি করার পর আবার চেয়ারে এসে বসল। খুব গভীর চিন্তায় যে সে মগ্ন তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমিই নীরবতা ভঙ্গ করলাম।   “নক্সা আর ছড়ার ব্যাপারটা কিছু বুঝলে ? “
বিক্রম গম্ভীর হয়ে বলল,” হুমম্ ! নক্সাটা কোনও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ডায়াগ্রাম জাতীয় কিছু হতে পারে। তবে ছড়াটার মানে আমি বের করেছি। প্রত্যেকটা লাইনের প্রথম অক্ষর যোগ কর.. “
“ছ বি মু মু, কিন্তু ছবিমুমুর মানেটা কি ?”
 
 
বিক্রম মাথা দোলালো, “উঁহু, ছবিমুমু নয় । শেষের লাইনটা ভালোকরে পড়ো, মড়ার মুণ্ড কাটতে বলছে। ‘মড়া’ শব্দের মুণ্ড অর্থাৎ মাথা কাটলে থাকে ‘ড়া’। তাহলে দাঁড়াল… “
” ছবিমুড়া। ” আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিই। বিক্রম বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে বলল,” ওয়েল ডান। এই ছবিমুড়াই আমাদের গন্তব্য। আমি গুগল সার্চ করে দেখে নিয়েছি, ছবিমুড়া একটা পর্যটনকেন্দ্র। জায়গাটা ত্রিপুরার গোমতী জেলার অমরপুর সাবডিভিশনে অবস্থিত। চলো ওখানে গিয়েই দেখা যাক। নেহানবাবু যা টাকাপয়সা দিয়ে গিয়েছেন তাতে টাকাপয়সার কমতি নেই। সায়ক, তুমি বরং ঝটপট একটা গাড়ির ব্যবস্থা কর। “
 
 
আমি বেরিয়ে পড়লাম। কথায় বলে ‘ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়’, হলোও তাই। বাড়ি ফেরার পথেই সেই ট্রাভেল এজেন্ট বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেলো। কথায় কথায় ওকে বললাম ছবিমুড়া যাওয়ার কথা। সব শুনে ও বলল,”ছবিমুড়া যাবি তো, নো প্রবলেম। আমি খুব সস্তায় গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যাওয়া আসা হল্ট সবকিছু। আমার জানা একটা ছেলে আছে, ড্রাইভার, আপাতত বসেই আছে, ও যাবে। আর গাড়ির ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। তুই কেবল তেলের দাম, ড্রাইভারের বেতন আর খাইখরচ দিস।” 
 
 
সবকিছু ফাইনাল করে বাড়ি চলে গেলাম। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে কালকেই রওনা দেব। গোছগাছ সেরে রাখি, সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে। 
খুব সকালেই বিক্রমের বাড়িতে চলে এলাম। দেখি দেবলীনাও হাজির। বিক্রম চুপি চুপি বলল,”দেবলীনা মনে হচ্ছে সঙ্গ ছাড়বে না, সকালেই এসে হাজির। আর ও যাওয়া মানেই আমার কপর্দকশূন্য হওয়ার পালা।”
আমি বললাম, “তোমার কিপটেমি সন্মন্ধে এতদিন শুনেছিলাম, আজ নিজের চোখে দেখছি। সত্যি তুমি পারোও মাইরি।”
 
 
দেবলীনা আমাদের কথোপকথনের বিষয়বস্তু আঁচ করতে পেরে বলল, “বাপি ঠিকই বলে, আমার চয়েসটাই ভুল। অন্যেরা তাদের প্রেমিকাকে লংড্রাইভে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে ওঠে, আর তুমি…”
“আমি ভীষণ কিপটে ডারলিং। তোমার বাবাও কিন্তু আমার চেয়ে কম যান না, এত বছরে যতবারই এসেছেন প্রত্যেকবার খালিহাতে। একপিস মিষ্টিও কেনার সামর্থ্য হয় না। ” বিক্রম দেবলীনার কথার জবাব দেয়। এদিকে ওদের মাঝখানে পড়ে আমার যথেষ্টই অস্বস্তি লাগছে। ঝগড়া যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই গাড়ির হর্নের তীব্র আওয়াজ কানে এল। গাড়ি এসে গেছে।
 
গাড়ির ড্রাইভার চন্দন সাঁতরা খুবই ভালোমানুষ। অনেকদিন ধরেই হাতে কাজ না থাকায় বেশ বিমর্ষ ছিলেন তিনি। হঠাৎ কাজটা পেয়ে আনন্দে বিহ্বল হয়ে উঠলেন । অ্যাডভান্স হিসাবে বিক্রম ওকে চার হাজার  টাকা দিল। বিক্রমের মতো কৃপণের হাত হতে এতগুলো টাকা বেরোতে দেখে যথেষ্টই অবাক হলাম।
গাড়ি চলতে শুরু করলো। শ্রাবণের অবিশ্রান্ত বারিধারা চারপাশের দৃশ্যপটকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। মাঠের কচিধানের চারাগুলি অনবরত মাথা নেড়ে বর্ষণের প্রবল প্রতাপ হতে বাঁচার চেষ্টা করছে। কিছুটা এগিয়ে মিললো ঝকঝকে রোদের দেখা, আবার একটু পরেই ঝরঝর বরিষণ। এইভাবেই চলছে।
 
নুতনহাটের কাছাকাছি আমাদের গাড়ি থামল। রাস্তার ধারে পাশাপাশি দুটো লাইন হোটেল। ওরই একটাতে ঢুকলাম। হোটেলে খরিদ্দার নেই বললেই চলে। হোটেল মালিক জানাল, চারদিন বন্ধ থাকার পর আজই হোটেল খুলেছে, সময় দিলে মাছের ঝোল ভাত রেঁধে দিতে পারে। বললাম, “চারজনের মতো খাবার বানিয়ে ফেলুন। আমরা বসছি।”
 
প্রায় ঘন্টাখানেক লাগল। গরম গরম ভাত,ডাল, আলু-ভাজা, লাউয়ের তরকারি আর মাছের ঝোল। খাবার যথেষ্টই সুস্বাদু।
 
 
 
… চলবে 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *